সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ১৯ আগস্ট : রাজ্য পুলিশের প্রায় ১২ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের প্রক্রিয়া ফের আইনি জটিলতায় আটকে গেল। ২০২৪ সালে তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মেধাতালিকা প্রকাশের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছে কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি বা ইডব্লিউএস (EWS) সংরক্ষণ সংক্রান্ত নিয়ম ঠিক ভাবে মানা হয়নি, এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই আদালতের এই নির্দেশ। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেধাতালিকা প্রকাশ করা যাবে না বলে জানিয়েছেন বিচারপতি অমৃতা সিংহ (Amrita Sinha)। রাজ্য পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগের জন্য ২০২৪ সালে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। প্রায় ১২ হাজার শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল নিয়োগ প্রক্রিয়া। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আবেদন গ্রহণ, লিখিত পরীক্ষা এবং পরবর্তী ধাপের কাজ এগিয়ে যায়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তার পরে চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ার একাধিক ধাপ শেষ হওয়ার পর মেধাতালিকা প্রকাশের প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সেই সময়েই আদালতে ওঠে সংরক্ষণ সংক্রান্ত অভিযোগ।
মামলাকারী সুদীপ্ত চক্রবর্তীর (Sudipta Chakraborty) অভিযোগ, কনস্টেবল নিয়োগে ইডব্লিউএস প্রার্থীদের জন্য যে সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রযোজ্য, তা নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ ভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সংরক্ষণের নিয়ম কী ভাবে কার্যকর করা হয়েছে, নিয়োগের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সেই নীতি মানা হয়েছে কি না, তা নিয়েই মূল আপত্তি জানানো হয়েছে আদালতে। এই অভিযোগের পর মেধাতালিকা প্রকাশের আগে বিষয়টি বিচারাধীন হয়ে পড়ে। বুধবার বিচারপতি অমৃতা সিংহের বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। শুনানিতে মামলাকারীর হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী অনিন্দ্য লাহিড়ি (Anindya Lahiri) এবং অর্কদেব বিশ্বাস (Arkadeb Biswas)। তাঁদের বক্তব্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংরক্ষণ কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। মামলার নথি ও অভিযোগ বিবেচনা করার পর আদালত আপাতত মেধাতালিকা প্রকাশ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই নিয়োগের মেধাতালিকা প্রকাশ করা যাবে না। ফলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগের পরবর্তী ধাপও আপাতত অপেক্ষায় থাকবে। হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর কাছে এই নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ লিখিত পরীক্ষা এবং সাক্ষাৎকারের মতো একাধিক ধাপ পেরিয়ে তাঁরা এখন চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায় ছিলেন। মেধাতালিকা প্রকাশ না হওয়ায় তাঁদের নিয়োগের ভবিষ্যৎও আদালতের পরবর্তী শুনানির দিকে তাকিয়ে থাকবে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু ২০২৪ সালে। সে সময় রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার ক্ষমতায় ছিল। পুলিশে কনস্টেবল পদে বিপুল সংখ্যক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বহু চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেন। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় পুলিশের জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরির অপেক্ষায় থাকা তরুণদের কাছেও এই নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লিখিত পরীক্ষা হওয়ার পর প্রার্থীদের একাংশ নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিয়মকানুন নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরে সেই অভিযোগের অংশ আদালত পর্যন্ত পৌঁছয়।
২০২৫ সালের নভেম্বরে নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার পরে ২০২৬ সালের শুরুতে সাক্ষাৎকার পর্বও শেষ হয়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্টারভিউ নেওয়ার পরে প্রার্থীদের মধ্যে মেধাতালিকা প্রকাশের অপেক্ষা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইডব্লিউএস সংরক্ষণ নিয়ে দায়ের হওয়া মামলার কারণে সেই তালিকা প্রকাশের পথে আপাতত আদালতের বাধা এল। রাজ্যে সরকারী নিয়োগ ঘিরে আইনি জটিলতা অবশ্য নতুন নয়। গত কয়েক বছরে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং পুরসভা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ নিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। একাধিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার তদন্তও হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি তদন্ত করেছে। নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলেছে এবং এখনও কয়েকটি মামলা বিচারাধীন। সেই আবহেই পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ নীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি রাজনৈতিক ভাবেও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল সরকারের আমলে শুরু হওয়া নিয়োগ প্রক্রিয়া বর্তমানে নতুন সরকারের সময় এসে আইনি বাধার মুখে পড়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই এই নিয়োগ নিয়ে আইনি জটিলতার সূত্রপাত হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন এই নিয়োগ প্রক্রিয়া কী ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তা নিয়েও আদালতের তরফে সরকারের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছিল।
মেধাতালিকা প্রকাশে স্থগিতাদেশের ফলে এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। বহু প্রার্থী লিখিত পরীক্ষা এবং সাক্ষাৎকার শেষ করে নিয়োগের শেষ ধাপের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের কাছে আদালতের এই নির্দেশের অর্থ হল, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আদালত পরবর্তী শুনানিতে সংরক্ষণ সংক্রান্ত অভিযোগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্যান্য দিক খতিয়ে দেখার পরে পরবর্তী নির্দেশ দিতে পারে। ইডব্লিউএস সংরক্ষণ নিয়ে মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে কারণ সরকারি নিয়োগে বিভিন্ন শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট সংরক্ষণ কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামো প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনও ত্রুটি হয়েছে কি না, তা নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণই পরবর্তী পদক্ষেপের দিশা ঠিক করবে। মেধাতালিকা প্রকাশ হয়ে গেলে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যেত। তার আগেই আদালতের নির্দেশ আসায় এখন পুরো প্রক্রিয়া বিচারাধীন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজ্য সরকারের তরফে এই মামলায় কী অবস্থান নেওয়া হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি পূর্বতন সরকারের সময় শুরু হলেও বর্তমানে তার পরবর্তী ধাপ সামলাতে হচ্ছে নতুন প্রশাসনকে। আদালতের নির্দেশের পরে সরকার কী ব্যাখ্যা দেয় ও নিয়োগের সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে কী তথ্য আদালতের সামনে পেশ করা হয়, তা নজরে থাকবে। উল্লেখ্য, প্রায় ১২ হাজার কনস্টেবল পদে নিয়োগের এই প্রক্রিয়া তাই শুধু চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত নয়, রাজ্যের সরকারী নিয়োগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। মেধাতালিকা প্রকাশ আটকে যাওয়ায় এখন আদালতের পরবর্তী শুনানির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন প্রার্থীরা। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থগিতাদেশ থাকায় তার আগে মামলার গতিপ্রকৃতিই ঠিক করবে নিয়োগ প্রক্রিয়া কোন পথে এগোবে। রাজ্যে সরকারী চাকরির নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে আইনি টানাপোড়েন চলছে, পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগে নতুন মামলাটি সেই তালিকায় আরও একটি অধ্যায় যোগ করল। প্রায় ১২ হাজার শূন্যপদে নিয়োগের জন্য পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পর মেধাতালিকা প্রকাশের ঠিক আগে আদালতের হস্তক্ষেপে এখন থমকে গেল পরবর্তী পদক্ষেপ। ইডব্লিউএস সংরক্ষণ সংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রার্থীদের অপেক্ষাই করতে হবে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kolkata New Market hotel fire | Bangladeshi journalist killed in Kolkata hotel fire : শিশুপুত্র ও শ্বশুরের চিকিৎসা করাতে কলকাতায়, নিউ মার্কেটের আগুনে সপরিবারে মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকের




