Sasraya News Sunday’s Literature Special | 4th January 2026, Edition 94, Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল, ৪ জানুয়ারি ২০২৬, সংখ্যা ৯৪, রবিবার

SHARE:

সম্পাকীয়

টা শুধু একটি মাস নয়! সময়ের ক্যালেন্ডারে এটি এক ধরনের মানসিক দর্শন। ৩৬৫ দিনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ভালোবাসার স্মৃতি মন্থন। পেছনে ফেলে আসা একটি বছরের ক্লান্তি, প্রাপ্তি, ক্ষত, ক্ষয় আর অপ্রাপ্তির ভার সবকিছুকে কাঁধে নিয়ে জানুয়ারি এসে দাঁড়ায় সামনে। এই মাস নতুনের সূচনা যেমন করে ঠিক তেমনই আত্মসমালোচনার এক নীরব চিত্র অঙ্কন করে। সাহিত্যিক দৃষ্টিতে জানুয়ারি মানে কেবল শীতের শেষ প্রান্ত নয়! এটি স্মৃতি ও প্রত্যাশার সংযোগস্থল। বাংলা সাহিত্য বরাবরই ঋতু ও সময়কে মানুষে রূপ দিয়েছে। জানুয়ারি সেই মানুষটি। যে খুব বেশি কথা বলে না কিন্তু, চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছ? গত বছরের ব্যর্থতা কি তোমাকে ভেঙেছে! না শিখিয়েছে? জানুয়ারির শীতল রোদে যেমন শরীর একটু স্থির হয়। আবার অন্য দিকে মনও স্থির হতে চায়। সাহিত্য সেই স্থিরতার ভেতর ঢুকে পড়ে। খুঁজে নেয় শব্দের আশ্রয়। এই মাসে প্রকৃতির রং বদলায়। কুয়াশা পাতলা হতে থাকে। ভোরের আলো একটু স্পষ্ট হয় ঠিক তা বলে শীতলতা কমে না বরং বারে। এই পরিবর্তন সাহিত্যেরও পরিবর্তনের সময়। নতুন পত্রিকা। নতুন লেখা। নতুন কবিতার খাতা সবকিছুই যেন জানুয়ারিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়। কিন্তু, মনের মধ্যে প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা কি সত্যিই নতুন কিছু লিখছি! না পুরনো ভাবনাকেই নতুন কাগজে সাজাচ্ছি? প্রতিটি জানুয়ারিই এই প্রশ্নটা তুলেই দেয়। বলা যায় একজন লেখকের কাছে জানুয়ারি অনেক সময় দায়বদ্ধতার মাস। বছর জুড়ে কী লিখলেন কী লিখতে পারলেন না তার হিসেব কষার সময়। সাহিত্য শুধু আবেগ নয়। সাহিত্য সময়ের দলিল। জানুয়ারি সেই দলিলের প্রথম পৃষ্ঠা। এখানে মিথ্যে আশ্বাসের জায়গা নেই। পাঠকও এই সময় একটু বেশি সৎ লেখা খোঁজে। ঝলমলে শব্দ নয়। গভীর অনুভব। বিশ্বাস। ভরসা এই মাসে তারই চাহিদা। সাহিত্য ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে জানুয়ারি মানে নতুন পরিকল্পনা। নতুন দিকনির্দেশ। কোন ধরনের লেখা জায়গা পাবে। কোন স্বরকে আমরা গুরুত্ব দেব। এই সিদ্ধান্তগুলো এই মাসেই জন্ম নেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যদি কেবল বাজার বা ট্রেন্ড দেখে নেওয়া হয়! তাহলে জানুয়ারির আত্মা হারিয়ে যায়। জানুয়ারি চায় সততা। চায় প্রশ্ন। চায় সাহস। সাহিত্যের কাজ শুধু সুন্দর বলা নয়! অস্বস্তিকর সত্যটাকেও ছুঁয়ে দেখা। এই মাসেই আমরা ফিরে তাকাই সমাজের দিকে। গত বছরে কী বদলেছে? মানুষ আরও একা হয়েছে! না আরও কাছাকাছি এসেছে? প্রযুক্তি আমাদের লেখাকে সহজ করেছে! না অনুভূতিকে পাতলা করেছে? জানুয়ারি এসব প্রশ্নকে সামনে এনে দাঁড় করায়। সাহিত্য যদি এই প্রশ্নগুলিকে এড়িয়ে যায় তবে তা সময়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। বাংলা সাহিত্যে জানুয়ারির আরেকটি বড় গুরুত্ব এটি স্মরণের মাস।

বহু লেখক, কবি, চিন্তকের জন্ম-মৃত্যুর স্মৃতি এই মাসের সঙ্গে জড়িয়ে। স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়! স্মরণ মানে তাদের ভাবনাকে নতুন প্রেক্ষিতে পড়া। জানুয়ারি আমাদের সেই সুযোগ দেয়। পুরনো লেখাকে নতুন আলোয় দেখার। একই সঙ্গে জানুয়ারি আশার মাস। সব অন্ধকারের পরেও মানুষ নতুন করে শুরু করতে চায়। এই চাওয়াটুকুই সাহিত্যের মূল শক্তি। একটি কবিতা। একটি গল্প। একটি প্রবন্ধ সবই তো শেষ পর্যন্ত মানুষের আশা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। জানুয়ারিতে লেখা সাহিত্য চর্চা খুব নীরবভাবে কিন্তু, গভীরভাবে আশার কথা বলে।বইমেলা থেকে সংস্কৃতি সাংস্কৃতিক সব উৎসব পালিত হয় ইংরেজিও নীতির আদর্শে। কিন্তু, বাঙালি তার ঐতিহ্যকে কখনোই হারিয়ে ফেলতে চাইনি। যতোই কর্পোরেট জগৎ এগিয়ে আসুক কোন ভাবেই ভারতীয় ঐতিহ্যতে আঁচ আনতেও পারবেনা বিদেশী কোন অপ সংস্কৃতি। তবুও বলি এই সম্পাদকীয় জানুয়ারিকে কোনো উৎসবের মাস হিসেবে দেখাতে চায় না। বরং একে দেখা দরকার আত্মসমীক্ষার সময় হিসেবে। লেখক, পাঠক, সম্পাদক তিনজনেরই। আমরা কী পড়ছি? কেন পড়ছি? কী লিখছি? কার জন্য লিখছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে জানুয়ারির চেয়ে উপযুক্ত সময় আর নেই। নতুন বছর মানেই নতুন প্রতিশ্রুতি এ কথা আমরা সবাই বলি। কিন্তু সাহিত্য প্রতিশ্রুতিতে নয়! সাহিত্য দায়ে বিশ্বাস করে। জানুয়ারি সেই দায়ের প্রথম ডাক। এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় শব্দেরও দায়িত্ব আছে। নীরবতারও ভাষা আছে।
সাশ্রয় নিউজের রবিবারের সাহিত্য স্পেশালের পাতায় জানুয়ারি তাই কেবল একটি মাস নয়! এটি একটি অবস্থান। যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে বলি আমরা সময়ের সঙ্গে সৎ থাকতে চাই। ভুল করব, দ্বিধা থাকবে, তবু প্রশ্ন করা বন্ধ করব না। জানুয়ারি আমাদের সেই সাহস দিক।🍁

 

 

 

🍂মহামিলনের কথা

হে আমার স্নেহশূন্যে রসনে, কেন তুমি হরি বলছো না? কল্যাণি! হরি বল,হরি ভব সাগরের তরণী।

ব্যাস শান্তকে বলেছিলেন—

কোটি জন্মার্জ্জিত পাপ কি ঔষধের দ্বারা শান্তি হয়?
হরিনাম কীর্ত্তন করাই কর্ত্তব্য,ভবব্যাধির তাহাই ঔষধ।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

জগতে পবিত্র হরিনাম সংকীর্ত্তন মহাপাতক-নাশন, সর্ব্বকাম্যবস্তু প্রদায়ক এবং মোক্ষ দান করেন। নামকীর্ত্তনের দ্বারা পাপ নষ্ট হয়,স্মরণে দেবত্ব লাভ হয় এবং যাঁর পূজা করলে নির্ব্বাণ মুক্তি পাওয়া যায়— সেই পরমেশ্বরকে কে না স্মরণ করবে?
ইনি বললেন নামকীর্ত্তনে পাপ নাশ,স্মরণে দেবত্বপ্রাপ্তি,পূজায় নির্ব্বাণ।
একমাত্র কীর্ত্তনের দ্বারাই সব পাওয়া যায়। পূজা বা স্মরণে যাঁদের অনুরাগ আছে তাঁরা পূজার ও স্মরণের দ্বারা বাঞ্ছিত ফল লাভ করে থাকেন।
সঙ্কেত করে,কারও নাম গোবিন্দ আছে তাকে ডেকে পরিহাস অর্থাৎ কেহ হরিনাম করেন তাকে দেখে ‘ রাধে রাধে গোবিন্দ বল’ এমনভাবে, হেলা ‘আরে ছি ছি রাম রাম ‘ এমনভাবে,খুব জ্বর হয়েছে— জ্বরের খেয়ালে ‘হরি হরি দয়াময়’ এমনভাবে শ্রীভগবানের নাম কীর্ত্তিত হলেও সমস্ত পাপ হরণ করেন।

পাপনাশ করবার যত শক্তি হরির নামে আছে,তত পাপ পাপীজন কিছুতেই করতে সমর্থ হয় না।
অগ্নি যেমন তুলারাশিকে ভস্মীভূত করে তদ্রূপ হরিনামকীর্ত্তন পুরুষের জ্ঞান-অজ্ঞানকৃত পাপরাশি অতি সত্বর দগ্ধ করে থাকেন।

শ্রদ্ধা সহকারে মানব হরিনাম সংকীর্ত্তন করলে, হে দ্বিজসত্তম, ক্রমশঃ তার সত্যফল ধারণ করে, প্রথম পাপনাশ, দ্বিতীয় মহাপূণ্য, তৃতীয় চতুর্ব্বিধ বৈরাগ্য,পঞ্চম গুরুসেবা, ষষ্ঠ আত্মজ্ঞান,অনন্তর সপ্তম ভ্রান্তিনাশ, অষ্টম তাতে স্থির সম্পূর্ণ আনন্দবোধ লাভ। হে দ্বিজসত্তম! নামপরায়ণের শীঘ্র পরমশুদ্ধ ব্রহ্মানন্দ প্রদায়ক জ্ঞান উৎপন্ন হয়।
এরজন্য কোন চেষ্টা করতে হয় না?
না। কেবল নাম সংকীর্ত্তন করতে করতে ভক্ত তাতে নিত্যস্থিতি লাভ করে।
মানবের মুক্তি আর যুক্তি হরিনাম।
হরিনামে চিরতৃপ্তি ভোগের বিশ্রাম॥
রূপ আর রঙ্গ শুধু হরি হরি রব্।
হরি নাম জপে ক্লেশ নহে ত সম্ভব্॥
হরির জনের কাছে নামের বড়াই।
হরির জনের শোভা,হরিনামে ভাই॥
হরির জনের কাছে তুল্য যোগ ভোগ্।
হরি নাম জপে ঘুচে অভাবের রোগ্॥
হরিজন হরিনাম সেবায় নিরত।
নানক শ্রীহরি-পূজা করবে সতত॥

আর কিছু করতে হবে না, যতক্ষণ কথা কবার শক্তি আছে ততক্ষণ হরি হরি বল—

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥

🍂শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী

 

 

🍂গদ্য
কল খুললে জল বাড়ি আর গাড়িতে পূর্ণ কলকাতা, কোথাও মাটি নেই সাঁকো নেই কেবল বালি চুনার পাথর কত শত গলি আর কত যে মোর ঘুরতে ঘুরতে মাথা বন বন পাটন করে ওঠে কলকাতার রাত রাত নয়, দিন দিন নয় যে ছায়ার পাশে ঠাণ্ডা মার্কা লম্বা চওড়া ছায়া তাকিয়ে দেখে ভিরমি খাবার জো। ইয়া ইয়া গো দাড়ি মাথায় ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

