সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পুজোর আবহের মধ্যেই বাংলার রাজনীতিতে ফের ভোটের উত্তাপ। নন্দীগ্রাম (Nandigram) ও রেজিনগর (Rejinagar) বিধানসভা কেন্দ্র-সহ পশ্চিমবঙ্গের দু’টি আসনে উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। কমিশনের নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, আগামী ৬ অক্টোবর ছ’টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। ভোটের ফল প্রকাশ করা হবে ৯ অক্টোবর। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি তামিলনাড়ু (Tamil Nadu), অসম (Assam) ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতেও উপনির্বাচন হবে। ফলে উৎসবের মরসুম শুরুর আগেই একাধিক রাজ্যে রাজনৈতিক প্রচারের ব্যস্ততা বাড়তে চলেছে। নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত তথ্যেও উপনির্বাচনকে শূন্য হওয়া আসন পূরণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের ঘোষিত সূচী অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। ১৭ সেপ্টেম্বর হবে মনোনয়নপত্র পরীক্ষা। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৯ সেপ্টেম্বর। এরপর শুরু হবে মূল নির্বাচনী লড়াই। পশ্চিমবঙ্গের দুই কেন্দ্র নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর ছাড়াও তামিলনাড়ুর মাদুরান্থাকম (Madurantakam) ও ধর্মপুরম (Dharmapuram), অসমের নগাঁও (Nagaon) এবং পুদুচেরির (Puducherry) থাট্টাঞ্চাভাডি (Thattanchavady) বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট হবে।
আরও পড়ুন :
নন্দীগ্রামকে ঘিরে এবারের উপনির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব আলাদা। পূর্ব মেদিনীপুরের এই কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের রাজনীতিতে অত্যন্ত আলোচিত। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর তৎকালীন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী। পরবর্তী সময়ে তিনি নন্দীগ্রামের বিধায়ক হিসেবে বিধানসভায় বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সরকারি নথিতেও ২১০ নম্বর নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের সদস্য হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম এবং তাঁর বিরোধী দলনেতা পরিচয় রয়েছে। নন্দীগ্রামের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক সম্পর্ক অবশ্য ২০২১ সালের ভোটে এসে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে এই এলাকায় তাঁর সাংগঠনিক প্রভাব রয়েছে। ২০০৭ সালের জমি আন্দোলনের পর নন্দীগ্রাম রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে গুরুত্ব অর্জন করে, তার সঙ্গে শুভেন্দুর রাজনৈতিক উত্থানের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। সেই কারণে উপনির্বাচনে বিজেপি (Bharatiya Janata Party) এই আসন ধরে রাখতে মরিয়া থাকবে। অন্য দিকে, তৃণমূল কংগ্রেসও নন্দীগ্রামকে নিছক একটি উপনির্বাচন হিসেবে দেখতে চাইবে না। ২০২১ সালের ফলের স্মৃতি, দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং আসন পুনর্দখলের লক্ষ্য, ইত্যাদি মিলিয়ে এই কেন্দ্রের লড়াইয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ যথেষ্ট বাড়তে পারে।
তবে উপনির্বাচনের ফল নিয়ে আগাম কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সহজ নয়। প্রার্থী নির্বাচন, স্থানীয় সংগঠনের অবস্থান, ভোটারদের মনোভাব এবং নির্বাচনী প্রচারের কৌশল, সবকিছুর উপর ফল নির্ভর করবে। বিশেষ করে উপনির্বাচনে সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় ভোটের সমীকরণ অনেক সময় বদলে যায়। তাই নন্দীগ্রামে বিজেপির শক্ত অবস্থান থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল কী দাঁড়ায়, তা জানতে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে রেজিনগর (Rejinagar) উপনির্বাচনেও রয়েছে আলাদা রাজনৈতিক সমীকরণ। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, দুই কেন্দ্র থেকে জয়ী হওয়ার পর রেজিনগর আসনটি খালি হয়েছে। একই সময়ে নওদা (Nawda) আসন ধরে রেখে রেজিনগর ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও এই উপনির্বাচনের পটভূমিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে রেজিনগরে নতুন করে রাজনৈতিক লড়াই শুরু হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দলগুলির কাছে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জনসংখ্যার বিন্যাস ও দীর্ঘদিনের ভোটের ধারা বিবেচনায় রেজিনগরের লড়াই নন্দীগ্রামের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। এই আসনে প্রার্থী বাছাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল, প্রত্যেকেই নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার পাশাপাশি বিরোধী শিবিরের ভোটে ভাগ বসানোর চেষ্টা করবে। ফলে মনোনয়নপর্ব শেষ হওয়ার পর থেকেই রেজিনগরে প্রচারের মাত্রা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উপনির্বাচনের ঘোষণার পর এখন নজর থাকবে প্রার্থী তালিকার দিকে। কোন দল কাকে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে প্রার্থী করে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হতে পারে। নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী বাছাই যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তৃণমূল কংগ্রেস কাকে সামনে আনে, সেটিও ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। রেজিনগরেও প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা, সংগঠন এবং ভোটের হিসাবকে গুরুত্ব দিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলিকে। নির্বাচন কমিশনের সূচী অনুযায়ী, মনোনয়ন জমা ও পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ১৯ সেপ্টেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হবে। তার পরেই চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা সামনে আসবে। হাতে থাকবে প্রচারের জন্য সীমিত সময়। ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণের আগে রাজনৈতিক দলগুলিকে সভা, মিছিল, বাড়ি-বাড়ি প্রচার এবং কর্মী সংগঠনের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছতে হবে। পুজোর ঠিক আগের সময়ে এই ভোট হওয়ায় প্রচারের সময় এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনাও দলগুলির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর দুই কেন্দ্রের উপনির্বাচন তাই শুধু বিধানসভার দু’টি শূন্য আসন পূরণের প্রক্রিয়া নয়, রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক প্রভাব বনাম তৃণমূলের সংগঠন, আর রেজিনগরে স্থানীয় ভোটের অঙ্ক—দুই ক্ষেত্রেই নজর থাকবে ভোটারদের সিদ্ধান্তের দিকে। ৬ অক্টোবর ইভিএমে বন্দি হবে সেই সিদ্ধান্ত। তিন দিন পর, ৯ অক্টোবর খুলবে ফলের খাতা। পুজোর আগে বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে তাই আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। নন্দীগ্রাম কি বিজেপির দখলেই থাকবে, নাকি তৃণমূল পুরনো জমি ফেরত পাওয়ার লড়াইয়ে সফল হবে? রেজিনগরে কোন দল নিজেদের অবস্থান শক্ত করবে? এই দুই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৯ অক্টোবর। তার আগে মনোনয়ন থেকে ভোট গ্রহণ, প্রতিটি ধাপেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Naoda Rejinagar Result 2026, AJUP Candidate Humayun Kabir: নওদা-রেজিনগরে চমক! নির্দল মুখ হুমায়ুন কবীরের ডাবল লিড, মুর্শিদাবাদে নতুন সমীকরণ




