সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ দক্ষিণ ২৪ পরগণা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর (Baruipur) এলাকায় গণপিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশের ধরপাকড় আরও জোরদার হয়েছে এবং নতুন করে আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে এই মামলায় মোট ধৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল সাত। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, তদন্ত এখনও চলছে এবং প্রয়োজনে আরও গ্রেফতার হতে পারে। মৃত যুবকের নাম ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল (Indrajit Mondal)। বয়স ছিল ৩৫ বছর। অভিযোগ, তাঁকে সন্দেহের বশে গণধোলাই দেওয়া হয়, যার জেরে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশকে তৎপর হতে হয়।
প্রথমে এই ঘটনায় দু’জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। পরে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শুক্রবার রাতে আরও তিন জনকে ধরা হয়। এই পাঁচ জনকেই আদালতের নির্দেশে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। এর মধ্যেই শনিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) বারুইপুর সফরে যান এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। তাঁর সফরের পরেই আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক তৎপরতার দিকটি সামনে আনছে। পুলিশ সূত্রে খবর, এখনও পর্যন্ত গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ফারুক সর্দার (Faruk Sardar), রাজেশ সর্দার (Rajesh Sardar), শরিফুল মল্লিক (Shariful Mallick), সাবিউদ্দীন বৈদ্য (Sabiuddin Baidya), ফরিদ শেখ (Farid Sheikh), আবু সিদ্দিক সর্দার (Abu Siddik Sardar) ও শামিম আলি খান (Shamim Ali Khan)। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী বেআইনি জমায়েত, অশান্তি সৃষ্টি, সরকারি কর্মীর কাজে বাধা দেওয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত ও গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শনিবার নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তিনি জানান, ‘নাম-পরিচয় দেখে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এক জন নিরীহ যুবককে হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয়েছে। যারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের কাউকেই ছাড়া হবে না।’ তাঁর কথায় উঠে আসে, ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনের তরফে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিহতের পরিবারের হাতে ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ইন্দ্রজিতের দাদাকে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের বাসভবন সংস্কারের কাজও করা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি সংবেদনশীল বিষয়। গত রবিবার সূর্যপুর (Suryapur) এলাকায় একটি পুকুর থেকে এক নাবালিকার দেহ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ ওঠে, তাকে গণধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং রেল অবরোধও করা হয়। সেই সময় সন্দেহের বশে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয় বলে অভিযোগ।
নিহতের পরিবারের দাবি, ইন্দ্রজিৎকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে মারধর করা হয়। তিনি তখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। পরে মারধরের জেরে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর থেকেই দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি ওঠে। মুখ্যমন্ত্রীর বারুইপুর সফরের সময় তিনি সূর্যপুর এলাকায় একটি নতুন পুলিশ ফাঁড়ির উদ্বোধন করেন। প্রশাসনের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রুখতে এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে আরও সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। তবে প্রশাসনের দাবি, তদন্ত নিরপেক্ষভাবে চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের একাংশ জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগোচ্ছে। এই গণপিটুনিকাণ্ড আবারও সামনে এনে দিয়েছে জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ না হলে সমাজে ভুল বার্তা যেতে পারে। তাই এই মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার দিকে নজর রয়েছে সকলের। উল্লেখ্য, বর্তমানে বারুইপুর এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে ঘটনাটি যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না। তদন্ত যত এগোবে, ততই সামনে আসতে পারে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Baruipur, Surjapur police outpost | চার দিনেই প্রতিশ্রুতি পূরণ! বারুইপুরে নতুন পুলিশ ফাঁড়ির উদ্বোধনে যাচ্ছেন শুভেন্দু, নির্যাতিতার পরিবারের দাবিতে দ্রুত পদক্ষেপে চর্চা




