সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ রায়পুর: দুই দশক আগের এক বহুল আলোচিত যৌন নির্যাতন মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে রায় পরিবর্তন করল ছত্তীসগঢ় হাইকোর্ট (Chhattisgarh High Court)। আদালতের মন্তব্য, ‘ধর্ষণের অপরিহার্য উপাদান হল সঙ্গম; শুধুমাত্র বীর্যপাত ঘটলেই তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে না।’ এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ২০০৫ সালে ট্রায়াল কোর্টের দেওয়া সাত বছরের কারাদণ্ড কমিয়ে তিন বছর ছয় মাস করা হয়েছে। মামলার সূত্রপাত ২০০৪ সালে। অভিযোগ ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তি জোরপূর্বক যৌন সঙ্গম করেন। পরের বছর ট্রায়াল কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। তবে আপিলের শুনানিতে অভিযুক্ত দাবি করেন, তিনি নির্যাতিতার গোপনাঙ্গের উপরে পুরুষাঙ্গ রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ‘প্রবেশ করাননি’। এই বক্তব্যই পরবর্তী আইনি বিশ্লেষণের কেন্দ্রে চলে আসে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নরেন্দ্র কুমার ব্যাস (Narendra Kumar Vyas) -এর বেঞ্চ রায়ে উল্লেখ করে, ‘ধর্ষণ প্রমাণে সঙ্গম একটি মৌলিক শর্ত। বীর্যপাত হওয়া একমাত্র নির্ধারক নয়। যদি সঙ্গমের প্রমাণ অনুপস্থিত থাকে, তবে তা ধর্ষণের চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’ আদালত আরও ব্যাখ্যা করে যে, সামান্যতম পেনিট্রেশন বা যোনীতে পুরুষাঙ্গের প্রবেশ ঘটলেই তা আইনত ধর্ষণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু সেই প্রবেশের স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা আবশ্যক।
এই মামলায় মেডিক্যাল রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। রিপোর্টে দেখা যায়, নির্যাতিতার যোনীচ্ছদ অক্ষত ছিল। যৌনাঙ্গে সাদা স্রাব ও লালচে ভাব থাকলেও, তা থেকে নিশ্চিতভাবে ‘ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে’ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, আংশিক পেনিট্রেশনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও, তা প্রমাণিত হয়নি। নির্যাতিতার বয়ানেও অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায় বলে আদালত মন্তব্য করে। প্রথম বয়ানে তিনি জোর করে যৌন সঙ্গমের অভিযোগ তুলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে জানান, অভিযুক্ত তাঁর যৌনাঙ্গের উপরে পুরুষাঙ্গ রেখেছিলেন মাত্র। এই পরিবর্তিত বক্তব্য মামলার ভিত্তিকে দুর্বল করে বলে মত দেয় আদালত।
রায়ে উল্লেখ, ‘ফৌজদারি মামলায় সন্দেহের সুবিধা অভিযুক্তের প্রাপ্য। যখন প্রমাণে স্পষ্টতা নেই, তখন কঠোরতম শাস্তি বহাল রাখা যায় না।’ সেই কারণেই ট্রায়াল কোর্টের রায় আংশিক সংশোধন করে সাজা কমানো হয়েছে। আদালত অপরাধকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি, বরং সেটিকে ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ হিসেবে গণ্য করেছে। আইন মহলের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষত ধর্ষণ ও ধর্ষণের চেষ্টার মধ্যে আইনি সীমারেখা নির্ধারণে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারায় ‘পেনিট্রেশন’ শব্দটির ব্যাখ্যা নিয়ে বহুবার বিতর্ক হয়েছে। এই রায়ে আদালত পুনরায় স্পষ্ট করেছে যে, ‘সঙ্গম’ শব্দটির আইনি অর্থ নির্ধারণে প্রমাণের মানদণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সমাজের একাংশ মনে করছে, এমন রায় ভুক্তভোগীদের জন্য হতাশাজনক হতে পারে। অন্যদিকে আইনি মহলের বক্তব্য, আদালত প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়; আবেগের ভিত্তিতে নয়। বিচারব্যবস্থার মূল নীতি হল সন্দেহাতীত প্রমাণের উপর নির্ভর করে দোষ নির্ধারণ। অন্যদিকে, এই রায় নতুন করে আলোচনায় এনেছে যৌন অপরাধের তদন্তপ্রক্রিয়া, মেডিক্যাল পরীক্ষার গুরুত্ব এবং সাক্ষ্যের সামঞ্জস্যতার প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ এবং নির্ভুল সাক্ষ্য রেকর্ডিং না হলে আদালতে মামলার ফল ভিন্ন হতে পারে। উল্লেখ্য, দুই দশক পুরনো এই মামলার রায় পরিবর্তন একদিকে যেমন আইনি ব্যাখ্যার স্পষ্টতা এনে দিল, তেমনি যৌন অপরাধ সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বিতর্কও উসকে দিল। ভবিষ্যতে উচ্চতর আদালতে এই ব্যাখ্যা কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেটাই দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Chhattisgarh road network, rural road development | ২৫ বছরে সড়ক উন্নয়নে ব্যাপক উন্নতি ছত্তিশগড়ে: ৪৮ হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা থেকে অর্থনৈতিক করিডর, উন্নয়নের নতুন মানচিত্র