বিচিত্র অভিজ্ঞতা

মমতা রায় চৌধুরী

লকাতা নাকি আজব শহর অনেকের কাছেই শুনেছি এমনকী আমাদের বিখ্যাত সাহিত্যিক মুজতবা আলী-এর লেখা গ্রন্থেও তার প্রমাণ পেয়েছি। আর ভারতবর্ষ সম্পর্কে আলেকজান্ডার মন্তব্য করেছিলেন ভারতবর্ষ বিচিত্র দেশ। সবকিছু মিলিয়ে আমরা কতই না এরকম বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই সব সময় লিপিবদ্ধ করা হয়ে ওঠে না। কখনও কখনও ভেবেছি ডায়রির পাতায় লিখে রাখব কিন্তু দিন গড়িয়ে যায় সময় গড়িয়ে যায় লেখা আর হয়ে ওঠে না। এবার সাশ্রয় নিউজ সাহিত্য স্পেশাল-এর পাতায় ভাবলাম একবার লিপিবদ্ধ করেই ফেলি সম্পাদক বেশ কয়েকদিন ধরেই বলছিলেন। একটা গদ্য লিখুন বা কিছু লেখা দিন। ভাবলাম কি আর লিখি, সেদিন এস আই আর বিরুদ্ধে বি এল আর -দের যে বিক্ষোভ সেই কর্মসূচীতে সামিল হওয়ার জন্য আমার দাদা এবং বন্ধু স্থানীয়দের সঙ্গে হাজির হয়েছিলাম কলকাতায়। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে সেদিন শুরু হয়েছিল পদযাত্রা অসংখ্য মানুষের কর্মসূচী তাদের বিক্ষোভ বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলগুলোর রিপোর্টাররাও হাজির ছিলেন কিন্তু এখন আপনারা ভাবছেন এস আই আর এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচীতে আর কি বিচিত্র অভিজ্ঞতা হতে পারে। হ্যাঁ
শুরুতেই যখন ট্রেনে উঠলাম শুরুতে বলতে যাত্রার কালে, অম্বিকা কালনা স্টেশন থেকে কোনও রকমে ট্রেনটা ছুটতে ছুটতে এসে ধরতে হয়েছিল ট্রেনটা পাবো না ভেবেই নিয়েছিলাম।

অনেক কাকুতি-মিনতি করার পর তখন বড় সাহেব বললেন ‘আপলোক দো আদমি গলদ কাম কিয়া হে জুরমানা একই আদমি কো ভরনা পারেগা। ইতনা ম্যায় কার সাকতে হু আপলোক কে লিয়ে।’ তখন ঐ স্যার বলেছিলেন ‘যে চালান দিতে হবে না আপনারা একটা টাকা নিয়ে নিন তাহলেই হয়।’

কিন্তু যাই হোক এক নম্বর প্লাটফর্মে দেওয়াতে কোনও রকমে এসে ট্রেনে উঠতে পারি তার মধ্যে এত এত ভিড় যারা আমাদের জন্য ওয়েট করছিলেন তাদের টিকি দেখতে পেলাম না যদিও এটা আশা করাই অনুচিত কারণ ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে আমি ঢুকেছি তারা ভেবেই নিয়েছিলেন আজকের কর্মসূচিতে আমি গর হাজির। কি আর করা যায়? আমি তো ভিড় ঠেলে ঠেলে ঢোকার চেষ্টা করছি যেহেতু হাওড়া স্টেশনে নামব সামনে দাঁড়ালে তো হবে না এতটা রাস্তা একটা সিট আমাকে পেতেই হবে। কিন্তু সিট পাওয়াটা কি অতই সস্তা! একেতে তো অফিস আওয়ার্স তারপর হচ্ছে সেদিন এরকম একটা বিক্ষোভ সমাবেশে যাবার জন্য অনেকে শামিল হবেন কাজে কাজেই ভিড় হওয়াটাই স্বাভাবিক। সবজি বিক্রেতা গাদাগুচ্ছ সবজি নিয়ে গেটটাকে লক করে দাঁড়িয়ে জেনারেল কম্পার্টমেন্টে। হলে যাত্রীদের অসুবিধা হচ্ছে। এক ভদ্র মহিলার সঙ্গে লেগে গেল। আর এমনিতেই প্রবাদ আছে যেখানে নারী সেখানেই অশান্তি। মূল ঝগড়া আসলে এখানে ভদ্রমহিলারও কোনও দোষ ছিল না তবে যারা পড়ছেন তারা হয়ত ভাবছেন, যেখানে মহিলা সেখানেই কোন্দল কিন্তু না বাচ্চা নিয়ে উঠতে গিয়ে উনি প্রায় সেই সবজির উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন স্বাভাবিকভাবেই তার মেজাজ বিগড়ে গিয়েছে। যাই হোক, সবজি বিক্রেতা নানাভাবে সাফাই দেবার চেষ্টা করলেন। ভদ্রমহিলা ও ঝোপ বুঝে কোপ মারলেন। এরপর কোনও রকমে একটা সিট পাওয়া গেল বলা যায় কপালটা ভালই ছিল ত্রিবেণী স্টেশনে। ত্রিবেণী স্টেশনে বসতে যাব তখন দেখা গেল ২-৪ জন স্টুডেন্ট তারাও যাচ্ছে হাওড়াতে ।স্টুডেন্টকে চিনতে পেরেছি কিন্তু তার মাকে চিনতে পারিনি। কিন্তু ভদ্রমহিলা এসে জিজ্ঞেস করলেন। ম্যাম কোথায় যাবেন কিছু কি আছে? আমি শুধু বললাম’ হ্যাঁ বিক্ষোভ কর্মসূচী।’

তারপর দেখলাম, ভদ্রমহিলা তার বোন বোনের শাশুড়ি বোনের বাচ্চা নিজের বাচ্চাদের নিয়ে উঠেছেন কিন্তু জায়গা একটাও পাননি যাবেন হাওড়াতে। ওখান থেকে আবার নাকি তাকে ট্রেন ধরতে হবে। খারাপ লাগছে তখন আমি নিজেই তৎপর হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম কে কোথায় নামবেন এবং জায়গার কথা শুনে ওনাদেরকে ডেকে নিলাম। তারপর যেতে যেতে আরও বেশি আলাপচারিতা, ঘনিষ্ঠতা এবং নতুন ক্লাসে উঠে মেয়েকে পড়াবেন কিনা সে ব্যাপারে আলোচনা হল কিন্তু আমি বললাম না আমি টিউশন করি না। একজন ছাত্রী বলল ‘আগে তো করতেন।’
বললাম, হ্যাঁ করতাম, কিন্তু যবে থেকে জারি হয়েছে টিচারদের টিউশন করা যাবে না তবে থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছি’।
অভিভাবিকা বললেন, কিন্তু অনেকে তো এখনো পড়াচ্ছেন।’
আমি দেখলাম, সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই আমি শুধু বললাম, ‘আমি পড়াচ্ছি না।’
ভদ্রমহিলা নাছোড়বান্দা, ‘আপনি পড়ালে খুব ভালো হতো।’
আমি বিষয়টাকে এড়িয়ে গেলাম তারপর দেখলাম ভদ্রমহিলা কিছু বাদামের প্যাকেট কিনলেন। তিনি এবার আমাকে দিলেন আমি না করতেই ছাত্রী আমলকির প্যাকেট থেকে বেশ মশলা আমলকি আমার দিকে এগিয়ে দিল বলল, ম্যাম এটা কিন্তু খান আমি জানি’। তখন বাধ্য হয়ে নিলাম আমিও ওদেরকে বললাম, তোরা কি খাবি বল। অভিভাবিকা বললেন, ‘এতটা রাস্তা যেতে হবে ঠিক আমরা চেয়ে নেব।’
আমি দেখলাম, না সত্যিই কি খারাপ লাগে। আমি বললাম, বল না তোরা কি খাবি?’
তখন ছাত্রীরা বলল, ‘আমরা ডাল মুখ ভাজা খাব ম্যাম।’ তখন তাই কিনে দেয়া হল। কখন যে হাওড়া স্টেশনে এসে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। হাওড়া স্টেশন এর আগে লিলুয়া আসতেই ছাত্রী বলে উঠল মা এবার নামতে হবে। তখন আমিও বললাম, ‘হ্যাঁ এখন নামতে হবে।’

হাওড়া স্টেশনে নেমে আমরা পরস্পর পরস্পরকে বিদায় জানিয়ে আমি লেডিস কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে এগোচ্ছি তখন দেখলাম, আমাদের সেই দাদারা আমাদের পেছনে। স্যার কে আমি বললাম, ‘স্যার আপনারা এগোন আমি বরং একটু ওয়াশরুম থেকে থেকে আসি। আমি আমার ব্যাগ পত্র ছোট স্যারকে দিয়ে আমি চলে গেলাম টয়লেটে টয়লেটে কেউ কি বিচিত্র অভিজ্ঞতা যে টয়লেটের আগে নিত এক টাকা করে এখন সেখানে ৫ টাকা আমি তখন মাসিদের বললাম, মাসে ৫ টাকা দেব এখন পাঁচ টাকা করেছ এরপরে দশ টাকা করব, তাই করো কিন্তু ওয়াশরুমে যেতে গিয়ে দেখছি এত নোংরা, এত নোংরা।আমি মাসিদের এসে বললাম, মাসি, টাকা নিচ্ছ তো সবই ঠিক আছে কিন্তু ওয়াশরুমটা তো একটু পরিষ্কার করতে হবে।’ আমরা কি করব বলুন, ‘সবাই যদি একটু জল ঠিকঠাক না দেয়।’ আমি বললাম, ‘এই সকালবেলাতেই জল ঠিকঠাক না দেয় মানেটা কি। তোমাদের পরিষ্কার করতে হবে।’ তখন দেখলাম মাসি কাকে একটা নির্দেশ দিল অন্য একটা বাথরুম যেখানে বেশি নোংরা সেটাকে পরিষ্কার করে দিল। আমি কোনওরকমে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করলাম। দেখছি ছোট স্যার আমার জন্য ওয়েট করছেন তারপর আমরা দু’জন মিলে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি, গিয়ে এক মজার কাণ্ড সেখানে দেখছি, আমাদের বড় স্যার আর রূপকের মধ্যে বেশ একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে সেখানে একজন পুলিশ আধিকারিককে ও দেখতে পেলাম। স্যারকে দেখছি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছেন। বিষয়টা দেখার জন্য আমরা এগিয়ে গেলাম তখন দেখলাম স্যারের হাতে সিগারেট ব্যাপারটা বুঝতে কোন অসুবিধা হল না এবং আমরা দু’জনেই বলে উঠলাম আজকে স্যারের এবার বার্থডে সেলিব্রেশন টা গেল। কি আর করা যায় আমরা সেখানে গেলাম। সেখানে গিয়ে শুনলাম, এক পুলিশ আধিকারিক তাদেরকে বলছেন–
‘আপলোক ইহা পে সিগারেট পী রেহে হেয়’।
‘না, না, না আমি তো সিগারেট খাইনি। আপলোক ঝুট বোল রাহাহে। ততক্ষণে রূপক দেখছে হ্যাঁ পেছনে তার সিনিয়র সিগারেট ধরিয়েছেন যদিও হাওড়া স্টেশনের ভেতরে নয় বাইরের দিকে অনেকটা বাইরেই তবুও তাকে ধরেছেন কি আর করেন।অনেক ক্ষমা-টমা চাইলেও ছাড়তে নারাজ তখন আমি বুঝতে পারলাম সকালবেলা কিছু পয়সা কামানোর ধান্দা। আমিও শেষ পর্যন্ত কি করি ওনাদের হয়ে উনার কাছে কাকুতি মিনতি করলাম কিন্তু কোনও কিছুতেই কোন সাড়া মিলল না। শুধু বললেন, আপলোক চালিয়ে বর সাব কে পাস।’
অগত্যা কি আর করা দু’জন চললেন, সঙ্গে আমি আর ছোট স্যার কোথায় যাই আমরা তাদের সঙ্গে গেলাম সেই মুহূর্তের সাক্ষী হবার জন্য। সেখানে দেখা গেল বড় সাহেব চালান রেডি করছেন বড় রকমের একটা মোটা টাকা সেখানে বসানোর চেষ্টা করছেন আর ওদিকে রূপকার তার সিনিয়র সঙ্গে ছোট স্যার তিনিও ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন কারণ আমার জন্যই ছোট স্যার হাওড়া স্টেশনে আটকে ছিলেন। আমি টয়লেটে যাব বলে তিনি আমার জন্য ওয়েট করছিলেন। আমরা এসে দেখি এইরকম একটা দুর্লভ রহস্যময় মুহূর্ত এদিকে বিক্ষোভ কর্মসূচীর সময় শুরু হয়ে যাচ্ছে এখনও বাস ধরার বাকি আছে সে কথাও বলা হল, যে এখানে একটা কর্মসূচী আছে এখানে এসেছি আমরা। আমাদের যেতে দেরি হয়ে যাবে কিন্তু কে কার কথা শোনে। বড় সাহেব বললেন, ‘আপলোক গলাত কাম কিয়া হে ইসিলিয়ে আপলোক কো জুর্মনা ভারনা পড়েগা।’
অনেক কাকুতি-মিনতি করার পর তখন বড় সাহেব বললেন ‘আপলোক দো আদমি গলদ কাম কিয়া হে জুরমানা একই আদমি কো ভরনা পারেগা। ইতনা ম্যায় কার সাকতে হু আপলোক কে লিয়ে।’ তখন ঐ স্যার বলেছিলেন ‘যে চালান দিতে হবে না আপনারা একটা টাকা নিয়ে নিন তাহলেই হয়।’
তখন ওই কর্তব্যরত বড় স্যার বললেন, ‘দেখিয়ে আইসা হেয় হামলোগ ডিউটি নিভানা জানতে হে। চালান কে বিনা জুরমনা নেহি লে পাংগে ইসিলিয়ে চালান কাটনা জরুরি হ্যায়।’ কি আর করা যাবে অগত্যা তাতেই রাজি হতে হলো। ২০০ টাকা জরিমানা হল।
শেষ পর্যন্ত রূপক ২০০ টাকা দিয়ে দিল কিন্তু স্যারের আফসোস গেল না। শেষে ডিউটি অফিসার বললেন, ‘দেখিয়ে অপরাধ তো হতাই রাহেগা লেকিন হামলোককা কাসিজ ইয়ে হেয় অপরাধকে ক্যাইসে কম কিয়া যায়।’
কিন্তু মনের ভেতরে সেই খচ খচ নিতে রয়েই গেল এদিকে আমাদের ছোট স্যার বললেন স্যার অত মন খারাপ করবেন না চলুন চলুন কিন্তু জন্মদিনের ব্যাপারটা তো মাটি হতে বসলো স্যারকে খাওয়ানোর কথা ছিল আজকে। বিক্ষোভ কর্মসূচির শেষে স্যারের বার্থডে সেলিব্রেশন হবে’।

