সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দুর্গাপুজো (Durga Puja) সামনে রেখে পুজো কমিটিগুলির জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। এ বছরও রাজ্যের পুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যোগ্য পুজো কমিটিগুলির জন্য এক লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে বড় বাজেটের পুজো কমিটিগুলির কাছে সরকারি অনুদান না নেওয়ার আবেদনও রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। যেসব পুজো কমিটির ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা ছাড়া আয়োজন চালানো কঠিন, তাদের জন্যই এই অর্থ বরাদ্দ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সোমবার মিলনমেলা প্রাঙ্গণে দুর্গাপুজো কমিটিগুলির সঙ্গে বৈঠকে বসেন শুভেন্দু। সেই বৈঠকেই পুজোর আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, দমকলের ছাড়পত্র, মদ বিক্রি, ডিজে, বিসর্জন এবং পুজোর উদ্বোধন নিয়ে একাধিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ফলে এ বছরের দুর্গাপুজোয় উৎসবের পাশাপাশি প্রশাসনিক নিয়মকানুনও বেশ কিছু ক্ষেত্রে বদলাতে চলেছে।
সরকারি অনুদানের পরিমাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। বৈঠকে শুভেন্দু জানান, এবার পুজো কমিটিগুলিকে এক লক্ষ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। তবে যে সমস্ত পুজো কমিটির বাজেট যথেষ্ট বড় এবং নিজেদের অর্থেই পুজো পরিচালনা করার সামর্থ্য রয়েছে, তাদের সরকারি অর্থ গ্রহণ না করার আবেদন করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘যাঁরা সক্ষম, তাঁদের কাছে সরকারের আর্থিক সাহায্য না নেওয়ার আবেদন করছি। যাঁদের এই টাকা ছাড়া পুজো করা কঠিন, তাঁদের জন্য সরকার এক লক্ষ টাকা দেবে।’ পুজোর অনুদান প্রসঙ্গে পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) আমলের নীতিরও সমালোচনা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, একসময় ২৫ হাজার টাকা দিয়ে দুর্গাপুজোয় সরকারি অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরে সেই অঙ্ক বেড়ে এক লক্ষ টাকার বেশি হয়েছিল। এবার নতুন সরকার এক লক্ষ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারি অনুদানের উপরে অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুধু নগদ অনুদান নয়, পুজো কমিটিগুলিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী জানান, পুজো কমিটিগুলিকে বিদ্যুৎ সংক্রান্ত খরচ থেকে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পুজো কমিটিগুলিকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। কলকাতার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসির (CESC) সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। পুজোর আগে দমকলের ছাড়পত্র নেওয়ার ক্ষেত্রেও কমিটিগুলিকে কোনও অর্থ দিতে হবে না বলে জানানো হয়েছে। পুজো মণ্ডপের নিরাপত্তা এবং অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম অবশ্যই মেনে চলতে হবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের জন্য আলাদা করে টাকা নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু। এর ফলে পুজো কমিটিগুলির একাধিক খাতে খরচ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি শব্দদূষণ নিয়েও কড়া অবস্থানের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ বছর রাজ্যের কোনও দুর্গাপুজোয় ডিজে বাজানো যাবে না বলে ঘোষণা করা হয়েছে। পুজোর মিছিল, শোভাযাত্রা কিংবা অন্য কোনও কর্মসূচিতেও ডিজে ব্যবহারের অনুমতি থাকবে না। শুভেন্দু বলেন, ‘এ বার পুজোয় ডিজে বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি। আপনারা সহযোগিতা করবেন।’ উল্লেখ্য, অষ্টমীর দিন মদ বিক্রির ক্ষেত্রেও থাকছে নিষেধাজ্ঞা। ওই দিন রাজ্যের মদের দোকান বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে পানশালাতেও মদ পরিবেশন বা বিক্রি করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে। পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন অষ্টমীতে এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। আইনশৃঙ্খলা এবং উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। পুজোর প্রতিমা এবং মণ্ডপ তৈরির ক্ষেত্রেও উদ্যোক্তাদের সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এমন কোনও বিষয় মণ্ডপসজ্জা বা প্রতিমায় রাখা যাবে না, যা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আঘাত করতে পারে। পুজোর থিম তৈরির সময়েও আয়োজকদের এই বিষয়টি মাথায় রাখার আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে মহালয়ার আগে পুজোর উদ্বোধন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার পরেই উদ্বোধনের কর্মসূচী করার কথা জানানো হয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষেত্রেও এবার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ২৫ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো (Kojagari Lakshmi Puja)। তার আগের দিন অর্থাৎ ২৪ অক্টোবরের মধ্যে দুর্গাপ্রতিমার নিরঞ্জন শেষ করতে হবে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় পঞ্জিকা ও প্রচলিত রীতি অনুসরণ করা হয়। সেই কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিসর্জন শেষ করার ব্যবস্থা করা হবে। বিসর্জনের সময় ঘাটে ক্রেন ব্যবহারের উপরও নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি দুর্গাপুজোর বিসর্জন বা শোভাযাত্রার কারণে জাতীয় সড়ক বন্ধ করা যাবে না। সাধারণ মানুষের যাতায়াতে যাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি না হয়, সেই বিষয়টি মাথায় রেখে পুজো কমিটিগুলিকে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।
এবার পুজোয় কার্নিভালও হবে না বলে ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। আগের সরকারের আমলে কলকাতায় দুর্গাপুজোর কার্নিভালকে ঘিরে বড় আয়োজন করা হলেও এবার সেই ব্যবস্থা থাকছে না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘যে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা ছিল, সেই কার্নিভাল হচ্ছে না।’ এর পরিবর্তে মহালয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের তরফে পৃথক কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। মহালয়ার দিন কলকাতার ইডেন গার্ডেনে (Eden Gardens) বড় অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটন দফতর এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর যৌথ ভাবে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে (Narendra Modi) সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রায় চার ঘণ্টার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি ড্রোন এবং আতশবাজির প্রদর্শনীও থাকবে। মহালয়ার দিন থেকেই রাজ্যজুড়ে দুর্গোৎসবের আবহ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
দীঘাতেও দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে পর্যটন দফতর। মহালয়ার পর রাজ্যের ছ’টি শহরে দু’দিন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে। কলকাতার চারটি ঘাটও সাজিয়ে তোলা হবে। পুজোর দিনগুলিতে শহর ও জেলার বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষের জন্য নানা আয়োজন রাখার কথা জানানো হয়েছে। ঠাকুর দেখার ক্ষেত্রেও বিশেষ কিছু উদ্যোগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। দিব্যাঙ্গজন এবং বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকদের জন্য পৃথক ভাবে প্রতিমা দর্শনের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের যাতে ভিড়ের কারণে সমস্যায় পড়তে না হয়, সেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে সাধারণ দর্শনার্থীদের যাতায়াতেও যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করার কথা বলা হয়েছে।
পুজো কমিটিগুলিকে উৎসাহ দিতে এবারও শারদ সম্মানের আয়োজন করবে রাজ্য সরকার। শ্রেষ্ঠ প্রতিমা, শ্রেষ্ঠ মণ্ডপ, পরিবেশবান্ধব পুজো, জনসমাগম ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের মতো বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু। মণ্ডপ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত মৃৎশিল্পীদের কাজকেও পুরস্কারের আওতায় আনা হবে। বিচার প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য বিচারকদের দায়িত্ব দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। নতুন পুজো কমিটিগুলির ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক নিয়ম মেনে চলার আবেদন করা হয়েছে। মণ্ডপ নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সংযোগ, প্রতিমা নিরঞ্জন এবং শোভাযাত্রা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট বিধি অনুসরণ করতে হবে। পুজোকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের চলাচল, যানবাহন এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও আয়োজকদের মাথায় রাখতে বলা হয়েছে।
ফলে এ বছরের দুর্গাপুজোয় একদিকে থাকছে পুজো কমিটিগুলির জন্য এক লক্ষ টাকার সরকারি সহায়তা, বিনামূল্যে বিদ্যুৎ ও দমকলের ছাড়পত্রে আর্থিক ছাড়, অন্যদিকে ডিজে নিষেধাজ্ঞা, অষ্টমীতে মদ বিক্রি বন্ধ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিসর্জন ও জাতীয় সড়ক অবরোধ না করার মতো একাধিক বিধিনিষেধও থাকছে। পুজো যত এগিয়ে আসবে, প্রশাসনের তরফে নিরাপত্তা ও যান চলাচল নিয়ে আরও নির্দেশিকা প্রকাশ করা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।




