Kashmir Saffron, Saffron Bulb Smuggling | কাশ্মীরের ‘লাল সোনা’ জাফরানে নতুন বিপদ, চোরাপথে বাইরে যাচ্ছে জাফরানের কন্দ, বিপাকে উপত্যকার চাষীরা

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শ্রীনগর: কাশ্মীরের মাটিতে উৎপাদিত জাফরান (Kashmir Saffron) দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম মূল্যবান কৃষিপণ্য হিসেবে পরিচিত। গন্ধ, রং ও গুণমানের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও কাশ্মীরি জাফরানের আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু সেই ‘লাল সোনা’ এবার অন্য ধরনের সমস্যার মুখে। জাফরানের উৎপাদন কমছে, চাষের জমির পরিমাণও আগের তুলনায় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে জাফরান গাছের কন্দ বেআইনিভাবে কাশ্মীরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ। ফলে উপত্যকার ভবিষ্যৎ জাফরান চাষ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাফরান গাছের কন্দ আসলে মাটির নিচে থাকা বাল্বের মতো একটি অংশ। এই কন্দ থেকেই নতুন গাছ জন্ম নেয় ও পরবর্তী সময়ে ফুল আসে। তাই জাফরান চাষের ক্ষেত্রে উন্নতমানের কন্দের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। একটি এলাকার ভালো মানের কন্দ অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে চাষ করা সম্ভব। আর সেই কারণেই কাশ্মীরের উন্নতমানের কন্দের দিকে নজর পড়েছে দেশের অন্য কয়েকটি রাজ্যের চাষীদের।

আরও পড়ুন : UPI cooling period India, digital payment security RBI | ১০ হাজারের বেশি অনলাইন পেমেন্টে ‘ওয়েটিং পিরিয়ড’? আরবিআইয়ের নতুন ভাবনা, গ্রাহকের হাতে বাড়তি নিয়ন্ত্রণ

গত কয়েক বছরে কাশ্মীর থেকে হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে জাফরানের কন্দ নিয়ে যাওয়ার একাধিক ঘটনা প্রশাসনের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই নড়েচড়ে বসেছে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন। কারণ, চাষিদের কাছ থেকে কন্দ সংগ্রহ করে বাইরে পাঠানো চলতে থাকলে স্থানীয় জাফরান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় রোপণ উপকরণের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ২০২৫ সালের আগস্টে আওয়ান্তিপোরার কাছে এমনই একটি ঘটনায় প্রায় ১৫০ কেজি জাফরান কন্দ উদ্ধার করা হয়েছিল। একটি গাড়ি থেকে ওই কন্দ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলটি পাম্পোরের বিখ্যাত জাফরান চাষের এলাকা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে। ঘটনায় চার জনকে আটক করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ঘটনাটি সামনে আসার পরই জাফরান কন্দের বেআইনি পরিবহণ নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারি আরও বাড়ে।

জাফরানের কন্দ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে চাষের বর্তমান পরিস্থিতিতেই। কাশ্মীরে জাফরান উৎপাদনের পরিমাণ কমেছে। একই সঙ্গে বহু কৃষিজমি জাফরান চাষ থেকে সরে গিয়েছে। ফলে ভালো মানের কন্দের চাহিদা থাকলেও স্থানীয় চাষিদের কাছে পর্যাপ্ত রোপণ উপকরণ সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় যদি উপত্যকার উন্নত কন্দ বেশি দামে বাইরের রাজ্যে বিক্রি হয়ে যায়, তা হলে স্থানীয় জাফরান শিল্পের উপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

সরকারি বিধিনিষেধও রয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের বাইরে জাফরানের কন্দ নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। জাফরান আইন, ২০০৭ ও বীজ আইন, ১৯৬৬ -এর আওতায় এই ধরনের রোপণ উপকরণের চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, বেশি দামের প্রস্তাব পেয়ে কিছু চাষি গোপনে কন্দ বাইরের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। স্থানীয় কৃষকদের একাংশের বক্তব্য, কাশ্মীরের কন্দের জন্য বাইরের রাজ্য থেকে ক্রমশ চাহিদা বাড়ছে। তার অন্যতম কারণ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জাফরান চাষের চেষ্টা শুরু হয়েছে। মাটি, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলো নিয়ন্ত্রণ করে ঘরের ভিতরে জাফরান উৎপাদনের পরীক্ষাও চলছে। সেই পরীক্ষায় ভালো ফল পাওয়ার জন্য উচ্চমানের কন্দের প্রয়োজন হচ্ছে। কাশ্মীরি কন্দ সেই কারণে বাইরের ক্রেতাদের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

একজন জাফরান চাষীর কথায়, ১০০ কেজি কন্দ বিক্রি করলে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ হিসেবে অনেকের কাছে কন্দ বিক্রি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে লাভ হলেও লম্বা প্রভাব স্থানীয় জাফরান চাষের উপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, কাশ্মীরের জাফরান শিল্পের সমস্যা অবশ্য আজকের নয়। কয়েক দশক ধরে চাষের জমি কমেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯৬-৯৭ সালে উপত্যকায় জাফরান চাষের জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫,৭০৭ হেক্টর। পরবর্তী সময়ে সেই জমির পরিমাণ কমে প্রায় ৩,৭১৫ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ জমি জাফরান চাষের আওতার বাইরে চলে গিয়েছে। জমি কমার পাশাপাশি উৎপাদনের ওঠানামাও কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। চাষিদের দাবি, গত বছর জাফরানের উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিক ভাবে কমে গিয়েছিল। আবহাওয়ার পরিবর্তন, চাষের খরচ, জমির ব্যবহার বদল এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের দিকে কৃষকদের ঝুঁকে পড়া, সবকিছুই জাফরান চাষের পরিসরে প্রভাব ফেলেছে।

আরও পড়ুন : Priyanka Chopra Lifestyle, Morning Routine | সকাল ৭টার পর উঠতে চান না প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, নতুন অভ্যাসে চমক

বিশেষ করে উচ্চঘনত্বের আপেল চাষের দিকে কাশ্মীরের বেশ কিছু কৃষকের ঝোঁক বেড়েছে। তুলনামূলক ভাবে বেশি ফলন এবং শ্রমের প্রয়োজন কম হওয়ার কারণে কিছু কৃষিজমিতে জাফরানের বদলে আপেল চাষ শুরু হয়েছে। ফলে একদিকে জাফরানের উৎপাদন কমছে, অন্য দিকে জাফরান চাষের জমিও সঙ্কুচিত হচ্ছে। সরকার অবশ্য জাফরান চাষের জমির পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে মোটামুটি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু জমি ধরে রাখার পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে মানসম্পন্ন কন্দের জোগান। কারণ, জমি থাকলেও ভাল কন্দ না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন।

এই পরিস্থিতিতে কন্দ সংরক্ষণে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে কৃষি দফতর। পাম্পোরে ‘জাফরান বীজ গুণন নার্সারি’ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় ভাবে উন্নতমানের ও স্বাস্থ্যকর কন্দ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। সরকারি ভাবে কন্দের জোগান নিশ্চিত করা গেলে চাষীদের বাইরের বাজারের উপর নির্ভরতা কমতে পারে। পাম্পোরের জোনাল কৃষি আধিকারিক আশিক হুসেন (Ashiq Hussain) জানিয়েছেন, জাফরান চাষের জন্য পরিচিত পাম্পোর এলাকায় সরকারি উদ্যোগে নার্সারি তৈরির জন্য জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের কাছে উন্নতমানের কন্দ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ কাজে আসতে পারে বলে কৃষি দফতরের আশা।

কাশ্মীরি জাফরানের পরিচিতি শুধু কৃষিপণ্য হিসেবে নয়, উপত্যকার কৃষি-সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত। পাম্পোরকে ঘিরে বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম জাফরান চাষের সঙ্গে যুক্ত। ফুল থেকে অতি সামান্য পরিমাণ জাফরান পাওয়া যায় বলে এর দামও তুলনামূলক ভাবে বেশি। তাই জাফরান চাষের প্রতিটি ধাপেই মান বজায় রাখা জরুরি। এখন কাশ্মীরের জাফরান শিল্পের সামনে একসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন। কী ভাবে চাষের জমি ধরে রাখা যাবে, উৎপাদন বাড়ানো যাবে, চাষিদের ন্যায্য দাম দেওয়া যাবে এবং উন্নতমানের কন্দ উপত্যকার বাইরে বেআইনি ভাবে চলে যাওয়া আটকানো যাবে, তার উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের পথ। শুধু বেআইনি পরিবহণ বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। স্থানীয় কৃষকদের কাছে পর্যাপ্ত কন্দ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং লাভজনক বাজার তৈরি করাও প্রয়োজন। কারণ, কাশ্মীরি জাফরানের পরিচয় তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। সেই পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মাটি, কৃষক ও একটি বিশেষ চাষপদ্ধতি। বাইরে থেকে কন্দের চাহিদা বাড়া এক দিকে কাশ্মীরি জাফরানের গুণমানের প্রতি আগ্রহের পরিচয় দিলেও, অন্য দিকে স্থানীয় চাষের জন্য তা নতুন চাপ তৈরি করছে। তাই ‘লাল সোনা’কে রক্ষা করতে কন্দ সংরক্ষণ, বেআইনি পাচার রোধ এবং জাফরান চাষিদের স্বার্থ, তিনটি দিকেই একসঙ্গে নজর দেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India paddy cultivation 2026, paddy cultivation area decline, ভারতে ধান চাষের জমি কমেছে ৩.৬৫ শতাংশ : তিন রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতিতে ধান চাষে বড় ধাক্কা

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন