সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ভারতের প্রাচীন নিরাময় পদ্ধতিকে বিশ্বদরবারে আরও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলল ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে। ভারতের বৈদিক যুগের চিকিৎসা পদ্ধতি, বিশেষত আয়ুর্বেদকে (Ayurveda) বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ (Nirmala Sitharaman)। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়ুর্বেদকে গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসার মূল ধারায় আনতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) নেতৃত্বাধীন সরকার বরাবরই প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান ও জীবনদর্শনকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার পক্ষপাতী। সেই নীতিরই প্রতিফলন দেখা গেল এবারের বাজেটে। সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS) -এর আদলে সারা দেশে তিনটি ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ আয়ুর্বেদ’ (All India Institute of Ayurveda) গড়ে তোলা হবে। সরকারের মতে, এই প্রতিষ্ঠানগুলি শুধু চিকিৎসা পরিষেবাই নয়, আয়ুর্বেদিক গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।
নির্মলা সীতারামণ (Nirmala Sitharaman) বাজেট ভাষনে বলেন, সরকার ভারতকে ‘মেডিক্যাল ভ্যালু ট্যুরিজ়ম হাব’ (Medical Value Tourism Hub) হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এই লক্ষ্য পূরণে আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার পাশাপাশি আয়ুর্বেদ, যোগ, ইউনানি-সহ ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘ভারতের প্রাচীন নিরাময় পদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক মহল ইতিমধ্যেই সম্মান জানিয়েছে। যোগাসনের মতো ভারতীয় চিকিৎসা ও জীবনচর্চা পদ্ধতি আজ বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।’ কোভিড-পরবর্তী সময়ে যোগাসনের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অর্থমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, রাষ্ট্রসংঘে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) যোগাসনের গুরুত্ব তুলে ধরার পর আন্তর্জাতিক স্তরে ‘ইন্টারন্যাশনাল যোগা ডে’ স্বীকৃতি পেয়েছে। একইভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আয়ুর্বেদও বিশ্বজুড়ে নতুন করে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এই আন্তর্জাতিক আগ্রহকে আরও পুষ্ট করতেই কেন্দ্র চায় আয়ুর্বেদের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করতে।
এই উদ্দেশ্যে আয়ুর্বেদিক ড্রাগ টেস্টিং গবেষণাগারগুলির মানোন্নয়নের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আয়ুর্বেদিক ওষুধের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও গুণমান যাচাইয়ের উপর জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি গুজরাতের জামনগরে অবস্থিত ‘হু গ্লোবাল ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন সেন্টার’ (WHO Global Centre for Traditional Medicine)-কে আরও আপগ্রেড করা হবে। এই কেন্দ্রটি ঐতিহ্যবাহী ওষুধ নিয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজেট বক্তৃতায় আরও জানানো হয়েছে, মেডিক্যাল ভ্যালু ট্যুরিজম হাব তৈরির প্রথম ধাপ হিসেবে দেশে পাঁচটি আঞ্চলিক মেডিক্যাল হাব গড়ে তোলা হবে। এই হাবগুলি তৈরি হবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (PPP Model) এবং প্রতিটি হাব একটি পূর্ণাঙ্গ ইন্টিগ্রেটেড হেল্থ কেয়ার কমপ্লেক্স হিসেবে কাজ করবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই মেডিক্যাল হাবগুলিতে এক ছাদের তলায় একাধিক পরিষেবা পাওয়া যাবে। এই হাবগুলিতে থাকবে, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার পরিকাঠামো, মেডিক্যাল শিক্ষার সুযোগ, মেডিক্যাল ভ্যালু ট্যুরিজম ফেসিলিটেশন সেন্টার, আয়ুষ (AYUSH) সেন্টার, আধুনিক রোগ নির্ণয়ের সুবিধা এবং চিকিৎসার পর রোগীদের পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষ আবাসিক ব্যবস্থাও। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদেশি রোগীদের পাশাপাশি দেশীয় রোগীরাও এই সমন্বিত পরিষেবার সুবিধা পাবেন।
কেন্দ্রের মতে, আয়ুর্বেদকে এগিয়ে নিয়ে গেলে তার সুফল শুধু স্বাস্থ্যখাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্মলা সীতারামণ (Nirmala Sitharaman) বলেন, আয়ুর্বেদিক ওষুধের উৎপাদন ও রফতানি বাড়লে দেশের সেই সব কৃষকের আয় বাড়বে, যাঁরা ভেষজ ও ঔষধী গাছের চাষ করেন। পাশাপাশি ওষুধ প্রস্তুতকরণ, প্যাকেজিং, বিপণন এবং পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষও অর্থনৈতিক ভাবে উপকৃত হবেন। মেডিক্যাল হাবগুলি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে বলেও বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সময় সংসদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে (Amit Shah) টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি শুধু বাজেটের একটি ঘোষণা নয়, বরং ভারতের প্রাচীন জ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আধুনিক অর্থনীতির মূল স্রোতে আনার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৬-এ আয়ুর্বেদকে ঘিরে যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পর্যটন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি, তিন ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Anandapur fire incident, PM Narendra Modi compensation | আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে গভীর শোকপ্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর, নিহতদের পরিবারপিছু ২ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা



