সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ পুণে: মাত্র ১৪ বল। তার মধ্যেই ব্যাট থেকে এল অর্ধশতরান। মহিলাদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নজির গড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন ভারতের প্রেমা রাওয়াত (Prema Rawat)। মহিলাদের সিনিয়র টি-টোয়েন্টি ট্রফিতে উত্তরাখণ্ডের হয়ে হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী ব্যাটিং করে নতুন রেকর্ড গড়লেন তিনি। এত দিন মহিলাদের টি-টোয়েন্টিতে দ্রুততম অর্ধশতরানের রেকর্ড ছিল পাকিস্তানের অধিনায়ক ফাতিমা সানার (Fatima Sana) দখলে। ১৫ বলে পঞ্চাশ করেছিলেন পাক ক্রিকেটার। এক বল কম খেলে সেই নজির নিজের নামে করে নিলেন প্রেমা। লেগ স্পিনার হিসেবে পরিচিত এই ভারতীয় ক্রিকেটারের ব্যাটিংয়ের এমন বিস্ফোরক রূপ ঘরোয়া ক্রিকেটের মঞ্চে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি পুণেতে উত্তরাখণ্ড ও হায়দরাবাদের ম্যাচে এই কীর্তি গড়েন প্রেমা। দলের হয়ে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই তিনি আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন । প্রতিপক্ষের বোলারদের উপর কার্যত ঝড় বইয়ে দেন এই ভারতীয় ক্রিকেটার। মাত্র ১৪ বলেই ৫০ রানের গণ্ডি পার করে যান। শেষ পর্যন্ত ১৪ বলে ৫০ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল ৩৫৭.১৪। ইনিংসে ছ’টি চার এবং চারটি ছক্কা হাঁকান প্রেমা। অর্থাৎ, তাঁর অর্ধশতরানের ৫০ রানের মধ্যে ৪৮ রানই এসেছে বাউন্ডারি থেকে। এমন বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে প্রতিপক্ষের বোলারদের কার্যত তিনি কোনও সুযোগ দেননি। মহিলাদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুততম অর্ধশতরানের তালিকায় এবার সবার উপরে উঠে এল প্রেমার নাম। এর আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন পাকিস্তানের ফাতিমা সানা। চলতি বছরের মে মাসে করাচিতে জিম্বাবোয়ের (Zimbabwe) বিরুদ্ধে মাত্র ১৫ বলে অর্ধশতরান করেছিলেন তিনি। তাঁর সেই ইনিংস তখন আন্তর্জাতিক মহিলাদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুততম পঞ্চাশের নজির হিসেবে আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু প্রেমা ১৪ বলে অর্ধশতরান করে সেই সময়সীমাকে আরও এক ধাপ কমিয়ে দিলেন।
ফাতিমার আগে এই রেকর্ডের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একাধিক পরিচিত নাম। নিউজ়িল্যান্ডের সোফি ডিভাইন (Sophie Devine), অস্ট্রেলিয়ার ফিবি লিচফিল্ড (Phoebe Litchfield) এবং ভারতের রিচা ঘোষ (Richa Ghosh) তিন জনই ১৮ বলে অর্ধশতরান করেছিলেন। তাঁদের কৃতিত্ব দীর্ঘদিন ধরে মহিলাদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দ্রুততম অর্ধশতরানের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছিল। পরে ফাতিমা ১৫ বলে পঞ্চাশ করে সেই তালিকায় নতুন মাপকাঠি তৈরি করেন। এবার প্রেমার ১৪ বলের ইনিংস সেই নজিরকেও পিছনে ফেলে দিল।
প্রেমার এই সাফল্যের গুরুত্ব শুধু একটি রেকর্ড ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মূলত লেগ স্পিনার। বল হাতে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করাই তাঁর পরিচিতি। কিন্তু পুণের ম্যাচে ব্যাট হাতে যে আগ্রাসন দেখালেন, তাতে তাঁর অলরাউন্ড দক্ষতার দিকটিও নতুন করে সামনে এসেছে। সাধারণত দলের বোলিং আক্রমণে দায়িত্ব সামলানো ক্রিকেটারদের কাছ থেকে এমন বিধ্বংসী ব্যাটিং খুব বেশি দেখা যায় না। ফলে প্রেমার এই ইনিংস তাঁকে ঘরোয়া ক্রিকেটের আলোচনায় আলাদা জায়গা করে দিয়েছে। চলতি বছরই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের হয়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক হয়েছে প্রেমার। এখনও পর্যন্ত দেশের জার্সিতে সাতটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার তিনি সুযোগ পেয়েছেন। জাতীয় দলে তাঁর অন্তর্ভুক্তির পিছনে ছিল ঘরোয়া ক্রিকেট ও ভারতীয় ‘এ’ দলের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স। বিশেষ করে বল হাতে তাঁর সাফল্য নির্বাচকদের নজর কেড়েছিল। এবার ব্যাট হাতেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন উত্তরাখণ্ডের এই ক্রিকেটার।
