সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কোচ বিহার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : কোচবিহারে প্রশাসনিক বৈঠক থেকে নারী নিরাপত্তা, শিশু সুরক্ষা ও বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে পুলিশকে কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari)। উত্তরবঙ্গ সফরের শুরুতেই কোচবিহারে গিয়ে একাধিক প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন তিনি। সেখানেই পকসো (POCSO) মামলায় সরকারের অবস্থান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ছোট শিশু থেকে শুরু করে বোন, দিদি ও মহিলাদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কোনও মহিলা বা শিশুর উপর আক্রমণ কিংবা নির্যাতনের চেষ্টা হলে পুলিশকে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নারী ও শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কোনও ধরনের আপস না করার নির্দেশও দেন।
মঙ্গলবার কোচবিহার দিয়ে উত্তরবঙ্গ সফর শুরু করেন শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এই প্রথম তাঁর কোচবিহার সফর। সফরের শুরুতেই মদনমোহন মন্দিরে গিয়ে পুজো দেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক (Nisith Pramanik)। মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর কোচবিহারের উন্নয়ন নিয়ে একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেলার উন্নয়নমূলক কাজের জন্য অর্থের ঘাটতি রাখা হবে না। রাস্তা, পুর পরিষেবা, বিমানবন্দর, জাতীয় সড়ক এবং সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন বিষয়কে প্রশাসনিক বৈঠকের আলোচনায় রাখা হয়। কোচবিহারে এসে প্রশাসনিক বৈঠকে একাধিক দফতরের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পুজোর আগে রাস্তা সংস্কারের বিষয়টি বিশেষ ভাবে উঠে আসে। পাশাপাশি জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ, পুর এলাকার পরিকাঠামো, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং কোচবিহার বিমানবন্দর নিয়েও আলোচনা হয়। আগামী ২৮ তারিখ কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী রামমোহন নায়ডু (Ram Mohan Naidu) রাজ্যে আসবেন বলে জানান শুভেন্দু। সেই সফরের সময় কোচবিহার বিমানবন্দর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথাও তিনি জানান।
কোচবিহার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। জেলার গুরুত্বপূর্ণ এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে স্নায়ুরোগ এবং হৃদ্রোগ চিকিৎসার পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় পরিষেবার ঘাটতি কেন রয়েছে, তা নিয়েও প্রশাসনিক স্তরে খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা যাতে জেলার বাসিন্দারা পান, সেই বিষয়েও তিনি প্রশাসনকে নজর রাখতে বলেন। তবে প্রশাসনিক বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে নারী ও শিশু সুরক্ষার প্রসঙ্গ। কয়েক দিন আগে কোচবিহারের সাহেবগঞ্জ থানা এলাকায় একটি পাটখেত থেকে ১২ বছরের এক নাবালিকার দেহ উদ্ধারকে ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনার তদন্তের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সেই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন।
বৈঠকে শুভেন্দুর বক্তব্য ছিল, ‘ছোট বাচ্চা, বোন, দিদি, মহিলাদের উপর কেউ আঙুল তুললে সেই আঙুল ভেঙে দিতে হবে।’ তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রশাসনিক নির্দেশের মূল বিষয় ছিল নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। পকসো আইনের আওতায় নাবালকদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে কঠোরতা বজায় রাখার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। নারী নিরাপত্তার পাশাপাশি কোচবিহারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও পুলিশকে একাধিক নির্দেশ দেন শুভেন্দু। সীমান্তবর্তী জেলার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অবৈধ পাচার এবং মাদক সংক্রান্ত অপরাধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। অসমের দিক থেকে বেআইনি ভাবে কয়লা, সুপারি বা অন্যান্য সামগ্রী যাতে রাজ্যে ঢুকতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
মাদক পাচার রুখতেও পুলিশের ভূমিকার উপর জোর দেওয়া হয়। সীমান্ত এলাকায় আফিম বা অন্যান্য নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যের চাষ কিংবা পাচারের সঙ্গে কেউ যুক্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। সীমান্তকে কেন্দ্র করে অপরাধচক্র যাতে সক্রিয় হতে না পারে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধেও কড়া অবস্থানের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কোনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জেলের মুখ দেখতে হতে পারে। সরকারি পরিষেবা ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে কোনও ধরনের আর্থিক অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না বলেও প্রশাসনিক বৈঠকে জানানো হয়। কোচবিহারের সীমান্ত পরিস্থিতিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় জেলার একাধিক এলাকা নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত দিয়ে বেআইনি সামগ্রী পাচার, মাদক পরিবহণ কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যকলাপ আটকাতে পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। জাতীয় সড়ক এবং সীমান্ত নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক সমন্বয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি কোচবিহারের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক দাবির বিষয়ও উঠে আসে। কামতাপুর রাজ্যের দাবিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রসঙ্গে শুভেন্দু বলেন, রাজবংশী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবি ও অধিকার নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজবংশীদের ভোটে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং তাঁদের দাবিগুলি আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে। রাজবংশী ভাষার জন্য অ্যাকাডেমি তৈরির বিষয়েও আর্থিক বরাদ্দের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। এই অ্যাকাডেমির জন্য ৫০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। উত্তরবঙ্গের ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর ইঙ্গিত হিসেবেও বিষয়টি সামনে এসেছে। রাজবংশী ভাষার সাংস্কৃতিক পরিসরকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার ক্ষেত্রে এই ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কোচবিহার সফরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। এর আগে বিরোধী দলনেতা হিসেবে কোচবিহার সফরের সময় শুভেন্দুর কনভয় ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। খাগড়াবাড়ি মোড়ে তাঁর কনভয়ে হামলা ও বুলেটপ্রুফ গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছিল। সেই পুরনো ঘটনার প্রসঙ্গও এ দিনের সফরে উঠে আসে। শুভেন্দু বলেন, তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন এবং মানুষের উপরও তাঁর আস্থা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে একই জেলায় তাঁর প্রশাসনিক সফর তাই রাজনৈতিক দিক থেকেও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কোচবিহারকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। জেলার রাস্তা, পুর পরিষেবা, বিমান যোগাযোগ, চিকিৎসা পরিকাঠামো এবং সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা, একাধিক ক্ষেত্রকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পুজোর আগে রাস্তা মেরামতের কাজ শেষ করার বিষয়েও প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহিলা ও শিশু সুরক্ষার প্রসঙ্গ অবশ্য দিনের বৈঠকে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। পকসো মামলার তদন্তে দ্রুততা, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। নাবালিকা মৃত্যুর সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার পরেই প্রশাসনিক স্তরে এই নির্দেশ দেওয়া হল।
নারী নিরাপত্তার সঙ্গে পুলিশি সক্রিয়তার প্রশ্নও এ দিনের বৈঠকে পাশাপাশি এসেছে। শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নয়, অপরাধ ঠেকাতে আগাম নজরদারি এবং স্থানীয় স্তরে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচার ও মাদক সংক্রান্ত অপরাধ দমনের নির্দেশের সঙ্গেও এই আইনশৃঙ্খলা নীতিকে যুক্ত করা হয়েছে।কোচবিহারের প্রশাসনিক বৈঠকে তাই একাধিক বিষয় একই সঙ্গে উঠে এল—নারী ও শিশু নিরাপত্তা, পকসো মামলা, সীমান্ত সুরক্ষা, পাচার বন্ধ, সরকারি প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম রোধ, রাস্তা সংস্কার, বিমানবন্দর, চিকিৎসা পরিকাঠামো এবং রাজবংশী ভাষার জন্য অ্যাকাডেমি। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী, প্রশাসন ও পুলিশকে একাধিক ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ করতে হবে। উত্তরবঙ্গ সফরের প্রথম দিনেই কোচবিহারকে ঘিরে উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা, দুই ক্ষেত্রেই একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়ে গেলেন শুভেন্দু। কোচবিহারবাসীর জন্য উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে অর্থের অভাব হবে না বলে আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে নারী, শিশু এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে প্রশাসনের অগ্রাধিকারের মধ্যে রাখার কথাও জানান। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর কোচবিহার সফরে উন্নয়নমূলক ঘোষণা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কড়া নির্দেশ, দুই দিকই সমান ভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : CM Suvendu Adhikari on West Bengal Investment | Rs 5000 Crore Investment : সল্টলেকে মুখ্যমন্ত্রীর বড় ঘোষণা! বাংলায় ৫ হাজার কোটির বিনিয়োগ, ১৪০ নতুন স্টোর থেকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প




