সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ওয়েলিংটন : ওয়েলিংটনের মাঠে ব্যাট হাতে ঝড় তুলে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একের পর এক রেকর্ড গড়লেন অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma)। নিউজিল্যান্ডের (New Zealand) বিরুদ্ধে মাত্র ৩৫ বলে শতরান পূর্ণ করে ভারতীয় ব্যাটারের এই বিধ্বংসী ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর কেড়েছে। শেষ পর্যন্ত ৩৮ বলে ১১৩ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ৯টি চার এবং ১১টি ছক্কা। প্রতিপক্ষের বোলারদের কার্যত দিশাহারা করে দেওয়া এই ব্যাটিংয়ে শুধু দলের রান বাড়ানোই নয়, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়েও নিজের নাম তুলে নিয়েছেন ভারতীয় ওপেনার। তাঁর এমন আগ্রাসী মেজাজ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন ভারতীয় দলের অধিনায়ক শ্রেয়াস আয়ার (Shreyas Iyer)। দ্রুত রান তোলার দক্ষতা, বড় শট খেলার ক্ষমতা আর অল্প সময়ের মধ্যে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়ার সামর্থ্য, অভিষেকের ইনিংসে ধরা পড়েছে এই তিনটি দিকই। তাঁর ৩৮ বলের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পাঁচটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড, যা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাঁর ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের পরিচয় দিচ্ছে।
অভিষেকের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক, দ্রুত শতরান করার ক্ষেত্রে তিনি ক্রমাগত নিজের নজিরকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এই নিয়ে তৃতীয় বার ৪০ বা তার কম বলে শতরান করলেন তিনি। গত মাসে দিল্লিতে আফগানিস্তানের (Afghanistan) বিরুদ্ধে মাত্র ৩০ বলে তিন অঙ্কের রান ছুঁয়েছিলেন ভারতীয় ব্যাটার। তার আগে ইংল্যান্ডের (England) বিরুদ্ধেও ৩৭ বলে শতরান করেছিলেন তিনি। এবার নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩৫ বলে শতরান করে নিজের রেকর্ডের তালিকায় আরও একটি স্মরণীয় ইনিংস যোগ করলেন। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ৪০ বা তার কম বলে একাধিক শতরান করার ক্ষেত্রে অভিষেকের কৃতিত্ব ইতিমধ্যেই তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। অন্য কোনও ব্যাটার এই নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে দু’বারও শতরান করতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ৩৫ বা তার কম বলে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি শতরান করার ক্ষেত্রেও বিশ্বের প্রথম ক্রিকেটার হওয়ার নজির গড়েছেন। শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই নয়, সব ধরনের টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতাতেও অভিষেকের দ্রুত শতরানের ধারাবাহিকতা নজরকাড়া। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই ইনিংসের ফলে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে চার বার ৩৫ বা তার কম বলে শতরান করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। এই মাপকাঠিতে বিশ্বের আর কোনও ক্রিকেটারের এমন রেকর্ড নেই। ভারতের তরুণ ক্রিকেটার বৈভব সূর্যবংশী (Vaibhav Suryavanshi) এবং উর্ভিল পাটেলও (Urvil Patel) দ্রুত শতরানের জন্য পরিচিত। তবে তাঁদের দু’জনেরই ৩৫ বা তার কম বলে শতরান করার রেকর্ড আছে দু’বার করে। অভিষেকের কৃতিত্ব সেখানে চার বার। ফলে দ্রুততম শতরানের ক্ষেত্রে শুধু আন্তর্জাতিক মঞ্চেই নয়, সামগ্রিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও নিজের অবস্থান আরও মজবুত করেছেন।
৪০ বা তার কম বলে শতরানের হিসাব ধরলেও অভিষেকের ধারাবাহিকতা চোখে পড়ার মতো। এই নিয়ে পাঁচ বার এমন দ্রুত শতরান করলেন তিনি। বৈভব সূর্যবংশী ও উর্ভিল পটেলের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা তিন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার জন্য ব্যাটারদের অনেক সময় ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু সেই ঝুঁকিকে কাজে লাগিয়ে বড় রান করার ক্ষমতাই অভিষেককে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রাখছে। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর ৩৮ বলে ১১৩ রানের ইনিংসেও দেখা গিয়েছে, শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে বোলারদের উপরে তিনি চাপ তৈরি করেছেন। একবার ছন্দ পেয়ে যাওয়ার পর চার ও ছক্কার সাহায্যে দ্রুত রান তুলেছেন। ফলে প্রতিপক্ষের বোলিং পরিকল্পনা কার্যকর করার সুযোগ ক্রমশ কমে এসেছে।
