সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে আচমকাই চাঞ্চল্য ছড়াল বৃহস্পতিবার। বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি যখন জোর কদমে চলছে, ঠিক সেই সময়েই রাজ্যপাল পদ থেকে পদত্যাগ করলেন সি.ভি. আনন্দ বোস (C.V. Anand Bose)। সূত্রের খবর, বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন তিনি এবং সেখান থেকেই রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। যদিও এই পদত্যাগপত্র এখনও পর্যন্ত গৃহীত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনও সরকারি ঘোষণা করা হয়নি। রাজভবনের তরফ থেকেও এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। কারণ, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তার মধ্যেই রাজ্যপালের এই পদত্যাগের খবর নতুন করে আলোড়ন তৈরি করেছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে।
সি.ভি. আনন্দ বোস ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় ৪০ মাস ধরে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাজ্যের শাসক দল ও রাজভবনের মধ্যে একাধিক ইস্যুতে সংঘাত প্রকাশ্যে এসেছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত বিষয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নানা ইস্যুতে রাজ্য সরকারের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে। রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বহুবার রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। অন্যদিকে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফেও বারবার তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এমনকি তাঁকে রাজ্যপাল পদ থেকে সরানোর দাবিও তোলা হয়েছিল বিভিন্ন সময়। রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক বিতর্কও সামনে আসে, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচনা চলেছে। তবে সবকিছুর মধ্যেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন তিনি। তাই নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগ অনেককেই অবাক করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ‘এই সিদ্ধান্তের পিছনে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কোনও বড় কারণ থাকতে পারে।’ যদিও সেই কারণ সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, শুক্রবার দার্জিলিং রাজভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল দেশের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর (Droupadi Murmu)। একটি বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করার কথা ছিল রাষ্ট্রপতির। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল হিসেবে C. V. Ananda Bose -এর উপস্থিত থাকার কথা ছিল এবং রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানানোর দায়িত্বও তাঁরই ছিল। এই কর্মসূচী উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবারই তাঁর বাগডোগরার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই তাঁকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয় বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। এরপরই হঠাৎ সামনে আসে তাঁর পদত্যাগের খবর। ফলে গোটা ঘটনাকে ঘিরে আরও রহস্য তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই পদত্যাগের ঘটনাকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন ঘিরে কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। রাজ্যপাল ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সম্পর্কও বেশ কয়েকবার প্রকাশ্যে তিক্ত হয়েছে।
একজন সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে রাজ্যপালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং সাংবিধানিক কাঠামো সঠিকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে এই পদটির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ভোটের আগে রাজ্যপালের পদত্যাগ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাঁর পদত্যাগ গৃহীত হলে পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল কে হবেন? অন্তর্বর্তী দায়িত্ব কে সামলাবেন? কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত কোনও সিদ্ধান্ত নেবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অন্য কোনও রাজ্যের রাজ্যপালকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় অথবা নতুন নিয়োগ ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনার পর রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়াও নজরে রাখা হচ্ছে। যদিও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক দলগুলির তরফে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। তবে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই নানা ব্যাখ্যা ঘুরতে শুরু করেছে।
একদিকে যখন নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে ভোটের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে সক্রিয় হয়েছে, অন্যদিকে রাজ্যপালের পদত্যাগের খবর পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে আগামী কয়েকদিনে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রপতির দপ্তরের অবস্থান কী হয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কিন্তু ভোটের মুখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু করল C. V. Ananda Bose -এর পদত্যাগের খবর। এই ঘটনার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কী হতে পারে, তা সময়ই বলবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : CV Anand Bose on Sheikh Shahjahan : ‘প্রত্যেকের জন্য এটা একটা শিক্ষা’ : সিভি আনন্দ বোস



