সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের পুরনো বিতর্ক ফের উসকে দিলেন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র (Madan Mitra)। দলের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে (Sovandeb Chattopadhyay) নিশানা করে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন তিনি। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের সময় সই জালিয়াতির অভিযোগ থেকে শুরু করে দল ভাঙার জন্য দায়ী করার দাবি, মদনের বক্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে।
মদন মিত্রের অভিযোগ, বিরোধী দলনেতার পদ পাওয়ার জন্য শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষে বিধায়কদের সই জাল করা হয়েছিল। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সূত্রের বক্তব্য। প্রকাশ্য সভা বা রাজনৈতিক বক্তব্যে মদন অবশ্য এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই শোভনদেবকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। কামারহাটির বিধায়কের বক্তব্যে উঠে এসেছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) প্রতিও প্রশ্ন। কেন দলের অভ্যন্তরের এই পরিস্থিতি তিনি মেনে নিলেন, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মদন। তাঁর কথায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমি নমস্কার জানাব, শ্রদ্ধা জানাব। শুধু চোখের জল ফেলে এটুকুই বলব, কেন সহ্য করলেন আপনি?’
এরপরই শোভনদেবকে নিশানা করে তাঁর বয়স ও রাজনৈতিক অতীত নিয়েও কটাক্ষ করেন মদন। তাঁর দাবি, বিরোধী দলনেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই বিধায়কদের সই জাল করার ঘটনা ঘটেছিল। আক্রমণের সুর আরও চড়িয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বিরোধী দলনেতা হওয়ার জন্য এত হ্যাংলা কেন?’ শোভনদেবের রাজনৈতিক জীবনের পুরনো ঘটনাও টেনে আনেন তিনি। মদনের বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকার কারণেই দলের মধ্যে ভাঙন তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে তদন্তের দাবিও তুলেছেন কামারহাটির বিধায়ক। তাঁর কথায়, ‘তদন্ত কমিশন বসুক। সব বেরিয়ে আসবে।’ একই সঙ্গে শোভনদেবকে উদ্দেশ্য করে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের তরফে একাধিকবার সুযোগ পেয়েছেন বর্ষীয়ান এই নেতা। মদনের অভিযোগের নিশানায় শুধু শোভনদেব নন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তও রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা করার ক্ষেত্রে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল এবং বিধায়কদের সই সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় বলে দাবি করেন তিনি।
বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের সময় সই নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল বিধানসভায় জমা দেওয়া একটি রেজোলিউশনকে ঘিরে। ভোটের ফল প্রকাশের পর বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করে একটি প্রস্তাব জমা পড়েছিল। সেই নথিতে তৃণমূলের বহু বিধায়কের সই ছিল বলে দাবি করা হয়। পরে কয়েকজন বিধায়কের সই নিয়ে আপত্তি ওঠে। তাঁদের পুরনো নথিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে নতুন নথির স্বাক্ষরের মিল নেই বলে অভিযোগ সামনে আসে। সই নিয়ে ওঠা প্রশ্ন দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নেয়। দলের একাধিক নেতা এই ঘটনায় আপত্তি জানাতে শুরু করেন বলে সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। কালীঘাটের নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁদের দূরত্বও বাড়তে থাকে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আখরুজ্জামান-সহ কয়েকজন নেতার অবস্থান নিয়ে তখন দলের অন্দরে আলোচনা শুরু হয়। পরে ঘটনাপ্রবাহ আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সই জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে বিধানসভায় অভিযোগ জমা পড়ার কথাও সামনে আসে। সূত্রের দাবি, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপান সাহা এই বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে তাঁদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনার পর তৃণমূলের অন্দরের বিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসে। এই ঘটনাক্রমকেই সামনে রেখে মদন মিত্র দাবি করছেন, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পেছনে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে পুরো ঘটনাটি সামনে আসবে। যদিও মদনের অভিযোগের প্রতিটি দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় তৃণমূলের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই নেতাকেই প্রকাশ্যে এমন আক্রমণ করার ঘটনা তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে চর্চা তৈরি করেছে। মদন মিত্র নিজেও তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নেতা এবং তাঁর প্রকাশ্য মন্তব্য সাধারণত রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পায়। ফলে তাঁর এই বক্তব্যের পর দলের ভিতরের সমীকরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে। মদনের বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণের সুরও ছিল যথেষ্ট তীব্র। তিনি দাবি করেন, শোভনদেব তাঁকে একসময় ‘সার্কাসের ক্লাউন’ বলেছিলেন। পালটা জবাবে তিনি নিজেকে ক্লাউন বলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আপনি তো বড় ক্লাউন। আপনার থেকেই তো শিখেছি।’ এই মন্তব্য ঘিরেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। মদন আরও দাবি করেছেন, দলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) সিদ্ধান্তের দিকেও প্রশ্ন তোলা উচিত। তাঁর বক্তব্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, বিরোধী দলনেতা নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া বিভাজন, তিনটি বিষয়ই এক সূত্রে এসেছে।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ এই বিতর্কের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনই বলা কঠিন। রাজ্য রাজনীতিতে বিরোধী দলনেতার পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিধানসভায় বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব, দলীয় বিধায়কদের সমন্বয় এবং সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান, সব ক্ষেত্রেই ওই পদের গুরুত্ব রয়েছে। তাই ওই পদকে ঘিরে কোনও বিতর্ক তৈরি হলে তার রাজনৈতিক অভিঘাতও বড় হতে পারে। সই জালিয়াতির অভিযোগের পাশাপাশি দলের মধ্যে একাধিক নেতার বহিষ্কার, নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব এবং দুই শিবিরে বিভাজনের যে ছবি সামনে এসেছে, তা তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। মদন মিত্রের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই পুরনো বিতর্ককেই ফের প্রকাশ্যে নিয়ে এল। এখন লক্ষ্য থাকবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এই অভিযোগের কোনও জবাব দেন কি না, এবং সই জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে তদন্তের পর কোনও নতুন তথ্য সামনে আসে কি না। মদন মিত্র ইতিমধ্যেই তদন্তের দাবি তুলেছেন। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের স্তর পেরিয়ে ফের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক আলোচনায় জায়গা করে নিতে পারে। তৃণমূলের অন্দরের এই প্রকাশ্য তরজা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম নজরকাড়া বিষয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Madan Mitra statement controversy, TMC vs BJP Bengal hawker issue | ‘ক্ষমতায় নেই তবুও ভয়’ মদন মিত্রর মন্তব্যে উত্তাল রাজ্য রাজনীতি




