সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : এশিয়ান গেমসের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৪৮ রান করেছেন শেফালি বর্মা (Shafali Verma)। সংখ্যাটা হয়তো শতরানের মতো চোখ ধাঁধানো নয়, কিন্তু এই ইনিংসের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। ২৯ বলে ৪৮ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এক বছরে সর্বাধিক রান করার নজির গড়ে ফেললেন ভারতের তরুণ ওপেনার। দক্ষিণ আফ্রিকার লরা উলভার্টকে (Laura Wolvaardt) পিছনে ফেলে এই কীর্তি নিজের নামে করে নিয়েছেন শেফালি। অর্থাৎ এশিয়ান গেমসের সোনার লড়াইয়ে নামার দিনেই ব্যক্তিগত রেকর্ডের তালিকাতেও নতুন পর্ব যোগ হল ভারতীয় ওপেনারের।ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। ইনিংসের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে দেখা যায় শেফালি আর স্মৃতি মন্ধানাকে (Smriti Mandhana)। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দলের লড়াইয়ে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তার ছাপও দেখা যায় ভারতের ব্যাটিংয়ে। প্রথম কয়েক ওভার থেকেই শ্রীলঙ্কার বোলারদের উপর চাপ বাড়াতে থাকেন দুই ওপেনার। বাউন্ডারি তুলনামূলক ছোট হওয়ায় সেই সুবিধাও তাঁরা কাজে লাগান।

আরও পড়ুন : Rohit Sharma Fitness | নতুন রূপে রোহিত শর্মা ফিটনেসে ফের হিটম্যান, সমালোচকদের জবাব দিলেন স্টাইলেই
পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার আগেই ভারতীয় স্কোরবোর্ডে উঠে যায় ৬৭ রান। কোনও উইকেট না হারিয়ে এত দ্রুত রান তুলে ভারতের দুই ওপেনার ফাইনালের শুরুতেই নিজেদের দখলে ম্যাচের গতি নিয়ে নেন। শেফালির ব্যাটিংয়ে ছিল পরিচিত আগ্রাসন, আর স্মৃতি নিজের ছন্দে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন ইনিংস। আগের ম্যাচে শতরান করা শেফালির দিকে স্বাভাবিক ভাবেই নজর ছিল বেশি। তবে ফাইনালে শতরান না এলেও তাঁর ইনিংস ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেয়। ২৯ বলে ৪৮ রান করেন শেফালি। তাঁর ব্যাট থেকে আসে তিনটি চার এবং তিনটি ছক্কা। শেষ পর্যন্ত চামুদি প্রবোদার (Chamudi Prabodha) বলে রিভার্স সুইপ খেলার চেষ্টা করতে গিয়ে উইকেট হারান তিনি। অর্ধশতরানের মাত্র দুই রান আগে থামতে হলেও তার আগেই প্রয়োজনীয় রানটি তুলে ফেলেছিলেন শেফালি। আর সেই রানই তাঁকে নিয়ে যায় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের একটি বড় বিশ্বরেকর্ডের সামনে।
চলতি বছরে শেফালির টি-টোয়েন্টি রান তখন দাঁড়িয়েছিল ৮১৫। এক বছরে সর্বাধিক টি-টোয়েন্টি রান করার নজির গড়তে লরা উলভার্টের রেকর্ড অতিক্রম করার জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল আরও ১০ রান। ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সেই প্রয়োজনীয় রান পেরিয়ে যেতে খুব বেশি সময় নেননি ভারতীয় ওপেনার। ৪৮ রান করার সঙ্গে সঙ্গেই রেকর্ডের নতুন মালিক হয়ে যান তিনি। ২০২৬ সালে এখনও পর্যন্ত ২৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন শেফালি। সেই ম্যাচগুলিতে তাঁর সংগ্রহ ৮৬৩ রান। ব্যাটিং গড় ৩৯.২২ এবং স্ট্রাইক রেট ১৬২.৮৩। একটি শতরান এবং সাতটি অর্ধশতরান রয়েছে তাঁর নামের পাশে। তাঁর সর্বোচ্চ অপরাজিত ইনিংস ১০০ রান। এক বছরে এত বেশি রান করে টি-টোয়েন্টির পরিসংখ্যানে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছেন তিনি। শেফালির এই কীর্তির তাৎপর্য আরও বাড়ে কারণ রেকর্ডটি এসেছে এশিয়ান গেমসের মতো বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে। সেমিফাইনালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শতরান করার পর ফাইনালেও তাঁর ব্যাট চলেছে একই আক্রমণাত্মক মেজাজে। যদিও শেষ পর্যন্ত ৪৮ রান করে সাজঘরে ফিরতে হয়েছে, ততক্ষণে ব্যক্তিগত রেকর্ডের জন্য প্রয়োজনীয় কাজটি হয়ে গিয়েছিল।

শেফালির পাশাপাশি চলতি বছরে ভারতের হয়ে ধারাবাহিক রান করেছেন স্মৃতি মন্ধানাও। বাঁহাতি ওপেনার এ বছর ২২টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৭৬৫ রান করেছেন। তাঁর নামের পাশেও রয়েছে একটি শতরান ও পাঁচটি অর্ধশতরান। এক বছরে টি-টোয়েন্টিতে সর্বাধিক রান করা ব্যাটারদের তালিকায় শেফালির পরেই ভারতের আর এক তারকা ব্যাটারের নাম থাকা ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। ফাইনালের ইনিংসেও স্মৃতি নিজের ভূমিকা যথাযথ ভাবে পালন করেন। শেফালি ফিরে যাওয়ার পর ভারতীয় ইনিংসের গতি কমতে দেননি তিনি। শ্রীলঙ্কার বোলারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বাউন্ডারি বের করে নিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ৪৫ বলে ৭৯ রান করে আউট হন স্মৃতি। তাঁর ইনিংসে ছিল পাঁচটি চার এবং সাতটি ছক্কা। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাট করে ভারতের স্কোরকে বড় জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন তিনি।
ভারতের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur) অবশ্য এই ম্যাচে বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ১৭ বলে ১৯ রান করে ফিরে যান তিনি। ফলে স্মৃতি আউট হওয়ার পরে ভারত ২০০ রানের গণ্ডি পার করবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তখনও ভারতের হাতে ছিল শেষ দিকের ওভার এবং ক্রিজে ছিলেন রিচা ঘোষ (Richa Ghosh)। রিচার ব্যাটিংয়ের ধরনই বদলে দেয় ভারতের শেষ দিকের ইনিংস। খুব অল্প সময়ের মধ্যে রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেন বাংলার উইকেটকিপার-ব্যাটার। মাত্র ২২ বলে ৪৯ রান করেন তিনি। ছ’টি চার এবং তিনটি ছক্কায় সাজানো তাঁর ইনিংস ভারতের স্কোরকে দ্রুত ২০০-র গণ্ডি পার করিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে ২১৬ রান করে ভারত। শেফালির ৪৮, স্মৃতির ৭৯ ও রিচার ৪৯ এই তিনটি ইনিংস ভারতের বড় স্কোরের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। ওপেনিং জুটিতে দ্রুত রান তোলার পর মাঝের ওভারে স্মৃতির দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং শেষ দিকে রিচার ঝোড়ো ব্যাটিং ভারতকে ফাইনালে শক্তিশালী জায়গায় পৌঁছে দেয়। ফলে শ্রীলঙ্কার সামনে দাঁড়ায় ২১৭ রানের বড় লক্ষ্য।

শেফালির ব্যক্তিগত রেকর্ডের দিক থেকেই ম্যাচটি আলাদা হয়ে থাকে। মাত্র ৪৮ রান করেও যে ভাবে এক বছরের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সর্বাধিক রানের রেকর্ড নিজের দখলে নিয়েছেন, তা তাঁর চলতি বছরের ধারাবাহিকতার ছবি তুলে ধরে। বড় ইনিংসের পাশাপাশি ছোট কিন্তু দ্রুতগতির ইনিংসও যে একটি ক্রিকেটারের পরিসংখ্যানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, শেফালির এ দিনের ব্যাটিং তারই উদাহরণ। একই সঙ্গে এই রেকর্ড ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ব্যাটিং গভীরতারও একটি দিক তুলে ধরছে। এক দিকে শেফালি, অন্য দিকে স্মৃতি, দু’জনেই একই বছরে বিপুল রান করে চলেছেন। তাঁদের পিছনে রিচার মতো আক্রমণাত্মক ব্যাটার থাকায় ভারতীয় দলের স্কোরিং ক্ষমতাও আরও বেড়েছে। ফাইনালে সেই সমন্বয়েরই ছবি দেখা যায়। শেফালির বিশ্বরেকর্ডের গল্প অবশ্য শুরু হয়েছিল ফাইনালের আগেই। সেমিফাইনালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শতরান করে তিনি দলকে ফাইনালে পৌঁছতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তার পর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে শিরোপার লড়াইয়ে নামার দিন মাত্র ২৯ বলে ৪৮ রান করে পৌঁছে গেলেন আরও একটি ব্যক্তিগত মাইলফলকে। ফলে এশিয়ান গেমসের এই পর্বে শেফালির ব্যাটিং পরপর দুই ম্যাচেই আলোচনার কেন্দ্রে।
শুধু রানসংখ্যা নয়, শেফালির স্ট্রাইক রেটও তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরন সম্পর্কে ধারণা দেয়। চলতি বছরে ৮৬৩ রান করার পাশাপাশি ১৬২.৮৩ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করেছেন তিনি। টি-টোয়েন্টির দ্রুতগতির ক্রিকেটে নিয়মিত ভাবে বড় রান করার সঙ্গে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ধরে রাখার এই সমন্বয়ই তাঁকে বছরের রান সংগ্রহের তালিকায় এত উপরে নিয়ে এসেছে। এশিয়ান গেমসের ফাইনালের আগে লরা উলভার্টের রেকর্ডই ছিল এক বছরে সর্বাধিক টি-টোয়েন্টি রানের মাপকাঠি। শেফালির হাতে সেই রেকর্ড বদলে গেল। ফাইনালে তাঁর ইনিংস থামল ৪৮ রানে, কিন্তু সেই ৪৮ রানই তাঁকে নিয়ে গেল বিশ্বরেকর্ডের জায়গায়। দলের জন্য বড় রান তোলার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইতিহাসও লিখে ফেললেন ভারতের ওপেনার। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে শেফালি-স্মৃতির ওপেনিং জুটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এদিনও সেই জুটিই ফাইনালের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বোলিং আক্রমণকে চাপে ফেলে দেয়। পরে স্মৃতি এবং রিচার ব্যাটিংয়ে ভারত ২১৬ রানে পৌঁছয়। আর সেই ইনিংসের মধ্যেই নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেন শেফালি, এক বছরে টি-টোয়েন্টিতে সর্বাধিক রান করা ক্রিকেটার হিসেবে।
এশিয়ান গেমসের ফাইনাল তাই শেফালির কাছে শুধু একটি শিরোপার লড়াই ছিল না। সেমিফাইনালের শতরানের পর ফাইনালের ৪৮ রান, তার সঙ্গে বিশ্বরেকর্ড, পরপর দুই ম্যাচে তাঁর ব্যাটিং ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের এই তারকার ধারাবাহিকতার নতুন পরিসংখ্যান তৈরি করল। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ফাইনালের মঞ্চে ২৯ বলের ইনিংসটিই হয়ে থাকল তাঁর ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি যাত্রার অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Smriti Mandhana record, Smriti Mandhana highest run scorer | ইতিহাস লিখলেন স্মৃতি মন্ধানা! টি-২০ ক্রিকেটে সবাইকে টপকে নতুন রেকর্ড ভারতের তারকার




