মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বিশ্বকাপের মঞ্চে সাফল্যের পর দেশের মাটিতে প্রথম ম্যাচ। তার উপর সামনে শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু মাঠে নামার পর কোনও চাপই যেন টের পাওয়া গেল না স্পেনের খেলায়। লেমিন ইয়ামাল (Lamine Yamal) -এর জোড়া গোল, মার্ক পুবিল (Marc Pubill)-এর গোল এবং নিকো উইলিয়ামস (Nico Williams)-এর গোলে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়ে উয়েফা নেশনস লিগে (UEFA Nations League) টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিল স্পেন। ম্যাচের পর ইয়ামালের প্রশংসায় পঞ্চমুখ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে (Luis de la Fuente)। তাঁর কথায়, ইয়ামালের ফুটবলে ‘জাদু’ রয়েছে। একই রাতে ঘুরে দাঁড়াল ইংল্যান্ডও। চেকিয়াকে (Czechia) ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথম জয়ের স্বাদ পেল হ্যারি কেনের (Harry Kane) দল। সেভিয়ার রামন সানচেজ-পিসহুয়ান স্টেডিয়ামে (Ramón Sánchez-Pizjuán Stadium) ম্যাচটি ছিল স্পেনের জন্য বিশেষ তাৎপর্যের। ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর দেশের মাটিতে প্রথম বার খেলতে নামল তারা। ম্যাচ শুরুর আগে সেই সাফল্যের স্মৃতিও ফিরে আসে মাঠে। ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের সদস্য এবং সেভিয়ার প্রাক্তন ফুটবলার জেসুস নাভাস (Jesus Navas) ট্রফি নিয়ে মাঠে আসেন। স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি (Rodri) -এর হাতে ট্রফি তুলে দেন তিনি। তার পর শুরু হয় নেশনস লিগের লড়াই।
আর ম্যাচ শুরুর পর ৭৫ সেকেন্ডও লাগেনি স্পেনকে এগিয়ে যেতে। শুরুতেই বল পেয়ে নিজের দক্ষতা দেখান ইয়ামাল। দ্রুত আক্রমণ গড়ে তুলে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ ভেঙে দেন তিনি। মাত্র এক মিনিটের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই তাঁর গোলে ১-০ এগিয়ে যায় স্পেন। ইয়ামালের জন্য এটিই ছিল এই নেশনস লিগে তৃতীয় গোল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেও গোল করেছিলেন বার্সেলোনার (Barcelona) এই তরুণ তারকা। ফলে প্রতিযোগিতার শুরুতেই তাঁর ধারাবাহিক গোলের ছবি ফুটে উঠেছে। তবে প্রথম গোল খাওয়ার পর ম্যাচ থেকে ক্রোয়েশিয়া হারিয়ে যায়নি। ধীরে ধীরে তারা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। ২৮ মিনিটের মাথায় সেই চাপের ফলও আসে। দিয়োন বেজো (Dion Beljo)-এর গোলে সমতা ফেরায় ক্রোয়েশিয়া। ১-১ হওয়ার পর ম্যাচ আবার নতুন করে জমে ওঠে। কিন্তু সেই সমতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। তিন মিনিটের মধ্যেই ফের এগিয়ে যায় স্পেন। ইয়ামালের বাড়ানো বল থেকে মার্ক পুবিল মাথা ছুঁইয়ে বল জালে পাঠান। প্রথমার্ধেই ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের আক্রমণের গতি আরও বাড়ে। ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও ইয়ামালকে সামলানো ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। ৬৩ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন তিনি। এই গোলের মাধ্যমে ব্যবধান বাড়িয়ে ৩-১ করে স্পেন। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন প্রায় পুরোপুরি চলে যায় তাদের হাতে। ইয়ামালের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সও তখন হয়ে ওঠে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। দুই গোলের পাশাপাশি সতীর্থকে দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
এর পর ম্যাচের শেষ ভাগে স্পেনের হয়ে চতুর্থ গোল করেন নিকো উইলিয়ামস। ফলে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ৪-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয়। দুই ম্যাচে ছয় গোল করে নেশনস লিগের গ্রুপ এ৩-তে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করল স্পেন। প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল তারা। দ্বিতীয় ম্যাচেও চার গোল করে জয় পাওয়ায় শুরু থেকেই গ্রুপে দারুণ ছন্দে রয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচের পর ইয়ামালের প্রশংসা করতে গিয়ে কোচ দে লা ফুয়েন্তে তাঁর ফুটবলের আলাদা বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘লেমিন উন্নতি করে চলেছে এবং কী ধরনের ফুটবলার, তা প্রতিটি ম্যাচে দেখিয়ে দিচ্ছে। ওর ফুটবলের জাদু আমরা দেখতে পাচ্ছি। ও যেভাবে খেলছে এবং দলকে সাহায্য করছে, তার স্বীকৃতি ভবিষ্যতে আরও বেশি করে পাবে।’ কোচের এই মন্তব্যের পেছনে ছিল ইয়ামালের সেই পারফরম্যান্সই, যেখানে তরুণ ফরোয়ার্ড নিজে দুই গোল করেছেন এবং আরও একটি গোল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ম্যাচের পর ইয়ামালও দলের পারফরম্যান্স নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বিশ্বকাপের ট্রফি দেশের মাটিতে নিয়ে এসে সতীর্থদের সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও বলেন তিনি। ইয়ামালের বক্তব্য, ‘এখানে ট্রফি নিয়ে আসতে পেরে আমরা খুবই উত্তেজিত। ম্যাচ জেতার পর অনুভূতিটা আরও ভাল হয়েছে।’ বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রথম ঘরের মাঠের ম্যাচে চার গোলের জয় পাওয়ায় স্পেনের সমর্থকদের উৎসবের আবহও তৈরি হয় সেভিয়ায়। ইয়ামালের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনার আরও একটি কারণ তাঁর বয়স এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে দ্রুত উত্থান। একের পর এক বড় ম্যাচে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নেশনস লিগের প্রথম ম্যাচে গোল করার পর ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল, দুই ম্যাচে তিন গোল তাঁর বর্তমান ছন্দের ছবি তুলে ধরছে। এর সঙ্গে দলের হয়ে নিয়মিত আক্রমণ তৈরি করার দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। ফলে স্পেনের আক্রমণভাগে ইয়ামালের গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
অন্য দিকে, একই গ্রুপের আর একটি ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াল ইংল্যান্ড। প্রথম ম্যাচে স্পেনের কাছে ৩-২ গোলে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে চেকিয়ার মাঠে নামেন হ্যারি কেনেরা। প্রাগের ফোর্তুনা অ্যারেনায় (Fortuna Arena) ২-০ গোলে জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড। অ্যান্টনি গর্ডন (Anthony Gordon) ও অধিনায়ক হ্যারি কেন গোল করেন। এই জয়ের ফলে নেশনস লিগে প্রথম পয়েন্টের পাশাপাশি প্রথম জয়ও পেল ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের জন্য ম্যাচটি সহজ ছিল না। প্রথমার্ধেই চেকিয়া ১০ জনের দলে পরিণত হয়। ২৩ মিনিটে এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে (Elliot Anderson) ফাউল করার পর সরাসরি লাল কার্ড দেখেন পাভেল শুলচ। ফলে দীর্ঘ সময় একজন বেশি নিয়ে খেলার সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। এই সুবিধা কাজে লাগাতে অবশ্য তাদের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বিরতির পর দ্রুতই গোলের মুখ খোলে ইংল্যান্ড। ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের (Trent Alexander-Arnold) ক্রস থেকে হেড করে গোল করেন অ্যান্টনি গর্ডন। এর পর ইংল্যান্ডের ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ আসে। শেষ পর্যন্ত হ্যারি কেনের বুদ্ধিদীপ্ত ফিনিশিংয়ে দ্বিতীয় গোল পায় দলটি। ফলে ২-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয়। ইউরো বা বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতার বাইরে নেশনস লিগেও কেন যে ইংল্যান্ডের আক্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ, এই ম্যাচেও তা দেখা গেল।
কেনের গোলটির গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ স্পেনের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেও ইংল্যান্ডের হয়ে তিনি গোল করেছিলেন। গর্ডনও টানা দ্বিতীয় ম্যাচে গোল পেলেন। ফলে প্রথম ম্যাচে হারলেও আক্রমণভাগের দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের গোল করার ধারাবাহিকতা ইংল্যান্ডের জন্য ইতিবাচক দিক হয়ে উঠেছে। গ্রুপ এ৩-তে এখন স্পেন দুই ম্যাচে দুই জয় নিয়ে এগিয়ে রয়েছে। ইংল্যান্ড প্রথম ম্যাচে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে জিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ক্রোয়েশিয়া প্রথম ম্যাচে চেকিয়াকে হারালেও স্পেনের কাছে বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে। সামনে আবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ রয়েছে। ৩ অক্টোবরের সেই ম্যাচ গ্রুপের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এরপর স্পেনও আবার চেকিয়ার মুখোমুখি হবে। নেশনস লিগের দ্বিতীয় ম্যাচডেতে তাই আলোচনার কেন্দ্রে থাকল দুই দল স্পেন ও ইংল্যান্ড। এক দিকে ইয়ামালের জোড়া গোল ও চার গোলের জয়, অন্য দিকে লাল কার্ডের সুবিধা কাজে লাগিয়ে কেন-গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ডের জয়। স্পেনের শুরুটা আরও নিখুঁত হয়েছে, ইংল্যান্ড প্রথম ম্যাচের ধাক্কা সামলে তিন পয়েন্ট তুলে নিয়েছে। আর ইয়ামাল? দুই ম্যাচেই গোল করে তিনি ইতিমধ্যেই নেশনস লিগের অন্যতম আলোচিত ফুটবলার হয়ে উঠেছেন। কোচের চোখে তাঁর খেলায় ‘জাদু’ দেখা গেলেও মাঠের পরিসংখ্যানও বলছে, এই তরুণ ফরোয়ার্ড এখন স্পেনের আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্র হয়ে উঠছেন।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Virat Kohli Shubman Gill conversation, India vs West Indies ODI | বিরাট-শুভমনের ১৫১ রানের জুটি: একসঙ্গে ব্যাট করার সময় কী কথা হয়?




