সাশ্রয় নিউজ ★ বনগাঁ : উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ মহকুমা আদালতে দেখা গেল এক বিরল দৃশ্য। নাবালিকাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিকবার সহবাসের অভিযোগে গ্রেপ্তার যুবক, পকসো (POCSO) আইনে মামলা, দীর্ঘ চার মাসের আইনি লড়াই, সব কিছুর মাঝেই ঘটনার মোড় ঘুরল নাটকীয়ভাবে। অভিযোগকারিণী কিশোরী ১৮ পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আদালতের সামনে জানালেন, ‘আমি ওকেই বিয়ে করব।’ বিচারকের অনুমতিতে এবং দুই পরিবারের উপস্থিতিতে আদালত চত্বরে সম্পন্ন হল বিয়ে।উল্লেখ্য যে, অভিযুক্ত যুবকের নাম সুরজ মণ্ডল (Suraj Mondal)। তিনি গাইঘাটা থানার সুটিয়া (Sutia, Gaighata)-র বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার মাস আগে এলাকার এক নাবালিকার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ, ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন’ সুরজ। পরে সম্পর্ক অস্বীকার ও ভয় দেখানোর অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এর মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন ওই নাবালিকা। পরিবারের কাছে বিষয়টি জানাজানি হতেই থানায় অভিযোগ দায়ের হয়।
অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সুরজ মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে। পকসো আইনে মামলা রুজু হয় এবং আদালতে তোলা হলে বিচারক জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। তদন্ত, মেডিক্যাল রিপোর্ট, সাক্ষ্যপ্রমাণ সব মিলিয়ে চার মাস কেটে যায়। এই সময়েই নাবালিকা ১৮ বছরে পা দেন। আইনত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাঁর বক্তব্য আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আইনজীবীদের একাংশ জানান, ‘নাবালিকার বয়স ১৮ পূর্ণ হলে তাঁর স্বাধীন মতামত আদালত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে।’ সেই প্রেক্ষিতেই বনগাঁ মহকুমা আদালতে নতুন আবেদন জমা পড়ে। সুরজ মণ্ডলের পরিবার বিয়েতে সম্মতি জানায়। সুরজ নিজেও আদালতকে জানান, ‘আমি বিয়ে করতে রাজি।’ অন্যদিকে তরুণীর সাফ বক্তব্য, ‘আমি ওকেই বিয়ে করব, অন্য কাউকে নয়।’ উভয়পক্ষের আবেদন ও পরিস্থিতির মানবিক দিক বিবেচনা করে বিচারক বিয়ের অনুমতি দেন বলে আদালত সূত্রে খবর। এরপরই নজিরবিহীন দৃশ্য। আদালত চত্বরে আইনজীবীদের উপস্থিতিতে কাবিলনামা পাঠ করে সম্পন্ন হয় বিয়ে। জেল হেফাজত থেকে সোজা আদালতে এসে সুরজ মণ্ডল বিয়ের আসরে বসেন। উপস্থিত ছিলেন দুই পরিবারের সদস্যরাও। আদালত প্রাঙ্গণে চার হাত এক হওয়ার এই ঘটনা স্থানীয় মহলে ব্যাপক চর্চার জন্ম দিয়েছে।
তবে আইনি দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পকসো আইন (Protection of Children from Sexual Offences Act) অনুযায়ী, নাবালিকার সম্মতি আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে অভিযোগের সময় তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকায় মামলা রুজু হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বিয়ের সিদ্ধান্ত পকসো মামলার প্রভাব সম্পূর্ণ মুছে দেয় না। বিচার প্রক্রিয়া আলাদা বিষয়।’ যদিও আদালত মানবিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিয়ের অনুমতি দিয়েছে, মামলার ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে এখনও জল্পনা রয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্য, ‘ঘটনাটা শুরু হয়েছিল গুরুতর অভিযোগ দিয়ে, কিন্তু শেষটা হল বিয়েতে।’ কেউ কেউ বলছেন, এটি ‘সমঝোতার পথ’; আবার অনেকে মনে করছেন, ‘নাবালিকা অবস্থায় সম্পর্ক ও গর্ভধারণের মতো বিষয় সমাজে সচেতনতার অভাবের দিকেই ইঙ্গিত করে।’ সামাজিক মাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ‘কৈশোরে আবেগের তীব্রতা বেশি থাকে। পরিবার ও সমাজের সঠিক দিশা না পেলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।’ একই সঙ্গে তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ব্যক্তির সিদ্ধান্তকে সম্মান করাও গণতান্ত্রিক সমাজের অংশ। তবে আইন ও নৈতিকতার ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। পুলিশ সূত্রে খবর, মামলার নথিপত্র আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানার এক আধিকারিক বলেন, ‘আইন অনুযায়ী যা করণীয়, তা করা হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালতের।’
বনগাঁ (Bangaon) মহকুমা আদালতের এই ঘটনা রাজ্যে পকসো মামলা, নাবালিকা সুরক্ষা ও বাল্যবিবাহ প্রসঙ্গে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘আইনের উদ্দেশ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নাবালিকা অবস্থায় অভিযোগ, গ্রেপ্তার, জেল হেফাজত, চার মাসের আইনি টানাপোড়েন, শেষ পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আদালতের অনুমতিতে বিয়ে। বনগাঁ আদালতের এই অধ্যায় রাজ্যের সাম্প্রতিক আইনি ঘটনাপ্রবাহে এক ব্যতিক্রমী নজির হয়ে রইল।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Saif Ali Khan, Amrita Singh, Saif Amrita wedding | সইফ আলি খান ও অমৃতা সিংয়ের বিয়ে কীভাবে হয়েছিল!


