Sasraya News Sunday’s Literature Special | 11th October 2026, Sunday | Issue 130 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার | সংখ্যা ১৩০

SHARE:

মানুষের ভিতরে কামনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যের যে প্রবণতাগুলির কথা ভারতীয় দর্শনে বলা হয়েছে, সেগুলিকে ছয় রিপু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই প্রবৃত্তিগুলি মানুষের চিন্তা ও আচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। আকাঙ্ক্ষা থেকে অর্জনের চেষ্টা জন্মায়, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন হলে তা লোভে পরিণত হতে পারে। আত্মমর্যাদা প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা অহংকারে পৌঁছলে অন্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। আপনজনের প্রতি টান স্বাভাবিক, কিন্তু মোহের কারণে মানুষ কখনও কখনও বাস্তবকে মেনে নিতে পারে না। ফলে নিজের সুখের সন্ধান করতে গিয়ে সে নিজেরই অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে।

সম্পাদকীয় 

মানুষের ভিতরে কামনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যের যে প্রবণতাগুলির কথা ভারতীয় দর্শনে বলা হয়েছে, সেগুলিকে ছয় রিপু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই প্রবৃত্তিগুলি মানুষের চিন্তা ও আচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। আকাঙ্ক্ষা থেকে অর্জনের চেষ্টা জন্মায়, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন হলে তা লোভে পরিণত হতে পারে। আত্মমর্যাদা প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা অহংকারে পৌঁছলে অন্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। আপনজনের প্রতি টান স্বাভাবিক, কিন্তু মোহের কারণে মানুষ কখনও কখনও বাস্তবকে মেনে নিতে পারে না। ফলে নিজের সুখের সন্ধান করতে গিয়ে সে নিজেরই অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে।

 

 

‘আমার’ থেকে ‘আমাদের’: জীবনের মোহ, কবিতার খিদে আর মানুষের আত্মঅন্বেষণ

মানুষের জীবন কখনও সমস্যাহীন নয়। প্রতিদিনের পথচলায় অভাব, প্রাপ্তি, আশা, হতাশা, আনন্দ ও বেদনা ইত্যাদি নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। এসবের ভিতরও থেমে থাকার অবকাশ নেই। জীবনের নানা টানাপোড়েন সামলে মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। নিজের দায়িত্ব পালন করতে হয়। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে হয়। এই চলার পথেই বারবার ফিরে আসে একটি ছোট শব্দ, ‘আমার’। আমার বাড়ি, আমার সংসার, আমার সাফল্য, আমার অধিকার, আমার ভালবাসা। শব্দটির মধ্যে রয়েছে আত্মপরিচয়ের আনন্দ, নিরাপত্তার আশ্বাস ও নিজের অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই ‘আমার’ যখন জীবনের প্রতিটি উপলব্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখনই শুরু হয় এক গভীর প্রশ্ন, যে পৃথিবীতে আমার জন্ম, সেই পৃথিবী কি কেবল আমারই?

কবিতা চর্চা মানেই শুধু আবেগের উদ্‌যাপন তা কিন্তু নয়। সমাজে বৈষম্য, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও বিচ্ছিন্নতা বাড়লে কবিতার সামনে নতুন প্রশ্নও এসে দাঁড়ায়। কবিতা কী কেবল ব্যক্তিগত বিষাদ ও সৌন্দর্যের আশ্রয় হবে, না কী মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সংকটকেও ভাষা দেবে? এই দু’য়ের মধ্যে বিরোধ নেই। ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকেই কখনও বৃহত্তর সমাজের বেদনা বোঝা যায়। আবার সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই মানুষ নিজের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

মানুষের অস্তিত্ব প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ এই পঞ্চভূতের ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন কোনও বিচ্ছিন্ন সত্তা না। প্রকৃতির উপাদানেই শরীরের গঠন, প্রকৃতির নিয়মেই তার বেড়ে ওঠা ও প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়াই তার শেষ পরিণতি। অথচ এই নির্ভরতার কথা ভুলে গিয়ে মানুষ প্রায়ই নিজের মালিকানাকেই জীবনের প্রধান সত্য বলে ধরে নেয়। জমি, সম্পদ, সম্পর্ক, খ্যাতি কিংবা জ্ঞান যা কিছু অর্জিত হয়, তার উপর চিরস্থায়ী অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় আমরা! অথচ সময়ের কাছে কোনও অর্জনই চিরকাল স্থির থাকে না। যা আজ নিজের বলে মনে হচ্ছে, কাল তা অন্যের হাতে যেতে পারে। যে সম্পর্ককে অবিচ্ছেদ্য বলে ভাবছি, তারও পরিবর্তন ঘটতে পারে। জীবনের এই অনিত্যতার মধ্যেই আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন। ‘আমার’ শব্দটিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা অবশ্যই উদ্দেশ্য না। ব্যক্তিগত পরিচয়, দায়িত্ববোধ ও আপনজনের প্রতি টান ছাড়া সমাজজীবন কল্পনা করা যায় না। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন নিজের প্রতি মমতা অন্যের প্রতি অবজ্ঞায় পরিণত হয়। অধিকারবোধ দখলদারির রূপ নেয়, আর ভালবাসা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। নিজের প্রাপ্তিকে বড় করে দেখতে গিয়ে অন্যের বঞ্চনাকে উপেক্ষা করা, নিজের মতকেই একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা কিংবা সামান্য বিরোধে সম্পর্ক ভেঙে ফেলা! এসব প্রবণতার মূলে রয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতার বিস্তার। তাই ব্যক্তিগত সত্তাকে অস্বীকার না করেও বৃহত্তর জগতের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বুঝে নেওয়া জরুরি।

মানুষের ভিতরে কামনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যের যে প্রবণতাগুলির কথা ভারতীয় দর্শনে বলা হয়েছে, সেগুলিকে ছয় রিপু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই প্রবৃত্তিগুলি মানুষের চিন্তা ও আচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। আকাঙ্ক্ষা থেকে অর্জনের চেষ্টা জন্মায়, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন হলে তা লোভে পরিণত হতে পারে। আত্মমর্যাদা প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা অহংকারে পৌঁছলে অন্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। আপনজনের প্রতি টান স্বাভাবিক, কিন্তু মোহের কারণে মানুষ কখনও কখনও বাস্তবকে মেনে নিতে পারে না। ফলে নিজের সুখের সন্ধান করতে গিয়ে সে নিজেরই অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে। এই প্রবৃত্তিগুলিকে চেনা মানে জীবন থেকে সমস্ত ইচ্ছা মুছে ফেলা তা কিন্তু নয়। তা হল, ইচ্ছার উপর নিজের বিচারবোধের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এই আত্মঅনুসন্ধানের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক গভীর। বিপুল সাহিত্যভুবনের একটি বিশেষ ক্ষেত্র কবিতা। আয়তনে ছোট হলেও কবিতা মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটাতে পারে। একটি শব্দ, একটি দৃশ্য, একটি স্মৃতি কিংবা সামান্য কোনও ঘটনা কবিতার ভিতরে নতুন অর্থ পায়। যে অনুভূতি সাধারণ কথোপকথনে ধরা পড়ে না, কবি কখনও ছন্দে, কখনও গদ্যকবিতায়, কখনও চুপচাপ ইঙ্গিতে তাকে প্রকাশ করেন। কবিতা শুধু ভাষার কারুকাজই না, মানুষের অন্তর্জগতকে আবিষ্কারেরও একটি পথ।

কবিতার ক্ষেত্রেও ‘আমার’ শব্দটির উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। কবি নিজের অনুভব থেকে লেখেন, নিজের দেখা পৃথিবীকে ভাষা দেন, ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনার ভিতর দিয়ে বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতার কাছে পৌঁছতে চান। তাঁর কবিতায় থাকে নিজস্ব কণ্ঠস্বর, নিজস্ব ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু কোনও কবিতাই শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। কবির ব্যক্তিগত অনুভবের সঙ্গে মিশে থাকে সমাজ, সময়, ইতিহাস, প্রকৃতি, পূর্বসূরি সাহিত্য ও অন্য মানুষের জীবন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা। যে ভাষায় কবি লেখেন, সেই ভাষা তাঁর একার সৃষ্টি নয়। অসংখ্য মানুষের ব্যবহার ও উত্তরাধিকারের ভিতর দিয়ে তার বিকাশ ঘটেছে। ফলে কবিতার মধ্যে ব্যক্তিগত প্রকাশ থাকলেও তার শিকড় ছড়িয়ে থাকে সমষ্টির মাটিতেই। এই কারণেই পৃথিবীজুড়ে নানা ভাষায়, নানা সংস্কৃতিতে, নানা সময়ে কবিতা রচিত হয়ে চলেছে। প্রত্যেক কবি নিজের মতো করে প্রেম, বিচ্ছেদ, যুদ্ধ, শান্তি, প্রকৃতি, মৃত্যু কিংবা জীবনের অর্থ খুঁজেছেন। বিষয় কখনও একই থেকেছে, কিন্তু তার প্রকাশ বদলে গিয়েছে মানুষের অভিজ্ঞতা ও সময়ের পরিবর্তনে। কিন্তু একটি কবিতা আরেকটি কবিতার পুনরাবৃত্তি না। আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনও সৃষ্টিও না। সাহিত্যিক উত্তরাধিকার, ভাষার বিবর্তন এবং মানুষের অভিন্ন অনুভূতির সঙ্গে তার যোগ রয়েছে। তাই কবিতার এই অবিরাম যাত্রাকে শুধু সৃষ্টির খেলা হিসেবে দেখলে আসল তাৎপর্য ধরা পড়বে না। এর মধ্যেই নিহিত নিজেকে প্রকাশ করার পাশাপাশি অন্যের অভিজ্ঞতাকে বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা।

কবিতা শব্দটির উৎস বা তার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা যায়, কিন্তু কবিতার আসল কাজ সংজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভাব যখন অনুভবের গভীরে পৌঁছে উপলব্ধির জন্ম দেয়, তখন ভাষা সেই উপলব্ধিকে প্রকাশের পথ খোঁজে। শব্দের বিন্যাস, ছন্দের ওঠানামা, ধ্বনির অনুরণন, লয়ের গতি ও বিরতির ব্যবহার মিলে পাঠকের মনে তৈরি করে স্বতন্ত্র অনুভূতির পরিসর। কখনও অন্ত্যমিলের বাঁধনে, কখনও মুক্ত ছন্দে, কখনও ছন্দহীন গদ্যরীতিতে কবিতা নিজের প্রকাশভঙ্গি খুঁজে নেয়। আবার তার সার্থকতাও শুধু নিয়ম মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না।পাঠকের মনে নতুন কোনও ভাবনা, প্রশ্ন কিংবা অনুভব জাগিয়ে তোলাও কবিতার বড় কাজ। কবিতা লেখার এই তাগিদকে তাই এক ধরনের অন্তর্গত খিদে বলা যায়। মানুষ যা দেখে, যা অনুভব করে, যা হারায় কিংবা যা পেতে চায়, তার সবটুকু দৈনন্দিন ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। কখনও সেই অপূর্ণতার জায়গা থেকেই জন্ম নিতে পারে কবিতা। কবি লিখে নিজের অনুভবকে কিছুটা বুঝতে চান, আবার পাঠক সেই লেখার মধ্যে নিজের জীবনের কোনও অনুরণন খুঁজে পান। লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তখন পাঠকের কাছে পৌঁছে অন্য অর্থ ধারণ করে। একটি কবিতা লেখার সময় কবির যে উপলব্ধি ছিল, পাঠের মুহূর্তে তা নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এই আদানপ্রদানেই কবিতা ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে।

