সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ চন্দ্রকোনা, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২৩ সেপ্টেম্বর : পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় এক বিধবা যুবতী ও এক যুবককে ঘিরে চাঞ্চল্য (Chandrakona Widow Harassment)। সমাজমাধ্যমে পরিচয়ের পর দেখা করতে আসা ওই যুবককে নিয়ে যুবতীর শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছনোর পরেই স্থানীয়দের একাংশ তাঁদের আটকে হেনস্থা করেছেন বলে অভিযোগ। রাস্তার ধারের একটি খুঁটিতে দু’জনকে বেঁধে মুখে চুন মাখানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। খবর পেয়ে চন্দ্রকোনা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দু’জনকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। তবে এখনও পর্যন্ত ওই ঘটনায় কারও গ্রেফতারির খবর নেই। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় কোনও পক্ষই লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। ঘটনাটি পশ্চিম মেদিনীপুরের (Paschim Medinipur) চন্দ্রকোনা পুরসভার (Chandrakona Municipality) গোঁসাইবাজার জওহরপুর এলাকার। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বছর পঁচিশের ওই যুবতী কয়েক মাস আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। তাঁর স্বামীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকছিলেন। সূত্রের খবর, সম্প্রতি সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে সন্দেশখালির (Sandeshkhali) এক যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ওই যুবক দেখা করতে চাইলে তাঁকে নিজের শ্বশুরবাড়িতে আসতে বলেছিলেন যুবতী।
অভিযোগ, বুধবার ওই যুবক সেখানে পৌঁছনোর পর স্থানীয়দের একাংশ তাঁদের দেখতে পান। এর পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যুবকটির সঙ্গে ওই মহিলার সম্পর্ক কী, কেন তিনি শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কিছু স্থানীয়ের তরফে যুবকের বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগও তোলা হয়। বিধবা হওয়ার পর এত অল্প সময়ের মধ্যে ওই যুবতী অন্য এক পুরুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় প্রকাশ্যে হেনস্থা। ঘটনার যে বর্ণনা সামনে এসেছে, তা আরও চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। অভিযোগ, ওই যুবক ও যুবতীকে রাস্তার পাশে নিয়ে গিয়ে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। তাঁদের মুখে চুন মাখিয়ে দেওয়া হয়। দু’জনকে ঘিরে স্থানীয়দের একাংশ নানাভাবে হেনস্থা করেন বলেও অভিযোগ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ভিড় জমে যায়। খবর পৌঁছয় চন্দ্রকোনা থানায়। এর পর পুলিশকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দু’জনকে উদ্ধার করেন।
পুলিশ সূত্রে খবর, এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে সমাজমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি পরিচয়। ওই ২৫ বছরের বিধবার সঙ্গে সন্দেশখালির এক যুবকের সম্প্রতি পরিচয় হয়। কথাবার্তার পর যুবকটি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। সেই সূত্রেই তাঁকে শ্বশুরবাড়িতে আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ওই সাক্ষাৎ শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের একাংশের হস্তক্ষেপে প্রকাশ্য হেনস্থার ঘটনায় গড়ায়। এখানেই উঠছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কার সঙ্গে দেখা করবেন বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখবেন, তা নিয়ে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোথা থেকে পেলেন? কোনও সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি থাকলে আইন মেনে অভিযোগ জানানোর পথ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে প্রকাশ্যে অপমান করা, খুঁটিতে বেঁধে রাখা কিংবা মুখে চুন মাখানোর মতো ঘটনা আইনের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষ করে ওই মহিলার বৈধব্যকে কেন্দ্র করে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করার অভিযোগটি ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। স্বামী মারা যাওয়ার পরে একজন নারী কত দিন শোক পালন করবেন, কার সঙ্গে কথা বলবেন কিংবা ভবিষ্যতে নিজের জীবন কী ভাবে পরিচালনা করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়। অথচ এই ঘটনায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য অপমানের অভিযোগ উঠেছে। যুবকটির ক্ষেত্রেও একই ভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে জনসমক্ষে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ। চন্দ্রকোনা থানার পুলিশ সূত্রে খবর, গন্ডগোলের খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে যুগলকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের থানায় নিয়ে এসে পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত গ্রামবাসী, মহিলার পরিবার কিংবা ওই যুবক-যুবতীর কেউই লিখিত অভিযোগ করেননি। ফলে এই মুহূর্তে কোনও মামলা বা গ্রেফতারির খবর নেই। দু’জনকেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জেলা পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন।
এই ঘটনার আর একটি দিকও নজরে এসেছে। কয়েক মাস আগেই ওই যুবতীর স্বামীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। সেই ঘটনায় পুলিশ মামলা রুজু করেছিল। তবে সেই তদন্তের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এই ঘটনায় কোনও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। ফলে পুরনো ঘটনার সঙ্গে বুধবারের ঘটনার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। পুলিশের তরফেও এমন কোনও যোগের কথা জানানো হয়নি। এখন প্রশ্ন, স্থানীয়দের একাংশ কেন নিজেরাই ওই দু’জনকে আটকে রেখে হেনস্থা করলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল সম্পর্ক নিয়ে। কিন্তু অভিযোগ থাকা আর কাউকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা পাওয়া, দুই বিষয় এক নয়। চন্দ্রকোনার এই ঘটনা সেই সীমারেখা নিয়েই নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পর্ক পছন্দ না হলে তার প্রতিবাদ জানানোর আইনসম্মত পথ রয়েছে। কিন্তু জনতার হাতে কাউকে তুলে দিয়ে অপমান করার প্রবণতা সমাজে ভয় তৈরি করতে পারে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আর বড় আকার নেয়নি। উদ্ধার হওয়ার পরে ওই যুবক ও যুবতীকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, এমন তথ্যও নেই। একই সঙ্গে যাঁরা তাঁদের খুঁটিতে বেঁধেছিলেন বা হেনস্থা করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও এখনও কোনও গ্রেফতারির খবর পাওয়া যায়নি। প্রসঙ্গত, চন্দ্রকোনার এই ঘটনা তাই শুধু যুবক-যুবতীর সম্পর্ককে ঘিরে স্থানীয় বিবাদের ঘটনা হয়ে থাকছে না। এর মধ্যে উঠে আসছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সামাজিক চাপ ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার মতো একাধিক প্রশ্ন! বিধবা হওয়ার পরে একজন নারীর জীবনযাপন নিয়ে সমাজের কতটা হস্তক্ষেপ করা উচিত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি থাকলে তার সমাধান কী ভাবে আইনি পথে করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে।
এই মুহূর্তে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ না থাকায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগ দায়েরের উপর। তবে প্রকাশ্য রাস্তায় দু’জন মানুষকে আটকে রেখে হেনস্থার যে অভিযোগ উঠেছে, তা ইতিমধ্যেই চন্দ্রকোনা এলাকায় আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সমাজমাধ্যমের পরিচয় থেকে শুরু হওয়া একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ কী ভাবে জনতার হস্তক্ষেপে প্রকাশ্য অপমানের ঘটনায় পরিণত হল, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে পশ্চিম মেদিনীপুরের এই এলাকায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi BRICS Speech, Rare Earth Minerals | জিনপিংয়ের সামনেই বিরল মৃত্তিকা নিয়ে মোদীর কড়া বার্তা, প্রযুক্তি-খনিজকে হাতিয়ার করার বিরুদ্ধে সরব ভারত