সত্যিই খারাপ লাগছে, স্যার আবার আস্তে আস্তে বলেন, দেখো এইখানে তো আর একজন বসে তখন খাচ্ছে কই তাকে তো ধরল না। তখন আমরাও বুঝলাম হ্যাঁ বেশ মুরগি পেয়েছিল আর কি করা অগত্যা কর্মসূচীর জন্যই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলাম বাস ধরার জন্য। শেষ আমি বললাম, ‘স্যার এটা আপনাদের পানিশমেন্ট হওয়া দরকার আপনারা যেখানে সেখানে পাবলিক প্লেসে ধূমপান করবেন এটা তো ঠিক নয় এরপরেও যদি আপনাদের শিক্ষা না হয় তাহলে আর কিছু করার নেই।’
স্যার বললেন পুরুষ মানুষ একটু ধূমপান না করলে হয় বলো। কি আর করি সবাই উঠে পড়লাম বাসে। একজন বলল মেট্রোতে গেলে হয় না তখন আমি বললাম দেখো আমি কোনওদিন বাবা মেট্রোতে চাপিনি। বলতে লজ্জাও লাগছিল কিন্তু বলেই ফেললাম কথাটা। তখন ছোট স্যার বললেন হ্যাঁ। আমিও চাপিনি। আচ্ছা চলো বাসেই যাই। বাসে গিয়ে আমরা যথারীতি সেই স্থানে নামলাম বিক্ষোভ কর্মসূচিতে শামিল হলাম। কিন্তু স্যারের বার্থডে সেলিব্রেশন খারাপ লাগছে। ফেরার সময় আবার তিন ধরার পালা ভেবেছিলাম আমরা কফি হাউসে ঢুকবো কিন্তু সেটা আর হলো না আবার সেই হাওড়া স্টেশনে দিকে রওনা দিলাম কিন্তু বাস থেকে নেমেই আবার আরেক ভিকারির পাল্লায় পড়া গেল। কিছু টাকা দিন। খুব খিদে পেয়েছে। স্যার মুচকি হেসে বললেন দেখো সকালে উঠে সেই ভিকারির পাল্লায় পড়েছিলাম আবার ফেরার সময় ভিখেরির পাল্লায় কি বল ছোট স্যার এখনো কি আবার অর্থদণ্ড আছে নাকি? যা আছে কপালে, দিয়ে দিন। প্রণাম থেকে টাকাটা বের করে দিলেন কিন্তু কি আজব ব্যাপার যে ঘোরাতে খোঁড়াতে এসে ভিখেরির বেশ নিয়ে টাকা নিয়ে গেল কিছু দূরে গিয়েই হাসতে হাসতে হেঁটে চলে গেল। কি আজব না সত্যিই কলকাতা এক আজব শহর। আজ কি হচ্ছে বুঝতে পারছি না এরকম এক একটা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছি। আর ভাবছি যতক্ষণ না বাড়ি পৌঁছাতে পারি তারপরে আরো কি ঘটনা ঘটে কে জানে। পিকচার আভি বাকি হেয়। হাওড়া স্টেশনে ঢুকে দেখলাম তখনো ট্রেনের টাইম একটু দেরি আছে দুটো ১৫ বাজে, ঠিক আছে, চলো। ফুড ক্যাফেতে ঢুকলাম আমরা ঢুকে সেই স্যারকেই আবার ধরা হল।
স্যার বললেন ‘স্যার আজকে বার্থডে সেলিব্রেশনটা তো সেভাবে হলো না কিন্তু কিছু তো একটা খেতে হবে’। স্যার বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বলো কি খাবে আমি খাওয়াচ্ছি। আমি আর রূপক তো ওয়াশ রুমে চলে গেলাম উপরে এসে দেখি অর্ডার করা হয়েছে চিকেন রোল। আমি নেমে এসে বললাম, ‘চিকেন রোল!’
স্যার বললেন, ‘দেখলে আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের ওদেরও একটা মতামত নেবার দরকার ছিল তো’
আমি ফুড ক্যাফের কর্মচারীটিকে বললাম চিকেন রোল কি গরম করা হয়ে গেছে না হলে আমাকে একটা পনির রোল দিন।’ ‘হ্যাঁ হয়ে গেছে।’
ইতিমধ্যে দেখলাম আমাদের সেই ছাত্র প্রাক্তন ছাত্র। ও প্রণাম করলো বাকি স্যারদের সঙ্গেও পরিচয় করে নিল তারপর ‘আমি বললাম তুই কালনা থেকে এখানে রোজ আসিস।’
তখন সে বলল হ্যাঁ এবং বলল এখন সে সুপারভাইজারের পদে আছে।’ বেশ ভাল লাগল। তারপর আমরা খাবার খেয়ে বিলমিটিয়ে ট্রেন ধরার জন্য গেলাম ট্রেন ধরতে গিয়ে আমি লেডিস কম্পার্টমেন্টে উঠলাম আর স্যার আর অন্যান্যরা জেনারেল কম্পার্টমেন্টে উঠলেন কিন্তু সেখানে গিয়েও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। বিষয়টা জায়গা নিয়ে। আমি যে জায়গাটা বসতে যাচ্ছি আমাকে তুলে দিয়ে এক ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমি এখানে বসব।’
‘কি আশ্চর্য ! কেন আমি তো আগেই এই জায়গাটা ধরেছি আপনি কেন বসবেন?’
‘না এই জায়গাটা আমার পছন্দ তাই আমি এখানে বসব।’
আমার মাথাটা কেমন যেন একটু হট হয়ে গেল। এটা মগের মূলুক। আপনিও যাত্রী। আমিও যাত্রী। আমি যখন আগে এসে জায়গাটা ধরেছি আপনাকে কেন দেব।’ হ্যাঁ সেখানেও একটা বোঝাপড়াতে আসা যায়। যদি আপনি আমাকে রিকোয়েস্ট করতেন যে আমার অসুবিধা আছে আমাকে এই জানলার ধারটা দিন কিন্তু তা নয় আপনি তো হুমকি দিচ্ছেন আপনি কি নেতা মন্ত্রীদের কেউ হন নাকি?’
এই দেখুন নেতা-মন্ত্রী দিয়ে কথা তুলবেন না।’
‘না আমি কথা তুলছি না আপনি সেভাবেই তো হুমকি দিচ্ছেন ওই জন্য বলছি। আপনি এক কাজ করুন আপনি আপনার জায়গায় বসুন আমি আমার জায়গায় বসছি তাহলে আর কোন কথা হয় না । বেচারি চুপ করে গেলেন ,সরে গেলেন ।দেখলাম চুপ করে গেলেই যেন এরা পেয়ে বসছে আজব তো। এবার আমি বসে জানালার দিকে তাকিয়ে আছি ট্রেন ছুটতে শুরু করল। এই সময় উঠলো লেডিস কম্পার্টমেন্টে মহিলা হকার প্রথমে এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা বোঝাই যাচ্ছে স্বামীহারা অসহায়। শেষমেশ পেটের তাগিদে এই কাজ করতে হচ্ছে। কেমন একটু করুনাও হলো অনেকক্ষণ ধরে হাঁকাহাঁকি করছেন বাদাম নেবেন বাদাম কখনো বলছেন গজা নেবেন কখনো বলছেন তারপর দেখলাম বাদাম চার্ট আর তিলের চাট ।একটা তিলের চাট দিন তো।
তখন বললেন যে খুচরা নেই এই দুটো দেব।’
আমি বললাম ‘ঠিক আছে একটা বাদাম একটা তিল দিন।’ খেতে শুরু করেছি ইতিমধ্যে দেখছি আর একজন মহিলা হকার সবজি নিয়ে উঠেছেন। মূলো নেবেন , ধনেপাতা, কপি নেবেন।’
এই সময়ে ওই বয়স্ক মহিলা দেখি বলছেন ‘তুমি কেন এখানে উঠেছ এখানে তো তোমার ওঠার কথা নয়। দেখছো তো এখানে আমিও কাজ করছি। এখন জানি না বাবা ওদের হকারদের কি নিয়ম আছে কেউ উঠতে পারবে কেউ উঠতে পারবে না সে ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই। কিন্তু যতদূর সম্ভব জানতে পারলাম শেষে কথাবার্তাতে যে যারা প্লাটফর্মে সবজি বিক্রি করে তারা ওখানেই করবে তারা কম্পার্টমেন্টে ঢুকে হকারি করতে পারবে না আর যারা ট্রেনে ফেরি করে তারা প্লাটফর্মে ঘুরে ঘুরে বসে বিক্রি করতে পারবে না। যদিও আমি শিওর নই। আমার এটা মনে হল তাই বলছি, ও বাবা কিছুক্ষণের মধ্যেই তো কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ বাধার মতো উপক্রম। যদিও এক পক্ষ নিষ্ক্রিয় বয়স্ক ভদ্র মহিলাকে যেভাবে গালাগাল করতে শুরু করল ওই মহিলা প্রথমে তো তুই তুকারি দিয়ে শুরু হল তোর বাপ কিনে দিয়েছে। আমি উঠতে পারব না, তুই একাই খাবি। আমার বাড়ি আমার বাড়িতে পেট নেই তোর জায়গায় তো যাইনি। আমি তো এই পাশটায় কাজ করছি তাতে তোর অসুবিধা কি হল, তারপর দেখলাম ভদ্রমহিলা মানে বয়স্ক ভদ্রমহিলা বেশ নরম সুরে বললেন কেন তোমরা তো প্ল্যাটফর্মে বসে ব্যবসা কর তোমাদের তো এখানে ওঠার কথা নয় আমরা যেমন প্লাটফর্মে বসে এগুলো বিক্রি করতে পারব না তাহলে তুমি কেন এখানে এসেছ আমি তো সেই কথাই বোঝাতে চেয়েছি। যাই হোক জোর যার মুলুক তার বুঝতেই পারলাম। ওই মহিলা সবজি বিক্রি করে নেমে গেল আস্তে আস্তে।