মনে রাখতে হবে যে, কবিতা চর্চা মানেই শুধু আবেগের উদ্‌যাপন তা কিন্তু নয়। সমাজে বৈষম্য, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও বিচ্ছিন্নতা বাড়লে কবিতার সামনে নতুন প্রশ্নও এসে দাঁড়ায়। কবিতা কী কেবল ব্যক্তিগত বিষাদ ও সৌন্দর্যের আশ্রয় হবে, না কী মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সংকটকেও ভাষা দেবে? এই দু’য়ের মধ্যে বিরোধ নেই। ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকেই কখনও বৃহত্তর সমাজের বেদনা বোঝা যায়। আবার সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই মানুষ নিজের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কবিতার শক্তি এখানেই, তা সব প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয়, কিন্তু বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা প্রশ্নকে সামনে আনতে পারে।

জীবনের সমস্যা থেকে মুক্তি হয়ত সম্ভব নয়, কিন্তু সমস্যার মধ্যে নিজের অবস্থান বুঝে নেওয়া সম্ভব। একইভাবে ‘আমার’ শব্দটিকে মুছে দেওয়া না, তার পরিসরকে প্রসারিত করাই প্রয়োজন। আমার সুখের সঙ্গে অন্যের সুখ, আমার অধিকারের সঙ্গে অন্যের অধিকার ও আমার পৃথিবীর সঙ্গে সকলের পৃথিবীর সম্পর্ক রয়েছে এই বোধ যত গভীর হবে, ততই ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনের মধ্যে সেতু তৈরি হবে। কবিতাও সেই সেতু নির্মাণের একটি মাধ্যম। তার মধ্যে থাকে ব্যক্তিগত কণ্ঠ, কিন্তু সেই কণ্ঠের প্রতিধ্বনি পৌঁছতে পারে অচেনা মানুষের কাছেও। অতএব, কবিতা লেখা ও পড়ার এই নিরন্তর তাগিদকে নিছক পাগলামি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর মধ্যেই নিহিত আছে মানুষকে বোঝার চেষ্টা, নিজের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হওয়া আর পরিচিত পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখার আকাঙ্ক্ষা। পঞ্চভূতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যেমন তার অস্তিত্বের ভিত্তি, তেমনই আত্মসংযম ও আত্মসমীক্ষা তাকে নিজের প্রবৃত্তির সীমা বুঝতে সাহায্য করে। আর কবিতা সেই বোঝাপড়াকে ভাষা দিতে পারে। ‘আমার’ থেকে ‘আমাদের’ এই যাত্রা এক দিনে শেষ হওয়ার নয়। যত দিন মানুষ অনুভব করবে, প্রশ্ন তুলবে, শব্দের মধ্যে নিজের অভিজ্ঞতাকে ধরতে চাইবে, তত দিন কবিতার জন্ম হবে। সেই খিদেই সাহিত্যকে সচল রাখে, আর মানুষের জীবনকে নিজের সীমানার বাইরে তাকানোর সুযোগ দেয়। 🍁

 

 

 

🍂মহামিলনের কথা 
হে হরে! আমার চিত্ত হরণ করে ভববন্ধন হতে মোচন কর৷ ২। হে কৃষ্ণ! আমার চিত্ত আকর্ষণ কর। ৩৷ হে হরে! স্বীয় মাধুর্য্যের দ্বারা আমার চিত্ত হরণ কর। ৪৷ হে কৃষ্ণ! নিজ ভক্তের দ্বারা ভজনগান দান করত আমার চিত্ত শোধন কর। ৫। হে কৃষ্ণ! তোমার নাম জপ গুণ লীলাদিতে আমার নিষ্ঠা প্রদান কর৷ ৬৷ হে কৃষ্ণ! আমার রুচি হোক৷ ৭৷ হে হরে! আমাকে সেবাযোগ্য কর৷

 

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ

শ্রীগোপাল গুরু গোস্বামী প্রত্যেক নামের পৃথক পৃথক অর্থ করেছেন। ভক্ত দুই প্রকার, সাধক এবং সিদ্ধ। সাধকও দুই প্রকার— প্রাথমিক ও প্রাত্যহিক। দেহের সহিত সিদ্ধগণ নিত্যসিদ্ধ। প্রাথমিক সাধকগণ নাম সংখ্যা বৃদ্ধি করতে করতে নামকীর্ত্তনের অবিচ্ছিন্নতা লাভ করেন।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব। ছবি: সংগৃহীত

প্রাথমিকগণের নামে রুচি থাকে না। ক্রমে নাম করার ফলে নামের কৃপায় নামে আদর হয়। আদরের সহিত নাম করতে থাকলে শ্রীভগবান আর দূরে থাকেন না। ধীরে ধীরে এসে স্পর্শ করেন— সাধকের ভাবোদয় হতে থাকে।প্রাথমিকগণ চিত্তশুদ্ধির জন্য জপ করেন। ১৷ হে হরে ! আমার চিত্ত হরণ করে ভববন্ধন হতে মোচন কর৷ ২। হে কৃষ্ণ! আমার চিত্ত আকর্ষণ কর। ৩৷ হে হরে! স্বীয় মাধুর্য্যের দ্বারা আমার চিত্ত হরণ কর। ৪৷ হে কৃষ্ণ! নিজ ভক্তের দ্বারা ভজনগান দান করত আমার চিত্ত শোধন কর। ৫। হে কৃষ্ণ! তোমার নাম জপ গুণ লীলাদিতে আমার নিষ্ঠা প্রদান কর৷ ৬৷ হে কৃষ্ণ! আমার রুচি হোক৷ ৭৷ হে হরে! আমাকে সেবাযোগ্য কর৷ ৮৷ হে হরে ! স্বীয় সেবা আদেশ কর৷ ৯। হে হরে! নিজ প্রিয়ের সহিত অভীষ্ট লীলা আমাকে দেখাও৷ ১০৷ হে রাম! প্রিয়ার সহিত নিজ অভীষ্ট লীলা আমাকে শ্রবণ করাও৷ ১১৷ হে হরে! নিজ প্রিয়ের সহিত স্বীয় অভীষ্ট লীলা আমাকে দেখাও৷ ১২। হে রাম! প্রিয়ার সহিত নিজ অভীষ্ট লীলা আমাকে দেখাও। ১৩। হে রাম! তোমার নামরূপ লীলা স্মরণাদিতে আমাকে নিয়োজিত কর৷ ১৪। হে রাম! সেবা বিষয়ে আমাকে সেবাযোগ্য কর। ১৫ ৷ হে হরে! আমাকে স্বীয় অঙ্গীকার করে রমণ কর। ১৬। হে হরে! আমার সহিত রমণ কর। ইতি এইভাবে মহামন্ত্রের অর্থ করেছেন। যদি কেউ অর্থ চিন্তা না করেও নামজপ করে তাহলে কি নামের কৃপা পায় না? অবশ্যই পায়, যিনি অর্থ চিন্তা করতে পারেন, তিনি অর্থসহ নাম করুন, যিনি তা না পারেন, তিনি যেমন-তেমন করে নাম করুন, নাম কৃপা করবেনই।

শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

 

🍂ফিরেপড়া | কবিতা

সমর সেন -এর একটি কবিতা

প্রেম

বিষাক্ত সাপের মতো আমার রক্তে
তোমাকে পাবার বাসনা।

আর মাঝে মাঝে আকাশে হলুদ রঙের অদ্ভুত চাঁদ ওঠে,
চঞ্চল বসন্ত কাঁপে গাছের পাতায়,
আর অন্ধকারে লাল কাঁকরের পথ
পড়ে থাকে অলস স্বপ্নের মতো।

সমস্ত দিন, আর সমস্ত রাত্রি ভরে
তোমাকে পাবার বাসনা বিষাক্ত সাপের মতো।

 

 

 

🍂সমসাময়িক
সিন্ধুর কাছে রক্তের সম্পর্ক বড় ছিল না, বড় ছিল মমতার সম্পর্ক। সেই কারণে আশ্রমের শিশুরা তাঁকে মা নয়, ‘মাই’ বলে ডাকত। মারাঠি ভাষায় যার অর্থ একই, মা, তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও গভীর শ্রদ্ধা। সেই মাইয়ের হাত ধরেই অনেকে আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর আশ্রমে বড় হওয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে কেউ হয়েছেন চিকিৎসক, কেউ আইনজীবী, কেউ অধ্যাপক, কেউ সমাজকর্মী।

 

গোয়াল ঘরে জন্ম দিয়েছিলেন সন্তান! হাজারেরও বেশি অনাথের মা সিন্ধুতাই

পালকি সিং

পেটে সন্তান, মাথার ওপর ছাদ নেই, পায়ের নিচে মাটিও যেন সরে যাচ্ছে! এমন অবস্থায় এক নারীকে যখন নিজের পরিবার দরজা বন্ধ করে দিল, তখন সমাজের কাছে তিনি হয়ে গেলেন অচ্ছুত। অথচ সেই নারীই কয়েক দশকের মধ্যে হয়ে উঠলেন এক হাজারেরও বেশি অনাথ শিশুর মা! গল্পটা সিন্ধুতাই সাপকালের, যাঁকে মহারাষ্ট্রের মানুষ আজও ‘মাই’ বলে ডাকেন। ১৪ নভেম্বর, ১৯৪৮। মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধা জেলার নভরগাঁও গ্রামে অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম হয় সিন্ধুতাইয়ের। দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। লেখাপড়ার সুযোগ ছিল সামান্য, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন জেদি। গ্রামের স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন কোনওরকমে। তার পরেই জীবনের গতিপথ বদলে যায়।

মহারাষ্ট্রের পুণে, ওয়ার্ধা, সাসওয়াড়ের আশ্রমগুলোতে সকাল হয় তাঁর ছবিতে মালা দিয়ে। শিশুরা পড়তে যায়, খেলতে যায়, গান গায়। তাদের প্রত্যেকের জীবনে সিন্ধুতাই অদৃশ্য ছায়া হয়ে রয়ে গিয়েছেন। নিজের জীবনে যে নিরাপত্তা তিনি পাননি, সেই নিরাপত্তাই সিন্ধু ফিরিয়ে দিয়েছেন হাজার শিশুকে।

মাত্র বারো বছর বয়সে পরিবার থেকে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সংসার, অভাব, আর অল্প বয়সের মাতৃত্ব এই তিনটি শব্দই তাঁর কৈশোরকে ঘিরে ধরে। কুড়ি বছর বয়সের আগেই তিন সন্তানের মা হন। চতুর্থ সন্তান যখন গর্ভে, তখনই নেমে আসে চরম আঘাত। জমি সংক্রান্ত একটি মিথ্যা অভিযোগকে কেন্দ্র করে শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। সেই সমিয় বাপের বাড়িতেও ঠাঁই মেলেনি। সেই সময় তিনি ন’মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আশ্রয় বলতে ছিল একটি গোয়ালঘর। সেখানেই গবাদি পশুর মধ্যে একা, বিনা সাহায্যে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন সিন্ধুতাই। নিজের হাতে নাড়ি কাটেন। গোয়ালের মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বাঁচতে হলে লড়াই করেই বাঁচতে হবে।

