সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ কলকাতা : বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (WTC) লড়াইয়ে বড়সড় পরিবর্তন এনে দিল দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa)। প্রথম টেস্টে হারের পর দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে (Australia) ইনিংস ও ৩১ রানে হারিয়ে দিল প্রোটিয়ারা। ব্যাটিং ও বোলিং, দুই বিভাগেই প্রতিপক্ষকে কার্যত কোণঠাসা করে সিরিজ়ে সমতা ফিরিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই ফলের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়েও। পয়েন্টের শতাংশের হিসাবে অস্ট্রেলিয়া এখনও শীর্ষে থাকলেও তাদের অবস্থান আগের তুলনায় কিছুটা চাপে পড়েছে। অন্য দিকে, দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের জায়গা মজবুত করার পথে এগিয়েছে। আর এই পরিস্থিতিতে ভারতের (India) সামনে খুলে রয়েছে ফাইনালে পৌঁছনোর সুযোগ। শুভমন গিলের (Shubman Gill) নেতৃত্বাধীন দলকে এখনও সাতটি টেস্ট খেলতে হবে বলে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সেই ম্যাচগুলির ফলই ভারতের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। দ্বিতীয় টেস্টে টসের পর ব্যাট করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসে বড় রান তুলে অস্ট্রেলিয়ার উপর চাপ তৈরি করে। ৯ উইকেটে ৪২৫ রান করার পর ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেন তারা। দলের অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা (Temba Bavuma) সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে করেন ১৭৯ রান।

টেম্বা বাভুমার ইনিংস দক্ষিণ আফ্রিকার বড় সংগ্রহ গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বাভুমার ব্যাটিংয়ে এক দিকে যেমন ছিল ধৈর্য, অন্য দিকে ছিল রান তোলার ধারাবাহিকতা। অধিনায়কের এই ইনিংসের ফলে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতে হয়। ইনিংসের শেষ দিকে মার্কো জানসেন (Marco Jansen) ও সিমন হারমারও (Simon Harmer) ব্যাট হাতে বড় অবদান রাখেন। জানসেন করেন ৮৫ রান, আর হারমারের সংগ্রহ ৮২। তাঁদের কার্যকর ব্যাটিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার রান চারশোর গণ্ডি পেরিয়ে যায়। জবাবে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস প্রায় বিপর্যয়ে শেষ হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের সামনে মাত্র ৯৯ রানেই গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। প্রথম ইনিংসে এত কম রান করার ফলে ম্যাচে তাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে বল হাতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন জানসেন। তিনি তুলে নেন পাঁচটি উইকেট। তাঁর গতিময় বোলিং আর ধারাবাহিক চাপ সামলাতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারেরা। প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার ৪২৫ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়ার ৯৯ রান ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দুই দলের মধ্যে ব্যবধান এতটাই বেড়ে যায় যে ফলো-অন করানোর সিদ্ধান্ত নিতে কোনও দ্বিধা করেনি দক্ষিণ আফ্রিকার দল পরিচালন বিভাগ।
ফলো-অন করতে নেমে দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য কিছুটা লড়াই করে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসের তুলনায় ব্যাটিংয়ে উন্নতি দেখা যায় তাদের। দলের হয়ে ট্রেভিস হেড (Travis Head) দুর্দান্ত ১২১ রানের ইনিংস খেলেন। তাঁর ব্যাটে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হেডের শতরানও দলকে ইনিংসের হার থেকে বাঁচাতে পারেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারেরা নিয়মিত উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কমিয়ে দেন। কাগিসো রাবাডা (Kagiso Rabada) দ্বিতীয় ইনিংসে চারটি উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধে বড় ধাক্কা দেন। শেষ পর্যন্ত ২৯৫ রানে শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস। ফলে ইনিংস ও ৩১ রানে জয় পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথম টেস্টে হারের পর এমন প্রত্যাবর্তন সিরিজকে নতুন মাত্রা দিল। এই জয়ের তাৎপর্য শুধু সিরিজের ফলাফলে সীমাবদ্ধ না। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায়ও এর প্রভাব পড়েছে। প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী, দলগুলির অবস্থান নির্ধারণে পয়েন্টের শতাংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দল সমান সংখ্যক টেস্ট না খেললেও অর্জিত পয়েন্টের অনুপাতের ভিত্তিতে তাদের তুলনা করা হয়। নির্ধারিত সময়ের শেষে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দুই দল ফাইনালে খেলার সুযোগ পায়। তাই একটি সিরিজ়ে জয় বা পরাজয় শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনায় বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার এই জয় সেই প্রতিযোগিতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
প্রদত্ত পয়েন্ট তালিকার হিসাব অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়া ১২টি টেস্ট খেলে ন’টিতে জয় ও তিনটিতে পরাজয় নিয়ে শীর্ষে আছে। তাদের পয়েন্টের শতাংশ ৭৫। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের ফলে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান আগের তুলনায় বেশি চাপে পড়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নিউ জিল্যান্ড (New Zealand)। ছ’টি টেস্টের মধ্যে চারটিতে জয়, একটিতে হার ও একটি ড্র নিয়ে তাদের পয়েন্টের শতাংশ ৭২.২২। দক্ষিণ আফ্রিকা রয়েছে তৃতীয় স্থানে। ছ’টি টেস্টের চারটিতে জিতে এবং দু’টিতে হেরে তাদের পয়েন্টের শতাংশ দাঁড়িয়েছে ৬৬.৬৭। অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সাফল্য শীর্ষ দলগুলির মধ্যে ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পয়েন্ট তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ (Bangladesh)। ছ’টি টেস্টে তিনটি জয়, দু’টি হার ও একটি ড্র নিয়ে তাদের পয়েন্টের শতাংশ ৫৫.৫৬। ভারতের অবস্থান পঞ্চম। দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুভমন গিলের দল ১১টি টেস্ট খেলে পাঁচটিতে জিতেছে, চারটিতে হেরেছে ও দু’টি টেস্ট ড্র করেছে। ভারতের পয়েন্টের শতাংশ ৫১.৫২। শীর্ষ দুইয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়া ও নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে ব্যবধান থাকলেও ভারতের হাতে এখনও বেশ কয়েকটি ম্যাচ রয়েছে। সেই কারণেই ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে নতুন করে।
ভারতের সামনে আছে দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরপর দুটি সিরিজ। প্রথমে নিউ জিল্যান্ডের মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজ খেলার কথা রয়েছে ভারতীয় দলের। তার পরে দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ টেস্টের সিরিজ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রদত্ত সূচি অনুযায়ী মোট সাতটি টেস্টে মাঠে নামার সুযোগ পাবে ভারত। এই সাত ম্যাচের ফল ভারতের পয়েন্টের শতাংশ বাড়ানো কিংবা কমিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নিউ জিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্টের শতাংশেও প্রভাব পড়তে পারে, কারণ এই দুই দলই ভারতের সরাসরি প্রতিপক্ষ। ভারতের ফাইনালে ওঠার অঙ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শীর্ষ দুই দলের বিরুদ্ধে সরাসরি খেলার সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে। নিউ জিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বেশি সংখ্যক ম্যাচ জিততে পারলে ভারত নিজের পয়েন্টের শতাংশ বাড়াতে পারবে। একই সঙ্গে ওই দলগুলির সম্ভাব্য পয়েন্ট অর্জনেও বাধা তৈরি হবে। ফলে ভারতকে শুধু অন্য সিরিজের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে, এমন পরিস্থিতি না। নিজেদের বাকি ম্যাচগুলিতে ধারাবাহিক জয় পেলে ফাইনালের দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু একটি বা দু’টি জয় যথেষ্ট হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রতিটি দলের চূড়ান্ত পয়েন্ট, বাকি ম্যাচের ফল ও প্রতিযোগিতার নির্ধারিত হিসাবের উপর।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিদেশের মাটিতে নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাফল্য পাওয়া ও পরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ পাঁচ টেস্টের সিরিজে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। দুই প্রতিপক্ষই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে। ফলে এই সিরিজগুলিতে সামান্য ভুলও পয়েন্টের হিসাবে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা, বোলারদের উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা ও চাপের সময়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার দক্ষতা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে দলের ক্রিকেটারদের ফিটনেস ও একাদশ নির্বাচনের বিষয়টিও দীর্ঘ সিরিজে ভূমিকা নিতে পারে। এখানে বলা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার জয় তাই ভারতের কাছে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া এখনও পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকলেও প্রতিযোগিতায় তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। নিউ জ়িল্যান্ডও দ্বিতীয় স্থানে থেকে ফাইনালের লড়াইয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের জয় দিয়ে শীর্ষ দলগুলির কাছে চাপ বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যদি বাকি সাতটি টেস্টে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়, তা হলে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান বদলানোর সুযোগ থাকবে। তবে চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে মাঠের পারফরম্যান্স ও প্রতিযোগিতার শেষ পর্যন্ত পয়েন্টের শতাংশের উপর। আপাতত দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস জয় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইকে আরও জমিয়ে তুলেছে, আর ভারতের সামনে রয়েছে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়ে নেওয়ার বড় সুযোগ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women cricket score Pratika Rawal 100 not out | প্রতীকার দুরন্ত শতরান, শ্রী চরণীর চার উইকেট! জিম্বাবোয়েকে ৯ উইকেটে উড়িয়ে এক দিনের সিরিজে দুর্দান্ত শুরু ভারতের




