শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতার দুর্গাপুজোয় (Durga Puja) মণ্ডপ মানেই শুধু দেবী প্রতিমার দর্শন নয়, ইতিহাস, শিল্পকলা ও স্থাপত্যের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও। সেই ধারাতেই এ বার প্রাচীন ভারতের স্তম্ভ স্থাপত্যকে কেন্দ্র করে অভিনব ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে বড়িশা ক্লাবের (Barisha Club) দুর্গাপুজো। ২০২৬ সালের পুজোয় তাদের থিম ‘কালরেখা: দ্য স্টোরি অফ ভার্টিক্যালস’ (Kaalrekha: The Story of Verticals)। প্রাচীন ভারতের মুক্তস্তম্ভের বিবর্তন, স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য ও সময়ের সঙ্গে তাদের বহন করে চলা ইতিহাসকে মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মৌর্য ও গুপ্তযুগের বিশাল প্রস্তরস্তম্ভ থেকে শুরু করে স্তম্ভের আদিরূপ, ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাকে শিল্পের ভাষায় ফুটিয়ে তোলাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল। থিমের পরিকল্পনায় রয়েছেন দীপ দাস (Deep Das) ও ঈশিকা চন্দ্র (Ishika Chandra)। প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সায়ক বসু (Sayak Basu)। তাঁদের পরিকল্পনা অনেকটাই স্বার্থক বলে মনে করছেন দর্শনার্থীরা।

আরও পড়ুন : The Cooperative Ground Durga Puja Samity – Golden Jubilee Celebration 2025
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে স্তম্ভ কেবল স্থাপত্যের একটি উপাদান নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উল্লম্ব নির্মাণগুলি হয়ে উঠেছে শাসনব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পাথরের গায়ে খোদাই করা লিপি, স্তম্ভের গঠন, তার মাথার অলংকরণ এবং নির্মাণশৈলীর মধ্যে দিয়ে অতীতের নানা অধ্যায় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এক একটি স্তম্ভ যেন বহন করে চলেছে নির্দিষ্ট সময়ের শিল্পবোধ, কারিগরি দক্ষতা এবং মানুষের জীবনযাপনের চিহ্ন। বড়িশা ক্লাবের এ বারের পুজোয় সেই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নানা দিকই নতুনভাবে উপস্থাপিত হতে চলেছে। ‘কালরেখা’ নামটির মধ্যেও রয়েছে সময়ের ধারাবাহিকতার ভাবনা। সভ্যতার পরিবর্তনের সঙ্গে বহু স্থাপত্য হারিয়ে গিয়েছে, বদলে গিয়েছে নগর ও জনপদের চেহারা। কিন্তু কিছু নির্মাণ আজও অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। ভারতের প্রাচীন মুক্তস্তম্ভগুলিও তেমনই ঐতিহ্যের ধারক। মাটি থেকে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া তাদের অবয়বের মধ্যে যেমন রয়েছে স্থাপত্যের দৃঢ়তা, তেমনই রয়েছে প্রতীকী তাৎপর্য। এই ঊর্ধ্বমুখী গঠনকে কেন্দ্র করেই ইতিহাস, শিল্প এবং আধ্যাত্মিক ভাবনাকে একই পরিসরে আনার চেষ্টা করছে বড়িশা ক্লাব।

প্রাচীন ভারতীয় স্তম্ভ স্থাপত্যের আলোচনায় মৌর্যযুগের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে। সম্রাট অশোকের (Ashoka) আমলে নির্মিত স্তম্ভগুলি ভারতীয় শিল্প ও ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন স্থানে পাওয়া এই স্তম্ভগুলির গায়ে খোদাই করা লিপি থেকে তৎকালীন শাসননীতি, নৈতিক আদর্শ এবং সমাজ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। পালিশ করা পাথরের গঠন, কারুকাজ ও স্তম্ভশীর্ষের নকশা প্রাচীন ভারতের ভাস্কর্যকলার উৎকর্ষের পরিচয় বহন করে। পরবর্তী সময়ে গুপ্তযুগেও ভারতীয় শিল্প, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। এই দীর্ঘ শিল্পযাত্রার বিভিন্ন দিককে মণ্ডপের নকশায় কীভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, সেই ভাবনাই এ বারের থিমের অন্যতম আকর্ষণ।

স্তম্ভের ইতিহাস কেবল বিশাল প্রস্তরনির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। তার আদি রূপ, নির্মাণের প্রাথমিক ধারণা এবং সময়ের সঙ্গে স্থাপত্যের পরিবর্তনও এই ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনও কোনও স্তম্ভ স্মৃতিচিহ্ন, কোনওটি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক, আবার কোনওটি শাসকের ক্ষমতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের নিদর্শন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন যুগে স্তম্ভের ব্যবহার ও নকশায় পরিবর্তন ঘটলেও ঊর্ধ্বমুখী কাঠামোর মৌলিক বৈশিষ্ট্য বহু ক্ষেত্রে বজায় থেকেছে। সেই ধারাবাহিকতার সূত্র ধরেই ‘কালরেখা’ অতীত থেকে বর্তমানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি শিল্পভাষা নির্মাণ করতে চাইছে। বড়িশা ক্লাবের মণ্ডপে স্থাপনা, ভাস্কর্য এবং দৃশ্যশিল্পের সমন্বয়ে এই ইতিহাসকে উপস্থাপন করা হবে। দর্শনার্থীরা মণ্ডপ পরিক্রমার সময় প্রাচীন স্থাপত্যের বিভিন্ন রূপ ও তার শিল্পগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এখানে স্তম্ভকে নিছক একটি স্থাপত্য উপাদান হিসেবে দেখানোই উদ্দেশ্য নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়, স্মৃতি ও বিশ্বাসের বহুমাত্রিক সম্পর্ক তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাচীন নির্মাণশৈলীর সঙ্গে আধুনিক শিল্পভাবনার সংযোগ ঘটিয়ে দর্শকদের সামনে একটি নতুন দৃশ্যভাষা হাজির করতে চাইছেন থিমের পরিকল্পকরা।

এই আয়োজনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে স্থাপত্যের সম্পর্ক। ভারতীয় ঐতিহ্যে ঊর্ধ্বমুখী স্তম্ভকে অনেক সময় মর্ত্য ও শাশ্বত জগতের মধ্যে প্রতীকী সংযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তার স্থির অবস্থান, দীর্ঘস্থায়িত্ব ও আকাশের দিকে প্রসারিত গঠন মানুষের বিশ্বাস ও অস্তিত্ব সম্পর্কে নানা ভাবনার জন্ম দেয়। বড়িশা ক্লাবের ‘কালরেখা’য় আদ্যাশক্তির ধারণার সঙ্গেও এই প্রতীকী সম্পর্ক যুক্ত করা হয়েছে। সৃষ্টির আদি শক্তি, স্থিতি এবং অস্তিত্বের ধারাবাহিকতার ভাবনাকে স্থাপত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করার প্রয়াস থাকছে এ বারের মণ্ডপে।

দুর্গাপুজোর থিম নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড়িশা ক্লাবের নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। সময়ের সঙ্গে কলকাতার থিম পুজোর পরিসর বদলেছে, বেড়েছে শিল্পীদের কাজের বৈচিত্র্য এবং মণ্ডপসজ্জার পরিধি। সেই পরিবর্তনের ধারায় নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে পুজো কমিটির অন্যতম কর্তা তরুণ চক্রবর্তী (Tarun Chakraborty) জানান, তাঁদের পুজো কলকাতায় থিমভিত্তিক দুর্গাপুজোর সূচনাপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। বহু বছরের অভিজ্ঞতার পর এ বার দীপ দাস ও ঈশিকা চন্দ্রের পরিকল্পনায় নতুন বিষয়কে মণ্ডপে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণ চক্রবর্তীর কথায়, ‘আমাদের পুজোই প্রথম বার কলকাতার দুর্গাপুজোয় থিমের পথ দেখিয়েছিল। তারপর অনেক বছর পথ চলেছি আমরা। এ বার দীপ ও ঈশিকাকে দিয়ে আমাদের পুজোর মঞ্চ সাজিয়েছি। ভারতের একটি বিষয়ের কালের যাত্রাকে তারা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে। প্রস্তরস্তম্ভ থেকে শুরু করে স্তম্ভের আদি রূপ, আশা করি এই বিষয়টি আগত দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়ে যাবে।’

এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এ বারের আয়োজনের ক্ষেত্রে বিষয় নির্বাচনের পাশাপাশি তার উপস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যের মতো একটি ঐতিহাসিক বিষয়কে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে তুলে ধরতে হলে তথ্য, শিল্পরূপ এবং দর্শকের অভিজ্ঞতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। স্তম্ভের গঠন, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং প্রতীকী তাৎপর্যকে দৃশ্যশিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করাই থিমের পরিকল্পকদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি যোগসূত্র তৈরি করার সুযোগও রয়েছে। কলকাতার দুর্গাপুজো দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প ও সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিসর হিসেবে পরিচিত। পুজোর কয়েকটি দিনে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হওয়া মণ্ডপগুলি দর্শকদের সামনে ইতিহাস, লোকশিল্প, স্থাপত্য, পরিবেশ এবং সামাজিক জীবনের নানা বিষয় তুলে ধরে। বড়িশা ক্লাবের ‘কালরেখা’ সেই পরিচিত ধারায় প্রাচীন ভারতীয় মুক্তস্তম্ভের ইতিহাসকে সামনে আনছে। ফলে যাঁরা স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে আগ্রহী, তাঁদের কাছেও এই মণ্ডপ আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন : Mahalaya : আজ মহালয়া
সভ্যতার ইতিহাসে বহু পরিবর্তন এলেও কিছু স্থাপত্য আজও মানুষের কাছে অতীতের পরিচয় বহন করে। প্রাচীন স্তম্ভের মধ্যে দিয়ে সেই ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়াসই বড়িশা ক্লাবের এ বারের দুর্গোৎসবের মূল আকর্ষণ। ‘কালরেখা: দ্য স্টোরি অফ ভার্টিক্যালস’ ভারতীয় স্থাপত্যের দীর্ঘ যাত্রাকে শিল্পের মাধ্যমে পাঠ করার একটি পরিকল্পনা। সময়ের ক্ষয় পেরিয়ে টিকে থাকা স্তম্ভগুলির ইতিহাস, নকশা ও প্রতীকী অর্থকে কেন্দ্র করে এ বার দুর্গাপুজোয় দর্শকদের সামনে খুলেছে প্রাচীন ভারতের শিল্পঐতিহ্যের এক অন্য জানালা।
সব ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Dakshin Delhi Kalibari Celebrates Durga Puja with ‘Bangla Beyond Bengal’