এরপর দেখি আমার পাশে যে ভদ্রমহিলা বসেছিলেন তারপরে দেখছি অন্যদিকে একজন ভদ্রমহিলা কান্নাকাটি করছেন কিছুক্ষণ পর ওই ভদ্র মহিলা বললেন এইখানে এসো তার পাশে এসে বসলো কিন্তু কি ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না।
শুধু ভদ্রমহিলা সান্ত্বনা দিলেন কান্নাকাটি করে কি হবে দেখা যাক কি করা যায় আমি একটু উপযাজক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে বিষয়টা উনি এড়িয়ে গেলেন তারপর যখন কয়েকটা স্টেশনের পর উভয়ই নেমে গেলেন পাশের জন বললেন শুনলাম ওনার স্বামীর সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে তাই আইনি পর্যায় গড়িয়েছে।
বেশ কৌতুহলী হলাম আর ভদ্রমহিলাও দেখলাম কৌতুহলী হয়ে এই বিষয়টা আমাকে বলছেন যে ওনার স্বামী নাকি পরকীয়া করেন এই নিয়ে। পাশাপাশি কয়েকজন ভদ্রমহিলা বললেন, এ বাবা মহিলা তো খুব কান্নাকাটি করছিলেন আজকাল যে কি হয়েছে কে জানে স্ত্রী থাকতে অন্য নারীর প্রতি আসক্ত।
এর কিছুক্ষণ পর দেখি এক ভদ্রমহিলা নামতে যাবেন কাজ করে ফেরেন সেই মাসিদের সঙ্গে ঝামেলা ভদ্রমহিলা দেখি বলছেন আপনারা এইখানে ভিড় করে বসে থাকলে আমি কি করে বেরোই বলুন আর কাজ করে যাওয়া মাসিরার তারা বললেন আমরা তো এক পাশেই আছি তোমার তাতে কি অসুবিধা হচ্ছে আর মাসিদের মধ্যে একজন বললেই বাকিরা ও তার সঙ্গ নেয়। বেচারি আর কি করেন। একটু পরে আমরাও আমাদের স্টেশনে এসে নামলাম তারপর নিজে নিজের গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা দিলাম। কিন্তু বিষয়টা হলো কলকাতা শহর নিয়ে যে এত গল্প আমরা পড়েছি আমার সুভাষ মুখোপাধ্যায় লেখা, ‘কলের কলকাতার কথা মনে পড়ে। মোনা ঠাকুর কলকাতায় কালীঘাটে এসে পৈতে নিয়ে দেশে ফিরে সেই আজব শহর কলকাতার দৃশ্য দেখে তার মনে যা যা হয়েছিল সেগুলো যখন তিনি গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন সেখানে গিয়ে তার যে বৃত্তান্ত তুলে ধরেছিলেন সেই কথাই কলের কলকাতাতে ফুটে উঠেছে। মোটর গাড়ি চলে শান বাঁধানো রাস্তায় ঠনঠন করে ঘন্টা বাজিয়ে চলে ট্রাম সেখানে কল টিপলে জ্যোৎস্না ফিনিক দেয়। কল খুললে জল বাড়ি আর গাড়িতে পূর্ণ কলকাতা, কোথাও মাটি নেই সাঁকো নেই কেবল বালি চুনার পাথর কত শত গলি আর কত যে মোর ঘুরতে ঘুরতে মাথা বন বন পাটন করে ওঠে কলকাতার রাত রাত নয়, দিন দিন নয় যে ছায়ার পাশে ঠাণ্ডা মার্কা লম্বা চওড়া ছায়া তাকিয়ে দেখে ভিরমি খাবার জো। ইয়া ইয়া গো দাড়ি মাথায় ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। তাছাড়া মুসলমান হিন্দু কাটাকাটি করে চুরি লাঠি বার হয় রাস্তায় আগুন জ্বলে ওঠে রাস্তায় লাশ গড়ায় আরো কত কি গল্প করেছিলে না সে কথা শুনে বন্ধুদের পেট ফুলে উঠেছিল। আজ আমিও কিছু আমার বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করলাম।🍁

 

বিজ্ঞপ্তি 
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ আগামী রবিবার থেকে শুরু হচ্ছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা ‘। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল ৯৫-সংখ্যা থেকে। 

 

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

 

ব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় 

 

১৩

নিঃশব্দ আলোর উত্থান

রাতের শহরটা যেন অচেনা কোনও মঞ্চ, যেখানে সব আলো কেবল নিভে যাওয়ার আগে শেষবার ঝলসে ওঠে। সোমদত্তা জানালার কাচে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলেকে সবকিছু খুলে বলার পর কয়েকদিন নির্ভার লাগছিল। এখন আবার যে কে সেই। কাঁচের ওপারে যে শহর, তা যেন কাঁচের ভেতরেই বন্দী, নড়ছে না, শ্বাস নিচ্ছে না, কেবল নীরবে গলে যাচ্ছে এক আলোকরেখা থেকে আরেকটিতে। ঘড়ির টিকটিক শব্দ যেন অদ্ভুত সঙ্গীত, যে সঙ্গীতে নাচে অদৃশ্য মুখোশ। সোমদত্তা হঠাৎ ভাবে, এই শহরের প্রতিটি মানুষই যেন মুখোশ পরে ঘুমায়, মুখোশ পরে ভালোবাসে, আর মুখোশ পরেই মরে যায়।
তার ঘরজুড়ে কুয়াশার মতো ছড়িয়ে আছে ছেঁড়া কাগজ, অর্ধেক লেখা চিঠি, আর পুরোনো এক আয়না। আয়নাটার মুখে ধুলো জমে আছে, তবু সে মাঝে মাঝে সেটার দিকে তাকায়, যেন নিজের মুখ নয়, অন্য কারও মুখ খুঁজছে। আজ যখন সে আয়নার দিকে তাকাল, হঠাৎ মনে হল, ওটা নড়ছে। চোখে চোখ রেখে আয়নার প্রতিচ্ছবিটা যেন ফিসফিস করে বলল, “তুমি আজও অভিনয় করছ?” সোমদত্তা চমকে উঠল। কণ্ঠটা পরিচিত, কিন্তু কোথায় শুনেছে মনে পড়ছে না। হতে পারে সেটা তার নিজের কণ্ঠই, যা বহুদিন আগে ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর আজ রাতে উঠে এসেছে স্বপ্নের পর্দা ফুঁড়ে।

মুখোশটা সে ধীরে ধীরে মুখে তোলে। ঠিক তখনই জানলার কাচে আবার তার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, কিন্তু এবার সেটা তার মতো নয়। মুখোশ পরা অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সেই মুখোশে হাসি নেই, কেবল চোখে ঘূর্ণি, যেন সেখানে সময় ঘুরছে, আর সব আলোকে টেনে নিচ্ছে নিজের গভীরে। সোমদত্তা তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, এই মুখটাই হয়তো তার আসল মুখ, যাকে সে সারাজীবন আড়াল করে রেখেছিল।
বাইরের হাওয়া হঠাৎ বেড়ে যায়। পর্দা উড়ে ওঠে, বাতি নিভে যায়। ঘরজুড়ে এখন কেবল আলোছায়ার খেলা।

সে আয়নাটার সামনে বসে। ঘরটা অন্ধকার, শুধু জানলার ফাঁক দিয়ে আসছে ফ্যাকাশে এক রেখা আলো, যেটা তার মুখের ওপর কাটা দাগের মতো পড়ে আছে। সে নিজের চোখে চোখ রাখে, দেখল, চোখের ভেতরেও যেন আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে, যাকে সে কোনোদিন চিনতে চায়নি। সেই মানুষটা বলল, “তুমি সারাজীবন অন্যদের মুখোশ পরে থেকেছ। আজ নিজের মুখটা দেখতে ভয় পাচ্ছ?” সোমদত্তা চোখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু প্রতিচ্ছবিটা হাসে, সে জানে, সোমদত্তা পালাতে পারবে না।
বাইরে কুকুর ডাকে, আবার থেমে যায়। দূরে কোনও ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়, এক দূরাগত ডাক, যেন অদৃশ্য কেউ ডেকে বলছে, “চলো, আর দেরি কোরো না।” সোমদত্তা মনে মনে ভাবে, কোথায় যাবে? এই ঘর, এই শহর, এই জীবন, সবই তো তার নিজের তৈরি কারাগার। বাইরে গেলে কি সে মুক্তি পাবে, নাকি কেবল এক কারাগার থেকে আরেকটিতে যাবে? প্রশ্নটা উত্তর চায় না, কেবল ঝুলে থাকে বাতাসে, ঠিক যেমন জানলার পাশে ঝুলে থাকা ভাঙা উইন্ডচাইম। বাতাস না এলেও সেটা আজ শব্দ করছে, এক অসম্ভব সুরে।

সে হঠাৎ চাদর টেনে নেয় নিজের গায়ে। শরীর ঠাণ্ডা, কিন্তু ভেতরটা জ্বলছে। মনে হচ্ছে, কোনো অদৃশ্য হাত তার বুকের ভেতর থেকে আলো টেনে নিচ্ছে, একে একে নিভিয়ে দিচ্ছে ভিতরের বাতিগুলো। আর প্রতিবার নিভে যাওয়ার পর শব্দ হয়, টিক, টিক, টিক- যেন ঘড়ির কাঁটা নয়, তার হৃদয়ের শেষ সময় গুনছে কেউ।
সেই শব্দে তার ঘুম পায় না। তার মনে হয়, ঘরটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছে। দেওয়ালগুলো পিছিয়ে যাচ্ছে, ছাদটা দূরে সরে যাচ্ছে, জানলা ফ্রেমগুলো হেলে পড়ছে সময়ের ভারে। ঘরের মাঝখানে এখন সে একা, কিন্তু একাকীত্বটাও যেন স্পর্শযোগ্য হয়ে উঠছে। দেয়াল থেকে ঝুলে থাকা ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো একে একে খুলে মেঝেতে পড়ে যায়, কিন্তু কোনো শব্দ হয় না, পাতাগুলো নরম আলোয় পরিণত হয়ে ভেসে যায় বাতাসে। সে বুঝতে পারে, সময় এখন তাকে গিলে নিচ্ছে, আর সে কিছুই করতে পারছে না।
সেই সময়ই দরজার বাইরে শব্দ হয়, টক্ টক্ টক্। কেউ আসছে। সোমদত্তা জানে না, এই রাতে কে তার দরজায় আসতে পারে। সে এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলে, কিন্তু বাইরে কেউ নেই। শুধু একটা পুরোনো মুখোশ পড়ে আছে দরজার সামনে, কাদায় মাখা। সে মুখোশটা তুলে নেয়। মুখোশটা যেন উষ্ণ, যেন এখনই কেউ সেটা খুলে রেখে গেছে। মুখোশে হালকা সুগন্ধ, পুরনো আতর, ফুলের মতো মিষ্টি, আবার একটু পচা পাতার মতো কষ্টের। সে মুখোশটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আর হঠাৎ মনে হয়, এই গন্ধটা সে চেনে। এই গন্ধ একসময় তার ঘুমের ভেতরে ঢুকে পড়ত, তার শরীরের চারপাশে ছড়িয়ে যেত।

মুখোশটা সে ধীরে ধীরে মুখে তোলে। ঠিক তখনই জানলার কাচে আবার তার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, কিন্তু এবার সেটা তার মতো নয়। মুখোশ পরা অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সেই মুখোশে হাসি নেই, কেবল চোখে ঘূর্ণি, যেন সেখানে সময় ঘুরছে, আর সব আলোকে টেনে নিচ্ছে নিজের গভীরে। সোমদত্তা তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, এই মুখটাই হয়তো তার আসল মুখ, যাকে সে সারাজীবন আড়াল করে রেখেছিল।
বাইরের হাওয়া হঠাৎ বেড়ে যায়। পর্দা উড়ে ওঠে, বাতি নিভে যায়। ঘরজুড়ে এখন কেবল আলোছায়ার খেলা। তার মনে হয়, এই ঘরটা যেন ধীরে ধীরে সমুদ্র হয়ে যাচ্ছে। দেয়ালের রঙ নীলচে, মেঝের কার্পেট তরঙ্গ তুলছে। সে হাঁটছে, কিন্তু পায়ের নিচে জল, চারদিকে গন্ধ, আতর, কাদা, লবণ। সে একা নয়, তার চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে মুখোশধারী মানুষ, প্রত্যেকের মুখে এক-একটা ভিন্ন গল্প। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ আবার চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারা সবাই তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলছে, ‘এসো, আমাদের সঙ্গে এসো।’

সোমদত্তা হাঁটতে থাকে, জল হাঁটু পর্যন্ত উঠে আসে। তার মনে হয়, এই জলে শুধু জল নেই, এখানে গলে আছে সময়, স্মৃতি, অনুতাপ। প্রতিটি তরঙ্গ যেন একেকটা শব্দ—তুমি অভিনয় করেছ, তুমি মুখোশ পরে থেকেছ, এখন তোমার পালা ডুববার।
সে থেমে যায়। চোখ তুলে দেখে, দূরে এক আলো, নরম, মলিন, কিন্তু আশ্চর্যভাবে স্থির। সে সেই আলোর দিকে হাঁটে। আলোর কাছাকাছি যেতেই বুঝতে পারে, সেটা আসলে একটা আয়না। কিন্তু এই আয়নাটা অন্যরকম। এর ভিতরে সে নিজের মুখ দেখে না, দেখে এক অচেনা মেয়ে, যার মুখ ভেজা, চোখে বৃষ্টি। মেয়ে বলছে, ‘তুমি আমার স্বপ্ন চুরি করেছিলে।’ সোমদত্তা ফিসফিস করে বলে, ‘কে তুমি?’
মেয়ে উত্তর দেয় না। কেবল হাত বাড়িয়ে আয়নার ভেতর থেকে বাইরে আসে। তার ত্বক ঠাণ্ডা কিন্তু স্পর্শে আগুন। সোমদত্তার মনে হয়, সে নিজের শরীরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে, নিজের মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে। বাস্তব, স্বপ্ন, মৃত্যু সবকিছুর সীমা একরকম ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

আলো নিভে যায়।
যখন চোখ খোলে, সে নিজেকে দেখে বিছানায়। ঘর ঠিকঠাক, সব কিছু আগের মতো। জানলা বন্ধ, আলো জ্বলছে। কিন্তু তার পাশে টেবিলের ওপর পড়ে আছে সেই মুখোশটা। এখন সেটি ঠান্ডা, নিঃশব্দ। সে হাত বাড়িয়ে মুখোশটা ছোঁয়। মনে হয়, কেমন যেন ভারী। চোখের গর্তের ভেতর জমে আছে একটু অন্ধকার, যেন কেউ তাকিয়ে আছে তার দিকেই।
হঠাৎ ঘড়ির কাঁটা তিনটে বাজায়। টিক টিক শব্দ আবার শুরু হয়, কিন্তু এবার তাতে একটা অন্যরকম ছন্দ, যেন ঘড়িটাও মুখোশ পরে নিয়েছে। সোমদত্তা হাসে, ঠোঁট শুকনো, কিন্তু হাসির ভেতর অদ্ভুত এক নীরবতা। সে উঠে দাঁড়ায়, আয়নার দিকে যায়। আয়নাটা একদম পরিষ্কার, কিন্তু প্রতিচ্ছবি দেখা যায় না। সে হাত বাড়িয়ে আয়না ছোঁয়, আর অনুভব করে, আয়নাটা আসলে জল। তার শরীর ধীরে ধীরে ঢুকে যায় সেই জলে। ঘরটা হারিয়ে যায়, দেওয়ালগুলো গলে পড়ে। চারপাশে কেবল ভাসছে মুখোশ, আলো, ছায়া, শব্দ, আর অগণিত অসমাপ্ত বাক্য। আর এই জলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোমদত্তা অনুভব করে, তার ভেতরের কেউ অবশেষে জেগে উঠছে। মুখোশ খুলে ফেলছে না, কিন্তু মুখোশের পেছন থেকে আলো ঝরে পড়ছে। সে জানে না এটা স্বপ্ন, মৃত্যু, না পুনর্জন্ম, কিন্তু প্রথমবারের মতো সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে। এবং সেই দেখাতেই জন্ম নিচ্ছে এক নতুন শব্দ, যার কোনও উচ্চারণ নেই, কোনও মানে নেই, কিন্তু তবুও সে শব্দে ভরে যাচ্ছে ঘরের প্রতিটি কোণ। সে শব্দ হল সোমদত্তার নিজস্ব নীরবতা, যে নীরবতার ভেতরই আজ তার জীবনের প্রথম সত্য বাক্য জন্ম নিচ্ছে। 🍁(চলবে)

 

 

 

 

🍂কবিতা 

 

সুদীপা বসু -এর কবিতাগুচ্ছ

বিষাদ

ভিজে যাচ্ছে আমার শরীর
ভিজে যাচ্ছে আমার মন
ভিজছে আমার যন্ত্রণা
আমি ভিজছি সারাক্ষণ।

ভিজছে আমার স্বপ্ন
ভিজছে আমার ঘর
ভিজে যাচ্ছে আমার আমি
আমি ভিজছি নিরন্তর।

ভিজছে আমার পৃথিবী
ভিজে যাচ্ছে আমার দেশ
ভিজছে আমার সীমান্ত
আমি আজও নিরুদ্দেশ।

ভিজছে আমার ভালোলাগা
ভিজে যাচ্ছে আমার ভুল
ভিজছে আমার আপাদমস্তক
ভিজছে একূল ওকূল।

ভিজছে আমার সমাজ
ভিজছে আমার ব্যথা
ভিজে যাচ্ছে কান্না আমার
ভিজছে না বলা কথা।

ভিজে যাচ্ছে আমার চেতন
ভিজে যাচ্ছে আমার শ্বাস
ভিজছে আমার অভিমান যত
ভিজছে ধূসর আকাশ।

ভিজে যাচ্ছে আমার শরীর
ভিজে যাচ্ছে আমার মন
জন্ম থেকে ভিজছি আমি
ভিজছি সারাক্ষণ।

ভিজে যাচ্ছে আমার শোক
ভিজে যাচ্ছে আমার স্বর
ভিজে যাচ্ছে আমার শাড়ি
আমার শরীর জুড়ে জ্বর।

চেনা- অচেনা

কয়েক দিন ধরেই বোতলদের বলছিলাম
ঐ রকম ভরা পেটে থাকিস্ না
বদ হজম হবেই হবে।

অনেক দিন পর
স্বপ্নকেও বললাম-
এই অসময়ে আর
আমার ঘুম ভাঙ্গাস না,
এমনিতেই ঘুম আসে না।
এখন আর আগের মতো
ঘুমও কাছে আসতে ভয় পায়।
কি জানি-
কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা।

রাস্তায় বের হলে-
রাস্তাটাও মশকরা করে।
অথচ রাস্তা আমার অনেক দিনের চেনা,
কেমন যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেছে।

চেনা মুখ গুলোও-
এখন মুখোশে ঢাকা ,
পাশাপাশি হাঁটছি অথচ দূরত্ব বাড়িয়ে!

ইদানীং ব্যবধান প্রাচীর তুলেছে।

 

অস্তিত্ব 

অন্তরের অন্তর্গত অন্তঃস্থলে হাহাকার চাপা পড়ে আছে।

গাছেদের হলুদ পাতায় আমার যন্ত্রণা,
দু’চোখে আগুন রেখে পেড়িয়ে যাই সীমান্তের সীমা,
পায়ে পায়ে আমার ঠিকানা।

 

আক্ষেপ 

কত যে বৃক্ষে আজ অকাল বার্ধক্য
কত সবুজ পাতায় কীটের দংশন ;
হলুদ তারুণ্যে তারা বিষাদে উদ্বিগ্ন
ঝরে ঝরে পড়ে থাকে পথের ধূলায়।

মিথ্যের বেসাতি কোলাহলে মেশে
দর্পচূর্ণ শাসকের অকাল বর্ষণ;
মূর্খ যারা স্তূতিস্তবে আবদ্ধ ভাতায়
প্রজন্মের স্বপ্নগুলো চুরি হয়ে যায়।

 

সংকেত 

স্বপ্নগুলো ফুটপাতেই
বিপন্ন ছিন্নমূল প্রায়
ওদের মুখের ভাষা কেড়েছে
গোপন বৈঠকে
গোপন আঁতাতে।

ওদের নিঃসৃত শ্বাস
লাভার প্রবাহে
গলে পড়বে রাজ্য রাজপাটে।

যে বোশেখ দিয়ে গেছে অহরহ শোক
যে আষাঢ় ভাসিয়েছে যত স্বপ্ন ছিল
শ্রাবণের যে ধারায় জলশূন্য চোখ
আশ্বিনের ঢাক বেজে গেছে
পাঁজরের খাঁজে;
আজ তার শেষ সংকেত
ফাগুনের গানে গানে পলাশের কালে
তারপর—
নতুন রং নতুন সকালে।

 

 

 

 

বৃন্দাবন দাস -এর একটি কবিতা 

তপঃকুণ্ড

ক’দিন খুব বিষন্ন যাচ্ছে

অথচ চারদিকে মানুষগুলো হই হই করে চলে যাচ্ছে
ডিসেম্বরের শীত পৌষ মাসের শীত
বড় প্রিয় শীত
কেউ ভ্রুক্ষেপ করছে না একটু দাঁড়াবে

কেউ কারো খোঁজ রাখছে না
কেউ পাশে থেকেও জানতে চাইছে না —
সে-জন কোথায় যাবে

মানুষ অমৃতময় সেই কবে শিখেছি
অথচ সেই অমৃত ছুঁতেই আজ ভয়
সবাই দৌড়চ্ছে নিজের স্বর্গ নিজেই বানিয়ে নেবে

আমার বন্ধুরাও কাব্যকলা
শিল্পে পরিণত করবে
ধরাধাম ধন্য হবে
যাদের জন্য এত প্রয়াস
তারা কোথায় যেন লুকিয়ে গেছে

আমি শুধু শুধু বিষন্নতার ঢেউ গুনছি
অকর্মণ্য বলেই বোধ হয়
আমার চারপাশে বিষাদের অর্ণব

স্বর্গেরও দিন শেষ ধরারও দিন শেষ
শুধু বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছি

তুমি আমাকে সন্ত্রাসবাদী বলবে
নাকি নিরাশবাদী বলবে
সে তোমার

সামনেই দেখি
তাপঃকুণ্ড জ্বেলে বসে আছেন
মানুষের ছেলেরা—

 

 

ভানুকিশোর সরকার -এর একটি কবিতা

রকমারি শিকার

হোটেল রেস্তোরাঁতে
হাড়-মাংস চিবোতে চিবোতে
মৃত প্রাণীর জন্য
চোখের জল ফেলছে
এমন আবাক কাণ্ড
কেউ কখনো শোনেনি,
বরং স্বাদ ঝাল মশলার বিচারে
ঠকা-জেতার হিসাব কষে
ওয়েটার বা কাউন্টারে যাওয়া।

ব্যবস্থাপনা দাঁড়িয়ে নেই
একজায়গায়–
খাদক খাদ্যের রুচি বদলেছে
বদলেছে জঙ্গলের নিয়ম।
তবে কুমিরের ছাগলছানা
ধরার গল্প এখনও আছে।
এখন সবচেয়ে সুস্বাদু
মেয়েদের তুলতুলে মাংসের
খোঁজে হন্যে বাজার এফোঁড়-ওফোঁড়।
মেয়েদের মাংসের খোলা রেস্তোরাঁয়
ঘটা করে চোখের আড়ালে
আশ্চর্য সব মানুষের মুখ
নেতা-গুণ্ডা
ভেকধারী সাধু মহারাজ
সবাই খদ্দের —
বিশেষ নাটকের প্রয়োজনে
রং করা চোখের জল ফেলা
এ ছাড়া কোন বালাই নেই।
ট্যাঁক আর ক্ষমতার রেস্তোয়
শিকার ধরা শিকার মারার
কত রকমারি কৌশল
পুলিশ আর শিকারি
সহযোগী বন্ধু
মুখোশের ভিড়
জীবন্ত মুখোশগুলো
খুবলে খাচ্ছে সময়ের স্রোত।

 

 

 

 

চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

প্রশ্ন পুরুষের কাছেই

পুরুষ তুমি যে হাতে কবিতা লেখো, অক্লেশে শব্দ নামাও, পালকের মতো নরম শরীর বুনে চলো, মুখে আওড়াও বনলতা সেন..
সে হাতে কেমন করে সম্মতি না পেলে হিংস্রতা দেখাও; একটু বুঝিয়ে বলবে কি!

তোমার যে হাত কনিষ্ঠের মাথায় নেমে আসে স্নেহে আশীর্বাদ হয়ে, সে হাত কেমন করে ত্রাস হয়ে শরীরের ভুলস্থান স্পর্শ করে সময় বিশেষে; একটু বুঝিয়ে বলবে কি!

তুমি শিক্ষক যে হাতে নিয়ে চকখড়ি ডাস্টার, তোমার সামনে ব্ল্যাকবোর্ড,
রসায়নাগারে বুনসেন বার্নারের উজ্জ্বল শিখায় দেখে নাও যে হাতে ধরা টেস্ট টিউবে দ্রবণের বর্ণ পরিবর্তন…
তোমার যে হাতে গিটার ওঠে,
যে হাতে স্টেথোস্কোপে গুনে নাও মুমূর্ষুর হৃদস্পন্দন,
সে হাতও সময় বিশেষে কেন এত ভুল করে; বলতে পারো, পুরুষ!

সে হাত কী করে, কী করে বলো এত পিছলে নিচে নামে, এত কালিমা মেখে নিতে পারে, কীটগ্রস্ত পচতে পারে বাড়ন্ত গ্যাংগ্রিনে; একটু বুঝিয়ে বলবে কি!

সেই কোন যুগ থেকে বিজ্ঞান তারস্বরে বলে চলেছে– স্বাভাবিক মেলামেশায় ক্ষতি নেই, অসম্মান নেই, বিকৃতি নেই, নারীপুরুষে ভেদাভেদ নেই..
বলে চলেছে, এত কর্কশ কোলাহলের মাঝেও তার বলে চলায় কোনো বিরাম নেই–
তাহলে পুরুষ তুমি এত ক্লিষ্ট কেন, বিকারে দুর্গন্ধময় কেন, তোমার কীসের এত অভাব!

কোথায় ভুল করলেন তোমার পিতামাতা, তোমাকে সুন্দর করে গড়তে চেয়ে, বলতে পারো, হে অনর্থক পুরুষ!

 

 

শুভঙ্কর দাস -এর একটি কবিতা

সেই খেজুর গাছ

প্রতিবছর আমার বুক চিড়ে নিংড়ে নেওয়া হয়
আমার রক্ত রস
ডানাগুলো কেটে ছেঁটে দেওয়া হয় নিষ্ঠুরতার চরম পর্যায়,
আমার চিৎকার আমার আর্তনাদ আমার বুকফাটা হাহাকার
সব শূন্য আকাশে ভেসে বেড়ায় যা কারোর কানে পৌঁছায় না।
আমি সেই খেজুর গাছ যাকে তোমরা রোজ কাটো
আর আমার বুকের রক্ত বেরিয়ে এলে অতি যত্নে তা সংরক্ষিত রাখো,
যতদিন আমি তোমাদের লালসা মেটাতে সক্ষম
সক্ষম তোমাদের তৃষ্ণা মেটাতে  আমার বুকের রক্তে,
ততদিন আমি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম।
তা না হলে অসহায় পুরুষের মতো অবজ্ঞা
ঘৃণা আর লাঞ্ছনায় জড়িয়ে ধরে সমস্ত শরীর।
আমি সেই খেজুর গাছ যার বুকে ঠুকে ঠুকে বসিয়ে দেওয়া হয়
শক্ত বাসের কোন গজাল যেভাবে যীশু খ্রীষ্টকে
বৃদ্ধ করা হয় ক্রুসে
আমার আর্তনাদ শুনে ছুটে আসে কিছু মৌমাছি
তারাও আমার রক্ত রস পান করে তৃষ্ণা মেটায়,
ছুটে আসে কিছু তৃষ্ণার্ত পাখি
তারাও তৃষ্ণা মিটায় আর আমার চোখের জল না দেখেই  চলে যায়।
কিন্তু কেউ বোঝে না, কেউ বুঝতেও চায় না
আমার কষ্ট আমার আর্তনাদের ভাষা।

 

 

নিতাই দাস -এর একটি কবিতা

অস্তিত্ব

আমি ক্রমে একলা হয়ে যাচ্ছি,
নিঃসঙ্গতা এখন এক অন্তর্গত ভূগোল
যেখানে হৃদয় মানচিত্রহীন—
মৃত্যুর চেয়েও জঠর এক সত্তা
আমার ভিতরেই জন্ম নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

একটি শূন্য চিহ্ন—
ঝুলে থাকে আত্মার মাঝদরজায়,
সেখানে একদিন ছিল
আলো, স্বপ্ন, কিংবা এক ধ্বংসের সম্ভাবনা।

নীল আলোর পথ
ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে যায়—
সাদা হয়ে যায়, যেন
আলোকেরও এক মৃত্যু আছে।

নিঃশব্দ চাঁদ—
সে হেঁটে যায় নিজেরই প্রতিবিম্বের পাশে
আমি দাঁড়িয়ে থাকি,
অজানা কাঁপন নিয়ে,
শব্দহীন এক অভ্যন্তরে।

মানুষ কি পারে
মৃত্যুর অতীত এক শূন্যতাকে ধারণ করতে?
নাকি মৃত্যুই কেবল ছায়া
যা দিয়ে ঢেকে রাখি
অর্থহীনতার আসল মুখ?

 

 

 

 

সমীরণ দাস -এর একটি কবিতা

স্বপ্ন পোড়া লাশ

স্বপ্ন ছিল বিদেশ যাবো স্ত্রী কে নিয়ে চারজন।
সেই আশা তেই বুক বেঁধেছি আনন্দিত মন।

জীবন যুদ্ধে লড়াই করে পেয়েছি অনেক যন্ত্রণা।

নিয়তির যে এমন খেলা মন বুঝি তা জানতো না।

বছর বছর অপেক্ষা আর প্রহর গোনা রাত।

এক লহমায় কেড়ে নিল নিয়তির সেই হাত।

স্বপ্ন যত ছিল বুঝি চোখের তারা ঘিরে।

হটাৎ করে ই হারিয়ে গেল হাজার লাশের ভীড়ে।

পিশাচ হয়ে অগ্নি শিখা গিলতে থাকে সব।

পুড়ছে দেহ, স্বপ্ন, স্মৃতি উঠছে কলরব।

জীবন চলে তার গতিতে কখন আসবে ডাক।

ফাঁকা হাতেই যেতে হবে যতই তোমার থাক।

চোখের তারায় স্বপ্ন নিয়ে পুড়তে থাকে দেহ।

ফুলের কুঁড়ি পুড়ছে দেখি বাঁচবে নাতো কেহ।

হে ভগবান! কেমন বিধান! নিষ্পাপ সব ফুল।

জীবন শুরু হবার আগেই ঘটে গেল ভুল।

আমিও যে আজ খুব অসহায় মৃত্যু পথযাত্রী।

চোখের তারায় স্বপ্ন পুড়ে ঘনিয়ে এলো রাত্রি।

সবাই যখন দেখতে এলো করলো হাহুতাশ।

আমি তখন অগ্নিদগ্ধ, স্বপ্ন পোড়া লাশ।

 

 

সংযুক্তা সাহা -এর একটি কবিতা

লটারি

টুকটুক পায়ে আমি,
গেলাম চলে দোকানে।
কড়কড়ে কুড়ি টাকা,
দিলাম মানে মানে।
একটা বাণ্ডিল এনে,
ফেলে দিল সামনে;
মায়ের নামে একটা টিকিট,
বের করে আনলাম টেনে-
পত্রিকাতে নামটা দেখে,
গেলাম আমি চমকে!
কাউকে কিছু জানাবো না-
কিন্তু কিছু যে পেয়েছি
বুঝবে সবাই ঠমকে ।
দোকানে গেলাম ম্যাগি কিনতে ,
আর চকোলেট খেতে,
খেয়েদেয়ে ফিরে আমি;
শুলাম টাকার বিছানা পেতে।
চারটে চাকর আমাকে
দেয় রেডি করে,
ড্রাইভার দেয় গাড়ির দরজা খুলে-
উঠে বসি নরম সিটে,
চারচাকা ছুটিয়ে আমি
যাচ্ছি ঘুরে বেরিয়ে-
সানগ্লাস আর সাটিনের জামায় যারাই আমায় দেখছে
সবার চোখ যাচ্ছে ধাঁধিয়ে।
বই-খাতার পাঠ আমি
দিয়েছি চুকিয়ে বুকিয়ে-
মা-বাবাও আমার সাথে
দিচ্ছে টাকা উড়িয়ে!
এমন সময় স্কুলভ্যানের হর্ন
দিল ঘুম কাটিয়ে;
চোখ খুলে উঠে দেখি
সব গেল হারিয়ে-
নিমেষে ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে
কাঁধে ঝুলল স্কুল ব্যাগ-
স্যারের ক্লাসে অংক কষতে কষতে স্বপ্নের ঘোর করলাম ত্যাগ।
বাড়ি ফিরে আসার পথে দেখি- পথের ধারের বস্তিগুলো,
বুঝলাম সাটিনের জামা নয়;
টাকা হলে সবার প্রথমে
বাঁচাবো প্রাণগুলো।
মায়ের ভরসা হব,
বাবার হব কাঁধ।
আমার ইচ্ছাবলে
ভেঙে যাবে সব বাধ।

 

 

 

শুভজিৎ নাগ -এর একটি কবিতা

অবয়ব

সেদিন দেখলাম টুকুনকে,
শীতের রোদুরে নকশী কাঁথায়
বর্ষার মেঘ রাঙা শাড়িতে,
হেমন্তের হিমেল সিন্গ্ধতা তার চোখে,
বসন্তের খোলা হাওয়া তার খোলা পিঠে।
রামধনুর হাসিতে ভরে উঠেছে তার মুখ,
সেই হাসির ছটায় ছটায় আমি হলাম রঙিন।
কুড়িগুলো বিকশিত হবার মতো
আমার চেতনা গুলো হল বিকশিত।
দখিনা বাতাসের মতো তার স্পর্শ
আমায় করলো পুলকিত।
বার বার দেখি তারে,
হৃদয়ের ডানা ভরে।
বাস্তব ও কল্পনা মিশিয়ে
সে এসে দাঁড়ায়,
“অবয়ব” রূপ ধরে।

 

 

গৌতম মণ্ডল -এর একটি কবিতা

দু’হাজার ছাব্বিশ

জীর্ণ জড়তা ঝেড়ে ফেলে সব
মুছিয়ে আঁধার রাত।
এসেছে আজকে নতুন সকাল
নতুন সুপ্রভাত।

চেয়ে দ্যাখো ঐ পাকুড় ডালে
ল্যাজঝোলা পাখি ডাকছে সকালে
পাখান মেলে উড়েবে আকাশে
আর দেবে সে, শিস।
এসো তুমি এসো নতুন ভোরে
দুহাজার ছাব্বিশ।

পৌষের ভোরে ঐ যে দূরে
পুবের আকাশ হাসছে ওরে
টক্ টকে লাল চাদর গায়ে
দেয় কে রোদের আশিস?
এসো তুমি এসো নতুন ভোরে
দুহাজার ছাব্বিশ ৷

আমার গাঁয়ে পথের বাঁয়ে
সবুজ রঙের শাড়িটি গায়ে
শিশির জলে স্নানটি কোরে
মাথা নাড়ে গম শিষ৷
এসো তুমি এসো নতুন ভোরে
দু’হাজার ছাব্বিশ৷

হলুদ রঙের সর্ষে ফুলে
ভোমরা এসে নাচছে দুলে
তাকিয়ে বলে রাঙালুর ক্ষেত-
“রাঙা রোদ মেখেনিস”৷
এসো তুমি এসো নতুন ভোরে
দুহাজার ছাব্বিশ।

সজনের ডাল, সাজবে সে কাল
ছোটো ছোটো সাদা ফুলে
সাদা শাড়ি গায় কি শোভা পায়
কাঁসাই নদীর কূলে৷

আমের শাখায় দুই পা নাচায়
ল্যাজ ঝোলা সেই পাখি
হলুদ বোলে সাজবে বোলে
স্বপ্ন সে চোখে আঁকি৷

সেই সে স্বপ্ন, ঊষার লগ্ন
নতুনের গায় গান—
“মুছে ফেলে দাও পুরাতন সব
বেদনার অভিমান৷

নতুন আলোয় ভাসুক এ গ্রাম ৷
সবাই জানে ‘রাঙামাটি’ নাম ৷
ঐ রাঙা মাটির আঁচল পেতে
রোদ্দুর বুকে নিস৷
এসো তুমি এসো নতুন আলোয়–
দু’হাজার ছাব্বিশ ৷

 

নিরুপম পাল (নীল পাহাড়) -এর একটি কবিতা

যুদ্ধ প্রাপ্তি

উপরে খোলা নীল আকাশ…
পাখিরা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়,
মেঘ রাশি আপন মনে খেলে যায়।
কিন্তু, নীচে এক বিশাল ভূখণ্ডের শাখা-প্রশাখা,
আবার, সেই ভূ-ভাগে কত দেশের ছবি আঁকা।

গগন ভেদ করে আসে ফতোয়া
গর্জে উঠে আব্দুল -করিম-ফাতেমা।
প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার লড়াই
বিস্তার ও আধিপত্যের লড়াই
ফতোয়া এসেছে… ‘জেহাদী হও’
জেহাদে জান্নাত পাবে,
বাহাওর হুরের বুক চিবিয়ে রস খাবে।

মিসাইলের বিকট শব্দে…
গোলাবারুদের বিষাক্ত-গন্ধে…
নর নিধন যজেও… রক্তাক্ত ধরণী।
লাশের স্তূপ থেকে বেরিয়ে আসা শিশু
মৃত মায়ের স্তনে দুধ খোঁজে।
কোন এক ক্ষুধার্ত কিশোর…
গেলা-পচা নর মাংস ভক্ষণ করে।
কোন এক তৃষ্ণার্ত কিশোরী…
অর্ধ-মৃত মানুষের বুক চিরে
শোণিত ধাঁরা পান করে।
হয়তোবা একদিন এই বিদ্রোহী শিশুরা…
আদেশকারীর পাঁজর চিরে,
রক্তস্নানের তরে, আসবে ফিরে।

 

 

গৌতম মিত্র -এর একটি কবিতা

২০২৬ নতুন বছর স্বাগত

নতুন ২০২৬ সাল স্বাগত
২০২৬ নিচ্ছে বিদায়
প্রতি বছর ভালো কাটবে
দিন গুনি এই আশায়

ভালো কথার ফুলঝুড়ি ঝরে
কত সুখ স্বপ্ন ভাসে মনে
নতুন বছর সবার কাটবে সুখে
খেয়ে পরে আনন্দে এ জীবনে

হায়রে স্বপ্ন হয় দুঃস্বপ্নময়
আশা নিরাশায় রূপান্তর
জীবন যেন বিভিষীকাময়
মানুষে মানুষে বিভেদ অন্তর

এবার আসুক কঠোর পরিবর্তন
সংঘবদ্ধ শুভশক্তির জাগরণ
ফিরে আসুক সত্য, নৈতিকতা
মিথ্যাচার অসভ্যতার হোক চিরমরণ।

 

 

 

🍂ফিচা

 

এই ছিলেন মা সারদা, যুগের থেকে এগিয়ে থাকা মহীয়সী, তিনিই প্রমাণ করলেন নারী শক্তিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি শেখালেন, স্বাধীনতা চাইলে তা ছিনিয়ে নিতে হয়, ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না। তিনি দেখালেন, মা হওয়া মানে শুধু সন্তানের প্রতি মমতা নয়, পৃথিবীর সমস্ত নিপীড়িত মানুষের প্রতি মমত্ববোধও। আজ একশো বছরেরও বেশি সময় পরে, মায়ের সেই কণ্ঠস্বর আজও প্রতিধ্বনিত হয়, “এমন কোনও বেটাছেলে কি সেখানে ছিল না, যে দু’চড় দিয়ে মেয়ে দু’টিকে ছাড়িয়ে আনতে পারে?”

 

যুগাতীত মা সারদা নারী মুক্তি ও স্বাবলম্বনের আলোকবর্তিকা

সৈকত প্রসাদ রায়

৯১৭ সাল, যুগান্তর বিপ্লবী দলের তিন সাহসী স্বাধীনতা সংগ্রামী অমর চট্টোপাধ্যায়, কুন্তল চক্রবর্তী ও ভূপেন্দ্রকুমার দত্ত তখন পলাতক। ব্রিটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে তাঁরা লুকিয়ে আছেন কোথাও। গোপন সূত্রে কলকাতা পুলিশ জানতে পারল, তিলজলা রেলওয়ে কেবিনের কর্মী দেবেন ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী সিন্ধুবালা দেবী এই তিন বিপ্লবীকে আশ্রয় দিয়েছেন তাঁদের রেলওয়ে কোয়ার্টার্সে।পুলিশ যখন অভিযান চালাল, ততক্ষণে তিন বিপ্লবী পালিয়ে গিয়েছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। পুলিশ তখন গ্রেফতার করল দেবেন ঘোষকে। তাঁর স্ত্রী সিন্ধুবালাও সমান দোষী, কিন্তু তিনি তখন কলকাতায় নেই। চলে গিয়েছেন বাঁকুড়ার ইন্দাসে, যূথবিহার গ্রামে, তাঁর পিতৃগৃহে।
বাঁকুড়া পুলিশকে নির্দেশ পাঠানো হল এই মহিলাকে গ্রেফতার করতে। পুলিশ সুপার ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে অভিযানে নামলেন, মাত্র একজন নারীকে গ্রেফতার করার জন্য। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্যত্র। পাশাপাশি দুই গ্রামে দুই সিন্ধুবালা; একজন দেবেনবাবুর স্ত্রী, অন্যজন তাঁর বোন। কাকে গ্রেফতার করবে পুলিশ? গ্রামের মানুষ মুখ খুলছে না, কেউ বলছে না কে কোন সিন্ধুবালা।ব্রিটিশ পুলিশ তখন এক নৃশংস সিদ্ধান্ত নিল। দু’জনকেই গ্রেফতার করা হবে। একজনকে ধরা হল সাবাজপুর থেকে, অন্যজনকে যূথবিহার থেকে। শুধু গ্রেফতার নয় জিপ থাকা সত্ত্বেও দুই নারীকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হল। তারপর বন্দী করা হল বাঁকুড়া জেলে।
এই ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। কারণটা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক- সিন্ধুবালা দেবী তখন গর্ভবতী। সন্তান প্রসবের জন্যই তিনি এসেছিলেন বাপের বাড়ি। (অন্য তথ্য অনুযায়ী, স্ত্রী নয়, বরং বোনই ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা।) এমন নাজুক অবস্থায় একজন গর্ভবতী নারীকে এভাবে পায়ে হেঁটে টেনে নিয়ে যাওয়ায় সমগ্র এলাকায় তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠল।

 

তাঁর নিজের মুখেই শুনি সেই সংগ্রামের কথা: “কামারপুকুরে লক্ষ্মী আর আমি ‘বর্ণপরিচয়’ একটু একটু পড়তুম। ভাগনে (হৃদয়) বই কেড়ে নিলে; বললে ‘মেয়ে-মানুষের লেখাপড়া শিখতে নেই; শেষে কি নাটক-নভেল পড়বে।” কী মর্মান্তিক এই কথা! একজন শিশু মেয়ের হাত থেকে বই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র সে মেয়ে বলে! কিন্তু মায়ের সেই সঙ্গী লক্ষ্মী ছিলেন আরও দৃঢ়চেতা। “লক্ষ্মী তার বই ছাড়লে না, ঝিয়ারী মানুষ কিনা, জোর করে রাখলে।” আর মা? তিনিও হাল ছাড়েননি। “আমি আবার গোপনে আর একখানি এক আনা দিয়ে কিনে আনালুম। লক্ষ্মী গিয়ে পাঠশালায় পড়ে আসত, সে ঘরে এসে আবার আমায় পড়াত।”

লোকমুখে প্রচারিত হতে হতে এই ভয়াবহ সংবাদ যখন জয়রামবাটিতে পৌঁছল, মা সারদাদেবী সেই মুহূর্তেই ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠল এমন তীব্র ক্ষোভ যা সেদিন সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। সংবাদবাহকের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ”বলো কী? এটা কি কোম্পানির আদেশ? না পুলিশ সাহেবের কেরামতি? নিরপরাধ স্ত্রীলোকের উপর এত অত্যাচার মহারানি ভিক্টোরিয়ার সময় তো কই শুনিনি?”
মায়ের কণ্ঠে ছিল গভীর বেদনা ও প্রতিবাদের আগুন। তাঁর নিজের শরীর তখন মোটেই সুস্থ নয়, নানা অসুখে জর্জরিত। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিল মানসিক যন্ত্রণা। দুই অসহায় নারীর প্রতি এই পাশবিক অত্যাচার তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। ক্রোধ আর বেদনায় তাঁর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। বললেন, ”এই যদি কোম্পানির আদেশ হয়, তো, আর বেশি দিন নয়। এমন কোনও বেটাছেলে কি সেখানে ছিল না, যে দু’চড় দিয়ে মেয়ে দু’টিকে ছাড়িয়ে আনতে পারে?” মায়ের এই কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠল, তিনি শুধু নারীর অপমান সহ্য করতে পারছেন না তাই নয়, তিনি চাইছেন পুরুষদেরও এগিয়ে আসতে, প্রতিবাদ করতে। কিছু সময় পরে যখন আবার সংবাদ এল যে দুই মহিলা মুক্তি পেয়েছেন, তখনই কেবল মায়ের হৃদয় থেকে ভারী পাথরটা সরে গেল। তিনি গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। শান্ত হলেন। কিন্তু সেই শান্তির মধ্যেও ছিল এক গভীর উৎকণ্ঠার ছাপ। বললেন, ”এই খবর যদি না পেতুম, তবে আজ আর ঘুমুতে পারতুম না।”

এই কথাগুলো শুনে যে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- কে এই মা যাঁর অপরিচিত দুই নারীকে নিয়ে এত গভীর চিন্তা? যাঁর ঘুম নষ্ট হয়ে যায় অন্যের দুঃখে? তিনি কি কোনও স্বাধীনতা সংগ্রামী? বিপ্লবী দলের সদস্য? না, আপাতদৃষ্টিতে কোনওটাই নন। অথচ মহিলাদের প্রতি পুলিশের এই নির্যাতন শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি একবারও বললেন না সমাজের অন্য মানুষদের মতো কী দরকার ছিল এমন ঝুঁকি নেওয়ার? বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়ার? বরং তাঁর সমস্ত সহানুভূতি ছিল সেই দুই নিপীড়িত নারীর প্রতি।
এই মা ঠাকুরণ আর কেউ নন, তিনি রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাসুন্দরীদেবীর কন্যা সারদাদেবী। জন্ম ২২ ডিসেম্বর ১৮৫৩ সালে, জয়রামবাটি গ্রামে। মাত্র ছ’বছর বয়স থেকে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনসঙ্গিনী। স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত বেলুড় মঠের সংঘ জননী। গোটা বিশ্ব যাঁকে চিনেছে কেবল ‘মা’ হিসেবে – যিনি ‘সতেরও মা, অসতেরও মা’। কিন্তু সেই মা শুধু আধ্যাত্মিক জগতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁর হৃদয় বিস্তৃত ছিল পৃথিবীর সমস্ত দুঃখী, নিপীড়িত, অসহায় মানুষের জন্য। বিশেষত নারীদের প্রতি তাঁর মমত্ব ছিল অসীম। তাই যখন দুই অপরিচিত নারী পুলিশের অত্যাচারের শিকার হলেন, মা তাঁদের নিজের কন্যার মতোই অনুভব করলেন।

মা সারদার ছোটবেলা কাটে জয়রামবাটি ও কামারপুকুরে। সেই সময়ে স্ত্রী-শিক্ষার কথা ভাবাই ছিল এক ধরনের পাপ। গ্রাম সমাজ কেন, শহরেও ভাবা হত না মেয়েদের শিক্ষার কথা। সমাজে প্রচলিত ছিল এক ভয়ংকর কুসংস্কার – মেয়েরা পড়লে বিধবা হবে, দুর্ভোগ নেমে আসবে সংসারে। এই বোধ সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রবাহমান ছিল বিষের মতো। তবু এই অন্ধকারের মধ্যেও গ্রামাঞ্চলে গুটিকয়েক সাহসী নারী গোপনে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা করছিলেন। সারদা মা ছিলেন তেমনই একজন বিদ্রোহী। তাঁর নিজের মুখেই শুনি সেই সংগ্রামের কথা: “কামারপুকুরে লক্ষ্মী আর আমি ‘বর্ণপরিচয়’ একটু একটু পড়তুম। ভাগনে (হৃদয়) বই কেড়ে নিলে; বললে ‘মেয়ে-মানুষের লেখাপড়া শিখতে নেই; শেষে কি নাটক-নভেল পড়বে।” কী মর্মান্তিক এই কথা! একজন শিশু মেয়ের হাত থেকে বই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র সে মেয়ে বলে! কিন্তু মায়ের সেই সঙ্গী লক্ষ্মী ছিলেন আরও দৃঢ়চেতা। “লক্ষ্মী তার বই ছাড়লে না, ঝিয়ারী মানুষ কিনা, জোর করে রাখলে।” আর মা? তিনিও হাল ছাড়েননি। “আমি আবার গোপনে আর একখানি এক আনা দিয়ে কিনে আনালুম। লক্ষ্মী গিয়ে পাঠশালায় পড়ে আসত, সে ঘরে এসে আবার আমায় পড়াত।”
কী অসীম জ্ঞানস্পৃহা! কী দৃঢ় সংকল্প! সমাজের সমস্ত বাধা-নিষেধের মধ্যেও তিনি লেখাপড়া ছাড়েননি।