এরপর শুরু হয় আরও কঠিন পথচলা। কোলে সদ্যোজাত মেয়ে, হাতে কিছুই নেই। রেলস্টেশনে, মন্দিরের চাতালে গান গেয়ে, ভিক্ষা চেয়ে দিন কাটত। কখনও আধপেটা, কখনও অভুক্ত। কিন্তু এই লড়াইয়ের মধ্যেই তিনি চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর মতো আরও অনেক শিশু রাস্তায় পড়ে আছে, যাদের মা নেই, বাবা নেই, ঘর নেই! সিন্ধুতাই নিজের ভাগের রুটি ভেঙে তাদের দিতে শুরু করলেন। প্রথমে একজন, তার পর দু’জন, তার পর আরও অনেকে। তাঁর কাছে আশ্রয় বলতে তখনও ফুটপাথ, খাবার বলতে ভিক্ষার চাল। কিন্তু সেই সামান্য নিয়েই তিনি হয়ে উঠলেন ওই শিশুদের ভরসা। তিনি বলতেন, ‘যে কষ্ট আমি পেয়েছি, তা যেন আর কোনও শিশুকে পেতে না হয়।’ এই ভাবনা থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর আশ্রম। মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি একের পর এক অনাথ আশ্রম তৈরি করেন। তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ‘সনমতি বাল নিকেতন’। পরবর্তী চল্লিশ বছরে তিনি আশ্রয় দিয়েছেন এক হাজার চারশোরও বেশি অনাথ, আদিবাসী ও পরিত্যক্ত শিশুকে। তাদের খাইয়েছেন, পড়িয়েছেন, বড় করেছেন নিজের সন্তানের মতো। সিন্ধুর কাছে রক্তের সম্পর্ক বড় ছিল না, বড় ছিল মমতার সম্পর্ক। সেই কারণে আশ্রমের শিশুরা তাঁকে মা নয়, ‘মাই’ বলে ডাকত। মারাঠি ভাষায় যার অর্থ একই, মা, তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও গভীর শ্রদ্ধা। সেই মাইয়ের হাত ধরেই অনেকে আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর আশ্রমে বড় হওয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে কেউ হয়েছেন চিকিৎসক, কেউ আইনজীবী, কেউ অধ্যাপক, কেউ সমাজকর্মী।

এক সময় যাঁকে গোয়ালঘরে সন্তান প্রসব করতে হয়েছিল, তাঁকেই পরে দেশ সম্মান জানিয়েছে সর্বোচ্চ মঞ্চে। সমাজসেবার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দু’শো সত্তরের বেশি সম্মান। দু’হাজার একুশ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করে। এ ছাড়াও পেয়েছেন ডি ওয়াই পাটিল পুরস্কার, অহল্যাবাঈ হোলকার পুরস্কারের মতো বহু স্বীকৃতি। কিন্তু কোনও পুরস্কারই তাঁকে তাঁর মাটি থেকে সরাতে পারেনি। তিনি বরাবর বলতেন, পুরস্কার তাঁর নয়, তাঁর সন্তানদের। তাঁর জীবন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বক্তৃতা দিয়ে, গান গেয়ে, মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে তিনি আশ্রম চালাতেন। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিতেন, আর সেই ভাষণ শুনে মানুষ এগিয়ে আসত। অনেকেই তাঁর জীবন নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন, জীবনী লিখেছেন। মারাঠি ভাষায় তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘মি সিন্ধুতাই সাপকাল’ নামে চলচ্চিত্র, যা জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছে।

৪ জানুয়ারি, ২০২২। পুণের একটি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সিন্ধুতাই। বয়স হয়েছিল তিয়াত্তর বছর। মৃত্যুর সময় তাঁর চারপাশে ছিলেন তাঁর হাজার সন্তান। যাদের কেউ অনাথ ছিল না আর, কারণ তাদের মা ছিল। এখনও মহারাষ্ট্রের পুণে, ওয়ার্ধা, সাসওয়াড়ের আশ্রমগুলোতে সকাল হয় তাঁর ছবিতে মালা দিয়ে। শিশুরা পড়তে যায়, খেলতে যায়, গান গায়। তাদের প্রত্যেকের জীবনে সিন্ধুতাই অদৃশ্য ছায়া হয়ে রয়ে গিয়েছেন। নিজের জীবনে যে নিরাপত্তা তিনি পাননি, সেই নিরাপত্তাই সিন্ধু ফিরিয়ে দিয়েছেন হাজার শিশুকে। নিজের ক্ষতকে তিনি অন্যের ওষুধ করে তুলেছিলেন। তাই সিন্ধুতাই সাপকাল কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি আশ্রয়ের নাম, একটি লড়াইয়ের নাম, যা প্রমাণ করে মা হওয়ার জন্য জন্ম দিতে হয় না, বুকে টেনে নিতে জানতে হয়।🍁

 

 

 

🍂সাময়িকী 
নব্বইয়ের দশকেই অ্যান কারসন লিখলেন এমন কিছু রচনা, যা তাঁর পরিচয় বদলে দিল। ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ সংকলনে প্রকাশিত ‘দ্য গ্লাস এসে’ একটি দীর্ঘ কবিতা, কিন্তু তাকে কেবল কবিতা বলা যায় না। এটি একই সঙ্গে শোকগাথা, প্রেমের উপাখ্যান ও সাহিত্য সমালোচনা। কথক একজন নারী, স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। তিনি যাচ্ছেন তাঁর নিঃসঙ্গ মায়ের কাছে, উত্তর ইংল্যান্ডের ঊষর প্রান্তরে। সঙ্গে নিয়েছেন এমিলি ব্রন্টির রচনাবলি। ব্রন্টির মুরল্যান্ড, তাঁর ‘উদারিং হাইটস’-এর হাওয়া, তাঁর একাকিত্ব, সবই মিশে যায় কথকের নিজের জীবনের সঙ্গে। তিন জন নিঃসঙ্গ নারী। যথাক্রমে কথক, তাঁর মা এবং এমিলি ব্রন্টি একটি রান্নাঘরের টেবিলে বসে আছেন। এই কল্পিত দৃশ্য থেকে তৈরি হয় পরিত্যক্ত হওয়ার একটি লম্বা প্রবন্ধ।

 

সাহিত্যে নোবেল জয়ী অ্যান কারসন ফেরালেন স্যাফো ও ক্যাটুলাসের সময়

বিশ্বনাথ চক্রবর্তী 

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার দিন সুইডিশ অ্যাকাডেমির তরফে যখন কানাডার অ্যান কারসনের নাম উচ্চারিত হল, তখন অনেক পাঠকের মনে প্রথম প্রশ্ন জেগেছিল, তিনি ঠিক কোন ঘরানার লেখক। তিনি কবি? নাকি প্রাবন্ধিক? নাকি অনুবাদক? নাকি নাট্যকার? উত্তর হল, তিনি সবই, আবার কোনওটাই পুরোপুরি নন। ১৯৫০ সালে টরন্টোতে জন্ম নেওয়া এই লেখক ১৯৮১ সালে ‘ওডি এট আমো এরগো সাম’ নামে ধ্রুপদি সাহিত্যে ডক্টরেট করেছিলেন। তার পর থেকে তিনি পড়িয়েছেন আমেরিকা ও কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, অনুবাদ করেছেন গ্রিক ট্র্যাজেডি, লিখেছেন কবিতা, প্রবন্ধ, লিব্রেটো, আবার কখনও বাক্সবন্দী শোকলিপি তৈরি করেছেন, যা বইয়ের চেয়েও বেশি ভাস্কর্য। তাঁর গোটা কাজের কেন্দ্রে রয়েছে একটি জেদ। শব্দ কোথা থেকে আসে? কীভাবে তার মানে বদলায়? এবং কীভাবে সেই শব্দকে ভেঙে নতুন অর্থ তৈরি করা যায়!

সুইডিশ অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান অ্যান্ডারস ওলসন তাঁর যে কথাটি বলেছিলেন, তা এই জেদকেই চিহ্নিত করে। তাঁর মতে, কারসনের সাহিত্য ভাষাতাত্ত্বিকের শব্দ নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ ও কবির নতুন অর্থের জন্য আকুলতার মিলনস্থল। তিনি নিজেই বলেন, শব্দের ব্যুৎপত্তি থেকেই তাঁর সব লেখার শুরু। এই কারণে তাঁর অনুবাদকে অনুবাদ বললে কম বলা হয়। স্যাফোর ছিন্নভিন্ন পঙ্‌ক্তির অনুবাদ ‘ইফ নট, উইন্টার’ ২০০২ সালে প্রকাশের পর থেকেই স্বতন্ত্র কাব্যগ্রন্থ হিসেবে পড়া হয়। একইভাবে সফোক্লিসের ‘ইলেকট্রা’ ও ‘অ্যান্টিগোনে’ কিংবা ইউরিপিদিসের ‘বাক্কাই’ -এর অনুবাদে তিনি প্রাচীন গ্রীক উচ্চারণকে আজকের মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন, সেখানে দেবতা ও মানুষের দ্বন্দ্ব আর দূরের পুরাণ থাকে না, হয়ে ওঠে ঘরের ভিতরের কথোপকথন।

ফ্লোট’ ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় বাইশটি পুস্তিকা হিসেবে। বইটি যে কোনও ক্রমে পড়া যায়। ২০২৪ সালে ‘রং নর্মা’ আবার প্রমাণ করে, কারসন প্রচলিত ধারার বইয়ে বিশ্বাস করেন না। অপেরা, নৃত্য, চিত্রকলা, নাটকের সঙ্গে কাজ করেছেন, কারণ তিনি মনে করেন, সাহিত্য কেবল পাতায় থাকে না, তা শরীরে, মঞ্চে, কণ্ঠে, চোখে থাকে।

এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ নামে দীর্ঘ প্রবন্ধ দিয়ে। স্যাফোর একটি শব্দবন্ধ থেকে তিনি তুলে আনেন ইরোসের সংজ্ঞা একই সঙ্গে তিক্ত ও মধুর। প্রেমে যে দূরত্ব থাকে, প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মধ্যে যে ফাঁক, সেই ফাঁকই প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখে, কবিতাকে সচল রাখে। এই ফাঁকের কথা বলতে গিয়েই কারসন তাঁর নিজস্ব পদ্ধতির কথা বলেছিলেন, ‘স্টিরিওস্কোপিক ভিশন’, যেখানে একই সঙ্গে দু’টি দৃষ্টিকে ভারসাম্যে ধরে রাখা যায়। এই পদ্ধতি তাঁর পরবর্তী সমস্ত লেখায় ছড়িয়ে আছে। ১৯৯৯ সালে ‘ইকোনমি অফ দ্য আনলস্ট’ বইতে তিনি খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের গ্রিক কবি সিমোনিদিস অফ কেওসের সঙ্গে বিংশ শতকের জার্মান কবি পল সেলানকে মুখোমুখি দাঁড় করালেন। এক জন স্মৃতি ও অর্থের বিনিময় নিয়ে লিখছেন, অন্য জন শোয়া ও নীরবতার কবি। দু’জনের মধ্যে হাজার বছরের ব্যবধান, কিন্তু কারসন দেখালেন, কীভাবে দু’জনেই ‘যা হারায়নি’ তার হিসেব রাখতে চেয়েছেন। আবার ২০০০ সালে ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’ বইতে ইতিহাসের জনক থুকিদিদিসের পাশে এসে বসলেন ভার্জিনিয়া উলফ। ইতিহাসের যুদ্ধবর্ণনা ও উপন্যাসের অন্তর্জগৎ, দুই বিপরীত মেরুকে একই পাতায় বসিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, কবিতা শুধু আত্মকথা না, তা ভিন্ন সময় ও ভিন্ন কণ্ঠের সংঘর্ষ থেকেও জন্ম নিতে পারে। এই খেলাচ্ছলে সময়কে উল্টে-পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতাই অ্যান কারসনকে নব্বইয়ের দশক থেকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও শিল্পের জগতে অপরিহার্য করে তুলেছে।

নব্বইয়ের দশকেই অ্যান কারসন লিখলেন এমন কিছু রচনা, যা তাঁর পরিচয় বদলে দিল। ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ সংকলনে প্রকাশিত ‘দ্য গ্লাস এসে’ একটি দীর্ঘ কবিতা, কিন্তু তাকে কেবল কবিতা বলা যায় না। এটি একই সঙ্গে শোকগাথা, প্রেমের উপাখ্যান ও সাহিত্য সমালোচনা। কথক একজন নারী, স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। তিনি যাচ্ছেন তাঁর নিঃসঙ্গ মায়ের কাছে, উত্তর ইংল্যান্ডের ঊষর প্রান্তরে। সঙ্গে নিয়েছেন এমিলি ব্রন্টির রচনাবলি। ব্রন্টির মুরল্যান্ড, তাঁর ‘উদারিং হাইটস’-এর হাওয়া, তাঁর একাকিত্ব, সবই মিশে যায় কথকের নিজের জীবনের সঙ্গে। তিন জন নিঃসঙ্গ নারী। যথাক্রমে কথক, তাঁর মা এবং এমিলি ব্রন্টি একটি রান্নাঘরের টেবিলে বসে আছেন। এই কল্পিত দৃশ্য থেকে তৈরি হয় পরিত্যক্ত হওয়ার একটি লম্বা প্রবন্ধ। এখানে কবিতা গল্পকে চায়, আবার গল্প কবিতার লাফ, দৃশ্যান্তর, আকস্মিক স্তব্ধতাকে চায়। কারসন সেই নির্ভরতাকে এমন দক্ষতায় সামলেছেন যে পাঠক বুঝতেই পারেন না, তিনি কবিতা পড়ছেন না গদ্য। আবার ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ তাঁর সবচেয়ে পঠিত আর আলোচিত বই। বাইরে থেকে দেখলে এটি পদ্যে লেখা উপন্যাস। ভিতরে এটি এক আধুনিক বয়ঃসন্ধির গল্প। উৎস খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের কবি স্টেসিকোরাসের লেখা গেরিওনের খণ্ডকাব্য।

