সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় পদক্ষেপের পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দীর্ঘদিন ধরে পরিকাঠামোগত সমস্যায় থাকা স্কুলগুলিকে নতুন করে সাজিয়ে তুলতে ৩০০ কোটি টাকার সমন্বিত অনুদানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জরাজীর্ণ ভবন থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, বেঞ্চ, পানীয় জল এবং অন্যান্য মৌলিক সুযোগসুবিধার ঘাটতি মেটানোর কাজে এই অর্থ ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে প্রতিটি জেলায় দু’টি করে ‘সিএম শ্রী’ স্কুল (CM Shri School West Bengal) তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য সরকারি স্কুলগুলিতে পড়াশোনার পরিবেশ আরও উন্নত করা। বহু জায়গায় বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের অভাবে স্কুল ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও শ্রেণিকক্ষের ছাদ মেরামতের প্রয়োজন, কোথাও পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই, আবার কোথাও পড়ুয়াদের বসার জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবের ঘাটতি রয়েছে। কয়েকটি স্কুলে খেলার মাঠ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর সমস্যাও রয়েছে। ৩০০ কোটি টাকার বরাদ্দের মাধ্যমে এই ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা দফতরের পরিকল্পনায় পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্কুলকে মডেল হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিটি জেলায় দুটি করে সিএম শ্রী স্কুল তৈরির পরিকল্পনা সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের ‘প্রধানমন্ত্রী শ্রী’ (CM Shri School West Bengal) স্কুলের আদলে রাজ্যের এই স্কুলগুলিকে সাজানো হবে। সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, উন্নত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞান ও কম্পিউটার ল্যাব, খেলাধুলার সুযোগ এবং পড়াশোনার সঙ্গে সহশিক্ষামূলক কার্যকলাপের উপর গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, একটি সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো কেবল ভবন বা শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পড়ুয়ারা কতটা স্বচ্ছন্দ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারছে, তাদের জন্য নিরাপদ শৌচাগার রয়েছে কি না, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া যাচ্ছে কি না, এসব বিষয়ও শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সেই কারণে পরিকাঠামোগত ঘাটতি পূরণে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করা বহু পরিবারের কাছে স্কুলের পরিকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক কারণে অনেক পড়ুয়ার পক্ষে বেসরকারি স্কুলের খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। ফলে সরকারি ও সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলির মানোন্নয়ন হলে বৃহৎ সংখ্যক ছাত্রছাত্রী তার সুবিধা পেতে পারেন। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্সল এলাকার স্কুলগুলিতে প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা বাড়লে স্থানীয় পড়ুয়াদের শিক্ষাজীবনে তার প্রভাব পড়তে পারে। সিএম শ্রী স্কুলের পরিকল্পনাতেও রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতিটি জেলায় দুটি করে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষা পরিকাঠামোর মডেল তৈরি হতে পারে। স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও কম্পিউটার ল্যাব, খেলাধুলার উপযুক্ত পরিকাঠামো, এসবের মাধ্যমে স্কুলশিক্ষাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য রয়েছে। শুধু পরীক্ষাভিত্তিক পড়াশোনা নয়, পড়ুয়াদের ব্যবহারিক জ্ঞান ও শারীরিক সক্ষমতার উপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রান্তিক এলাকার ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেশি। বড় শহরগুলির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা সহজে পাওয়া যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক স্কুলে এখনও তা পর্যাপ্ত নয়। সিএম শ্রী স্কুলের মতো আধুনিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জেলায় তৈরি হলে সেই ব্যবধান কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্যান্য স্কুলও পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে উপকৃত হলে স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক মান বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে। শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলার পরিকাঠামো উন্নয়নেও রাজ্য সরকার আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হল স্থানীয় স্তরে ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করা ও তাঁদের আরও উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা। ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স, ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলায় প্রতিভাবান তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণের জন্য উন্নত পরিকাঠামো তৈরি হলে রাজ্য ও জাতীয় স্তরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পথও আরও সুগম হতে পারে।
উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় খেলাধুলার প্রতি তরুণদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। কিন্তু উপযুক্ত মাঠ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রশিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব অনেক সময় প্রতিভাকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না। সেন্টার অফ এক্সিলেন্স তৈরির উদ্যোগ সেই ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় প্রতিভাকে নিজের এলাকার কাছাকাছি প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া গেলে পরিবারের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপও কমতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থার আর একটি পরিবর্তনের বিষয়ও সামনে এসেছে। স্কুলের পাঠ্যক্রমে স্যার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Syama Prasad Mukherjee) ও স্বামী প্রাণবানন্দ (Swami Pranavananda) -এর অবদান যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ গঠনের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁদের ভূমিকার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাজ্যের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পাঠ্যক্রমের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় ইতিহাস, ব্যক্তিত্ব ও রাজ্যের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়গুলি পড়াশোনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের রাজ্যের অতীত সম্পর্কে আরও জানতে পারবেন। পশ্চিমবঙ্গের গঠন, দেশভাগের প্রেক্ষাপট এবং সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পাঠ্যক্রমে আলোচনা থাকলে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সম্পর্ক বোঝার সুযোগও তৈরি হয়। তবে পরিকাঠামো উন্নয়নের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি কাজের গুণমান, সময়সীমা এবং রক্ষণাবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ৩০০ কোটি টাকা কোন কোন স্কুলে কীভাবে ব্যয় করা হবে, কোন প্রতিষ্ঠান আগে সংস্কারের আওতায় আসবে এবং কাজ শেষ হওয়ার পর পরিকাঠামো কতটা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, এসব বিষয়েও নজর রাখতে হবে। কারণ নতুন ভবন বা মেরামতের কাজের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে কয়েক বছর পর ফের একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সিএম শ্রী স্কুলগুলির ক্ষেত্রেও পরিকাঠামো তৈরির পাশাপাশি শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিয়মিত শিক্ষার মান যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হবে। আধুনিক শ্রেণিকক্ষ বা কম্পিউটার ল্যাব তৈরি হলেই শিক্ষার মান বদলে যায় না; সেই সুযোগগুলি কীভাবে শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার উপরও ফলাফল নির্ভর করে। একই ভাবে খেলাধুলার কেন্দ্র তৈরি করার পর প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। রাজ্য সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনায় তাই একই সঙ্গে রয়েছে পুরনো স্কুলের সংস্কার, নতুন মডেল স্কুল তৈরি, ক্রীড়া পরিকাঠামো বাড়ানো এবং পাঠ্যক্রমে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় যুক্ত করার উদ্যোগ। ৩০০ কোটি টাকার অনুদান মূলত স্কুলের পরিকাঠামোগত দুর্বলতা কাটানোর কাজে ব্যবহৃত হলে বহু সরকারি ও সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হতে পারে। আর প্রতিটি জেলায় দুটি করে সিএম শ্রী স্কুল তৈরি হলে আধুনিক শিক্ষার পরিকাঠামো রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি নতুন কাঠামো তৈরি হবে।
শিক্ষা ও খেলাধুলাকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখার ফলে পড়ুয়াদের সামগ্রিক বিকাশের উপরও জোর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একদিকে যেখানে নিরাপদ ও উন্নত স্কুল ভবন এবং আধুনিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সেখানে মাঠ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলের পরিকাঠামোয় কতটা পরিবর্তন আসে, তার দিকেই নজর থাকবে পড়ুয়া, অভিভাবক ও শিক্ষামহলের। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ কার্যকর ভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারি স্কুলের চেহারায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের মেরামতির প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, উন্নত ক্রীড়া পরিকাঠামো এবং ইতিহাসভিত্তিক পাঠ্যক্রম, তিনটি ক্ষেত্রেই একসঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবের মাটিতে পৌঁছয় এবং কতগুলি স্কুল সরাসরি তার সুফল পায়, সেটিই হয়ে উঠবে পরবর্তী বড় বিষয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari on Bengal disaster response force | অর্জুন বাহিনী গড়ছে রাজ্য, থাকবেন প্রাক্তন সেনা ও অগ্নিবীর! বিপর্যয় মোকাবিলায় বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর




