সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বিশ্ব ফুটবলের আকাশে বর্ণময় অধ্যায়ের সমাপ্তি হল। পর্তুগালের জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে (Cristiano Ronaldo)। দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে অসংখ্য রেকর্ড, স্মরণীয় গোল ও একাধিক আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের সাক্ষী থেকেছে ফুটবলবিশ্ব। এবার সেই যাত্রায় দাঁড়ি টানার সিদ্ধান্ত নিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। বৃহস্পতিবার সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি আবেগঘন ভিডিয়োর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের কথা জানিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই তারকা। তাঁর এই ঘোষণায় স্বাভাবিকভাবেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী। কারণ, পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সির সঙ্গে রোনাল্ডোর নাম এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে, তাঁকে ছাড়া জাতীয় দলকে কল্পনা করাই কঠিন। ২০০৩ সালে পর্তুগালের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল রোনাল্ডোর। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।
প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলার হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিশ্চিনো রোনাল্ডো হয়ে উঠেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। গোল করার ক্ষমতা, অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা, গতিময় ফুটবল এবং কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ পথচলায় কখনও তাঁকে দেখা গিয়েছে তরুণ প্রতিভা হিসেবে, কখনও দলের অধিনায়ক হিসেবে, আবার কখনও দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্যের নায়ক হিসেবে। নিজের অবসরের সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি রোনাল্ডো। তাঁর কথায়, জাতীয় দলের হয়ে খেলার অধ্যায় শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। এত বছর ধরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা তাঁর জীবনের অন্যতম মূল্যবান অভিজ্ঞতা। পর্তুগালের জার্সি গায়ে মাঠে নামার মধ্যে যে গর্ব ও দায়িত্ববোধ রয়েছে, তা অন্য কোনও কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। দেশের সমর্থকদের ভালোবাসা, সতীর্থদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাওয়া সাফল্য চিরকাল তাঁর স্মৃতিতে থেকে যাবে।
বিদায় ঘোষণা করতে গিয়ে রোনাল্ডো জানিয়েছেন, ২৩ বছর ধরে পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি পরার সুযোগ পাওয়া তাঁর কাছে বিরাট সম্মানের। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারা তাঁর জীবনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল দেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে গেলেও পর্তুগালের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কোনও দিন কমবে না। জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার সুযোগ না থাকলেও দেশের ফুটবলের সঙ্গে তাঁর আবেগের সম্পর্ক অটুট থাকবে। রোনাল্ডোর অবসরের ঘোষণার আগে অবশ্য পর্তুগাল শিবিরে কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কোচ জর্জ জেসুসের (Jorge Jesus) সঙ্গে মতবিরোধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। গত সেপ্টেম্বরে প্রশিক্ষণ শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও সেই বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। নেশনস লিগে নরওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রথম একাদশে জায়গা পাননি রোনাল্ডো। শুধু তাই নয়, পরিবর্ত ফুটবলার হিসেবেও তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি।
এই ঘটনা নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন পর্তুগালের অধিনায়ক। তাঁর দাবি ছিল, ম্যাচে অন্তত ৩০ মিনিট খেলার সুযোগ দেওয়ার কথা তাঁকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কোচ সেই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। রোনাল্ডোর কাছে বিষয়টি ছিল আস্থার সম্পর্কের অবনতি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে দেওয়া আশ্বাস থেকে সরে আসায় তিনি হতাশ হয়েছিলেন। অন্যদিকে কোচ জর্জ জেসুস জানিয়েছিলেন, দলের স্বার্থে কাকে খেলানো হবে, কতক্ষণ খেলানো হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণ তাঁর। পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও পরে নিজের আচরণের জন্য সতীর্থ ও সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন রোনাল্ডো। জাতীয় দলের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা নিয়েও কোনও প্রশ্ন তুলতে চাননি তিনি। ফলে সেই ঘটনার পরেও তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার অব্যাহত থাকবে বলে অনেকে মনে করেছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে অবসরের ঘোষণা ফুটবলমহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোচের সঙ্গে সাম্প্রতিক মতবিরোধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনও নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পর্তুগালের হয়ে রোনাল্ডোর পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর অবদান কতটা অসাধারণ। ২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের (Kazakhstan) বিরুদ্ধে প্রথমবার তিনি দেশের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন। তারপর থেকে ২৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন ১৪৬টি গোল। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার পাশাপাশি সর্বোচ্চ গোলদাতার বিশ্বরেকর্ডও তাঁর দখলে। এই দুটি নজিরই তাঁকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