এই বিদ্যোৎসাহ তাঁর পরবর্তী জীবনেও অটুট ছিল। মা বলছেন: “ভাল করে শেখা হয় দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর তখন চিকিৎসার জন্য শ্যামপুকুরে। একাটি একাটি আছি। ভব মুখুজ্যেদের একটি মেয়ে আসত নাইতে। সে মধ্যে মধ্যে অনেকক্ষণ আমার কাছে থাকত। সে রোজ নাইবার সময় পাঠ দিত ও নিত। আমি তাকে শাক পাতা, বাগান হতে যা আমার এখানে দিত, তাই খুব করে দিতুম।”
কী সুন্দর এই চিত্র! মা গুরুদক্ষিণা দিতে ভুলছেন না তাঁর শিক্ষয়িত্রীকে। শাকপাতা, বাগানের সবজি দিয়ে তিনি জ্ঞানের মূল্য চুকিয়ে দিচ্ছেন।
নিজে এত কষ্ট করে পড়েছেন বলেই নারীশিক্ষা ও নারীর সমান অধিকারের বিষয়ে এত দৃঢ় মত ছিল মা সারদার। তিনি প্রাণ দিয়ে চাইতেন মেয়েরা লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াক। গৌরী মা বা নিবেদিতার স্কুল নিয়ে তাঁর আগ্রহের শেষ ছিল না। তিনি জানতেন স্কুল হলে মেয়েরা শুধু পড়াশোনাই শিখবে না, শিখবে হাতের কাজও, যা দিয়ে পরবর্তীকালে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে মেয়েরা। কারণ তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, স্বাবলম্বিতা ছাড়া মেয়েদের স্বাধীনতা কখনও আসবে না। এক স্ত্রীভক্ত মেয়ের বিয়ে দিতে না পারায় যখন কেউ দুঃখ প্রকাশ করলেন, মা বললেন: “বে দিতে না পার, এত ভাবনা করে কী হবে? নিবেদিতার স্কুলে রেখে দিও। লেখাপড়া শিখবে, বেশ থাকবে।” কী অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি! যে সমাজ বিয়ে ছাড়া মেয়ের জীবন ভাবতেই পারত না, সেই সমাজে মা দেখিয়ে দিচ্ছেন, বিয়ে নয়, শিক্ষাই মেয়েদের মুক্তির পথ।

এই প্রসঙ্গেই অনিবার্যভাবে আসে বাল্যবিবাহের কথা। পরম বিস্ময়ে আমরা দেখি মা ছিলেন এর তীব্রতম সমালোচক। নিজের যেমন জ্ঞানস্পৃহা ছিল, তেমনি ছিলেন অল্প বয়সে বিয়ের কঠোর বিরোধী। নিবেদিতার স্কুলে দুটি মাদ্রাজি বয়স্ক কুমারী মেয়েকে দেখে একই সঙ্গে মা খুশি ও দুঃখিত হয়ে বলেছিলেন: “আহা, তারা কেমন সব কাজকর্ম শিখছে! আর আমাদের! এখানে পোড়া দেশের লোকে কি আটবছরের হতে না হতেই বলে, ‘পরগোত্র করে দাও, পরগোত্র করে দাও!”
মায়ের কণ্ঠে ছিল গভীর বেদনা। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে বাল্যবিবাহ নারীদের জীবন ধ্বংস করে দেয়। তাই আরও বললেন: “আহা! রাধুর যদি বিয়ে না হত তা হলে কি এত দুঃখ-দুর্দশা হত?” এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার নারীর অকথিত যন্ত্রণা। রাধুর মতো কত মেয়ে যে অকালে বিয়ের বেড়িতে বাঁধা পড়ে জীবনভর কষ্ট ভোগ করেছে!
নারীর দুঃখ-দুর্দশা মা সারদাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি সব সময় নারীশিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতেন। তাঁর দর্শন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, নারীর ভাগ্য বিপর্যয়ের জন্য শুধু ভাগ্যদেবতা বা ভগবানের নামে দোষ দিলে হবে না। নিজেকেই খণ্ডাতে হবে সেই বিধান। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। নিজের অধিকার নিজেকেই ছিনিয়ে আনতে হবে। এই কথা তাঁর কণ্ঠে বারবার উঠে এসেছে। তিনি চাইতেন না নারীরা কেবল সহনশীল থাকুক। তিনি চাইতেন নারীরা হয়ে উঠুক স্বাবলম্বী, শিক্ষিত, আত্মনির্ভরশীল। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই পারে নারীকে প্রকৃত স্বাধীনতা দিতে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই পারে নারীকে পুরুষের করুণার পাত্র থেকে সমান অধিকারের সঙ্গী করে তুলতে। আসলে, মা সারদা ছিলেন জীবন্ত প্রতিবাদের প্রতীক। যে সমাজ নারীকে নীরবে সব সহ্য করতে শেখায়, সেই সমাজেই তিনি প্রমাণ করলেন, নারী নীরব নয়, তিনি প্রতিবাদী। নারী দুর্বল নয়, তিনি শক্তিশালী। সেদিন জয়রামবাটিতে তাঁর সেই ক্রোধ ছিল শুধু একজন মায়ের ক্রোধ নয়, ছিল যুগ যুগান্তরের নির্যাতিত নারীদের সম্মিলিত প্রতিবাদ।

মা সারদা যে তাঁর যুগের থেকে কতটা এগিয়ে, কতটা আধুনিক ছিলেন তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি বহুবার। প্রতিটি মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা তাঁর কাছে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নারী নয়, প্রতিটি মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করতেন। ভগিনী নিবেদিতা তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন এক অসাধারণ কথা: “আমার কাছে তাঁর অধ্যাত্মমহিমার মতোই অপূর্ব ঠেকেছিল তাঁর সম্ভ্রান্ত সৌজন্যের সৌন্দর্য, তাঁর উদার মুক্ত মনের মহিমা।”
এই মুক্ত মনটাই তাঁকে সত্যিকারের আধুনিক করে তুলেছিল। যা আজও আমাদের চিন্তা করতে বাধ্য করে, সত্যিকারের স্বাধীনতা মানে আসলে কী! শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শুধু শিক্ষার অধিকার পেলেই কি প্রকৃত স্বাধীনতা আসে? নাকি যথার্থ শিক্ষা ও স্বাধীনতার খোঁজে আজও আমরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি! আজ মহিলারা শিক্ষা, রাজনীতি ও প্রশাসনের নানা ক্ষেত্রে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত মুক্তি কি এসেছে? এই জাগ্রত নারীজাতি সমগ্র মানবজাতির পরবর্তী বিবর্তনে বিশিষ্ট ভূমিকা নেবে, এই বিশ্বাসে অটল থেকে মা সারদা হয়ে উঠছেন সেই আলোকবর্তিকা, আজও তিনি পথ দেখাচ্ছেন। মা সারদাকে আমরা মিছিল করতে দেখিনি। মিটিং-এ বক্তৃতা দিতে দেখিনি। রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে নারীজাতির শক্তি প্রকাশের দাবি জানাতে দেখিনি। কিন্তু গৃহের কোণে থেকেও কীভাবে তিনি শক্তিরূপিণী মহামায়া হয়ে উঠলেন, তা আজও আমাদের বিস্মিত করে। এখানেই তাঁর মহত্ত্ব। তিনি প্রমাণ করলেন, বিপ্লব শুধু রাস্তায় হয় না, ঘরেও হয়। প্রতিবাদ শুধু স্লোগানে নয়, নীরব দৃঢ়তায়ও প্রকাশ পায়। নারীর শক্তি শুধু প্রকাশ্য মঞ্চে নয়, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেও বিদ্যমান। আর এখানেই তিনি এখনও সমান প্রাসঙ্গিক। যখন আমাদের দেশে আঠারো থেকে একুশে মেয়েদের বিয়ের কথা আইন করে বলার কথা ভাবা হচ্ছে, তখন মা সারদার কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হয়ে ধ্বনিত হয়। তিনি বলে যাচ্ছেন, বিয়ে নয়, মেয়েদের শিক্ষা ও নিজের পায়ের ওপর দাঁড়ানোর স্বাধীনতাই একমাত্র দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

স্বামী বিবেকানন্দ একবার এক চিঠিতে তাঁর গুরুভাইকে লিখেছিলেন: “মা-ঠাকুরণ কী বস্তু বুঝতে পারনি, এখনও কেহই পার না, ক্রমে পারবে। ভায়া, শক্তি বিনা জগতের উদ্ধার হবে না।… মা-ঠাকুরণ ভারতে পুনরায় সেই মহাশক্তি জাগাতে এসেছেন, তাঁকে অবলম্বন করে আবার সব গার্গী মৈত্রেয়ী জগতে জন্মাবে।”
স্বামীজির এই ভাবনা কতটা সঠিক ছিল তা আজ প্রমাণিত। শুধু বাঙালি নয়, শুধু ভারতীয় নয়, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মা এখন বিশ্বজনীন। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান না কেন, দেখবেন তিনি সমস্ত পৃথিবীর মা হয়ে উঠেছেন। আফ্রিকা থেকে আমেরিকা, ইউরোপ থেকে এশিয়া, সর্বত্র তাঁর উপস্থিতি। আর এখানেই তাঁকে নতুন করে জানার প্রয়োজন আজ আরও বেশি। যে সমাজ আজও নারীকে বোঝা মনে করে, যে সমাজ আজও মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, যে সমাজ আজও বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেনি, সেই সমাজের জন্য মা সারদা আজও প্রাসঙ্গিক, আজও প্রয়োজনীয়, আজও পথপ্রদর্শক।

মা সারদা আজও আমাদের শেখান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই প্রকৃত ধর্ম। নারী মুক্তি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি প্রতিটি নারীর মৌলিক অধিকার। শিক্ষা, স্বাবলম্বিতা এবং আত্মমর্যাদা, এই তিনটি স্তম্ভের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে নারী স্বাধীনতার ভিত্তি। মা সারদা সেই ভিত্তি নির্মাণে আজীবন কাজ করে গেছেন। তাঁর জীবন, তাঁর শিক্ষা, তাঁর দর্শন আজও আমাদের পথ দেখায়। আজও যখন কোনও নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন সেখানে মা সারদার সেই অগ্নিশর্মা মূর্তি জেগে ওঠে। আজও যখন কোনো মেয়ে শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করে, তখন সেখানে মায়ের সেই বর্ণপরিচয় পড়ার স্মৃতি জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই ছিলেন মা সারদা, যুগের থেকে এগিয়ে থাকা মহীয়সী, তিনিই প্রমাণ করলেন নারী শক্তিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি শেখালেন, স্বাধীনতা চাইলে তা ছিনিয়ে নিতে হয়, ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না। তিনি দেখালেন, মা হওয়া মানে শুধু সন্তানের প্রতি মমতা নয়, পৃথিবীর সমস্ত নিপীড়িত মানুষের প্রতি মমত্ববোধও। আজ একশো বছরেরও বেশি সময় পরে, মায়ের সেই কণ্ঠস্বর আজও প্রতিধ্বনিত হয়, “এমন কোনও বেটাছেলে কি সেখানে ছিল না, যে দু’চড় দিয়ে মেয়ে দু’টিকে ছাড়িয়ে আনতে পারে?” এই প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক। আজও আমরা খুঁজছি সেই সাহসী মানুষদের, যাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। আজও আমরা স্বপ্ন দেখি সেই সমাজের, যেখানে নারী পাবে তার প্রাপ্য সম্মান, মর্যাদা এবং স্বাধীনতা। মা সারদা সেই স্বপ্নের বীজ বপন করে গিয়েছেন। এখন আমাদের দায়িত্ব সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করা।🍂

তথ্যসূত্র : শতরূপে সারদা | স্বামী লোকেশ্বরানন্দ

 

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন