সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই আবেগ, প্রত্যাশা আর ইতিহাস তৈরির লড়াই। সেই মঞ্চেই আবার মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা (Argentina) ও স্পেন (Spain)। একদিকে লিওনেল মেসির (Lionel Messi) নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার হাতছানি, অন্যদিকে নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য নিয়ে স্পেনের আগ্রাসী পরিকল্পনা। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে একটি মাত্র গোলেই নির্ধারিত হয়ে যায় ম্যাচের ভাগ্য। বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস (Ferran Torres) -এর সেই গোল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
স্কোরলাইন যতই ১-০ হোক, মাঠের খেলায় স্পেনের প্রভাব ছিল অনেকটাই বেশি, এমনটাই মনে করছেন ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ। ম্যাচের নানা পরিসংখ্যান ও কৌশলগত বিশ্লেষণ ঘেঁটে উঠে আসছে আর্জেন্টিনার হারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রথমেই আসে স্পেনের মিডফিল্ড দখলের বিষয়টি। পুরো ম্যাচে মাঝমাঠে যে নিয়ন্ত্রণ স্পেন বজায় রেখেছিল, তা আর্জেন্টিনাকে স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে দেয়নি। রদ্রি (Rodri) ও পেদ্রির (Pedri) মতো খেলোয়াড়রা দ্রুত পাস, বল দখল ও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা নেন। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা বারবার চাপে পড়ে যান। ফলে আক্রমণে ওঠার সুযোগ কমে যায়। এক দর্শকের কথায়, ‘মাঝমাঠে বল পেলেই স্পেন সেটা কেড়ে নিচ্ছিল, আর্জেন্টিনার কোনও রিদম তৈরি হচ্ছিল না।’
দ্বিতীয়ত, লিওনেল মেসির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করা মেসিকে এদিন প্রায় নিষ্ক্রিয় করে রাখে স্পেন। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে (Luis de la Fuente) মেসিকে ঘিরে বিশেষ রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা সাজান। রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজ (Fabian Ruiz) মিলে তাকে ঘনিষ্ঠভাবে চেপে রাখেন। ফলে মেসি নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেননি। পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচের শুরুতে দীর্ঘ সময় বলের সংস্পর্শই পাননি তিনি। এমনকি পুরো ম্যাচে উল্লেখযোগ্য কোনও আক্রমণ তৈরি করতেও পারেননি। তৃতীয় কারণ হিসেবে উঠে আসে, এঞ্জো ফার্নান্দেজ (Enzo Fernandez) -এর লাল কার্ড। ম্যাচের একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় ফাউলের জন্য মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। তখন ম্যাচ গড়াচ্ছে অতিরিক্ত সময়ের দিকে, আর সেই সময় একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে খেলতে হওয়া আর্জেন্টিনার জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্পেন শেষ দিকে আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায়। সেই চাপ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত গোল হজম করে আর্জেন্টিনা।
চতুর্থত, রক্ষণভাগে চোট বড় প্রভাব ফেলে। লিসান্দ্রো মার্টিনেজ (Lisandro Martinez) ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো (Cristian Romero) এই দুই নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডারের অনুপস্থিতি দলের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ম্যাচের মাঝপথেই চোটের কারণে তাঁদের মাঠ ছাড়তে হয়। এর ফলে ডিফেন্সের সংগঠন ভেঙে পড়ে ও পেছন থেকে বল গড়ে তোলার ক্ষমতাও কমে যায়। স্পেন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আক্রমণ বাড়াতে থাকে। এবং পঞ্চম কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে আর্জেন্টিনার আক্রমণে গতি না থাকা। ফাইনালের আগে একাধিক ম্যাচে গোলবন্যা বইয়ে দেওয়া আর্জেন্টিনা এদিন আক্রমণে প্রায় নিষ্প্রভ ছিল। কোচ লিওনেল স্কালোনি (Lionel Scaloni) তুলনামূলক রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেন। ফলে দল অনেকটাই নিজেদের অর্ধে থেকে যায়। আক্রমণে লোকসংখ্যা কম থাকায় গোলের সুযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা খুব কম শট নিতে পেরেছে, এবং লক্ষ্যে তেমন কোনও শট ছিল না।
অন্যদিকে স্পেন একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যায়। তাদের শটের সংখ্যা ও লক্ষ্যে নেওয়া শট দুই ক্ষেত্রেই ব্যবধান ছিল চোখে পড়ার মতো। এই পরিসংখ্যানই ম্যাচে কার দখল বেশি ছিল, তার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু খেলায় ফাইনাল ম্যাচে হার মানেই সব শেষ নয়। তবে এই হার আর্জেন্টিনার জন্য বড় ধাক্কা। দীর্ঘদিন পর টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ এসেছিল তাদের সামনে। কিন্তু নানা কারণের জেরে সেই স্বপ্ন পূরণ হল না। অন্যদিকে স্পেন তাদের কৌশল, ধৈর্য ও পরিকল্পনার মাধ্যমে শিরোপা ঘরে তোলে। ম্যাচ শেষে অনেকেই বলছেন, ‘ফুটবলে কৌশল আর দলগত পারফরম্যান্সই শেষ কথা।’ এই ফাইনাল সেই কথাকেই আবার সামনে নিয়ে এল। মাঠে লম্বা লড়াই দেখাল, ছোট ছোট সিদ্ধান্তই বড় ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Argentina comeback, Messi semifinal victory | ৮৪ মিনিটের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন! ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা, মেসির মুখে জয়ের আসল রহস্য