রোনাল্ডোর কেরিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্যগুলির মধ্যে অন্যতম ২০১৬ সালের ইউরো কাপ (UEFA Euro 2016) জয়। ফ্রান্সের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতায় প্রথমবার ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পর্তুগাল। ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচের শুরুতেই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল রোনাল্ডোকে। কিন্তু মাঠের বাইরে থেকেও অধিনায়ক হিসেবে সতীর্থদের উৎসাহ জুগিয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে গোল করে পর্তুগালকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন এদের (Eder)। দেশের ফুটবল ইতিহাসে সেই রাত আজও স্মরণীয়। এরপরও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে পর্তুগাল। ২০১৯ সালে উয়েফা নেশনস লিগ (UEFA Nations League) জেতে দলটি। ২০২৫ সালেও সেই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় পর্তুগাল। নেতৃত্বের পাশাপাশি গোল করে দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন রোনাল্ডো। তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ব্যক্তিগত সাফল্য এবং দলগত অর্জনের এক অসাধারণ সমন্বয় দেখা গিয়েছে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) ঘিরেও রোনাল্ডোকে নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ ছিল যথেষ্ট। ছয়টি আলাদা বিশ্বকাপে গোল করার নজির গড়ে ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি প্রতিবারই নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বয়স বাড়লেও গোল করার ক্ষুধা ও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে টিকে থাকার ইচ্ছা কমেনি এই তারকার। তবে জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ করার সিদ্ধান্তের ফলে পর্তুগালের হয়ে আর কোনও বিশ্বকাপ বা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাঁকে দেখা যাবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক, ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও ক্লাব ফুটবলে এখনই বুটজোড়া তুলে রাখছেন না রোনাল্ডো। সৌদি আরবের আল নাসর (Al Nassr) ক্লাবের হয়ে এখনও খেলছেন তিনি। ক্লাব পর্যায়ে আরও কিছু সময় নিজের সেরাটা দেওয়ার পাশাপাশি কেরিয়ারে তাঁর ১০০০ গোলের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্য। ইতিমধ্যেই ক্লাব এবং জাতীয় দল মিলিয়ে অসংখ্য গোল করেছেন। ফলে আগামী দিনে তাঁর প্রতিটি ম্যাচ এবং প্রতিটি গোলের দিকে নজর থাকবে ফুটবলবিশ্বের।
রোনাল্ডোর আন্তর্জাতিক অবসরের ফলে পর্তুগাল জাতীয় দলের সামনে এখন নতুন অধ্যায় শুরু করার চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলের আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা ছিলেন। গোলের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করা, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং কঠিন মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বও সামলেছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে দলের আক্রমণভাগে নেতৃত্ব এবং গোল করার দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজন তৈরি হবে। পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে রোনাল্ডোর অবদান শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। তাঁর হাত ধরেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশটি এক নতুন পরিচিতি পেয়েছে। যে দল একসময় বড় প্রতিযোগিতায় সাফল্যের অপেক্ষায় থাকত, সেই দলই ইউরোপের সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। রোনাল্ডোর নেতৃত্বে পর্তুগালের ফুটবল সংস্কৃতিতেও এসেছে পরিবর্তন। তাঁর অসাধারণ পেশাদারত্ব, দীর্ঘদিন ধরে নিজের ফিটনেস ধরে রাখা ও প্রতিটি ম্যাচে জয়ের জন্য লড়াই করার মানসিকতা তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখবে।
২৩ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে বহুবার সমালোচনার মুখে পড়েছেন রোনাল্ডো। কখনও মাঠের পারফরম্যান্স, কখনও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আবার কখনও দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল এবং ম্যাচ খেলার রেকর্ড তাঁর দীর্ঘ অধ্যবসায়েরই ফল। পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি এবার অন্য কোনও ফুটবলারের গায়ে উঠবে। নতুন অধিনায়ক, নতুন প্রজন্ম ও নতুন লক্ষ্য নিয়ে এগোবে দল। কিন্তু রোনাল্ডোর তৈরি করা ইতিহাস সহজে অতিক্রম করা সম্ভব হবে না। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর শেষ ম্যাচ কবে, সেই স্মৃতি ও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে শেষ বিদায়ের মুহূর্ত ফুটবলপ্রেমীদের কাছে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে। দেশের হয়ে আর মাঠে না নামলেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল দিক হিসেবেই থেকে যাবে।
ছবি; সংগৃহীত
আরও পড়ুন Rohit Sharma Virat Kohli India Win Against New Zealand | রোহিতের বুদ্ধিতে ভাঙল কিউয়ি জুটি, কোহলির ব্যাটে জয়! ‘রো-কো’র প্রশংসায় পঞ্চমুখ শুভমন



