সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলম্বো : ক্রিকেট মাঠে যাঁর নেতৃত্বে ইতিহাস লিখেছিল শ্রীলঙ্কা, সেই বিশ্বজয়ী অধিনায়ক আজ দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত। ১৯৯৬ সালের এক দিনের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কাকে চ্যাম্পিয়ন করে তোলা অর্জুন রণতুঙ্গা (Arjuna Ranatunga) এখন জেলযাত্রার মুখে। প্রায় ৪৫ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছে শ্রীলঙ্কার দুর্নীতি দমন তদন্ত কমিশন। বর্তমানে তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন। তবে কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রণতুঙ্গা দেশে ফিরলেই তাঁকে গ্রেফতার করা হবে।ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে অর্জুন রণতুঙ্গা শুধু একজন সফল অধিনায়কই নন, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার অন্যতম কারিগর। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৯৬ সালে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা আয়োজিত বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ট্রফি জিতেছিল লঙ্কানরা। সেটাই এখনও পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার একমাত্র ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ জয়। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের প্রায় তিন দশক পর আজ সেই অধিনায়কই দুর্নীতির দাগে কলঙ্কিত।
ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে পা রাখেন রণতুঙ্গা। তিনি শ্রীলঙ্কার পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলেছিলেন। সেই সময়েই তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। অভিযোগ ছিল, অর্থের বিনিময়ে একাধিক বেসরকারি সংস্থাকে বেআইনি ভাবে পেট্রোলিয়াম সংক্রান্ত বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্তের পর সেই অভিযোগই সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী থাকাকালীন রণতুঙ্গা ২৭টি সংস্থাকে বেআইনি ভাবে কাজের বরাত দেন। এর বিনিময়ে তিনি মোট প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন বলে কমিশনের দাবি। এই দুর্নীতিতে তাঁর সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর দাদা ধাম্মিকা রণতুঙ্গারুও (Dhammika Ranatunga)। সূত্রের খবর, ধাম্মিকা রণতুঙ্গা সেই সময় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। কমিশনের মতে, দুই ভাই মিলেই পুরো দুর্নীতির ছক কষেছিলেন। সোমবার ধাম্মিকাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে অবশ্য তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে তাঁর শ্রীলঙ্কা ও আমেরিকার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার কারণে আদালত নির্দেশ দিয়েছে, তিনি যেন দেশ ছাড়তে না পারেন।
কলম্বোর ম্যাজিস্ট্রেট আসাঙ্গা বোদারাগামাকে (Asanga Bodaragama) দুর্নীতি দমন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, অর্জুন রণতুঙ্গা দেশে ফিরলেই তাঁকে গ্রেফতার করা হবে। তদন্তকারীদের মতে, প্রমাণ এতটাই শক্ত যে তাঁকে গ্রেফতার না করার কোনও সুযোগ নেই। কমিশনের এক আধিকারিক জানান, ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তিনি যত বড় নামই হোন না কেন, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি পেতেই হবে।’ এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুরা কুমার দিশানায়েক (Anura Kumara Dissanayake) ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। ক্ষমতায় এসেই তিনি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করেন। সেই কমিশনই দীর্ঘ তদন্ত শেষে রণতুঙ্গাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
শুধু অর্জুন বা ধাম্মিকা নন, রণতুঙ্গা পরিবারের অন্য সদস্যরাও এখন আইনি জটিলতায়। অর্জুনের ভাই প্রসন্ন রণতুঙ্গা (Prasanna Ranatunga), শ্রীলঙ্কার প্রাক্তন পর্যটনমন্ত্রী ছিলেন, তাকেও গত মাসে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় স্পষ্ট, শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রশাসন প্রাক্তন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পিছপা হচ্ছে না।
অন্যদিকে, এই রায়ের পর শ্রীলঙ্কার ক্রীড়ামহল ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, ‘বিশ্বজয়ী অধিনায়ক’ হিসেবে রণতুঙ্গার অবদান অনস্বীকার্য, কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্য কখনও আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এই ঘটনা শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে দুর্নীতির গভীর শিকড়কে আরও একবার সামনে এনে দিল। উল্লেখ্য যে, ক্রিকেট ইতিহাসে রণতুঙ্গার নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু সেই সোনালি অধ্যায়ের পাশে এখন যুক্ত হল এক কালো অধ্যায়। দেশে ফিরলেই গ্রেফতার, এই খবর শুধু শ্রীলঙ্কাতেই নয়, গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায় নতুন করে আলোড়ন ফেলেছে। বিশ্বজয়ের নায়ক থেকে দুর্নীতির আসামি, অর্জুন রণতুঙ্গার এই পতন নিঃসন্দেহে শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে থাকল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : H-1B visa fee hike, Trump H-1B policy | এইচ-১বি ভিসা নিয়ে ট্রাম্পের অস্বস্তি! ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আদালতে ২০টি মার্কিন প্রদেশ, প্রশ্নের মুখে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি!




