সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ৪ অক্টোবর ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটার অপেক্ষায় রয়েছেন হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী। একদিকে ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতা, অন্যদিকে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের অভিঘাত, সব মিলিয়ে রাজ্যের শিক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই টানাপড়েন চলছে। এর মধ্যেই নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও বহু প্রার্থীর অপেক্ষার অবসান হয়নি। চাকরির দাবিতে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনও অব্যাহত। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখলেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন (Deepak Barman)। তাঁর আশ্বাস, চলতি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেই নতুন করে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু তা-ই নয়, আগামী দিনে প্রতি বছর নিয়ম মেনে শিক্ষক নিয়োগ করার পরিকল্পনাও আছে রাজ্য সরকারের।
বুধবার নিয়োগের দাবিতে চলতে থাকা আন্দোলন ও বিভিন্ন মহলের দাবি প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান জানান শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক আন্দোলন বা নতুন করে বঞ্চিতদের তালিকা তৈরি করে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়োগ ব্যবস্থাকে নিয়মের মধ্যে ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। মন্ত্রীর মতে, বর্তমানে যে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে, সেটি শেষ না করে নতুন করে একাধিক দাবি বিবেচনা করতে গেলে ভবিষ্যতের চাকরিপ্রার্থীদের জন্য আরও বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্যে উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যতের প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, বর্তমানে যাঁরা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা শেষ করছেন, বিএড (B.Ed.) কিংবা ডিএলএড (D.El.Ed.) প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাঁরাও শিক্ষকতার চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন। ফলে অতীতের নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্ত দাবি একসঙ্গে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সামনে বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। মন্ত্রীর যুক্তি, পুরনো জটিলতা মেটানোর পাশাপাশি আগামী দিনে যাঁরা নতুন করে শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন করবেন, তাঁদের জন্যও চাকরির সুযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
এই প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের দাবিদাওয়া সামনে আনা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলেও তাঁর দাবি। মন্ত্রীর বক্তব্য, প্রত্যেকটি দাবির ভিত্তিতে যদি সরকার চাকরির ব্যবস্থা করতে যায়, তা হলে আগামী দুই দশকেও নতুন প্রজন্মের বহু যোগ্য প্রার্থীর জন্য নিয়োগের সুযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম, যোগ্যতা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষেই তিনি সওয়াল করেছেন। শিক্ষামন্ত্রীর মতে, চাকরি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা কিংবা প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির চালানোর প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা অন্য কোনও পদ্ধতির পরিবর্তে প্রার্থীর পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতাই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত। দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে কিংবা প্রশাসনের উপর চাপ তৈরি করে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা শুধু নিয়োগ ব্যবস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, নতুন প্রজন্মের মধ্যেও ভুল ধারণা তৈরি করে। এর ফলে যাঁরা নিয়ম মেনে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশ্যে দীপক বর্মনের পরামর্শ, আন্দোলন বা বিভিন্ন ধরনের প্ররোচনার মধ্যে নিজেদের সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মন দেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য, যোগ্যতা অর্জন করাই চাকরি পাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সরকারের তরফে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা চলছে ও আগামী দিনেও সেই প্রক্রিয়া নিয়মিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তাই কোনও ব্যক্তির কাছে সুপারিশ নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নিজেদের প্রস্তুতি আরও মজবুত করার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রীর দাবি, যোগ্য প্রার্থীদের মূল্যায়ন করার নীতিতেই এগোতে চায় বর্তমান সরকার। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকার ফলে রাজ্যের চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়ার জেরে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বহু পরিবার এক ধাক্কায় আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। অন্যদিকে, যাঁরা নতুন করে শিক্ষকতার চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যেও নিয়োগের সময়সীমা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। চলতি নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও প্রত্যাশিত গতিতে নিয়োগ সম্পূর্ণ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের কাছে নিয়মিত নিয়োগের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিয়োগের নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকলে প্রশিক্ষণ নেওয়া, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে তাই নতুন নিয়োগের পাশাপাশি প্রতি বছর শিক্ষক নিয়োগ চালু রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। স্কুলশিক্ষামন্ত্রীর বুধবারের বক্তব্যে ফের আলোচনায় আসে স্কুল সার্ভিস কমিশনের ২০১৬ সালের প্যানেল বাতিলের বিষয়টিও। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতা চলছে। সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) নির্দেশের পর সংশ্লিষ্ট নিয়োগ ব্যবস্থাকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা সরকারের কাছে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশ মেনে বর্তমান জটিলতা কাটিয়ে ওঠার পরেই পরবর্তী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থাৎ পুরনো নিয়োগ সংক্রান্ত আইনি সমস্যার নিষ্পত্তি এবং নতুন নিয়োগের প্রস্তুতি—দুটি বিষয়কেই পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে প্রশাসন।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হল প্রতি বছর শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি। আগামী দিনে শিক্ষক নিয়োগকে আর দীর্ঘ বিরতির মধ্যে আটকে রাখতে চায় না সরকার। এ প্রসঙ্গে দুর্গাপুজোর সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি জানান, যেমন প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে দুর্গাপুজো হয়, তেমনি নিয়মিত ব্যবধানে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর এই মন্তব্যের ফলে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এতদিন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি কবে প্রকাশিত হবে, পরীক্ষা কবে হবে এবং চূড়ান্ত তালিকা কবে বেরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এবার সেই জায়গায় একটি নিয়মিত নিয়োগ কাঠামো তৈরির আশ্বাস দিলেন মন্ত্রী। অবশ্য প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবায়নের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর নিয়োগ করতে হলে শূন্যপদের হিসাব, শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রয়োজন, পরীক্ষার সময়সূচি এবং ফল প্রকাশের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ মেনে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করাও প্রয়োজন। রাজ্যের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলিতে কোথায় কত শিক্ষক প্রয়োজন, কোন বিষয়ে শূন্যপদ রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কীভাবে নিয়োগ করা হবে, তার উপরেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে।
কিন্তু, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সরকারের নতুন অবস্থান চাকরিপ্রার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে উঠে এসেছে। একদিকে চলতি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার আশ্বাস, অন্যদিকে আদালতের নির্দেশ মেনে ২০১৬ সালের প্যানেল সংক্রান্ত জটিলতা কাটানোর প্রতিশ্রুতি ও পরবর্তী সময়ে প্রতি বছর নিয়োগের পরিকল্পনা, এই তিনটি বিষয়ই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার দিনক্ষণ এবং বাস্তবে কতগুলি পদে নিয়োগ হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর দুর্গাপুজোর মতো বার্ষিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তবে রূপ পায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজ্যের শিক্ষকতার চাকরিপ্রার্থীরা।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Partha Chatterjee bail, SSC scam Bengal | তিন বছর পর জেল থেকে মুক্ত পার্থ চট্টোপাধ্যায়! কী প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক মহলে?




