সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ২৩ সেপ্টেম্বর : এক মাসের ব্যবধানও পেরোয়নি, তার মধ্যেই ফের বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ ধ্বংসের অভিযানে নামল রাজ্য সরকার। বুধবার নিউ টাউনের ইকো পার্কে ৩ লক্ষ ১০ হাজার বোতল নিষিদ্ধ কাশির সিরাপের উপর রোলার চালিয়ে সেগুলি নষ্ট করা হল (3.10 Lakh Banned Cough Syrup Bottles Destroyed at Eco Park)। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) নিজেই এই অভিযানে অংশ নেন। প্রশাসনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ধ্বংস হওয়া কাশির সিরাপের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩১ কোটি টাকা। ‘নেশামুক্ত ভারত-২০২৯’ কর্মসূচীর আওতায় বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের উদ্যোগে এই অভিযান হয়।
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে প্রায় দুই লক্ষ নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ ধ্বংসের পর এবার ইকো পার্কে আরও বড় মাপের অভিযান চালাল রাজ্য। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই বালুরঘাটে বাজেয়াপ্ত কাশির সিরাপের বোতলের উপর রোলার চালিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বুধবারের কর্মসূচীতে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলেও এ বার ধ্বংস করা হল আরও বেশি পরিমাণে বাজেয়াপ্ত সামগ্রী। ইকো পার্কে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক বোতল ধ্বংসের ঘটনাকে রাজ্যের চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের দ্বিতীয় বড় পর্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বুধবারের অনুষ্ঠানে রাজ্যের পুলিশ মহলের শীর্ষ আধিকারিকদের উপস্থিতিও ছিল। রাজ্য পুলিশের ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত (Siddhinath Gupta)-সহ একাধিক আধিকারিক সেখানে ছিলেন। নিষিদ্ধ কাশির সিরাপের বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি মাদক পাচারের পথ বন্ধ করা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিশ, স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ (STF), কলকাতা পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ (BSF), নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো বা এনসিবি (Narcotics Control Bureau)-সহ একাধিক সংস্থা এই ধরনের অভিযানে যুক্ত রয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। ইকো পার্কের অনুষ্ঠানের পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু জানান, সরকারের নেশাবিরোধী অভিযান থামছে না। তাঁর কথায়, ‘আজ দ্বিতীয় বড় অভিযান করলাম।’ প্রধানমন্ত্রীর ‘নেশামুক্ত ভারত’ কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পশ্চিমবঙ্গেও মাদকবিরোধী পদক্ষেপকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই বিষয়টিকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ নিয়ে রাজ্য সরকারের উদ্বেগের পিছনে রয়েছে এর বেআইনি ব্যবহার এবং পাচারের অভিযোগ। চিকিৎসার কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি কিছু কাশির সিরাপের অপব্যবহার করে নেশার সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। সেই কারণে বাজেয়াপ্ত হওয়া এই ধরনের সামগ্রী ধ্বংস করার পাশাপাশি সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করার উপরও জোর দিচ্ছে প্রশাসন। বুধবারের কর্মসূচিতে সেই বিষয়টিই সামনে এসেছে। প্রসঙ্গত, এর আগে ২ সেপ্টেম্বর বালুরঘাটে প্রায় দুই লক্ষ নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ ধ্বংস করা হয়েছিল। সেই অভিযানে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের সামগ্রী নষ্ট করা হয় বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছিল। এবার ইকো পার্কে প্রায় ৩১ কোটি টাকা মূল্যের ৩ লক্ষ ১০ হাজার বোতল ধ্বংসের দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই দফায় বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ সরকারি অভিযানে নষ্ট করা হয়েছে।
বালুরঘাটের অভিযানের পরে সংশ্লিষ্ট একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার কাছ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। রাজ্য সরকারের দাবি, ওই সংস্থা জানিয়েছে, তাদের একটি কাশির সিরাপ পশ্চিমবঙ্গে আর সরাসরি অথবা স্থানীয় ডিপোর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হবে না। নিষিদ্ধ কাশির সিরাপের অবৈধ ব্যবহার ঠেকাতে উৎপাদক সংস্থা এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টিকেও তাই গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ দিন নেশার সঙ্গে অপরাধের সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য করেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুতর অপরাধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, তদন্তে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের যোগ থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তবে কোনও নির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে মাদকের ভূমিকা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, বেআইনি নেশার বিস্তার শুধু একজন ব্যক্তির জীবনেই প্রভাব ফেলে না, তার অভিঘাত পরিবার এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশেও পড়তে পারে।
এই প্রসঙ্গে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও উল্লেখ করেন শুভেন্দু। ওই ঘটনার সঙ্গে মাদকের যোগ রয়েছে, এমন দাবি মুখ্যমন্ত্রী করেছেন। এই ধরনের মন্তব্যকে অবশ্য নির্দিষ্ট মামলার তদন্তের তথ্য ও আদালতের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার বিষয় রয়েছে। বুধবারের বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী মূলত মাদকবিরোধী অভিযানের প্রয়োজনীয়তার যুক্তি হিসেবে বিভিন্ন অপরাধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। মাদকবিরোধী অভিযানে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলির দিকেও নজর বাড়ানোর কথা জানিয়েছে রাজ্য। কারণ কাশির সিরাপের পাশাপাশি অন্য ধরনের নিষিদ্ধ মাদকও পাচারের মাধ্যমে রাজ্যে ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। বিএসএফ এবং রাজ্য পুলিশের সমন্বিত অভিযান, এসটিএফের কার্যকলাপ এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানের মাধ্যমে পাচারের চক্র ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
এনসিবি, রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ ও এসটিএফের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্তরের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, যৌথ অভিযানের ফলে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই আরও কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মাদক ঢোকার পথ বন্ধ করা এবং রাজ্যের ভিতরে তার সরবরাহের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করার উপরও নজর রয়েছে।উল্লেখ্য, ইকো পার্কে বুধবারের অভিযান রাজ্য সরকারের মাদকবিরোধী অবস্থানের স্পষ্ট ছিল। বালুরঘাটের পরে দ্বিতীয় দফায় একই ধরনের উদ্যোগ আয়োজন করে সরকার দেখাতে চেয়েছে, বাজেয়াপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ মাদকসামগ্রী সংরক্ষণ করে রাখার পরিবর্তে আইন মেনে তা ধ্বংস করার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি পাচারকারী এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ দিন যুবসমাজকে নেশার কবল থেকে দূরে রাখার উপর বিশেষ জোর দেন। তাঁর কথায়, ‘আমরা থেমে থাকব না। যুবসমাজকে বাঁচানোর জন্য নেশামুক্ত ভারত গড়ার অঙ্গীকার আমরা করলাম।’ রাজ্য সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নেশামুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে পুলিশি অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
এর আগে বালুরঘাটে নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ ধ্বংসের কর্মসূচীর সময়ও মুখ্যমন্ত্রী মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথা বলেছিলেন। ইকো পার্কের কর্মসূচি সেই ধারাবাহিকতারই পরবর্তী ধাপ। এবার ধ্বংস করা সামগ্রীর পরিমাণ এবং আনুমানিক মূল্য, দুই ক্ষেত্রেই অঙ্ক বড়। ফলে রাজ্যের মাদকবিরোধী অভিযানের আলোচনায় ইকো পার্কের এই অভিযান নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। তাই, প্রশাসনের সামনে এখন দু’টি বড় কাজ, এক দিকে বাজেয়াপ্ত নিষিদ্ধ মাদক ধ্বংসের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া, অন্য দিকে সেই সামগ্রী রাজ্যে ঢোকার উৎস এবং সরবরাহের নেটওয়ার্ক খুঁজে বের করা। শুধুমাত্র মাদক উদ্ধার করে নষ্ট করার পাশাপাশি পাচারের চক্রের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও তদন্ত কতটা এগোয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে নেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের পুনর্বাসন ও সচেতনতার বিষয়টিও মাদকবিরোধী নীতির অংশ।
৩ লক্ষ ১০ হাজার বোতল কাশির সিরাপ ধ্বংসের পর মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী অভিযান থামছে না। বালুরঘাটের পরে ইকো পার্ক, এরপর রাজ্যের অন্যত্রও বাজেয়াপ্ত মাদক ধ্বংসের কর্মসূচি হতে পারে বলে প্রশাসনিক তৎপরতা থেকে ইঙ্গিত মিলছে। নেশার অবৈধ কারবারের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতি কতটা কার্যকর হয়, তার পরীক্ষা হবে আগামী দিনের অভিযান, তদন্ত এবং পাচারচক্রের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপে। আপাতত ইকো পার্কে ৩১ কোটি টাকা মূল্যের নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ ধ্বংসের ছবি রাজ্যের মাদকবিরোধী অভিযানের অন্যতম বড় দৃশ্য হয়ে থাকল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari minority voters, Nandigram bypoll 2026 | ‘এবার আপনাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে’, নন্দীগ্রাম-রেজিনগরের সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় বার্তা শুভেন্দু অধিকারীর