চলতি বছরের মহিলাদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ভারতীয় দলে জায়গা পেয়েছিলেন প্রেমা। শ্রেয়াঙ্কা পাটিল (Shreyanka Patil) চোটের কারণে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যাওয়ায় তাঁর পরিবর্ত হিসেবে দলে নেওয়া হয়েছিল প্রেমাকে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে সুযোগ পাওয়া তাঁর কেরিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যদিও জাতীয় দলে জায়গা পাকা করতে হলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখা প্রয়োজন, তবু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর খেলার উন্নতি নজর কেড়েছে। এর আগেও ভারতীয় ‘এ’ দলের হয়ে একাধিক প্রতিযোগিতায় নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন প্রেমা। মহিলাদের এশিয়া কাপ রাইজ়িং স্টার প্রতিযোগিতায় পাঁচটি ম্যাচ খেলে আটটি উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। বল হাতে তাঁর কার্যকারিতা দলকে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভারতীয় ‘এ’ দলের হয়ে তিনটি ম্যাচে সাতটি উইকেট সংগ্রহ করেছিলেন এই লেগ স্পিনার। বিদেশের মাটিতে এমন পারফরম্যান্স তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় দলের দরজাও খুলে দিয়েছিল।
মহিলাদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে প্রেমার বোলিংও নজর কেড়েছিল। সেই ম্যাচে মাত্র ৯ রান দিয়ে তিনটি উইকেট তুলে নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপের বিরুদ্ধে তাঁর নিয়ন্ত্রিত বোলিং ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলেও নিজের দক্ষতার পরিচয় ইতিমধ্যেই দিয়েছেন প্রেমা। এবার ব্যাট হাতে রেকর্ড গড়ে তাঁর পরিচিতির পরিধি আরও বাড়ল। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন প্রতিভার উত্থান ঘটছে। জাতীয় দলের বাইরে ঘরোয়া প্রতিযোগিতা এবং ‘এ’ দলের ম্যাচগুলিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই চালাচ্ছেন একাধিক ক্রিকেটার। এই পরিস্থিতিতে প্রেমার মতো ক্রিকেটারের পারফরম্যান্স নির্বাচকদের সামনে নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যিনি মূলত বোলার, তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত রান করার ক্ষমতা দলকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের গভীরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় প্রেমার মতো কার্যকর ব্যাটিং করতে পারা বোলার দলের ভারসাম্য বাড়াতে পারেন।
প্রসঙ্গত, একটি ঘরোয়া ম্যাচের দুর্দান্ত ইনিংসের ভিত্তিতে জাতীয় দলে তাঁর ভূমিকা কী হবে, তা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক স্তরে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যাটিংয়ের দক্ষতা দেখানোই হবে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। তবু ১৪ বলে অর্ধশতরানের মতো নজির যে তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াবে, তা বলাই যায়। একই সঙ্গে এই ইনিংসের মাধ্যমে নির্বাচকদের কাছেও নিজের ব্যাটিং দক্ষতার পরিচয় তিনি তুলে ধরলেন। প্রেমার এই কৃতিত্ব ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। এত দিন দ্রুততম অর্ধশতরানের রেকর্ড নিয়ে আলোচনায় ছিলেন ফাতিমা সানা, সোফি ডিভাইন, ফিবি লিচফিল্ড এবং রিচা ঘোষের মতো ক্রিকেটাররা। এবার সেই তালিকার শীর্ষে উঠে এল এক ভারতীয় লেগ স্পিনারের নাম। মাত্র ১৪ বলে পঞ্চাশ করে প্রেমা দেখিয়ে দিলেন, বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও ম্যাচের গতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। উত্তরাখণ্ডের হয়ে খেলা এই ইনিংস আগামী দিনে জাতীয় দলের হয়ে আরও বেশি সুযোগ পাওয়ার দাবিকে নিঃসন্দেহে জোরদার করবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubman Gill Gautam Gambhir meeting | টি-টোয়েন্টি অনুশীলনে শুভমন, গম্ভীরের সঙ্গে গোপন আলোচনা ঘিরে চর্চা



