সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর একের পর এক হামলার আবহে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বললেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল (Ajit Doval)। সোমবার, ১২ অক্টোবর ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসিন রেজাই (Mohsen Rezaei) -এর সঙ্গে তাঁর এই কথোপকথন হয়েছে ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস সূত্র মারফৎ খবর। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ভারত ও ইরানের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েও দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে ঠিক কোন কোন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। হরমুজ প্রণালীতে ভারতীয় নাবিকদের নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ কূটনৈতিক মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইরানি দূতাবাসের তরফে সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মহসিন রেজাই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। আলোচনায় সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলি উঠে এসেছে। তবে হরমুজ় প্রণালীতে জাহাজের উপর হামলা, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা কিংবা সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণ স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে সরাসরি কোনও আলোচনা হয়েছে কি না, তা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ফোনালাপের নির্দিষ্ট আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে অনুমান করা গেলেও সরকারি ভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনও সীমিত। ভারত ও ইরানের মধ্যে এই যোগাযোগ এমন এক সময়ে হল, যখন পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলিতে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরের দিকে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এই জলপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের জন্য এই পথের উপর নির্ভর করে বহু দেশ। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হল, পশ্চিম এশিয়ার সমুদ্রপথে পণ্যবাহী জাহাজে ভারতীয় নাবিকদের উপস্থিতি। সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রবিবার, ১১ অক্টোবর ওমানের উপকূলের কাছে এমটি পেট্রো ডলফিন (MT Petro Dolphin) নামের একটি জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নিকারাগুয়ার পতাকাবাহী ওই জাহাজে ১১ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। হামলার পরে কয়েক জনকে উদ্ধার করা গেলেও দুই ভারতীয় নাবিকের খোঁজ মেলেনি। তাঁদের সন্ধানে তল্লাশি চালানোর কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলে উল্লেখ। একই দিনে আরও একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার খবর সামনে আসে। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী এমটি ভলথেরা (MT Valthera) নামের জাহাজটিতে ১১ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। জাহাজটির উপর হামলার পরেও নাবিকেরা নিরাপদ রয়েছেন বলে সূত্রের খবর। অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’টি জাহাজকে ঘিরে এমন ঘটনার ফলে হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশের জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
উল্লেখ্য যে, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন দিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতীয় নাবিকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী জাহাজে কাজ করেন ও বহু গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পণ্য পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বিপজ্জনক হয়ে উঠলে তাঁদের প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়ে। একই সঙ্গে জাহাজের ক্ষতি, পণ্য পরিবহণে বিলম্ব, বিমা ও পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার নিন্দা জানিয়েছে বলে উল্লেখ। সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দিয়েছে নতুন দিল্লি। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে ভারতের জ্বালানি আমদানি ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগে চাপ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে দেশের আমদানি ব্যয়, পরিবহণ খরচ এবং সামগ্রিক মূল্যস্তরের উপর। তাই এই জলপথে নিরাপত্তা বজায় রাখা ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
অজিত ডোভাল ও মহসিন রেজাইয়ের কথোপকথনের আর একটি তাৎপর্য রয়েছে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে। সম্প্রতি ব্রিক্স (BRICS) সম্মেলন উপলক্ষ্যে ভারতে এসেছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian)। তাঁর সফরের পর অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তাদের মধ্যে এই যোগাযোগ হয়েছে। যদিও ফোনালাপের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি।
ভারতকে এক দিকে নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার স্বার্থও দেখতে হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট সমঝোতা হয়েছে বা জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমন দাবি করার মতো তথ্য এখনও সামনে আসেনি। হরমুজ প্রণালীতে সাম্প্রতিক হামলার পর ভারতীয় নাবিকদের সন্ধান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন তাৎক্ষণিক গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি, এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত ফিরিয়ে আনা আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অজিত ডোভাল ও মহসিন রেজ়াইয়ের ফোনালাপে সেই বিষয়গুলি আলোচনায় এসেছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা থাকলেও দুই দেশের সরকারি বিবৃতিতে শুধু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আর পারস্পরিক স্বার্থের কথা বলা হয়েছে। আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয় ও ভারত-ইরান যোগাযোগের মাধ্যমে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও অগ্রগতি হয় কি না, এখন সেদিকেই লক্ষ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Putin praises Modi, Modi Ukraine peace efforts | ‘যত দ্রুত সম্ভব সংঘাত শেষ হোক’! মোদীর উদ্যোগে পুতিনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, কী বললেন রুশ প্রেসিডেন্ট?




