শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বলিউডের প্রচলিত তারকা-সম্পর্কের গল্প থেকে খানিকটা আলাদা পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ (Anurag Kashyap) ও শুভ্রা শেট্টীর (Shubra Shetty) সম্পর্ক। বয়সের ব্যবধান প্রায় দুই দশক, সম্পর্কের শুরুতে পরিবারের উদ্বেগ, ব্যক্তিগত জীবনকে দীর্ঘদিন সংবাদমাধ্যমের নজর থেকে দূরে রাখার চেষ্টা, এসবকিছুর মধ্যেই একে অপরের পাশে থেকেছেন তাঁরা। প্রায় ১১ বছরের এই সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি দু’জনে একসঙ্গে কথা বলায় ফের আলোচনায় এসেছে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা পর্ব। শুভ্রা শেট্টী মূলত বিনোদন জগতের প্রচারের আলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকলেও নিয়মিত ভাবে সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেননি তিনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বয়স ৩০-এর কোঠায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে তাঁর যোগ থাকলেও অভিনেত্রী হিসেবে নয়, নির্মাণের নেপথ্যের কাজের সঙ্গেই তাঁর নাম জড়িয়েছে। জানা যায়, একসময় অনুরাগ কাশ্যপের প্রযোজনা সংস্থা ফ্যানটম ফিল্মসের (Phantom Films) সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসাবেও তিনি কাজ করেছিলেন ।

অনুরাগ ও শুভ্রার সম্পর্কের কথা প্রথম দিকে খুব বেশি মানুষের জানা ছিল না। দু’জনে একসঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, পার্টি এবং চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত আয়োজনে উপস্থিত হলেও সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতেন না। নিজেদের ব্যক্তিগত পরিসর নিজেদের মধ্যেই রাখতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সমাজমাধ্যমে একসঙ্গে ছবি প্রকাশ্যে আসার পরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। প্রায় এক দশক আগে অনুরাগ শুভ্রার সঙ্গে একটি ছবি সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নেওয়ার পর তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর পর সংবাদমাধ্যমেও তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে খবর প্রকাশিত হতে থাকে। শুভ্রার কথায়, সম্পর্কের প্রথম দিকে তাঁরা ইচ্ছা করেই বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একবার সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরে আগের মতো ব্যক্তিগত পরিসর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এই সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত বিষয় তাঁদের বয়সের ব্যবধান। অনুরাগ ও শুভ্রার মধ্যে বয়সের ফারাক প্রায় ২০ থেকে ২১ বছর। শুভ্রা যখন অনুরাগের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ২০। অন্য দিকে, অনুরাগ তখন জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন। এর আগে তাঁর দুটি বিয়ে হয়েছিল এবং তাঁর একটি সন্তানও রয়েছে। ফলে সম্পর্কের শুরুতে বয়সের ব্যবধান ও পরিচালকের অতীত নিয়ে শুভ্রার পরিবারের উদ্বেগ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না।
শুভ্রা নিজেও জানিয়েছেন, তাঁর বাবা-মায়ের সংশয়কে তিনি অস্বাভাবিক বলে মনে করেননি। তাঁদের জায়গা থেকে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করাই স্বাভাবিক ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়। শুভ্রার পরিবারও ধীরে ধীরে তাঁদের সম্পর্ককে মেনে নেয়। মজার বিষয় হল, বয়সের ব্যবধান নিয়ে শুভ্রার তুলনায় অনুরাগের নিজের মধ্যেই অস্বস্তি বেশি কাজ করেছিল। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে পরিচালক জানিয়েছেন, সম্পর্কের একেবারে শুরুর দিকে তিনি নিজেই বয়সের ফারাক নিয়ে ভাবতেন। এমনকী এক পর্যায়ে শুভ্রাকে নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন। অনুরাগের কথায়, ‘আমি বয়সের ব্যবধান নিয়ে নিজের মধ্যেই অস্বস্তিতে ভুগতাম। একটা সময়ে ওকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।’ তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা মূলত বয়সের হিসাব থেকেই তৈরি হয়েছিল। শুভ্রার বয়স বাড়ার সঙ্গে তাঁর চেহারায় তেমন পরিবর্তন না আসায় নিজের বয়সের বিষয়টি পরিচালকের কাছে আরও বেশি অনুভূত হত বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অন্য দিকে, শুভ্রার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খানিকটা আলাদা। সম্পর্কের প্রথম দিকে অনুরাগের জীবনের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি ছিল। তিনি ইতিমধ্যে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে বহু অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন। শুভ্রা তখন জীবনের অনেক কিছুই নতুন করে দেখছেন। তাই অনুরাগ তাঁকে নিজের মতো করে পৃথিবীকে জানার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। শুভ্রা জানিয়েছেন, অনুরাগ তাঁকে কখনও নিজের সঙ্গে আটকে রাখতে চাননি। বরং তিনি চেয়েছিলেন, শুভ্রা নিজের পছন্দ, কাজ এবং জীবন সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নিন। শুভ্রার কথায়, ‘ও অনেক কিছু দেখেছিল, আমি তখনও তেমন কিছু দেখিনি। তাই ও চাইত আমি বাইরে যাই, নিজের পথ খুঁজি।’ এই জায়গাটিই তাঁদের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে। সম্পর্কের শুরুতেই অনুরাগ শুভ্রাকে নিজের জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভাবে জড়িয়ে নেওয়ার বদলে সময় দিয়েছিলেন। শুভ্রা নিজের মতো করে জীবনকে চিনুন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিন, এমন ভাবনাই ছিল পরিচালকের।
এমনকী, তাঁদের প্রেমের কথা প্রথম প্রকাশ করেছিলেন অনুরাগই। শুভ্রা জানিয়েছেন, সম্পর্কের ব্যাপারে অনুরাগ নিজের অনুভূতি সম্পর্কে তুলনামূলক ভাবে আগে নিশ্চিত হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম ভালবাসার কথা জানান। কিন্তু তার পরেও শুভ্রাকে তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে বলেননি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বই, সিনেমা ও চলচ্চিত্র উৎসবের মতো নানা বিষয়ে তাঁদের আগ্রহ তাঁদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। দু’জনের মধ্যে সিনেমা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা যেমন হয়েছে, তেমনই বই পড়া কিংবা চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের মিল রয়েছে। এমনকি অনুরাগের তুলনায় শুভ্রা বেশি চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছেন বলেও জানা যায়।

তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় শুটিং করার সময়। শুভ্রা একটি সম্পূর্ণ ছবির শুটিংয়ে অনুরাগের সঙ্গে ছিলেন। দীর্ঘ সময় পাশাপাশি কাজ করার সেই অভিজ্ঞতা পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, কাজের জায়গাতেও শুভ্রার সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া কতটা গভীর, সেই উপলব্ধি তৈরি হয় অনুরাগের। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকেই অনুরাগ বুঝতে পারেন, শুভ্রার সঙ্গে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্তটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে স্বাভাবিক। বয়সের হিসাব, পারিবারিক আপত্তি কিংবা সম্পর্ক নিয়ে বাইরের আলোচনা, কোনও কিছুই শেষ পর্যন্ত তাঁদের দীর্ঘ সম্পর্ককে ভেঙে দিতে পারেনি। বর্তমানে অনুরাগ ও শুভ্রা বেঙ্গালুরুতে থাকেন। মুম্বাইয়ের ব্যস্ত চলচ্চিত্রজগতের পরিবেশ থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে নতুন শহরে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। অবশ্য অনুরাগের পেশাগত ব্যস্ততা এখনও যথেষ্ট। পরিচালনার পাশাপাশি প্রযোজনা এবং অভিনয়ের কাজেও তাঁকে দেখা যায়। সম্প্রতি পরিচালকের আসনে আবার ফিরেছেন অনুরাগ। তাঁর পরিচালিত ‘বন্দর’ (Bandar) ছবিতে অভিনয় করেছেন ববি দেওল (Bobby Deol)। ছবিটি ৫ জুন ভারতে মুক্তি পেয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের একটি চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, অনুরাগ কাশ্যপ ও শুভ্রা শেট্টীর সম্পর্কের গল্প তাই শুধু বয়সের ব্যবধানের কারণে আলোচনায় আসা কোনও সম্পর্কের গল্প নয়। একদিকে রয়েছে দু’দশকের কাছাকাছি বয়সের ফারাক, অন্য দিকে রয়েছে নিজের মতো করে জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ। সম্পর্কের শুরুতে যে বিষয়গুলি তাঁদের জন্য কঠিন ছিল, সময়ের সঙ্গে সেগুলিই পরিণত হয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অংশে। প্রায় ১১ বছর ধরে চলা এই সম্পর্ক এখনও তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। আর এত বছর পর নিজেদের সম্পর্কের কথা নিয়ে দু’জনের মুখ খোলা সেই পুরনো গল্পকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Alia Bhatt BAFTA 2026 | কান-এর ঝলক পেরিয়ে বাফটা ২০২৬-এ উপস্থাপিকার আসনে আলিয়া ভাট! বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় তারকার নতুন মাইলফলক