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্রুততম টি-টোয়েন্টি শতরানের রেকর্ডও এবার নিজের দখলে নিয়েছেন অভিষেক। এর আগে এই রেকর্ড ছিল শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka) কুশল পেরেরার (Kusal Perera)। ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪৪ বলে শতরান করেছিলেন তিনি। অভিষেক সেই নজির ভেঙে ৩৫ বলেই শতরান পূর্ণ করেন। শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পুরনো রেকর্ড নয়, এই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভারতীয় ব্যাটারদেরও দ্রুততম শতরানের রেকর্ডও ভেঙেছেন। গত জানুয়ারিতে তিরুঅনন্তপুরমে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪২ বলে শতরান করেছিলেন ঈশান কিশান (Ishan Kishan)। এবার তাঁর সতীর্থ অভিষেক সেই সময়কে আরও কমিয়ে এনে নতুন নজির গড়লেন। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪০ বা তার কম বলে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি শতরান করার কৃতিত্বও প্রথম বার দেখা গেল তাঁর ব্যাটে। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এমন দ্রুত শতরান যে কোনও ব্যাটারের কাছেই বড় সাফল্য, আর অভিষেকের ক্ষেত্রে তা এসেছে একাধিক রেকর্ডের সঙ্গে।
এই ইনিংসের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, অল্প বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করার অসাধারণ দক্ষতা। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১৫ বা তার কম বলে তিন বার অর্ধশতরান করার নজির গড়েছেন অভিষেক। বিশ্বের আর কোনও ক্রিকেটার এই নির্দিষ্ট কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেননি বলে দাবি করা হয়েছে বিভিন্ন সূত্রে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অর্ধশতরান করতে সাধারণত ব্যাটারদের কিছুটা সময় নিতে হয়। কিন্তু অভিষেকের ব্যাটিংয়ের ধরন অনেকটাই আলাদা। তিনি শুরু থেকেই বড় শট খেলতে পারেন ও ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে দ্রুত রান তুলতে পারেন। ফলে পাওয়ার প্লে-র মধ্যেই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর এই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দলের জন্যও মূল্যবান, কারণ অল্প সময়ের মধ্যে বড় রান তুলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া সম্ভব হয়। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১১৩ রানের ইনিংসে অভিষেকের ছক্কা মারার ক্ষমতাও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। ৩৮ বলের মধ্যে তিনি ১১টি ছক্কা হাঁকান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একটি ইনিংসে ১০ বা তার বেশি ছক্কা মারার কৃতিত্ব এই নিয়ে তৃতীয় বার অর্জন করলেন ভারতীয় ব্যাটার। টেস্ট খেলিয়ে দেশগুলির ক্রিকেটারদের মধ্যে এই নজির বিরল। অস্ট্রেলিয়ার (Australia) অ্যারন ফিঞ্চ (Aaron Finch) এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের (West Indies) ক্রিস গেল (Chris Gayle) দু’বার করে একটি টি-টোয়েন্টি ইনিংসে অন্তত ১০টি ছক্কা মেরেছেন। অভিষেক তাঁদের সেই সংখ্যাকে ছাপিয়ে তিন বার এই কৃতিত্ব অর্জন করলেন। অবশ্য সব দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে এই বিভাগে সর্বোচ্চ রেকর্ড আছে মালয়েশিয়ার (Malaysia) করণবীর সিং-এর (Karanbir Singh)। তিনি পাঁচটি টি-টোয়েন্টি ইনিংসে অন্তত ১০টি করে ছক্কা মেরেছেন। ফলে অভিষেকের সামনে এই বিভাগেও ভবিষ্যতে নিজের রেকর্ড আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকছে।
৩৫ বলে শতরান এবং ৩৮ বলে ১১৩ রান, এই দুই পরিসংখ্যানই অভিষেকের ইনিংসের বিস্ফোরক চরিত্র তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। তবে শুধু দ্রুত রান বা ছক্কার সংখ্যা দিয়ে এই ব্যাটিংয়ের গুরুত্ব বিচার করলে ছবির একটা অংশই দেখা হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক ভাবে এমন আগ্রাসী ইনিংস খেলার জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং বোলারদের পরিকল্পনা বুঝে পাল্টা আক্রমণ করার দক্ষতা। অভিষেকের ইনিংসে সেই দিকগুলিও সামনে এসেছে। একই ম্যাচে দ্রুত শতরান, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নতুন নজির ও এক ইনিংসে প্রচুর ছক্কা সব মিলিয়ে তাঁর ব্যাটিং হয়ে উঠেছে রেকর্ডের ভান্ডার। ভারতীয় দলের হয়ে তাঁর এই পারফরম্যান্স আগামী ম্যাচগুলিতেও প্রত্যাশা বাড়াবে। তবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে প্রতিটি ম্যাচে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও জরুরি। আপাতত নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই বিধ্বংসী ইনিংসের সুবাদে অভিষেক শর্মা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির আলোচনায় নিজের জায়গা আরও পোক্ত করে নিলেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rohit Sharma captain IPL 2026 | আইপিএল ২০২৬-এ বড় ধাক্কা: কোহলিদের বিরুদ্ধে মুম্বাইয়ের অধিনায়ক কে? রোহিত শর্মা কি ফের নেতৃত্বে ফিরছেন!