পুরাণে গেরিওন লাল রঙের ডানাওয়ালা দৈত্য তাঁকে হেরাক্লিস হত্যা করে তার গবাদি পশু নিয়ে যান। কারসন সেই দৈত্যকে বানালেন একজন কিশোর, যে লাল, লাজুক, মায়ের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত। শৈশবে ভাইয়ের হাতে নিপীড়নের স্মৃতি বয়ে বেড়ায় সে। পরে সে প্রেমে পড়ে হেরাক্লিসের, হেরাক্লিস সুদর্শন, আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু নির্মম। যে মানুষটিকে ভালবাসলে ধ্বংস অনিবার্য, তাকেই ভালবাসার প্রশ্ন! এই চিরন্তন মানবিক সঙ্কটকে কারসন লিখলেন এমন ভাষায় যে, সেখানে প্রাচীন মহাকাব্যের গাম্ভীর্য ও আজকের কিশোরের ডায়েরির কথ্যভাষা পাশাপাশি থাকে। ‘কী হয় যখন তুমি এমন কাউকে ভালবাসো যে শেষ পর্যন্ত তোমাকে ধ্বংস করবে’? এই প্রশ্নটি বইটির কেন্দ্রে রয়েছে, এবং সেই প্রশ্ন এখনও ততটাই জীবন্ত। কারসন একবার বলেছিলেন, একঘেয়েমি তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ। সেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে তিনি লড়েন রসিকতা ও আঘাতের মিশ্রণে। ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য বিউটি অফ দ্য হাজব্যান্ড’ বইটির উপশিরোনাম ‘আ ফিকশনাল এসে ইন ২৯ ট্যাঙ্গোস’। ২৯টি ট্যাঙ্গো, অর্থাৎ উনত্রিশটি দৃশ্যে একটি দাম্পত্যের ভাঙন, যেখানে প্রতিটি পর্বের শুরুতে রয়েছে জন কিটসের পঙ্‌ক্তি। কিটস লিখেছিলেন, ‘বিউটি ইজ ট্রুথ’। কারসন সেই মহৎ বাক্যকে বসিয়ে দিলেন একজন মিথ্যাবাদী স্বামীর পাশে। ওখানে সৌন্দর্য, কামনা ও প্রতারণা একে অপরকে কাটছে। এই বইতে প্রেম শুধু সুখ না, তা ক্লান্তি, সন্দেহ এবং আত্মপ্রবঞ্চনারও অংশ।

কারসনের সবচেয়ে গভীর ব্যক্তিগত কাজ ‘নক্স’ ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। ভাই মাইকেল দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, ২০০০ সালে ডেনমার্কে তাঁর মৃত্যু হয়। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া চিঠি, ছবি, হাতে লেখা কাগজ জড়ো করে কারসন তৈরি করেন একটি বাক্স, তার ভিতরে অ্যাকর্ডিয়নের মতো ভাঁজ করা একটি দীর্ঘ পাতা। সেই পাতায় ছবি, লেখা, অনুবাদ মিলেমিশে থাকে। এর মধ্যে তৃতীয় একটি সময়ের স্তর তৈরি করে রোমান কবি ক্যাটুলাসের ১০১ নম্বর শোকগাথা, যা ক্যাটুলাস লিখেছিলেন তাঁর ভাইয়ের জন্য, তিনিও বিদেশেই মারা গিয়েছিলেন। কারসন সেই কবিতার অনুবাদ করেন, এবং নিজের ভাইয়ের শোকের সঙ্গে দু’হাজার বছর আগের একজন ভাইয়ের শোককে মিলিয়ে দেন। ‘নক্স’ তো শুধু পড়ার বই নয়, এটি দেখার, ছোঁয়ার, ভাঁজ খোলার, স্পর্শ নেওয়ার বইও। ওই বইয়ে শোক লেখা থেকে যেন বস্তু হয়ে ওঠে! কী অবাক না?

পরবর্তী সময়ে ‘ফ্লোট’ ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় বাইশটি পুস্তিকা হিসেবে। বইটি যে কোনও ক্রমে পড়া যায়। ২০২৪ সালে ‘রং নর্মা’ আবার প্রমাণ করে, কারসন প্রচলিত ধারার বইয়ে বিশ্বাস করেন না। অপেরা, নৃত্য, চিত্রকলা, নাটকের সঙ্গে কাজ করেছেন, কারণ তিনি মনে করেন, সাহিত্য কেবল পাতায় থাকে না, তা শরীরে, মঞ্চে, কণ্ঠে, চোখে থাকে। অ্যান কারসন -এর এই স্বভাবের সঙ্গে বাঙালি পাঠকের তেমন হয়ত পরিচয় নেই। এইখানে বারবার মনে পড়ে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা, মধুসূদন গ্রীক মহাকাব্যের আদলে ‘মেঘনাদবধ’ লিখেছিলেন। মনে পড়ে বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কথাও, তাঁরাও ফরাসি ও গ্রীক ঐতিহ্যকে বাংলা কবিতায় নতুনভাবে এনেছিলেন। কারসন সেই কাজটিই করেছেন ইংরেজি ভাষায়, তবে আরও উগ্র, আরও মুক্তভাবে। তিনি দেখিয়েছেন, প্রাচীন গ্রন্থ কেবল পাণ্ডিত্যের বিষয় নয়, তা আজকের প্রেম, বিচ্ছেদ, লিঙ্গ, পরিচয়, শোকের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। তাঁর রচনায় কবিতা ও গদ্য, গবেষণা ও আত্মজীবনী, অনুবাদ ও মৌলিক সৃষ্টি সব মিশে যায়। এই মিশ্রণই তাঁকে সমকালীন সাহিত্যে একক করে তুলেছে। তাঁর লেখা সহজ নয়, কারণ তিনি পাঠককে সহজ পথে হাঁটতে দেন না। কারসন শব্দের ভিতরে শব্দ খোঁজেন, পুরাণের ভিতরে আজকের মুখ খোঁজেন, এবং সেই খোঁজের মধ্যে পাঠককে টেনে নেন। সেই টানেই সাহিত্যে নোবেল ২০২৬ তাঁর হাতে মানায়।🍁

 

 

 

 

🍂গ্রন্থ সমালোচনা | ১ 
লেখক এখানে শুধু ভারতের দর্শনকেই তুলে ধরেননি, তার সঙ্গে পশ্চিমের ভাবনাকেও মিলিয়েছেন। বইতে যখন সিদ্ধার্থ বলেন, ‘আমি খুঁজেছি আত্মাকে, ব্রহ্মকে, আত্মা, জীবন, পরমব্রহ্ম এবং অন্তর্বাসী অপরিজ্ঞাত মূলধারাকে খুঁজতে গিয়ে নিজেকে ক্ষয় করেছি। তিলে তিলে অগ্রাহ্য করেছি নিজের অস্তিত্বকে। আর তা করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি পথের মাঝখানে’, তখন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ বাণীর কথা মনে পড়ে। আবার বুদ্ধের নির্বাণের পথকে সিদ্ধার্থ যখন বলেন, ‘একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে যেন ঐক্যানুভূতির জগতে প্রবেশ করল এমন কিছু যার প্রমাণ নেই, যা সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত, সংসারের ঊর্ধ্বে উঠবার আর নির্বাণ লাভ সম্বন্ধে আপনার মতবাদ আকস্মিক ও খাপছাড়া মনে হয়’… 

 

 

উপনিষদ থেকে তাওবাদ, একটি উপন্যাসে তিন মহাদেশের দর্শন প্রবাহ

পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায় 

নাম শুনে মনে হতে পারে, জার্মান লেখক হেরমান হেসের ‘সিদ্ধার্থ’ উপন্যাসটি গৌতম বুদ্ধের জীবনী। কারণ সিদ্ধার্থ তো বুদ্ধেরই আরেক নাম। কিন্তু বইটি খুললেই ভুল ভাঙে। এই সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক একজন যুবক, ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান। বুদ্ধের দেখা পেয়েছেন, তাঁর কথা শুনেছেন, কিন্তু তাঁর শিষ্য হননি। নিজের মতো করে সত্যের খোঁজে বেরিয়েছেন। এই খোঁজই উপন্যাসের মূল বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত। শুরুতে দেখা যায়, সিদ্ধার্থ সংসার ত্যাগ করেছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন বন্ধু গোবিন্দ। দু’জনে মিলে সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কঠোর সাধনা করছেন। কিন্তু এই সাধনায় তাঁর মনের খিদে মেটে না। তিনি বোঝেন, অন্যের বলে দেওয়া পথে হেঁটে আত্মাকে জানা যায় না। এই সময়ে তাঁদের দেখা হয় গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে। জেতবনে তখন বুদ্ধ তাঁর দর্শন প্রচার করছেন। গোবিন্দ মুগ্ধ হয়ে বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু সিদ্ধার্থ করেন না। তিনি বুদ্ধকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু মনে মনে বলেন, মুক্তি অন্যের উপদেশ শুনে আসে না, নিজেকে দিয়ে অনুভব করতে হয়!

হেস সেই সময়টিকে এক সুতোয় গাঁথতে চেয়েছেন। অন্যদিকে, বইটির ভাষা খুব সরল, কিন্তু ভাব গভীর। ছোট ছোট বাক্যে তিনি বড় বড় প্রশ্ন তুলেছেন। জীবনের অর্থ কী, জ্ঞান কি অন্যের কাছ থেকে পাওয়া যায়, নাকি নিজেকে পুড়িয়ে শিখতে হয়, এই সব প্রশ্নের উত্তর তিনি সরাসরি দেননি। তিনি দেখিয়েছেন, প্রত্যেক মানুষকে নিজের নদী নিজেকেই পার হতে হয়।

এই সিদ্ধান্ত থেকেই তাঁর একা পথ চলা শুরু। সিদ্ধার্থ ফিরে যান সংসারে। সেখানে দেখা হয় নগরের বিখ্যাত নটী কমলার সঙ্গে। কমলার কাছে তিনি প্রেম ও ভোগের শিক্ষা নেন। কমলার মাধ্যমেই পরিচয় হয় ব্যবসায়ী কামস্বামীর সঙ্গে। ধীরে ধীরে সিদ্ধার্থ এক সময়ের ত্যাগী সন্ন্যাসী থেকে হয়ে ওঠেন বিষয়ী মানুষ, অর্থ, লোভ, আরামের জগতে ডুবে যান। লেখক এখানে যৌনতাকে কোনও পাপ হিসেবে দেখাননি, একটি কলা হিসেবে দেখিয়েছেন। কমলার সঙ্গে সিদ্ধার্থের সম্পর্ক, ‘কবিতার বিনিময়ে চুম্বন’ এই সব দৃশ্যে প্রাচীন ভারতের কামশাস্ত্রের ছায়া আছে। কিন্তু ভোগের জীবনও তাঁকে শান্তি দেয় না। এক সময়ে তাঁর মনে হয়, তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন। আগের মতোই আবার সব ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়েন। তখনই দেখা হয় বাসুদেব নামে এক মাঝির সঙ্গে।

বাসুদেব নদীর ধারে থাকেন, নদী পারাপার করেন। তিনি সিদ্ধার্থকে বলেন, প্রকৃতির কাছ থেকে শিখতে। নদীর বয়ে চলা, তার শব্দ, তার চুপ থাকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের শিক্ষা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধার্থ বাসুদেবের কাছেই দীক্ষা নেন। নদীর কাছে বসে তিনি বোঝেন, জীবন একটু প্রবাহ, সেখানে জন্ম, মৃত্যু, সুখ, দুঃখ সবই একসঙ্গে বয়ে চলে। এই দীর্ঘ যাত্রায় সিদ্ধার্থ যাঁদের সংস্পর্শে এসেছেন, প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখেছেন। ব্রাহ্মণ পিতার কাছ থেকে শৃঙ্খলা, সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে সংযম, বুদ্ধের কাছ থেকে করুণা, কমলার কাছ থেকে প্রেমের শিল্প, কামস্বামীর কাছ থেকে সংসারের হিসেব, আর বাসুদেবের কাছ থেকে প্রকৃতির সঙ্গে এক হয়ে যাওয়া। এই সব শিক্ষা মিলেই সিদ্ধার্থকে পূর্ণ মানুষ করে তোলে।

উপন্যাসটি পড়তে গেলে মনে হয়, লেখক এখানে শুধু ভারতের দর্শনকেই তুলে ধরেননি, তার সঙ্গে পশ্চিমের ভাবনাকেও মিলিয়েছেন। বইতে যখন সিদ্ধার্থ বলেন, ‘আমি খুঁজেছি আত্মাকে, ব্রহ্মকে, আত্মা, জীবন, পরমব্রহ্ম এবং অন্তর্বাসী অপরিজ্ঞাত মূলধারাকে খুঁজতে গিয়ে নিজেকে ক্ষয় করেছি। তিলে তিলে অগ্রাহ্য করেছি নিজের অস্তিত্বকে। আর তা করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি পথের মাঝখানে’, তখন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ বাণীর কথা মনে পড়ে। আবার বুদ্ধের নির্বাণের পথকে সিদ্ধার্থ যখন বলেন, ‘একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে যেন ঐক্যানুভূতির জগতে প্রবেশ করল এমন কিছু যার প্রমাণ নেই, যা সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত, সংসারের ঊর্ধ্বে উঠবার আর নির্বাণ লাভ সম্বন্ধে আপনার মতবাদ আকস্মিক ও খাপছাড়া মনে হয়’, তখন বোঝা যায়, তিনি বুদ্ধের পথকে অস্বীকার করছেন না, কিন্তু নিজের পথ খুঁজছেন। এই কারণেই লেখক হেনরি মিলার বলেছিলেন, ‘সাধারণভাবে পরিচিত বুদ্ধকে অতিক্রম করে এখানে এক নতুন বুদ্ধ সৃষ্টি করা হয়েছে।’

হেরমান হেস নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘Siddhartha is a very European book despite its setting. It is the expression of my liberation from Indian thinking’। অর্থাৎ বইটির পটভূমি প্রাচ্যের হলেও এর ভিতরের ভাবনা ইউরোপীয়। তিনি ভারতীয় দর্শন থেকে মুক্তি পেতেই এই বই লিখেছিলেন। তাই এখানে ভারতকে যেমন দেখা যায়, তা পশ্চিমের চোখে দেখা ভারত। এতে বুদ্ধ, উপনিষদ, কামসূত্র, তাওবাদ, কনফুসিয়াস এসব দর্শনের মিশ্রণ আছে। গৌতম বুদ্ধ যে সময়ে ভারতে তাঁর মত প্রচার করছেন, প্রায় একই সময়ে গ্রিসে সক্রেটিস ও চিনে কনফুসিয়াস তাঁদের ভাবনা প্রচার করছেন। হেস সেই সময়টিকে এক সুতোয় গাঁথতে চেয়েছেন। অন্যদিকে, বইটির ভাষা খুব সরল, কিন্তু ভাব গভীর। ছোট ছোট বাক্যে তিনি বড় বড় প্রশ্ন তুলেছেন। জীবনের অর্থ কী, জ্ঞান কি অন্যের কাছ থেকে পাওয়া যায়, নাকি নিজেকে পুড়িয়ে শিখতে হয়, এই সব প্রশ্নের উত্তর তিনি সরাসরি দেননি। তিনি দেখিয়েছেন, প্রত্যেক মানুষকে নিজের নদী নিজেকেই পার হতে হয়।

এইসময়ের পাঠকের কাছে ‘সিদ্ধার্থ’একটি আয়না হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এই বইয়ে ভোগ ও ত্যাগ, সংসার এবং সন্ন্যাস, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এসব বিপরীত একটি জায়গায় এসে মেলে। তিনি বুদ্ধের জীবন জানতে চান, এখানে বুদ্ধকে পাবেন অন্য চোখে। আর যে নিজের জীবনের পথ খুঁজছেন, তিনি এখানে পাবেন একজন সঙ্গী, যে বলে যান, সত্য কেউ তোমাকে দেবে না, তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে! তবে এই ভাবনা সবক্ষেত্রে সবার জন্য সমান নাও হতে পারে!🍁

 

 

 

🍂কবিতা 

 

স্বপন দত্ত -এর একটি কবিতা

পুনরায় তো পুনরায়-ই

কৃষকের মাঠ। আলো ঝুলছে। অথচ—
অথচ নিশ্চিন্ত সারি সারি অন্ধকার অখণ্ড।
অখণ্ড দুঃখ কষ্ট সঙ্গীত গাছ।
নাক ডাকতে-ডাকতে ডাকাতে-ডাকাতে
অশরীরী পাহাড়কে ছাড়িয়ে উঠে চলেছে
জরায়ুর ডানায়-ডানায় প্রাচীন মাঠের আচরণ
শব্দ নাকি মৈথুন স্তব্ধ স্তম্ভ অবশিষ্ট একটি আগামীকাল
একটি পুনরায় পুঁতে রাখা কি কি!

 

 

শুভমিতা মোনাকার -এর একটি কবিতা

ছদ্মবেশী বসন্ত

হৃদয়ের শিকড়ে যখন আগুন লাগে,
তখন পুরো ভালোবাসার গাছটাই জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যায়।
যে সবুজ ছায়ায় একসময় বসে শান্তি পেতাম,
আজ সেই সবুজ ছায়াটা আর সবুজ ছায়া নেই।
আজ সেখানে শুধুই এক লেলিহান দাবানল,
যা পুড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বাসের সবটুকু আঙিনা আর আশ্রয়।
এখন চারপাশে শুধু বিষাক্ত ধোঁয়া আর ছাইয়ের স্তূপ,
কি জানি, আমি হয়তো দাবানলকেই সবুজ ছায়া ভেবেছিলাম!
আসলে মরীচিকাকে জল ভেবে যেমন তৃষ্ণা মেটে না,
তেমনি ছদ্মবেশী ছায়ায় সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া যায় না।
সেখানে কোনোদিন সত্যিকারের বসন্ত মেলে না—
শুধু রয়ে যায় এক বুক শূন্যতা, আর পুড়ে যাওয়া মনের হাহাকার।

 

 

অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

সার্টিফিকেট 

নীরব একাকিত্ব।কেউ যেন কোথাও নেই।

তবুও নিজের উপস্থিতি
কয়েকটা অক্ষর আর শব্দের ভেতর।
প্রামাণ্য হিসেবে থেকে যায় প্রশংসাপত্রে।

এই যে শিশুটি ভূমিষ্ট হলো,তার উপস্থিতি
জন্ম সার্টিফিকেটের ভেতর।

তারপর, সে একে একে পরীক্ষায় কৃতকার্য হবে।
তারও উপস্থিতি কয়েকটি সার্টিফিকেটের ভেতর।

এরকমভাবে সবাই ছুটে চলেছি, নিজেদের অস্তিত্ব রাখার জন্য কিছু নথির ভেতর।

অতঃপর মৃত্যু।

তারপরেও যে উপস্থিতি, সেটুকু রয়ে যায় ডেথ সার্টিফিকেটের ভেতর।

এইভাবেই বোধহয় সব কিছু ছড়িয়ে পড়ে।

 

বৃন্দাবন দাস -এর তিনটি কবিতা

১৯ মে-র কথা 

এমন শুদ্ধ দিন, এমন সত্যের দিন
আর যাই হোক, কখনো অপবিত্র হবে না

অযথা আর কোন বৃক্ষের পত্রমোচন হবে না
হবে না বনভূমে তপোভূমে মত্তহস্তী বিচরণ

প্রতিটি প্রাণে, প্রাণের দীর্ঘ আশ্বাস
তীব্র ভালোবাসা
বাংলার মাটি বাংলার জল একাকার
অমল শুদ্ধতা

১৯ মে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অমলিন অঞ্জলি
সৌন্দর্যতাপিত অমর
নচিকেতা দিন

১৯ মে
ভাবন-অভাবনের চিরন্তন উর্ধে
শপথ নেবার দিন—

 

 

এতদিন 

এতদিন হাততালি দিতে দিতে হেঁটেছি চৌকোশ
এখন খরস্রোতা সামনাসামনি

কে জানত ফাঁকা জায়গা এতো এতো অপালনীয়-উৎসব
মুখোমুখি ধুলোমাটি দাঁড়াবে শীর্ণ শরীরের উৎসে

যাছিল নিজস্ব অহং যাছিল পাহাড় চূড়া দখলের মোহ
কীকরে যে ভিজে গেল চোখের জলে ঘৃণার ফুত্কারে

এ বড় ভয়াল নিঃশ্বাস
অবহেলা ফুঁড়েই কিনা মাটির গান

কে যে নগরপাল কে যে বিকৃত প্রেমিক
শূন্য বিড়ম্বনায় একাই পুড়ে যাচ্ছে

আমরা শুধু রাজকোষে সিঁড়ি বাই
ধুলো যেন না লাগে হাতের তালুতে—

সম্পর্ক 

রাজা মানেই যুদ্ধ ব্যাপারী
প্রজা তার সত্যি যোগানদার

বিদূষক আর ভাঁড়
তোলপাড় আর দেশটা

২.

ব্রজপুরে সবার ডানা এক

কেউ মাঝামাঝি নয়
কেউ অপসারিত নয়

রাক্ষসখোক্ষস এক সংবিধান

 

 

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

শরীর মানে অল্প আলো, গোপন চিঠি…

আমি শব্দগুলো আঙুলে ধরে পড়ব।

চোখের কোণে জমে থাকা নরম অন্ধকার
ধীরে ধীরে গলে যায় ঠোঁটের কাছে এসে…

শ্বাসের ভেতর উষ্ণতা
ছড়িয়ে পড়ছে বিছানায়
জানলার বাইরে শহর, ঘুমিয়ে পড়ে
ভিতরে ভিতরে জেগে থাকে ধীর ছন্দ

এখন একটু কাছে এলেই বোঝা যায়
ভালবাসা আসলে শরীরেরই আরেকটি নাম…

তাই?

 

সৌমনা ঘোষাল -এর দু’টি কবিতা

আমাদের কবিতা /১

হঠাৎ খুব সাধারণ লাগে পৃথিবীটা।

জানলার বাইরে পৃথিবী
সে আর আলাদা করে ডাকে না।

তোমার হাতের কাছে আমার হাত
কেমন অন্যমনস্ক হয়ে থাকে।

কিছু কথা বলা যায় না
তবু বোঝা যায়, স্পর্শে ;

রাত গভীর আমরা নিজেদের কাছেই
আরও কাছে ফিরে আসি।

 

আমাদের কবিতা /২

শরীরের গন্ধে
চেনা ঘরটাও
নতুন হয়ে গিয়েছে!

আমি তাকিয়ে দেখি
এইটুকুই যেন যথেষ্ট।

কাছে এলে সময় ধীরে ধীরে নামে
ঘড়ির কাঁটা যেন থমকে যায়।

একটু স্পর্শ, খুব স্বাভাবিক,
তার ভেতরে ঢেউ লুকোনো।
কথা না বলেও
আমরা অনেক কিছু বলে ফেলি।

 

অরবিন্দ শ্রীনিবাস -এর দু’টি কবিতা

শিরোনামহীন 

শাড়ির ভাঁজ, এখানে লুকোনো বিকেলের
আমি একটু কাছে গিয়ে খুঁজি গন্ধটুকু!
চুলে তোমার বৃষ্টির গন্ধ,
আঙুলে আমার অনভ্যস্ত কাঁপুনি।
চোখাচোখি হলেই
শহরটা হালকা নড়ে ওঠে,
ল্যাম্পপোস্টগুলো যেন দুলছে
তুমি বলো : এত সিরিয়াস কেন?
আমি হেসে বলি : আসলে আবহাওয়া।
নীরবতা নেমে এলে বারান্দায়
দু’জনের নীরবতা আলতো ছুঁয়ে যাই…
তারপর হঠাৎ হাত ছুঁয়ে ফেলা
বাকি সব গল্প বাতাস বুঝে নেয়।

 

 

আরও একটি শিরোনামহীন 

 

ওই ঠোঁটে উষ্ণতা

আমি শুধু দূর থেকে অভিধান খুঁজি

ঘড়ির কাঁটা থমকে
থাকে খানিক,
সময়ও স্থির

কাঁধ…
তোমার হালকা চাপ
বাড়িটা তখন
একদম ব্যক্তিগত

জানলার বাইরে
নির্লিপ্ত চাঁদ
ভিতরে ছোট ছোট
দুঃসাহসী মৌনতা

 

 

শর্বাণীরঞ্জন কুণ্ডু -এর দু’টি কবিতা 

দোষ ধরা

যারা স্বার্থপর হয়
তারা অন্যের দোষ ধরে।
যাদের অনেক দোষ
তারা অন্যের দোষ ধরে।

অনেকেই জানে না
পৃথিবীটা চোখ মেলে দেখতে হয়।

বড় বিচিত্র এই পৃথিবী।
যা কিছু চরাচরে
সবই ইতিহাস বহন করে।

তোমার আমার ক্ষমতা অতি সীমিত।
দু চোখ ভরে দেখাই বিহিত।

এমন অনেক মানুষ আছে
যারা পৃথিবীর দিকে তাকাতেই শেখেনি।
তারা কেবল আত্মসর্বস্ব।
তারা কেবলই মানুষের দোষ ধরে।

 

 

সাশ্রয় নিউজ Illustration

প্রকৃতি 

কখনও কখনও জীবন গড়গড়িয়ে চলে।
জীবন যেন একটা মসৃন সড়ক
গড়গড়িয়ে চলে জীবন সকট।
পথে কোনো খানাখন্দ নেই,
দুর্বৃত্তের আনাগোনা নেই।
দিব্যি গান গাইতে গাইতে, শিষ দিতে চলেছি।
ওদিকে আকাশে হয়ত মেঘ জমেছে।
চোখে পরেনি।
বাতাসের গতি বেড়েছে।
সাদা মেঘ কালো হয়েছে,
জলভারে নীচে নেমে এসেছে।
শেষে ঝঞ্জা, বজ্র, বিদ্যুত ও বৃষ্টি।
ভিজে চুপচুপে হতে হল।
ভাগ্যাহত হলে বিদ্যুৎ-স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুও হতে পারতো।
অদৃষ্ট কেউ জানে না
তাই প্রকৃতির কাছে নতজানু হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

 

অরুনেশ চট্টোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা 

শূন্য 

মায়া, শীতের উষ্ণ রোদ। আর না। এইসব ছাড়িয়ে যাই। দ্রুত…

দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, শুধু প্রেম

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস  
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী 

৩২. 

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বা বিপন্ন প্রজাতির জীবদের যেমন গোলাপি পৃষ্ঠা বা পিঙ্ক পেজ বলে নির্দেশ করা হয় এ যেন মনে হল তিথির কাছে লতাদের জীবন কাহিনি অনেকটা সেরকম। তাই কাগুজি মাসিকে বলল, হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ কথাটা।
এ তো পিঙ্ক পেজের মত অবস্থা।
—সেটা আবার কি বৌমা।
—ও তুমি বুঝবে না।
—হ্যাঁ, তোমাদের ওই শিক্ষিত ভাষা আমাদের ভেতরে ঢুকবে না গো। গোমুখ্য হয়ে বসে আছি।
—বেশ ওই নিয়ে আর তোমাকে আফসোস করতে হবে না, কী করবে বলো?
—না গো, মাঝে মাঝে মনে হয় লেখাপড়াটা শিখলে কত ভাল হতো।
—সে তো তুমি এখনও শিখতে পারো।
—কি যে বলো না বৌমা। এখন কী আর সেই বয়স আছে?

ছেলেটি লতার সঙ্গে সেদিন সন্ধ্যে থেকে রাত পর্যন্ত অনেকক্ষণ একসঙ্গে ছিল। লতার জীবনের সেদিনের সন্ধ্যেটা ছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো। তবুও তার মাঝে মাঝে ভয় করে কি জানি, এই চন্দ্রিমার আলোকিত সুন্দর মুহূর্তগুলো চিরস্থায়ী হবে তো?
দু’টি বুভুক্ষ হৃদয় যেন মেলে দিয়েছিল ডানা। চন্দ্রিমার আলো যেন অনেক বেশি হৃদয় স্পর্শ করেছিল।

—ও মা লেখাপড়ার আবার বয়স কি! লেখাপড়ার কোনও বয়স নেই।
বুবুন কোথা থেকে এসে শুনতে পেয়ে বলল,
—মাম মাম আমি, মাসি দিদাকে পড়াব।
—কী করবে তুমি?
তিথি হাসতে হাসতে বলল
আমি টিচার হব।
—টিচার টিচার খেলব।
কাগুজি মাসি বুবুনকে টেনে কোলে বসাল। তারপর বলল, —তাই বাবা তাহলে আমি তোমার কাছে লেখাপড়া শিখব।
তিথি হাসতে হাসতে বলল,
—নাও এবার বায়না সামলাও তুমি। আমি শুনতে গেলাম লতাদির কথা তুমি এখন লেখাপড়া নিয়ে বসলে।
—তাহলে মাসি দিদা, তুমি কবে থেকে ক্লাস করবে?
এটা তো ভারি চিন্তার ব্যাপার হয়ে গেল কাগুজি মাসি মাথা চুলকে বলল,
—কেন!
—আমার তো এখনও কিছু কেনা হয়নি বই, স্লেট পেন্সিল কি করে লেখাপড়া শিখব?
—আমার কাছে আছে। তবে স্লেট নেই।
তিথি দেখল, এবার গন্ডগোল হবে ওর সব পণ্ডশ্রম ব্যর্থ হবে। ওকে, এবার যদি এরা এখানে টিচার টিচার খেলা শুরু করে দেয় তাহলে তো মাসির কাছ থেকে শোনাই হবে না। তিথি বুবনকে টেনে নিয়ে বলল, আচ্ছা বুবুন সোনা, তুমি বলো মাসির এখন কপালে লেগেছে তো তাহলে মাসি দিদা কী করে এখন লেখাপড়া করবে?
বুবুন কী একটা ভাবার চেষ্টা করল তারপরে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে মাসি দিদা ঠিক হোক তারপর আমি লেখাপড়া শেখাব। চল পুচু। আমরা উপরে গিয়ে খেলা খেলা করি।
—হ্যাঁ, সেই বেশ ভাল। তিথি বলল।
বুবুন চলে গেল। সঙ্গ নিল পুচু।
দেখলে মাসি, কী কাণ্ড বাঁধিয়েছিলে?
—হ্যাঁ।
—তবে হ্যাঁ, আমার ছেলে ভুলবে না! তোমাকে কিন্তু লেখাপড়া করতেই হবে।
সেই তো মাস্টার মশাই যখন কথা দিয়েছেন তখন তো ছাত্রী হিসেবে আমাকে পালন করতেই হবে।
দু’জনেই হো হো হো করে হেসে উঠল।
—তবে জানো মাসি, পুচুটা থাকার জন্য আমার বুবুনের একাকীত্ব ঘুচে গিয়েছে।
—এটা তুমি ঠিকই বলেছ।
নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির এই একটা সমস্যা জানো, তো তবে তোমরা আছো শাশুড়ি মা আছে সেটা অনেকটা ভরসার জায়গা।
—হ্যাঁগো, বৌমা তুমি তো তাও বোঝো এখনকার যে দিনকাল পড়েছে কেউ তো শ্বশুর- শাশুড়ি নিয়ে থাকতেই চায় না।
—ছাড়ো তো মাসি।
—হ্যাঁ, সেই ভাল।
—আচ্ছা না বলো, তারপর লতাদির কথা।
সে আর কি বলি! লতাকে বোঝানোর পর ও-বলল, তাহলে ভাবছ এবার আমি ঠকব না। আমি বললাম, সেটা কী করে বলি, সেটা ভেবে এগুলো তো কাউকে ভালবাসাই যাবে না।
—কিন্তু আমার যে ভয় লাগে মাসি।
—ভয়কে দূর করতে হবে যে।
কথায় বলে না প্রেমেতে মজিলে মন কিবা হাঁড়ি কিবা ডোম।
লতা চুপ করে থেকে অনেকক্ষণ ভাবল, তারপর বলল,
—ঠিক আছে মাসি যা আছি তার থেকে তো আর খারাপ কিছু হবে না।
মাসি বলল, আমি লতার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,
—একদম।
সেদিন লতা খুব সুন্দর করে সেজেছিল এ যেন ওর অভিসারে যাবার দিন।
বাবা তুমি তো অভিসার বেশ ভাল বোঝো মাসি।
না গো কীর্তন শুনি না তাই বললাম।
—ঠিকই বলেছ।
সেদিন আমাদের হেড মাসি খুব মুডে ছিল। লতা বেশ করে মাসিকে মাখন লাগাল। যেন লতা মাসির কথা মতই চলবে এমন একটা ভাব।
মাসি সেদিন নেশায় ডুবেছিল। সে নিশ্চিত ছিল লতার উপর ভরসা করেছিল। সন্ধ্যে থেকেই লতার ঘরে নানা আয়োজন চলছিল। বাকি মেয়েরা লতার এই বদলে যাওয়াতে কেমন অবাক হয়ে গেছিল। তারপর আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
ছেলেটি লতার সঙ্গে দেখা করল, লতার মনের কথা জানতে পেরে এতটাই উচ্ছ্বসিত যে পারলে সেই রাতেই লতাকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে। লতা একবার আমার সঙ্গে মাঝে দেখা করল। আমাকে সব ব্যাপার খুলে বলল।
—তুমি কী বললে, মাসি?
—আমি বললাম, মুহূর্তেই ডিসিশন নিবি একবার ভেবে দেখলে হয় না।
—কী ভেবে দেখবে মাসি? —তুমিই তো রাজি করালে আবার তুমি বলছ…
কাগুজি মাসি বলল,
হ্যাঁ বলেছি, তখনও বলেছি। তবে আমি ওকে কটা শর্ত দিতে বলেছিলাম।
—শর্ত!
—হ্যাঁ, এবার ওর সম্পর্কে সবকিছু জানতে হবে ওর পরিবার সম্পর্কে কোথায় থাকে না থাকে কি করে সেসব জানতে হবে না?
—হ্যাঁ ঠিকই বলেছ, মাসি তোমার তো অনেক বুদ্ধি।
আর বুদ্ধি। বুদ্ধিতে যেন আমি বৃহস্পতি।
—কেন বাবা, এরকম করে বলছ মাসি, আমি তোমাকে কিন্তু সত্যি কথাই বলেছি।
—বেশ ইন্টারেস্টিং। তারপর…
—তারপর যেমন বলা ঠিক সেই মতই কাজ।
—ছেলেটি লতার সঙ্গে সেদিন সন্ধ্যে থেকে রাত পর্যন্ত অনেকক্ষণ একসঙ্গে ছিল। লতার জীবনের সেদিনের সন্ধ্যেটা ছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো। তবুও তার মাঝে মাঝে ভয় করে কি জানি, এই চন্দ্রিমার আলোকিত সুন্দর মুহূর্তগুলো চিরস্থায়ী হবে তো?
দু’টি বুভুক্ষ হৃদয় যেন মেলে দিয়েছিল ডানা। চন্দ্রিমার আলো যেন অনেক বেশি হৃদয় স্পর্শ করেছিল।
মাসির চোখে জল।
—একি মাসি তুমি কাঁদছ কেন?
—আমার ভেতরে ভেতরে একটা ভয় কাজ করছিল যদিও সেই ভয়টার কথা ওকে প্রকাশ করিনি।
—কীসের ভয় মাসি?
—ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম, ছেলেটি যেন বিবাহিত না হয়।
তিথি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—এটা অবশ্য ঠিক।
—আসলে কি জানো, বৌমা গলিতে যারা আসে বিবাহিত যেমন আসে তেমনি অবিবাহিত। লতাকে যে পরামর্শ দিয়ে এগুলোর কথা বলা হয়েছে সেই অনুযায়ী কাজ এগিয়েছিল।
তবেএখানে এক করুণ বেদনাদায়ক কাহিনি।
আবার আর এক কাহিনি… 🍁(ক্রমশঃ)

 

 

 

🍁গ্রন্থ আলোচনা | ২

 

এই উপন্যাস কোনও জটিল সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়। এখানে চরিত্রের সংখ্যা কম, ঘটনাও সরলরৈখিক। কিন্তু তার মধ্যেই লেখক মানবজীবনের একটি চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরেছেন। আমরা অনেক সময় ভাবি, আমাদের কাজের কোনও মূল্য নেই, কেউ আমাদের মনে রাখবে না। কিন্তু বইটি বলে, প্রতিটি মানুষই অন্য কারও জীবনের কোনও না কোনও দিকের সঙ্গে যুক্ত। একই দিকে, এইসময় দাঁড়িয়ে বইটির প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়ে যায়।

 

আমাদের জীবন কি সত্যিই অর্থহীন, উত্তর দিচ্ছে ‘দ্য ফাইভ পিপল ইউ মিট ইন হেভেন’

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়

মৃত্যু সবকিছুর শেষ? নাকি তার পরেও থেকে যায় কিছু হিসেব-নিকেশ? মানুষের জীবনে এমন অনেক প্রশ্ন থাকে, যার উত্তর ইহজগতে মেলে না। সেই না পাওয়া উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই একদিন জীবনের মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হয়। মার্কিন লেখক মিচ অ্যালবম তাঁর ‘দ্য ফাইভ পিপল ইউ মিট ইন হেভেন’ বইতে এই ভাবনাটিকেই গল্পের আকার দিয়েছেন। দেখা যায়, উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছেন এডি। পেশায় একটি বিনোদন পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের প্রধান। সারা জীবন ধরে তিনি সেই পার্কের যন্ত্রপাতি সামলেছেন, ঘাম ঝরিয়েছেন, অথচ নিজের জীবন নিয়ে তেমন কোনও গর্ব করার মতো গল্প তাঁর নেই। একঘেয়ে, ক্লান্তিকর, সাধারণ এক জীবন। একদিন পার্কে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। একটি ট্রলি উপর থেকে পড়তে থাকে, নীচে দাঁড়িয়ে একটি ছোট মেয়ে। এডি ছুটে যান মেয়েটিকে বাঁচাতে। মেয়েটিকে সরিয়ে দিতে গিয়ে নিজেই প্রাণ হারান। এখান থেকেই শুরু হয় বইয়ের আসল যাত্রা। মৃত্যুর পর এডি দেখেন, তিনি একটি অন্য জগতে পৌঁছে গিয়েছেন। সেখানে একে একে পাঁচ জন মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। এঁরা প্রত্যেকেই তাঁর জীবনের সঙ্গে কোনও না কোনও ভাবে জড়িত। কাউকে তিনি চিনতেন, কাউকে চিনতেন না। কেউ তাঁর খুব কাছের, কেউ আবার দূরের, এমনকি অচেনা। কিন্তু প্রত্যেকের সঙ্গেই তাঁর জীবনের একটি যোগসূত্র রয়েছে।

মিচ অ্যালবমের বইটি পড়তে পড়তে সেই বিশ্বাসের সঙ্গে কোথাও যেন মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয়, হয়ত আমাদের পূর্বপুরুষরাও স্বর্গে সেই পাঁচ জনের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছেন। তাঁদের সমস্ত যন্ত্রণা, সব বোঝা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এবং এখন তাঁরা অপেক্ষা করছেন, অন্য কারও জীবনে সেই পাঁচ জনের একজন হয়ে ওঠার জন্য।

এই পাঁচ জনের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়েই এডি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, তাঁর ফেলে আসা জীবনের অর্থ কী ছিল। কেন কিছু ঘটনা ঘটেছিল? কেন কিছু মানুষ তাঁর জীবনে এসেছিল? কেন কিছু কষ্ট তাঁকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে? তার ব্যাখ্যা মেলে। লেখক দেখাতে চেয়েছেন, পৃথিবীতে কোনও জীবনই অর্থহীন নয়। প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি ছোট ঘটনা, প্রতিটি ভাল-মন্দ কাজ কোথাও না কোথাও অন্য কারও জীবনে প্রভাব ফেলে। বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হল, সহজ বর্ণনা। মিচ অ্যালবম অত্যন্ত সাধারণ ভাষায়, কোনও ভারী দর্শন ছাড়াই একটি গভীর কথা বলে গিয়েছেন। কীভাবে এক-একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কেন হচ্ছে, তার কারণ লেখক এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে পাঠক একবার শুরু করলে শেষ না করে উঠতে পারেন না। বইটি আকারে ছোট, কিন্তু তার ভাবনা অনেক বড়।

অনেক পাঠকের কাছেই মিচ অ্যালবম পরিচিত ‘টিউসডেস উইথ মরি’ বইটির জন্য। সেই বইটি আসলে জীবন ও মৃত্যু নিয়ে হৃদয়বিদারক কথোপকথন। সেই তুলনায় এই বইটি অনেক বেশি কল্পনানির্ভর, কিন্তু আবেগের দিক থেকেও কম যায় না। যাঁরা ‘টিউসডেস উইথ মরি’ পড়ে কিছুটা ভারাক্রান্ত বোধ করেছেন, তাঁদের জন্য এই বইটি অনেকটা হালকা অথচ গভীর বিরতি হতে পারে। পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক যেন পাঠকের কাঁধে হাত রেখে বলছেন, ‘তোমার জীবনও গুরুত্বপূর্ণ, তুমিও কারও না কারও জন্য জরুরি।’

সমালোচকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই উপন্যাস কোনও জটিল সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়। এখানে চরিত্রের সংখ্যা কম, ঘটনাও সরলরৈখিক। কিন্তু তার মধ্যেই লেখক মানবজীবনের একটি চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরেছেন। আমরা অনেক সময় ভাবি, আমাদের কাজের কোনও মূল্য নেই, কেউ আমাদের মনে রাখবে না। কিন্তু বইটি বলে, প্রতিটি মানুষই অন্য কারও জীবনের কোনও না কোনও দিকের সঙ্গে যুক্ত। একই দিকে, এইসময় দাঁড়িয়ে বইটির প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়ে যায়। সদ্য মহালয়া গেল। পিতৃপক্ষের অবসান, দেবীপক্ষের সূচনা। এই দিনে বাঙালি তাঁর পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে, তর্পণ করে। তাঁদের উদ্দেশ্যে জল দান করে। বিশ্বাস করা হয়, পূর্বপুরুষরা এই সময়ে মর্ত্যে নেমে আসেন। মিচ অ্যালবমের বইটি পড়তে পড়তে সেই বিশ্বাসের সঙ্গে কোথাও যেন মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয়, হয়ত আমাদের পূর্বপুরুষরাও স্বর্গে সেই পাঁচ জনের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছেন। তাঁদের সমস্ত যন্ত্রণা, সব বোঝা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এবং এখন তাঁরা অপেক্ষা করছেন, অন্য কারও জীবনে সেই পাঁচ জনের একজন হয়ে ওঠার জন্য।

বইটির শেষ পাতায় পৌঁছে অন্য ধরনের শান্তি অনুভব হয়। মনে হয়, মৃত্যু ভয়ের নয়, আসলে তা দীর্ঘ যাত্রার পরে বিশ্রাম। এবং সেই বিশ্রামের আগে জীবনের সব অসমাপ্ত গল্পের একটি সমাপ্তি আছে। এডির গল্প সেই সমাপ্তিরই গল্প। এখানে বলা যায়, যাঁরা জীবনের অর্থ খুঁজছেন, যাঁরা ভাবছেন তাঁদের জীবন খুব সাধারণ, তাঁদের জন্য এই বইটি অবশ্যই পাঠ্য। এটি কোনও ধর্মগ্রন্থ নয়, কোনও উপদেশমালাও নয়। এটি শুধু একটি গল্প, যা পড়ার পর মনে হয়, আমরা কেউ একা নই, আমরা সবাই একে অপরের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। আর সেই বাঁধনই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, হ্যাঁ, মৃত্যুর পরেও।🍁

 

 

🍁গদ্য 
প্রিয় মানুষকে নিজের পরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম করে দেখার প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। ‘তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই না, তুমিই আমার পরিচয়’! কী অসম্ভব লাইন! এই বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে প্রেমের গভীর আত্মসমর্পণ। প্রিয় মানুষকে জীবনের এমন একটি গভীরতম জায়গায় বসানো হয়েছে, যেখানে তাঁর গুরুত্ব আর আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন থাকে না। তাঁকে দেবী ও ভগবানের সঙ্গে তুলনা করার মধ্যেও চিহ্নিত আছে শ্রদ্ধা ও আবেগের চূড়ান্ত প্রকাশ।

 

‘তুমি আমার জীবনের সুর, আমার অস্তিত্বের পরিচয়’ : প্রেমের গভীরতায় জাভেদ আখতারের কবিতার দর্শন

অভিরাজ চক্রবর্তী

মানুষের জীবনে কিছু অনুভূতি থাকে, যাদের মাপার কোনও নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। আনন্দ, দুঃখ, অভিমান, অপেক্ষা কিংবা ভালবাসা প্রতিটি অনুভূতির প্রকাশ আলাদা হলেও মানুষের অন্তর্জগতে তাদের প্রভাব গভীর। বিশেষ করে প্রেম এমন এক অনুভব, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে নতুন অর্থ দিতে পারে। পরিচিত পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখতে শেখায়, সাধারণ মুহূর্তের মধ্যে অসাধারণ আনন্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। কখনও একটি মানুষের উপস্থিতি জীবনের ক্লান্তি কমিয়ে দেয়, কখনও তাঁর অনুপস্থিতিই প্রতিটি মুহূর্তে শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করে। লেখক ও কবি জাভেদ আখতারের (Javed Akhtar) ‘কীভাবে বলব তোমায়, আমার জন্য তুমি কী?’ কবিতায় এই গভীর অনুভূতিরই কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছে। মূল হিন্দি কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেন সংবেদন শীল। কবিতাটির কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক প্রশ্ন, যার উত্তর দিতে গিয়ে মানুষ বারবার নিজের অনুভূতির কাছেই ফিরে আসেন, প্রিয় মানুষটি তার জীবনে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ? প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনুভূতি প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। মানুষ তার প্রিয়জনকে জানাতে চায়, তাঁর উপস্থিতি কতটা মূল্যবান, তাঁর সঙ্গে কাটানো সময় কতটা আপন। কিন্তু অনুভূতির গভীরতা যখন ভাষার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন পরিচিত শব্দও যেন যথেষ্ট মনে হয় না। ‘কীভাবে বোঝাব তোমায়, আমার জন্য তুমি কে?’ কবিতার এই প্রশ্নের মধ্যে সেই অসহায়তাই ধরা পড়ে। এখানে কোনও সরল উত্তর দেওয়ার চেষ্টা নেই। প্রিয় মানুষকে বোঝানোর জন্য কবি একের পর এক অনুভূতি, স্মৃতি ও উপমার আশ্রয় নিয়েছেন। কারণ ভালবাসার মানুষের গুরুত্ব বোঝাতে সম্পর্কের নাম বলা যথেষ্ট না। সেই সম্পর্ক জীবনের প্রতিটি স্তরে কীভাবে ছড়িয়ে রয়েছে, সেটিও অনুভব করা প্রয়োজন।

