মেধা পাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বাংলা সাহিত্যের আরেকটি নীরব কিন্তু গভীর নক্ষত্র নিভে গেল। শ্রমজীবী কবি সুশীল পাঁজা (Sushil Panja) প্রয়াত। রবিবার, ৪ জানুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই কবি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন এই। তাঁর প্রয়াণে বাংলা কবিতার জগতে যে শূন্যতা তৈরি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলেই মনে করছেন সাহিত্যপ্রেমীরা।
১৯৪৬ সালের ২৭ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেছিলেন সুশীল পাঁজা। জীবনের শুরু থেকেই কঠিন বাস্তবের সঙ্গে লড়াই করতে করতে বড় হয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর কবিতার মূল সুর হয়ে উঠেছিল। যাঁরা শহুরে অভিজাত বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবন, বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে কবিতার ভাষা দিয়েছেন সুশীল পাঁজা। সুশীল পাঁজার কবিতায় রাজনীতি ছিল, কিন্তু তা কখনও স্লোগানে পরিণত হয়নি। কারখানার ধোঁয়া, নির্মাণ শ্রমিকের ক্লান্ত শরীর, দিনমজুরের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আবার একই সঙ্গে ছিল মানবিকতা ও প্রতিবাদের দৃঢ় উচ্চারণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতা শুধু সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়, সমাজের প্রতিচ্ছবিও। তাঁর লেখনীতে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর বারবার উঠে এসেছে পরিষ্কার ও নির্ভীকভাবে।
কবি হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ খুব সহজ পথে হয়নি। দীর্ঘদিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন। লিখেছেন ছোট-বড় অজস্র সাময়িকপত্রে। তিনি বুঝেছিলেন, শ্রমের ঘাম আর জীবনের বাস্তবতা, আর তার থেকেই তাঁর কবিতার জন্ম। তাঁর কবিতায় কৃত্রিমতা নেই, আছে মাটির গন্ধ।
বঙ্গসাহিত্য মহলে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘শ্রমজীবী কবি’ হিসেবেই। এই পরিচয় তিনি নিজেও গর্বের সঙ্গে বহন করতেন। বিভিন্ন সাহিত্যসভা ও ছোট পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর কবিতা পাঠকের কাছে পৌঁছতে থাকে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে অনুগত পাঠকবর্গ, তাঁর কবিতায় নিজেদের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতেন।
সমালোচকদের মতে, কবি সুশীল পাঁজা (Sushil Panja) মূলত সমাজবাস্তবতার কবি। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা থাকলেও তা কখনও বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। প্রেম, প্রকৃতি কিংবা স্বপ্ন, সবই তাঁর কবিতায় এসেছে শ্রমজীবী মানুষের চোখ দিয়ে দেখা দৃষ্টিভঙ্গিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সমসাময়িক বহু কবির থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
উল্লেখ্য, তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলা সাহিত্য জগতে শোকের ছায়া নেমে আসে। কবি, লেখক, সাহিত্যিক এবং পাঠক মহল সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন সাহিত্য মঞ্চে শোকবার্তা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সাহিত্যিকের মতে, আজকের দিনে যখন কবিতা ক্রমশ মধ্যবিত্ত ও নাগরিক অভিজ্ঞতার ডিজিটাল বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, তখন সুশীল পাঁজার মতো কবিরা ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শ্রমজীবী মানুষের জীবনও গভীর সাহিত্যিক মূল্য বহন করে। তাঁর কবিতা সেই সত্যকেই বারবার প্রতিষ্ঠা করেছে।
ব্যক্তিজীবনে সুশীল পাঁজা ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন। বড় পুরস্কার বা সম্মান তাঁর জীবনে খুব বেশি আসেনি। কিন্তু তিনি কখনও সে নিয়ে আক্ষেপ করেননি। ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘কবিতার আসল পুরস্কার পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছনো।’ সেই জায়গায় তিনি নিঃসন্দেহে সফল হয়েছিলেন। শেষ বয়সেও কবিতা লেখা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি সুশীল পাঁজা। অসুস্থ শরীর নিয়েও লিখে গিয়েছেন, পড়ে গিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের কবিদের লেখা পড়ে তাঁদের উৎসাহ দিতেন। তাঁর কাছে কবিতা ছিল আজীবনের সাধনা, কোনও নির্দিষ্ট সময়ের শখ নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সুশীল পাঁজা-এর (Sushil Panja) প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারাল নিষ্ঠাবান, সংগ্রামী ও মানবিক কবিকে। তাঁর স্মৃতির প্রতি অকৃত্রিম সাহিত্যের অকৃত্রিম পাঠকরা গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ কুড়ি-তম কিস্তি)




