বিনীত শর্মা, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক বিধি মানা নিয়ে ফের তীব্র প্রশ্ন তুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে বুধবার সরাসরি নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সামনে আপত্তি জানান তিনি। প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠকে অভিষেক-সহ তৃণমূলের মোট ১০ জন সাংসদ অংশ নেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিক বৈঠক করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও পদ্ধতি নিয়ে একের পর এক বিস্ফোরক প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল নেতা।
অভিষেকের মূল অভিযোগ, এসআইআর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা কোনও লিখিত নোটিস বা সরকারি সার্কুলার আকারে না দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জারি করতে পারে? সাংবাদিকদের সামনে অভিষেক বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছে। একটি সরকারি নির্দেশ কীভাবে হোয়াটসঅ্যাপে আসতে পারে?’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তৃণমূল সাংসদের আরও প্রশ্ন, কেন্দ্রীয় সরকার বা নির্বাচন কমিশন কি ভবিষ্যতে দেশের রাজ্য ও শহরগুলিকে হোয়াটসঅ্যাপেই চালাতে চাইছে? কোনও ফরম্যাল নোটিস, গেজেট নোটিফিকেশন বা লিখিত নির্দেশিকা ছাড়াই যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, তবে তার আইনি বৈধতা কোথায়? এই প্রশ্নই তুলেছেন অভিষেক। তাঁর দাবি, কমিশনের তরফে নোটিফিকেশন জারি করতে সমস্যা কোথায়, সেটাই আসল প্রশ্ন। কারণ লিখিত নোটিস হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সাংবিধানিক অধিকার থাকে তা আইনি ভাবে চ্যালেঞ্জ করার।
অভিষেকের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃতই নোটিফিকেশন দিচ্ছে না। কারণ নোটিফিকেশন হলে কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসলে ওরা যদি নোটিফিকেশন দেয়, তাহলে দেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের অধিকার রয়েছে, সেটাকে চ্যালেঞ্জ করার।’ তাঁর আরও অভিযোগ, কমিশন কিছু বিষয় আড়াল করতেই এই পথ বেছে নিয়েছে। উল্লেখ্য যে, এসআইআর-এর প্রথম পর্যায় থেকেই বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-দের (BLO) মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, একের পর এক নতুন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করে কমিশনের তরফে নির্দেশ পাঠানো হচ্ছে। কোনও নির্দিষ্ট লিখিত গাইডলাইন নেই, নেই অফিসিয়াল নোটিস। ফলে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত বিএলও-রাও বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এসআইআর পর্ব প্রায় শেষের দিকে পৌঁছলেও এখনও পর্যন্ত সমস্ত নির্দেশিকা শুধুমাত্র হোয়াটসঅ্যাপেই দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের।
এই পরিস্থিতিকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করে অভিষেক বলেন, এর মাধ্যমে ভোটার তালিকায় কারসাজির রাস্তা তৈরি হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘ব্যাক এন্ডে নাম ডিলিট করা হচ্ছে।’ অর্থাৎ, ভোটার তালিকার আড়ালে এমন কিছু পরিবর্তন হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অভিষেকের দাবি, এভাবেই আসলে ভোট চুরি হচ্ছে, ব্যালট বাক্সে নয়, ভোটার তালিকাতেই।তৃণমূল নেতা স্পষ্ট করে দেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে তাঁদের প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংবিধানিক। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা গণতন্ত্রের ভিত্তি। সেখানে যদি নির্দেশ জারির মতো মৌলিক বিষয়েও স্বচ্ছতা না থাকে, তবে মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পদক্ষেপ লিখিত ভাবে, আইনি কাঠামোর মধ্যে হওয়া উচিত।
সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক আরও জানান, বৈঠকে তাঁরা নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) -এর কাছেও এই প্রশ্নগুলি সরাসরি তুলেছেন। কেন হোয়াটসঅ্যাপের মতো একটি অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমকে সরকারি নির্দেশের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কোনও সন্তোষজনক উত্তর তাঁরা পাননি বলেও তিনি দাবি করেন।
রাজনৈতিক সমালোচকদের মতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অভিযোগ শুধু তৃণমূলের রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বৃহত্তর নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে যখন ডিজিটাল মাধ্যমে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, ডেটা নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে, তখন হোয়াটসঅ্যাপে সরকারি নির্দেশ পাঠানোর অভিযোগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অভিষেকের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি সত্যিই নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকে, তবে তাদের কোনও কিছু লুকোনোর প্রয়োজন নেই। লিখিত নোটিস, সার্কুলার ও নোটিফিকেশন প্রকাশ্যে আনলেই সমস্ত সন্দেহ দূর হতে পারে। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে হোয়াটসঅ্যাপ নির্ভর নির্দেশিকা চালু রাখার অর্থই হল, কোনও না কোনও বিষয় আড়ালে রাখার চেষ্টা।অন্যদিকে, এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের এই আক্রমণ আগামী দিনে আরও রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়াবে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। ভোটার তালিকা থেকে গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা, সব কিছুই যে একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তা নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Humayun Kabir, Mamata Abhishek Rift | ব্রিগেডের লক্ষভিড়ের ডাক দিয়ে মমতা-অভিষেক ফাটলের বার্তা? হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক কৌশলে নতুন সমীকরণ