প্রেমের অভিজ্ঞতা সব সময় আনন্দে ভরা না। সম্পর্কের মধ্যে হাসি যেমন থাকে, তেমনই থাকে কান্না, অভিমান, ভয় ও হারানোর আশঙ্কা। কবিতার ‘আমার জন্য পাওয়াও তুমি, হারানোও তুমি, হাসাও তুমি, কান্নাও তুমি’ পঙ্‌ক্তিতে সেই বিপরীত অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। প্রিয় মানুষকে কাছে পাওয়ার আনন্দ যত গভীর হতে পারে, তাঁকে হারানোর আশঙ্কাও ততটাই বেদনাদায়ক হয়ে উঠতে পারে। সম্পর্কের স্মৃতি কখনও মুখে হাসি ফোটায়, আবার কখনও একই স্মৃতি মন ভারী করে দেয়। মানুষের অনুভূতি যে সব সময় একমুখী এমন ভাবলে ভুল হবে। কবিতার এই অংশ সেই সত্যকে সামনে আনে।

ওই কবিতায় প্রিয় মানুষকে ‘হৃৎস্পন্দনের গান’ এবং ‘জীবনের সুর’ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। এই উপমাগুলির মধ্যে রয়েছে প্রেমের মৌলিক উপলব্ধি। হৃদস্পন্দন যেমন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তেমনই কোনও কোনও মানুষের উপস্থিতি আমাদের মানসিক জগতের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে তাঁকে আলাদা করে ভাবা কঠিন হয়ে ওঠে। তাঁর সঙ্গে কথা বলা, তাঁর মতামত শোনা কিংবা তাঁর পাশে কিছুটা সময় কাটানো এসবই জীবনের পরিচিত অভিজ্ঞতাকে নতুন মাত্রা দেয়। জীবনের সুরের সঙ্গে প্রিয় মানুষকে তুলনা করার অর্থও যেন সেটাই। জীবনে নানা রকম ওঠাপড়া থাকে, কখনও আনন্দের সময় আসে, কখনও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সেই চলার পথে কাছের মানুষের সঙ্গ অনেক সময় মনকে স্থির হতে সাহায্য করে। কবিতাটিতে প্রেমকে জীবন, বন্দেগি, আলো ও সতেজতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই শব্দগুলি নিছক প্রশংসা হিসেবে দেখলে ভুল হয়ে যাবে। এই শব্দগুলি প্রিয় মানুষকে ঘিরে তৈরি হওয়া মানসিক জগতের পরিচয় বহন করে। কারও উপস্থিতিতে যদি জীবনের প্রতি আগ্রহ বাড়ে, প্রতিদিনের কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায় কিংবা বিপদের সময়েও সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা বজায় থাকে। আর সেই সম্পর্কের গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়। ভালবাসা তখন কেবল দু’জন মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি থাকে না, তা জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করে। এই অনুভূতির সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও স্বাধীনতার জায়গা থাকে। কাউকে ভালোবাসার অর্থ তাঁর উপর নিজের সমস্ত প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়াও না। স্বতন্ত্র সত্তাকেও মূল্য দেওয়া।

‘চোখে তুমি, স্মৃতিতে তুমি, ঘুমে তুমি, স্বপ্নে তুমি’… এই পঙ্‌ক্তিগুলিতে মানুষের স্মৃতি ও কল্পনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক উঠে এসেছে। ভালবাসার মানুষ সব সময় চোখের সামনে থাকেন না। দূরত্ব, কাজের ব্যস্ততা কিংবা পরিস্থিতির কারণে আলাদা থাকতে হলেও তাঁর স্মৃতি মনের মধ্যে থেকে যেতে পারে। কোনও পরিচিত গান, পথের দৃশ্য, পুরনো কথোপকথন কিংবা হঠাৎ ঘটে যাওয়া ছোট কোনও ঘটনা মনে করিয়ে দিতে পারে তাঁর কথা। কখনও ঘুমের আগে সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে, কখনও আবার স্বপ্নের মধ্যেও ফিরে আসেন তিনি। এই অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে মনের এক নিজস্ব জগৎ, যেখানে বাস্তবের দূরত্ব সব সময় অনুভূতির দূরত্ব হয়ে ওঠে না। প্রেমের এই অন্তর্জগৎ তো শুধু স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না। কবিতায় সকাল, সন্ধ্যা, দিন-রাত, ভাবনা ও কাজের মধ্যে প্রিয় মানুষের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, গভীর সম্পর্ক মানুষের অভ্যাসের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে। কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর মতামতের কথা মনে পড়তে পারে, দিনের শেষে কোনও অভিজ্ঞতা তাঁকে জানাতে ইচ্ছা করতে পারে, কিংবা আনন্দের মুহূর্তে প্রথমেই তাঁর সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়ার কথা মনে হতে পারে। অর্থাৎ ভালবাসার মানুষ জীবনের বাইরের কোনও আলাদা অংশ নন, তিনি হয়ে ওঠেন দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। এই কারণেই তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় নিজস্ব স্মৃতি, নিজস্ব ভাষা ও সম্পর্কের একান্ত পরিসর।

মনে রাখতে হবে যে, প্রেমের অভিজ্ঞতা সব সময় আনন্দে ভরা না। সম্পর্কের মধ্যে হাসি যেমন থাকে, তেমনই থাকে কান্না, অভিমান, ভয় ও হারানোর আশঙ্কা। কবিতার ‘আমার জন্য পাওয়াও তুমি, হারানোও তুমি, হাসাও তুমি, কান্নাও তুমি’ পঙ্‌ক্তিতে সেই বিপরীত অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। প্রিয় মানুষকে কাছে পাওয়ার আনন্দ যত গভীর হতে পারে, তাঁকে হারানোর আশঙ্কাও ততটাই বেদনাদায়ক হয়ে উঠতে পারে। সম্পর্কের স্মৃতি কখনও মুখে হাসি ফোটায়, আবার কখনও একই স্মৃতি মন ভারী করে দেয়। মানুষের অনুভূতি যে সব সময় একমুখী এমন ভাবলে ভুল হবে। কবিতার এই অংশ সেই সত্যকে সামনে আনে। ভালবাসার মধ্যে আনন্দ ও বিষাদ পাশাপাশি থাকার কারণেই সম্পর্কের অভিজ্ঞতা এত ব্যক্তিগত, বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। আবার ‘যেখানেই যাই, যেদিকেই তাকাই, তুমি সেখানেই, তুমি ওখানেই’… এই ভাবনায় প্রিয় মানুষের সর্বব্যাপী উপস্থিতির অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। বাস্তবে তিনি পাশে না থাকলেও চারপাশের নানা কিছুর মধ্যে তাঁর স্মৃতি খুঁজে পাওয়া যায়। কোনও বিশেষ জায়গা, ঋতু, খাবার কিংবা পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে একসঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি। ফলে চারপাশের জগৎও ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠে। প্রেমের এই বৈশিষ্ট্য মানুষের অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করে, কারণ তখন কোনও ঘটনা শুধু বর্তমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সঙ্গে জুড়ে যায় অতীতের স্মৃতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশাও।

কবিতার শেষাংশে এসে প্রিয় মানুষকে নিজের পরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম করে দেখার প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। ‘তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই না, তুমিই আমার পরিচয়’! কী অসম্ভব লাইন! এই বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে প্রেমের গভীর আত্মসমর্পণ। প্রিয় মানুষকে জীবনের এমন একটি গভীরতম জায়গায় বসানো হয়েছে, যেখানে তাঁর গুরুত্ব আর আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন থাকে না। তাঁকে দেবী ও ভগবানের সঙ্গে তুলনা করার মধ্যেও চিহ্নিত আছে শ্রদ্ধা ও আবেগের চূড়ান্ত প্রকাশ। কাব্যিক ভাষায় এই ধরনের তুলনা প্রেমের তীব্রতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, বাস্তব জীবনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের পরিচয় ও আত্মমর্যাদা বজায় রাখাও জরুরি। দু’জন মানুষ পরস্পরের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন, অথচ তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব চিন্তা, পছন্দ ও স্বাধীনতা থাকতে পারে। সম্পর্কের সুস্থতা নির্ভর করে এই দুই সত্তার পারস্পরিক স্বীকৃতির উপর।

জাভেদ আখতারের এই কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর সহজ প্রকাশভঙ্গি। জটিল শব্দ বা দুর্বোধ্য বাক্যের পরিবর্তে পরিচিত অনুভূতিকে সামনে আনা হয়েছে। ফলে পাঠক নিজের জীবনের সঙ্গে কবিতার যোগ খুঁজে নিতে পারেন। কেউ হয়ত এখানে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের স্থিরতা দেখবেন, কেউ দেখবেন নতুন প্রেমের আবেগ, আবার কারও মনে ফিরে আসতে পারে দূরে থাকা কোনও মানুষের স্মৃতি। ঈশ্বরের সঙ্গে অসীম টান! একই কবিতা বিভিন্ন পাঠকের মনে বিভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে। সাহিত্য ও কবিতার সৌন্দর্য এখানেই। লেখকের অনুভূতি পাঠকের কাছে পৌঁছলেও তার অর্থ একটিমাত্র ব্যাখ্যায় আটকে থাকে না। বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে এই কবিতা অন্য ভাষার পাঠকের কাছেও পৌঁছনোর সুযোগ পেয়েছে। ভাষার নিজস্ব ছন্দ ও প্রকাশভঙ্গি আলাদা হলেও প্রেম, অপেক্ষা, স্মৃতি ও আপনজনের গুরুত্ব মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই ভাষান্তরের পরেও কবিতার মূল আবেগ পাঠকের মনে সাড়া জাগাতে পারে। সংবেদন শীল-এর অনুবাদে সেই অনুভূতিকে বাংলায় প্রকাশ করার প্রয়াস রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ‘কীভাবে বলব তোমায়, আমার জন্য তুমি কী?’ শুধু প্রেম নিবেদনের কবিতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কবিতাটি অনুভূতি প্রকাশের সীমা নিয়েও একটি বিশেষ ভাবনার সৃষ্টি করে। মানুষ অনেক সময় জানে, তার জীবনে কেউ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অথচ সেই গুরুত্ব বোঝানোর মতো যথাযথ শব্দ খুঁজে পায় না। তখন কবিতা হয়ে ওঠে মনের কথা বলার একটি আশ্রয়। প্রিয় মানুষকে জীবনের সুর, স্মৃতির ঠিকানা কিংবা নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখা, এসবের মধ্য দিয়ে প্রেমের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাষা পায়। হয়ত ভালবাসাকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু তাকে অনুভব করা যায়, ভাগ করে নেওয়া যায় এবং শব্দের মধ্যে কিছুটা ধরে রাখা যায়। জাভেদ আখতারের কবিতার মূল আকর্ষণ সেই চেষ্টাতেই।🍁

আরও পড়ুন : Sasraya News Sunday’s Literature Special | 4th October 2026, Issue 129, Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ৪ অক্টোবর ২০২৬, সংখ্যা ১২৯ | রবিবার

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরেপড়া :  কবিতা ‘ আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন