মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের পরিচয় কোনও একটি সময়ের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। প্রজন্ম বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে, সিনেমা তৈরির ধরন পাল্টেছে, প্রযুক্তির দুনিয়ায় এসেছে আমূল পরিবর্তন, কিন্তু উত্তমকুমার (Uttam Kumar) এখনও বাঙালির চলচ্চিত্র-স্মৃতির অন্যতম উজ্জ্বল মুখ। তাঁর জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে সেই মহানায়ককে স্মরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। রবিবার, ৩০ অগস্ট ‘মন কী বাত’-এর ১৩৭তম পর্বে বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তী অভিনেতার অভিনয়জীবন, পরিশ্রম, বহুমুখী প্রতিভা ও সমাজসেবামূলক কাজের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য যে, আগামী ৩ সেপ্টেম্বর উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ। সেই উপলক্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিছু দিনের মধ্যেই, আগামী ৩ সেপ্টেম্বর, আমরা মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ পালন করব।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী -এর কথায়, উত্তমকুমার ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক শিল্পী, যাঁর অভিনয় দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। শুধু জনপ্রিয়তার নিরিখে নয়, অভিনয়ের গভীরতা ও চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষমতার কারণেও তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। উত্তমকুমারকে স্মরণ করতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে উঠে আসে পরিচালক সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) -এর সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথাও। বাংলা চলচ্চিত্রের দুই কিংবদন্তীর এই সৃষ্টিশীল সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ (Nayak) ছবিতে উত্তমকুমারের অভিনয় এখনও ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত পর্ব। প্রধানমন্ত্রীর কথাতেও সেই প্রসঙ্গ ফিরে আসে। তিনি বলেন, ‘সিনেপ্রেমীরা বিশ্বাস করেন যে সত্যজিৎ রায় ‘নায়ক’ ছবির পুরো চিত্রনাট্যটা উত্তমকুমারকে মাথায় রেখেই লিখেছিলেন।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও উঠে আসে সত্যজিৎ রায়ের উত্তমকুমার সম্পর্কে মূল্যায়নের কথা। তাঁর কথায়, রায়ের মতে উত্তমকুমারের মধ্যে সম্ভ্রমের পাশাপাশি গভীর আবেগ ছিল এবং যে কোনও চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার জন্য তিনি প্রচণ্ড পরিশ্রম করতেন।
‘নায়ক’ ছবিতে অরিন্দম মুখোপাধ্যায় চরিত্রে উত্তমকুমারের অভিনয় বাংলা সিনেমার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। জনপ্রিয় এক চলচ্চিত্র তারকাকে কেন্দ্র করে এক দিনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে তাঁর অতীত, সাফল্য, অনুশোচনা, ভয়, সম্পর্ক আর আত্মবিশ্লেষণকে তুলে ধরেছিলেন সত্যজিৎ রায়। উত্তমকুমারের তারকা-সত্তা এবং অভিনয়ক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়েই তৈরি হয়েছিল চরিত্রটি। ফলে ছবিটি মুক্তির বহু দশক পরেও ‘নায়ক’ নিয়ে আলোচনা থামেনি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উত্তমকুমারের সমাজসেবামূলক কাজের কথাও উল্লেখ করেন। অভিনয়ের বাইরে মানুষের পাশে থাকার যে মানসিকতা তাঁর মধ্যে ছিল, সেটিও জন্মশতবর্ষের আগে তাঁকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উঠে এসেছে। নরেন্দ্র মোদীর কথায়, উত্তমকুমারের জীবন থেকে প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার শিক্ষা পাওয়া যায়। সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছনোর পিছনে তাঁর অধ্যবসায় এবং পরিশ্রমের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের আরও একটি তাৎপর্য রয়েছে। কারণ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমারের প্রভাব কেবল তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা কিংবা জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষার দর্শকের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। প্রেমের নায়ক, পারিবারিক গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, সামাজিক ছবির অভিনেতা কিংবা গভীর মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র, বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্ম অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়ের। পরবর্তী সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত হন উত্তমকুমার নামে। তাঁর অভিনয়জীবনের শুরুটা অবশ্য আজকের দৃষ্টিতে যতটা সহজ বলে মনে হয়, বাস্তবে ততটা ছিল না। একের পর এক ছবিতে কাজ করার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি। পরে সেই জায়গাই তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মহানায়ক’-এর মর্যাদা এনে দেয়। তিন দশকের বেশি সময়ের কর্মজীবনে উত্তমকুমার শুধু অভিনেতা হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। পরিচালক, প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার হিসাবেও কাজ করেছেন। ক্যামেরার সামনে তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন ছিল, তেমনই সিনেমার নির্মাণপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল। নিজের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্রকে আরও সমৃদ্ধ করার নানা কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।
‘হারানো সুর’ (Harano Sur), ‘সপ্তপদী’ (Saptapadi), ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (Sare Chuattar), ‘চিড়িয়াখানা’ (Chiriakhana), ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ (Anthony Firingee) তাঁর অভিনীত ছবির তালিকা বাংলা চলচ্চিত্রের এক দীর্ঘ ইতিহাসের মতো। প্রতিটি ছবিতে চরিত্রের ধরন আলাদা, গল্পের পরিবেশ আলাদা, অভিনয়ের প্রয়োজনও আলাদা। তবু প্রতিটি ছবিতে নিজের অভিনয়ের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গিয়েছেন উত্তম কুমার। বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের (Suchitra Sen) সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা সিনেমার জনপ্রিয়তার ইতিহাসে আলাদা অধ্যায় তৈরি করেছে। পর্দায় তাঁদের রসায়ন বহু দশক ধরে দর্শকের কাছে আলোচনার বিষয়। ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’-র মতো ছবিতে তাঁদের জুটি প্রেমের চলচ্চিত্রের এক বিশেষ ধারাকে জনপ্রিয় করে তোলে। তবে উত্তমকুমারের অভিনয়জীবনকে কেবল সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর কাজের ব্যাপ্তি অনেকটাই আড়ালে থেকে যাবে।
সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ -এর পাশাপাশি ‘চিড়িয়াখানা’র মতো ছবিতেও তাঁর অভিনয়ের অন্য দিক দেখা গিয়েছিল। আবার ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-তে একেবারে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। চরিত্র অনুযায়ী ভাষা, শরীরী অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার ধরন এবং আবেগের প্রকাশ বদলে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর অন্যতম বড় শক্তি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উত্তমকুমারের পরিশ্রমের প্রসঙ্গ তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সাধারণ দর্শকের কাছে জনপ্রিয় তারকার জীবন অনেক সময় কেবল পর্দার সাফল্য দিয়েই বিচার করা হয়। কিন্তু একটি চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে অভিনেতাকে কতটা প্রস্তুতি নিতে হয়, উত্তমকুমারের দীর্ঘ কর্মজীবন তারও একটি উদাহরণ। চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের অভিনয়ের ধরন বদলাতে তিনি যে কতটা যত্নবান ছিলেন, তাঁর বিভিন্ন ছবির দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। উল্লেখ্য, উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচির আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক ও শিল্পীমহলের কাছে এই বছরটি তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তাঁর অভিনীত ছবি নিয়ে নতুন করে আলোচনা, পুরনো ছবি প্রদর্শন, তাঁর কাজের মূল্যায়ন এবং বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানের পুনর্পাঠ, নানা ভাবে জন্মশতবর্ষ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, কিছু দিন আগে কলকাতায় একটি পথসভায় যাওয়ার সময় উত্তমকুমারের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সেই সময় তিনি মহানায়কের একটি প্রতিকৃতিও উপহার পেয়েছিলেন বলে জানান। সেই স্মৃতির কথাও ‘মন কী বাত’-এ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের আগে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উত্তমকুমার চিরদিন মানুষের হৃদয়ে রাজ করবেন।’ মাত্র কয়েকটি শব্দে মহানায়কের সঙ্গে বাঙালির দীর্ঘ সম্পর্কের কথাই যেন উঠে এসেছে। কারণ ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তমকুমারের মৃত্যু হলেও তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি এখনও বাংলা সংস্কৃতির জীবন্ত অংশ। প্রসঙ্গত, ১৯৮০ সালের সেই জুলাইয়ের পর কেটে গিয়েছে চার দশকেরও বেশি সময়। কিন্তু উত্তমকুমারের ছবি এখনও টিভি দর্শকদের টানে, তাঁর সংলাপ এখনও মানুষের মুখে শোনা যায়, তাঁর অভিনীত চরিত্র নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। নতুন প্রজন্মের দর্শকও তাঁর অভিনয় আবিষ্কার করছে ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে। ফলে সময়ের সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তার ধরন বদলালেও তাঁর উপস্থিতি হারিয়ে যায়নি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনেক তারকা এসেছেন, নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন এবং সময়ের সঙ্গে তাঁদের জনপ্রিয়তার মাত্রা বদলেছে। উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কটি অন্য রকম। তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই একটি নির্দিষ্ট সময়, এক ধরনের অভিনয়, একাধিক জনপ্রিয় জুটি ও বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের স্মৃতি সামনে চলে আসে। তাঁর জন্মশতবর্ষ তাই শুধু একজন অভিনেতার জন্মদিনের শতবর্ষ নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের পুনর্পাঠও। নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে সেই শিল্পীসত্তার পাশাপাশি উঠে এসেছে তাঁর অধ্যবসায়, বহুমুখী কাজ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাও। আগামী ৩ সেপ্টেম্বর ১০০ বছরে পা দেবে উত্তমকুমারের জন্মস্মৃতি। তিনি শারীরিক ভাবে নেই বহু বছর, কিন্তু তাঁর সিনেমা, তাঁর চরিত্র এবং তাঁর অভিনয়ের উত্তরাধিকার এখনও বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে বহমান। জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা সেই উত্তরাধিকারকে জাতীয় পরিসরে আরও এক বার আলোচনায় নিয়ে এল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Uttam Kumar Suchitra Sen Holi | দোলের রঙে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন




