West Bengal private blood bank irregularities, plasma sale controversy | দানের রক্ত কোথায় যাচ্ছে? কোটি টাকার প্লাজমা বেচাকেনার অভিযোগে কাঠগড়ায় ব্লাড ব্যাঙ্ক

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: মানুষের দান করা রক্তকে ঘিরে যদি ব্যবসার অভিযোগ ওঠে, তার অভিঘাত শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের মধ্যে আটকে থাকে না। সরাসরি ধাক্কা লাগে রক্তদানের (Blood Donation) মতো একটি মানবিক উদ্যোগের উপরও। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক তদন্তে যে ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে, তাতে সেই আশঙ্কাই বাড়ছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে অনুমতি ছাড়া রক্তের উপাদান ভিন্‌রাজ্যে পাঠানো, রক্তদাতাদের উপহারের টোপ দেওয়া, বয়স ও ওজনের নিয়ম না মেনে রক্ত সংগ্রহ, নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি রক্ত নেওয়া এবং রক্ত সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গাফিলতি। স্বাস্থ্য দফতরের তদন্তে একাধিক বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর প্রশাসনিক পদক্ষেপ শুরু হলেও পরে আলোচনার ভিত্তিতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে অনিয়ম সংশোধনের জন্য সময়ও দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ককে ঘিরে। রক্তের মজুতের হিসাব খতিয়ে দেখতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছ’মাসের লেনদেনে বড় অঙ্কের অসঙ্গতি নজরে আসে বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে দাবি। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ওই সময়ের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি টাকার লোহিতকণিকা ও প্লাজমা ভিন্‌রাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছিল। রক্ত বা তার উপাদান এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অনুমোদন ও সরকারি বিধি রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

আরও পড়ুন : Sheikh Hasina extradition from India, India Bangladesh extradition treaty | শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়ারও রয়েছে আইনি পথ, প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও বাংলাদেশের দাবি মানতেই হবে না ভারতকে

এর পর একই ধরনের হিসাব অন্য বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির ক্ষেত্রেও খতিয়ে দেখা শুরু হয়। স্বাস্থ্য দফতরের তদন্তে অভিযোগ ওঠে, কলকাতার আরও কয়েকটি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মতো রাজ্যে মোটা টাকার বিনিময়ে রক্তের উপাদান পাঠানো হয়েছে। রাজ্যে বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের সংখ্যা ৭৪ বলে দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটির বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি। অন্য কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ছোটখাটো নিয়মভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। রক্তের চাহিদা ও সংগ্রহের হিসাবও এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ ইউনিট রক্ত প্রতি বছর প্রয়োজন হতে পারে, এমন একটি প্রচলিত হিসাব ধরে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১০ লক্ষ ইউনিট বলে ধরা হয়। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে রাজ্যে বিপুল পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করা হয়। স্বাস্থ্য দফতরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি বছরে প্রায় ১১ থেকে ১২ লক্ষ ইউনিট এবং বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি প্রায় ৭ থেকে ৮ লক্ষ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করে। অর্থাৎ মোট সংগ্রহ রাজ্যের আনুমানিক চাহিদার তুলনায় অনেকটাই বেশি।

এই উদ্বৃত্ত রক্তের উপাদানই কী বাণিজ্যিক লেনদেনের দিকে যাচ্ছে? তদন্তের অন্যতম বড় প্রশ্ন এখন সেটিই। রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে প্লাজ়মা এবং প্যাক্ড রেড ব্লাড সেলের আলাদা চাহিদা রয়েছে। থ্যালাসেমিয়া-সহ বিভিন্ন রোগে লোহিতকণিকার প্রয়োজন হয়। অন্য দিকে ওষুধ প্রস্তুতিতেও প্লাজ়মা ব্যবহার করা হয়। ফলে সংগৃহীত রক্তকে পৃথক করে তার উপাদান অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়। সরকারি নিয়মে কোথায়, কী ভাবে ও কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে এগুলি পাঠানো যাবে, তার কাঠামো রয়েছে। সূত্রের খবর, তদন্তে উঠে এসেছে প্লাজ়মা বিক্রির আর্থিক দিকটিও। একটি সরকারি চুক্তির ক্ষেত্রে প্রতি লিটার প্লাজমার দাম প্রায় ৪১১৬ টাকা নির্ধারিত রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। আবার একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের তরফে ভিন্‌রাজ্যে প্রতি লিটার প্রায় ৪৪০০ টাকা দরে প্লাজমা পাঠানোর তথ্যও সামনে এসেছে। ফলে বিপুল পরিমাণ প্লাজ়মা সংগ্রহ করতে পারলে তার সঙ্গে বড় আর্থিক লেনদেন জড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

অডিটে পাওয়া নথি নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। মধ্য কলকাতার একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করেছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। তার মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ইউনিট এ রাজ্যের রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হলেও ১৬ থেকে ১৭ হাজার ইউনিটের মতো প্লাজ়মা অন্যত্র পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। কলকাতার অন্য একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকেও ছ’মাসে তিন কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্লাজ়মা অন্যত্র যাওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে স্বাস্থ্য দফতরের দাবি। কিন্তু, রক্ত সংগ্রহের জায়গাতেই অনিয়মের অভিযোগ থেমে নেই। স্বাস্থ্য দফতরের কাছে আসা একটি অভিযোগ থেকেই রক্তদান শিবিরের উপর নজরদারি বাড়ে। অভিযোগ ছিল, একটি শিবিরে রক্তদাতাদের উপহার হিসেবে পাখা দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি জানার পরে তদন্ত শুরু হয়। স্বাস্থ্যকর্তাদের একাংশের বক্তব্য, সরকারি ব্যবস্থার বদলে বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে রক্তদান শিবির পরিচালনার প্রবণতা বেড়েছে। সেখানে উপহার কিংবা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে রক্তদাতা জোগাড় করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রক্তদান স্বেচ্ছামূলক ও মানবিক উদ্যোগ। তাই রক্তদাতাকে সরাসরি অর্থ দেওয়া বা উপহারের বিনিময়ে রক্ত সংগ্রহের ব্যবস্থা আইনবিরুদ্ধ। অথচ তদন্তে পাখা, প্রেসার কুকার, স্মার্ট ওয়াচের মতো উপহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও আবার সরাসরি উপহার না দিয়ে কুপন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সেই কুপন দেখিয়ে পরে উপহার নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের। রক্তদাতা প্রতি খরচ নিয়েও সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যের কথা সামনে এসেছে। সরকারি ব্যবস্থায় শিবিরে রক্তদাতাদের জন্য রিফ্রেশমেন্ট বাবদ প্রায় ১০০ টাকা ও শিবির আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছে। বেসরকারি ব্যবস্থায় সেই খরচ অনেক বেশি হতে পারে। ফলে রক্ত সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় উপহার ও অন্যান্য খরচ কতটা ভূমিকা নিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হল রক্তদাতার বয়স, ওজন ও শারীরিক যোগ্যতা সংক্রান্ত নিয়ম ভাঙার অভিযোগ। দুর্গাপুরের একটি রক্তদান শিবিরে ১১ এবং ১৩ বছর বয়সী শিশুদের কাছ থেকে রক্ত নেওয়ার অভিযোগে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সি কারও কাছ থেকে রক্ত নেওয়া যায় না। রক্তদাতার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে অন্তত ১২.৫ গ্রাম এবং ওজন কমপক্ষে ৪৫ কেজি হওয়া প্রয়োজন। সাধারণ ভাবে ৪৫ কেজি বা তার বেশি ওজনের ক্ষেত্রে ৩৫০ মিলিলিটার এবং ৫৫ কেজি বা তার বেশি হলে সর্বোচ্চ ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে। তদন্তে অভিযোগ উঠেছে, কোথাও ৩৫০ মিলিলিটারের পাউচে ৫০০ মিলিলিটার পর্যন্ত রক্ত নেওয়া হয়েছে। রক্ত সংগ্রহের পাউচে নির্দিষ্ট অনুপাতে সংরক্ষণকারী রাসায়নিক থাকে। তার সঙ্গে রক্তের পরিমাণের সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি। নির্ধারিত সীমার বেশি রক্ত নিলে সংরক্ষণের মান এবং রক্তের উপাদানের গুণমান নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে চিকিৎসা মহলের বক্তব্য। শিবির পরিচালনার ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিটি রক্তদান শিবিরে এমবিবিএস চিকিৎসক থাকার নিয়ম রয়েছে। অথচ কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়ুয়াদের দিয়ে সেই দায়িত্ব সামলানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। চিহ্নিত পড়ুয়াদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের পরিকাঠামো নিয়েও তদন্তকারীরা আপত্তি জানিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেলের এক প্রাক্তন কর্তার দাবি, নিয়ম অনুযায়ী ড্রাগ কন্ট্রোল বিভাগ এবং স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেলের যৌথ পরিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে সেই নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এত দিন ধরে যদি অনিয়ম চলতে থাকে, তা হলে নিয়মিত পরিদর্শনে তা আগে ধরা পড়ল না কেন, সেই প্রশ্নও উঠেছে। স্বাস্থ্য দফতর অবশ্য আপাতত অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক অবস্থান নিয়েছে। কয়েকটি ব্লাড ব্যাঙ্ককে পাড়ায় পাড়ায় রক্তদান শিবির আয়োজন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। পরে আলোচনার ভিত্তিতে সেই পদক্ষেপগুলি প্রত্যাহার করা হয়। অনিয়ম সংশোধনের জন্য সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Shardwat Mukhopadhyay) জানিয়েছেন, বহু মানুষের কর্মসংস্থান এই প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত এবং সামনে উৎসবের মরসুম থাকায় সরকার আপাতত কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঘটলে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অন্য জায়গায়। রক্তদাতারা যদি মনে করেন তাঁদের দান করা রক্ত বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে, তা হলে স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রবণতা কমতে পারে। বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সারা বছর ধরে মানুষের মধ্যে রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রচার চালায়। সেই সামাজিক উদ্যোগের ভিত্তিতেই রাজ্যে বিপুল পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ হয়। সেখানে দানের রক্তকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলে মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, রক্ত কোনও সাধারণ পণ্য নয়। একজন মানুষের দান করা রক্ত অন্য একজনের জীবন বাঁচাতে পারে। তাই রক্ত সংগ্রহ থেকে সংরক্ষণ, পরীক্ষা, উপাদান পৃথকীকরণ এবং রোগীর কাছে পৌঁছনো, প্রতিটি ধাপেই নিয়ম মানা জরুরি। স্বাস্থ্য দফতরের সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে আসা অভিযোগগুলি সেই ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসনের হাতে এখন বড় দায়িত্ব হল অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা এবং রক্তদাতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ রক্তদানের সঙ্গে মানুষের বিশ্বাস জড়িয়ে থাকে, আর সেই বিশ্বাসে আঘাত লাগলে তার প্রভাব পড়তে পারে হাসপাতালের শয্যা থেকে রক্তদান শিবির পর্যন্ত।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Death Penalty India, Supreme Court | ভারতে ফাঁসিই থাকছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি, বিকল্পের আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন