সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার আগেই বাংলায় ফের ভোটের আবহ। এ বার আর বিধানসভা নয়, রাজ্যসভার একটি আসন ঘিরে নির্বাচন হবে পুজোর মধ্যেই। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ কোয়েল মল্লিকের (Koel Mallick) পদত্যাগের ফলে যে আসনটি খালি হয়েছিল, সেখানে আগামী ১৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণের দিন ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, দিনটি দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী। অর্থাৎ, দেবীর বোধনের দিনই রাজ্যসভার ওই আসনে নতুন সদস্য বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। একই দিনে ভোট গণনা করে ফল প্রকাশের কথাও জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সূচী অনুযায়ী, এই ভোটের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হবে ২৯ সেপ্টেম্বর। প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ৬ অক্টোবর। পরের দিন, অর্থাৎ ৭ অক্টোবর হবে মনোনয়নপত্র পরীক্ষা। প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের শেষ সুযোগ ৯ অক্টোবর। ভোট হবে ১৬ অক্টোবর এবং ওই দিনই গণনার মাধ্যমে ফল জানা যাবে। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া ১৯ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার সময়সীমা রাখা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের ১০টি এবং উত্তরাখণ্ডের একটি রাজ্যসভা আসনেও একই দিনে ভোট রয়েছে।
কোয়েল মল্লিকের পদত্যাগের পর থেকেই তাঁর ফেলে যাওয়া আসনটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছিল। চলতি বছরের ১৬ জুলাই রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন অভিনেত্রী। দিল্লিতে গিয়ে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান তথা উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাকৃষ্ণণের (C. P. Radhakrishnan) কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন তিনি। সেই পদক্ষেপের পরই প্রশ্ন উঠেছিল, অল্প সময়ের জন্য রাজ্যসভার সদস্য থাকার পর কেন পদ ছাড়লেন কোয়েল? তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান কী হতে পারে, তা নিয়েও নানা আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে এখনও পর্যন্ত তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সামনে আসেনি। কোয়েল মল্লিকের রাজ্যসভায় যাত্রাটিও ছিল সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনাগুলির মধ্যে। চলতি বছরের শুরুতে রাজ্যসভার নির্বাচনের জন্য তৃণমূল কংগ্রেস যে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কোয়েল। তাঁর পাশাপাশি প্রাক্তন রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার (Rajeev Kumar), প্রাক্তন মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় (Babul Supriyo) ও আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী (Menaka Guruswamy) -এর নামও সামনে এসেছিল। নির্বাচনের পর কোয়েল রাজ্যসভার সদস্য হন। কিন্তু সংসদের উচ্চকক্ষে তাঁর সময়কাল দীর্ঘ হয়নি। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন।
পদত্যাগের দিনই অবশ্য কোয়েলকে ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা নতুন মাত্রা পায়। উপরাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র জমা দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের (Bhupender Yadav) সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। এই সাক্ষাৎ ঘিরে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছিল। কারণ, তৃণমূলের কয়েক জন প্রাক্তন সাংসদের রাজনৈতিক অবস্থান বদলের পর তাঁদের সঙ্গে কেন্দ্রের শাসক শিবিরের নেতাদের যোগাযোগের খবর সামনে এসেছিল। তবে কোয়েল মল্লিক নিজে কোনও নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেননি। ফলে তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে থাকা তথ্যের বাইরে অতিরিক্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। এবার সেই শূন্য আসনেই নতুন করে ভোট হচ্ছে। রাজ্যসভার আসনটি সরাসরি সাধারণ ভোটারদের ভোটে পূরণ হয় না। বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরা এই ধরনের নির্বাচনে ভোট দেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণই এই ভোটের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। প্রার্থীদের মনোনয়ন, তাঁদের সমর্থনে থাকা বিধায়কদের সংখ্যা এ ভোটের অঙ্ক এসব কিছু মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন : Thalapathy Vijay retirement | অভিনয় থেকে অবসর থলপতি বিজয়ের, রাজনীতিতে নতুন ইনিংস
কিন্তু, এই নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ভোটের দিন। দুর্গাপুজো বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই পুজোর ষষ্ঠীর দিনেই রাজ্যসভার ভোট হওয়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পুজোর আবহ একই দিনে মিলবে। ১৬ অক্টোবর ভোটের পর গণনাও সেদিনই হবে বলে নির্বাচন কমিশনের সূচিতে উল্লেখ রয়েছে। ফলে পুজোর আবহের মধ্যেই রাজ্য রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ফল সামনে আসবে।কোয়েলের পদত্যাগের আগে রাজ্যসভায় তৃণমূলের আরও কয়েক জন সদস্য পদ ছেড়েছিলেন। সুখেন্দুশেখর রায় (Sukhendu Sekhar Ray), সুস্মিতা দেব (Sushmita Dev) এবং প্রকাশ চিক বরাইক (Prakash Chik Baraik)-এর পদত্যাগও রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তাঁদের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা পরিবর্তন ঘটেছে। সেই ধারাবাহিকতার মধ্যে কোয়েল মল্লিকের পদত্যাগও আলাদা গুরুত্ব পায়। তবে তাঁর ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত অন্য কোনও দলে যোগদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি।
কোয়েলের রাজ্যসভা সফরের সময়কালও ছিল তুলনামূলক ভাবে সংক্ষিপ্ত। তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভাবে সংসদীয় অধিবেশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। চলতি বছরের বাদল অধিবেশন তাঁর জন্য সংসদে সক্রিয় হওয়ার প্রথম বড় সুযোগ হতে পারত। কিন্তু তার আগেই সদস্যপদ ছাড়ায় সেই সম্ভাবনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এখন মূল প্রশ্ন, খালি হওয়া আসনে কে প্রার্থী হবেন? তৃণমূল কংগ্রেস কী নিজেদের প্রার্থী দেবে, নাকি বিরোধী শিবির থেকেও কোনও নাম সামনে আসবে? তা এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে জানা যায়নি। মনোনয়ন জমার শেষ দিন ৬ অক্টোবর হওয়ায় তার আগেই রাজনৈতিক দলগুলিকে নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে। প্রার্থীদের নাম প্রকাশের পরেই ভোটের প্রকৃত অঙ্ক আরও পরিষ্কার হবে। উল্লেখ্য, একই দিনে উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের রাজ্যসভা আসনেও ভোট রয়েছে। উত্তরপ্রদেশে ১০টি এবং উত্তরাখণ্ডে একটি আসনের জন্য নির্বাচন হবে। ফলে ১৬ অক্টোবর জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও রাজ্যসভা নির্বাচনের দিন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গের একটি শূন্য আসনের নির্বাচন সেই বৃহত্তর নির্বাচনী সূচির অংশ।
রাজ্যসভার এই উপনির্বাচন ঘিরে তাই একদিকে যেমন রয়েছে দুর্গাপুজোর আবহ, অন্য দিকে রয়েছে বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভোটের অঙ্ক। কোয়েল মল্লিকের পদত্যাগে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান কে পূরণ করবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ১৬ অক্টোবর। তার আগে ২৯ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর শুরু হবে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া। বস্তুত, বাংলার রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে পুজোর সময় সাধারণত উৎসবের আবহই প্রধান হয়ে ওঠে। এবার সেই সময়ের মধ্যেই রাজ্যসভার একটি আসনের জন্য ভোট এবং ফল প্রকাশ হতে চলেছে। ফলে দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন শুধু উৎসবের সূচনাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভা রাজনীতির ক্ষেত্রেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কোয়েল মল্লিকের ছেড়ে যাওয়া আসনে শেষ পর্যন্ত কোন নাম উঠে আসে, আর ভোটের ফল কোন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে, এখন নজর সেদিকেই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Koel Mallick US trip, Koel Mallick resignation | ইস্তফা জল্পনার মাঝে আমেরিকায় কোয়েল মল্লিক, নীরবতায় বাড়ছে রহস্য




