রীতা বিশ্বাস পাণ্ডে, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ঐদিন মানে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মধ্যপ্রাচ্যের শান্ত নীল আকাশের উঁচুতে, মুহূর্তের মধ্যে একটি সাধারণ যাত্রীবাহী বিমান হয়ে উঠেছিল জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের স্থান। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ১০৭৩ নম্বর ফ্লাইট (বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮) এক সাংঘাতিক সংকটের মুখে পড়ে, যখন বিমানের ওমানি ফার্স্ট অফিসার ককপিটের ভেতরে হিংস্র আক্রমণ চালিয়ে বসেন। একটি ধারাল অস্ত্র নিয়ে কো-পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রণ বিকল করে দেওয়ার চেষ্টা করেন, যার ফলে বিমানটি মাত্র আধ মিনিটেরও কম সময়ে প্রায় ১৪,০০০ ফুট নিচে নেমে যায়। এই ভয়াবহ বিপর্যয়কে এক এক নিমিষে বানচাল করে দেন বিমানের পাইলট-ইন-কমান্ড, ভারতীয় নাগরিক ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার, তাঁর অদম্য সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধির জোরে।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নির্ধারিত সময়েই আকাশে উড়েছিল বিমানটি। প্রায় দু’ঘণ্টার মাথায়, জর্ডান সীমান্তের কাছের আকাশসীমায় পৌঁছালে কো-পাইলট আচমকা ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। মাথায় ও হাতে গুরুতর আঘাত পেয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন মাচ্ছার বিমানের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। বিমানের সব যাত্রীর জীবনের চরম ঝুঁকি বুঝতে পেরে তিনি রক্তাপ্লুত অবস্থাতেই ককপিটের সুরক্ষিত দরজার লক খুলে দেন ও বাইরের সাহায্য চান, একই সঙ্গে তিনি কো-পাইলটের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে থাকেন বলে উল্লেখ।
এদিকে বিমানের ডিসট্রেস ট্রানসপন্ডার কোড দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে, সাধারণ জরুরি সংকেত ‘স্কোয়ক ৭৭০০’ থেকে মুহূর্তের মধ্যে হাইজ্যাক সতর্কবার্তা ‘স্কোয়ক ৭৫০০’-এ বদলে যায়, যা আশেপাশের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে ককপিট দখলের স্পষ্ট বার্তা দেয়। ককপিটের দরজা খুলে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক সহায়তার সুযোগ তৈরি হয়। ইয়ানিভ হায়ুন নামের এক যাত্রী দ্রুত ককপিটে ঢুকে পড়েন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ কাঠি (কনট্রোলস) টেনে ধরে খাড়া পতন বা স্টিপ ডিসেন্ট থামান। ঠিক একই সময়ে, ড. শোটা মুসায়েভ নামের একজন দন্তচিকিৎসক যাত্রী অন্য ক্রু সদস্যদের সহায়তায় হামলাকারী কো-পাইলটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে কাবু করেন। জিপ টাই এবং হেডফোনের তার দিয়ে আক্রমণকারীকে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর ড. মুসায়েভ দ্রুত ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের মারাত্মক রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
ককপিট বিপদমুক্ত হলে বিমানে থাকা অন্য এক রিলিফ ক্রু দল বিমানের দায়িত্ব নেন ও বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটিকে নিরাপদ উচ্চতায় ফিরিয়ে আনেন। পরবর্তীতে বিমানটিকে নিরাপদে সৌদি আরবের তাবুক শহরে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিন আব্দুলঅ্যাজিজ বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। রানওয়েতেই জরুরি মেডিকেল টিম বিমানটিকে ঘিরে ফেলে। ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়, চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত। এদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলাকারী কো-পাইলটকে হেফাজতে নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হয়েছে।
বিশ্বনেতারা ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের এই অসীম সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বড় বিপর্যয় এড়ানোর জন্য ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের অসামান্য বীরত্বের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পাইলট, ক্রু এবং যাত্রীদের এই অসাধারণ যৌথ প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান, যার কারণে বিমানটির ১৭৪ জন যাত্রীর প্রত্যেকেই অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছেন।
ছবি: সংগৃহীত



