মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: মাইক্রোফোন হাতে শ্রেয়া ঘোষাল (Shreya Ghoshal) মানেই মুগ্ধতা। একের পর এক হিট গান, দেশ-বিদেশে অনুষ্ঠান, রেকর্ডিংয়ের ব্যস্ততা, গানের জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ তিনি। কিন্তু মঞ্চের ঝলমলে দুনিয়ার বাইরে শ্রেয়ার আর এক পরিচয়, তিনি স্ত্রী ও মা। কাজের ব্যস্ততার সঙ্গে কীভাবে সংসার সামলান শ্রেয়া? স্বামী শিলাদিত্য মুখোপাধ্যায়ের (Shiladitya Mukhopadhyaya) সঙ্গে কীভাবে ভাগ করে নেন ঘরের দায়িত্ব? সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে সেই অন্দরমহলের গল্পই শোনালেন গায়িকা। আর শিলাদিত্যকে নিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। শ্রেয়ার কথায়, সংসার সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর স্বামী কোনও কাজকেই শুধু তাঁর দায়িত্ব বলে মনে করেন না। নিজের প্রয়োজনের কাজ নিজেই করে নিতে পছন্দ করেন শিলাদিত্য। শুধু নিজের থালা-বাসন ধোয়া নয়, রান্নাঘর পরিষ্কার করার মতো কাজও নিজের হাতে করেন তিনি। এমনকি শ্রেয়া স্বামীর হয়ে সেই কাজ করে দিতে গেলেও নাকি তিনি খুশি হন না!
শিলাদিত্যকে নিয়ে বলতে গিয়ে শ্রেয়া বলেন, ‘আমি ভাগ্য করে এই মানুষটাকে পেয়েছি। ও পুরো বাড়িটা সামলায়। নিজের মতো করে থাকতে ভালবাসে বলে ও নিজেই নিজের থালা-বাসন ধুয়ে নেয়, রান্নাঘর পরিষ্কার করে। আমি সেগুলি করে দিলে বরং ও রেগে যায়।’ শ্রেয়ার এই কথাতেই ধরা পড়েছে তাঁদের সংসারের এক অন্য রকম সমীকরণ। যেখানে ঘরের কাজ নিয়ে ‘কার দায়িত্ব কতটা’ সেই হিসাব কষার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী দু’জনেই কাজ করে নেন। আর এই অভ্যাস যে এক দিনে তৈরি হয়নি, সেটিও জানিয়েছেন গায়িকা।
দু’জনের পেশাই যথেষ্ট ব্যস্ততাপূর্ণ। শ্রেয়ার গানের অনুষ্ঠান, রেকর্ডিং, সফর নিয়ে বছরের একটা বড় সময় কেটে যায় বাড়ির বাইরে। কখনও দিনের পর দিন, কখনও আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য অন্য শহর বা দেশে থাকতে হয় তাঁকে। অন্য দিকে, শিলাদিত্যও নিজের পেশাগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাই সংসার চালানোর জন্য একজনকে সব সময় বাড়িতে থাকতেই হবে, এমন কোনও নিয়ম তাঁদের সম্পর্কে নেই। শ্রেয়ার মতে, দু’জনেই একে অপরের কাজকে সম্মান করেন। একজন বাইরে থাকলে অন্য জন নিজের মতো করে বাড়ির দায়িত্ব সামলে নেন। এই বোঝাপড়াই তাঁদের দাম্পত্যের অন্যতম বড় শক্তি।
নিজেদের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে শ্রেয়া বলেন, ‘আমরা দু’জনেই সারাদিন কঠিন পরিশ্রম করি। তাই সংসারের কাজও একসঙ্গে করি। ও কখনও বলেনি, তুমি বাড়িতে কেন নেই। অনেক সময়ে আমি মাসের পর মাস বাড়িতে থাকি না। আমাদের প্রেমের সময় থেকেই ও এই বিষয়টা এমনই ছিল। ও জানত, আমি ওর জন্য থাকব। ওর কোনও অহমিকা নেই, আমারও নেই। এই দিক থেকে আমরা দু’জনেই একই রকম।’ এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, শ্রেয়া-শিলাদিত্যের সম্পর্কের ভিতটা কতটা পুরনো। তাঁদের পরিচয় কোনও তারকা-জগতের ঝলমলে অনুষ্ঠানে নয়, স্কুলজীবনেই। ছোটবেলা থেকেই বন্ধুত্ব ছিল দু’জনের। সময়ের সঙ্গে সেই বন্ধুত্ব গড়ায় প্রেমে। পরে সেই সম্পর্কই পরিণতি পায় বিয়েতে।
শ্রেয়ার গানের কেরিয়ারের উত্থানের সময়ও পাশে ছিলেন শিলাদিত্য। ‘দেবদাস’ (Devdas) ছবির মাধ্যমে পেশাদার গানের দুনিয়ায় বড় সুযোগ পান শ্রেয়া। সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর (Sanjay Leela Bhansali) ছবিতে গান গাওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করে নেন তিনি। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় গান তাঁর ঝুলিতে আসে। বাংলা-সহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়ে শ্রেয়া হয়ে ওঠেন ভারতীয় সংগীতের অন্যতম পরিচিত কণ্ঠ। সেই সময় শিলাদিত্যও নিজের কেরিয়ার নিয়ে এগোচ্ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে। একজনের জগৎ গান, অন্য জনের কর্মক্ষেত্র প্রযুক্তি পেশার দিক থেকে দু’জনের পথ আলাদা হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কে সেই ব্যবধান কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
২০১৫ সালে বিয়ে করেন শ্রেয়া ঘোষাল ও শিলাদিত্য মুখোপাধ্যায়। বিয়ের পরও নিজের গানের কেরিয়ার একই গতিতে এগিয়ে নিয়ে যান শ্রেয়া। অন্য দিকে, শিলাদিত্যও নিজের পেশাগত জীবন সামলাতে থাকেন। ফলে তাঁদের দাম্পত্যের শুরু থেকেই দু’জনেরই কাজের চাপ ছিল। সেই পরিস্থিতিতে সংসারকে কী ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তার নিজস্ব ছন্দ তৈরি করে নিয়েছিলেন তাঁরা। এরপর ২০২১ সালে তাঁদের জীবনে আসে নতুন অতিথি। জন্ম হয় তাঁদের পুত্রসন্তান দেবযানের (Devyaan)। বাবা-মা হওয়ার পর বদলে যায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবন। সন্তানকে ঘিরে নতুন দায়িত্ব যোগ হয় দু’জনেরই। কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততাও থেমে থাকেনি শ্রেয়ার।
আরও পড়ুন : Alka Yagnik health condition | জন্মদিনে আবেগঘন বার্তা, পুরনো স্মৃতিতে ভাসলেন সঙ্গীতজগৎ
মা হওয়ার পর নিজের কাজের সময় নিয়েও সচেতন হন গায়িকা। সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার জন্য কাজের সূচিতে বদল আনেন তিনি। শ্রেয়ার কাছে পেশা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই পরিবার ও সন্তানকে সময় দেওয়াও সমান জরুরি। আর এই জায়গাতেই শিলাদিত্যের সহযোগিতা তাঁর জন্য বড় ভূমিকা নেয়। এখন তাঁদের জীবনের অনেকটা জুড়েই রয়েছেন দেবযান। সন্তানকে ঘিরে দু’জনের ব্যস্ততা যেমন রয়েছে, তেমনই নিজেদের পেশাগত কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। শ্রেয়ার কথায়, দু’জনেই শান্ত স্বভাবের মানুষ। তাই সংসারে অযথা চাপ তৈরি না করে নিজেদের মতো করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তাঁদের পছন্দ।
শ্রেয়ার বক্তব্যের আরও একটি দিক নজর কেড়েছে। তিনি জানিয়েছেন, শিলাদিত্যের মধ্যে কোনও অহমিকা নেই। তাঁর নিজেরও নেই। অর্থাৎ, কে বেশি সফল, কে বেশি ব্যস্ত, কে সংসারে বেশি কাজ করছেন, এই ধরনের তুলনা তাঁদের সম্পর্কে জায়গা পায় না। বরং দু’জনের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাস। বিশেষ করে শ্রেয়ার মতো একজন তারকার ক্ষেত্রে এই বোঝাপড়ার গুরুত্ব আরও বেশি। গানের অনুষ্ঠানের জন্য দীর্ঘ সফর করতে হয় তাঁকে। কাজের প্রয়োজনে দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে থাকা তাঁর জীবনের অংশ। এমন পরিস্থিতিতে সঙ্গীর সহযোগিতা না থাকলে পরিবার ও পেশা দু’দিক সামলানো কঠিন হতে পারে। শিলাদিত্য সেই জায়গায় তাঁকে নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন বলেই জানালেন শ্রেয়া। আর তাই শিলাদিত্যের থালা-বাসন ধোয়া কিংবা রান্নাঘর পরিষ্কার করার ঘটনা নিছক ঘরের কাজের গল্প নয়। শ্রেয়ার বক্তব্যে এটি তাঁদের সম্পর্কের পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ছবিও হয়ে উঠেছে। স্ত্রী জনপ্রিয় গায়িকা বলে বাড়ির সব দায়িত্ব তাঁর উপর থাকবে, এমন ভাবনা শিলাদিত্যের নেই। একই ভাবে শ্রেয়াও স্বামীর কাজকে নিজের দায়িত্বের অংশ বলে ধরে নিয়ে সব কিছু নিজের হাতে তুলে নেন না।
দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব, প্রেম, বিয়ে এবং সন্তান, সময়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের পরিধি বেড়েছে। তার পরেও সেই পুরনো বন্ধুত্বের জায়গাটা যেন রয়ে গিয়েছে। কাজের চাপ থাকলেও একে অপরকে সময় দেওয়ার চেষ্টা, সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্মান করা, এই তিনটিই তাঁদের দাম্পত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শ্রেয়ার সাম্প্রতিক মন্তব্য তাই অনুরাগীদের সামনে তাঁর তারকা-জীবনের বাইরের একটি পরিচিত ছবি তুলে ধরেছে। মঞ্চে যিনি হাজার হাজার মানুষকে গান শোনান, সেই শ্রেয়াই বাড়ি ফিরে এমন এক সংসারের অংশ, যেখানে স্বামী নিজের থালা নিজেই ধুয়ে ফেলেন, রান্নাঘর পরিষ্কার করেন এবং স্ত্রী তাঁর হয়ে সেই কাজ করে দিলে বরং রেগে যান! তারকা দম্পতির এই সহজ, স্বাভাবিক সংসার-সমীকরণই এখন অনুরাগীদের আলোচনায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Arijit Singh, Shreya Ghoshal | অরিজিৎ সিং -এর প্লেব্যাক থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তে শিল্পীর স্বাধীনতার পক্ষেই সওয়াল শ্রেয়া ঘোষালের




