সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বিজেপি সাংসদ নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের (Ananta Maharaj) বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজ্যের দেওয়া ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান এ বার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার নবান্নের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। ফলে সরকারি ভাবে অনন্ত মহারাজ আর বঙ্গবিভূষণ সম্মানপ্রাপক হিসেবে পরিচিত হতে পারবেন না। রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, অনন্ত মহারাজকে যখন বঙ্গবিভূষণ সম্মান দেওয়া হয়েছিল, তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজ্য সরকারের তরফে তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়। সেই সময় তাঁর সামাজিক ও জনজীবনে অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সম্মান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে তাই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নবান্নের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাজ্য ও রাজ্যবাসীর প্রতি বিশিষ্ট অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারের নজরে এমন কিছু বিষয় এসেছে, যার সঙ্গে ওই সম্মানের মর্যাদা ও প্রতিপত্তির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সমস্ত তথ্য বিবেচনা করার পরে সরকার মনে করেছে, তাঁর কাছে ওই সম্মান থাকা বঙ্গবিভূষণের মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সেই কারণেই সম্মানটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদিও ঠিক কোন ঘটনার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নবান্নের বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে অনন্ত মহারাজের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পরেই এই সিদ্ধান্ত সামনে এল। ফলে দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের পর অনন্ত মহারাজ এই সম্মানপ্রাপক হিসেবে নিজের পরিচয় ব্যবহার করতে পারবেন না। একই সঙ্গে সম্মানপ্রাপকদের তালিকা থেকেও তাঁর নাম বাদ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত কোনও সরকারি সুযোগসুবিধাও ভবিষ্যতে তিনি পাবেন না বলে জানানো হয়েছে। নেতাজীকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয় অনন্ত মহারাজের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ নিয়ে তীব্র আপত্তি ওঠে। তিনি দাবি করেছিলেন, ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে নেতাজির কোনও ভূমিকা ছিল না। পাশাপাশি আজাদ হিন্দ ফৌজকে (Indian National Army) নেতাজী ব্যবহার করেছিলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ শুরু হয়।
এই পরিস্থিতিতেই বুধবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করেন। নেতাজী সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য বা সমাজমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্টের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার কঠোর অবস্থান নেবে বলে জানান তিনি। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কোনও ব্যক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়। পুলিশ ও সাইবার সেলকে সমাজমাধ্যমে নেতাজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট ও মন্তব্যের দিকে নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, নেতাজির মর্যাদা নিয়ে কোনও ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য বরদাস্ত করা হবে না। কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তা না-দেখেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ঘোষণার পরেই উত্তর দিনাজপুরে এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। নেতাজীকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল, বিজেপির সাংসদ অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের ক্ষেত্রেও কি একই নীতি কার্যকর হবে? কারণ, অনন্ত মহারাজ বিজেপির সাংসদ। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে তখনই জানানো হয়েছিল, আইন সবার জন্য একই। তার পরের দিনই বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে এল। অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘদিনের। তার মধ্যেই বিজেপির এক সাংসদের কাছ থেকে রাজ্য সরকারের দেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সম্মান প্রত্যাহার করাকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Pal) এই প্রসঙ্গে অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁর কথায়, ‘অনন্ত মহারাজ যদি মনে করে থাকেন বাংলার মানুষের মন পাবেন নেতাজীকে অপমান করে, সেটা খুব দুঃখজনক। নেতাজীর অপমান বাঙালির অপমান। আমরা সেটা বরদাস্ত করব না। এটা নিয়ে কোনও রাজনীতিও করতে দেব না।’ উল্লেখ্য যে, বঙ্গবিভূষণ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সম্মান। বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের এই সম্মান দেওয়া হয়। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজসেবা, প্রশাসন, শিক্ষা-সহ নানা ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। ফলে কোনও প্রাপকের কাছ থেকে তা প্রত্যাহারের ঘটনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
এক্ষেত্রে সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে ‘পরবর্তী সময়ে নজরে আসা গুরুতর বিষয়’ -এর কথা বলা হলেও তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে ঠিক কোন তথ্য বা ঘটনার ভিত্তিতে সম্মান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে নেতাজীকে নিয়ে অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের পরই রাজ্য সরকারের তরফে একের পর এক পদক্ষেপ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক জল্পনা আরও বেড়েছে। অন্য দিকে, নেতাজি-সংক্রান্ত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের অবস্থান যে কঠোর, তা গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহেই ধরা পড়েছে। সমাজমাধ্যমে কোনও আপত্তিকর পোস্ট করা হলে তা চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে সাইবার সেল। পুলিশের তরফেও সংশ্লিষ্ট পোস্ট ও মন্তব্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ করা হচ্ছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, নেতাজির মর্যাদা নিয়ে কোনও ধরনের অবমাননাকর বক্তব্যের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার নবান্নের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তাই আলোচনার কেন্দ্রে অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহার। ফেব্রুয়ারিতে যে সম্মান পেয়েছিলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সম্মান হারালেন বিজেপি সাংসদ। এখন প্রশ্ন উঠছে, এর পর তাঁর বিরুদ্ধে আরও কোনও প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপ করা হবে কি না। পাশাপাশি নেতাজিকে নিয়ে তাঁর মন্তব্যের বিষয়ে পুলিশের তদন্ত কোন পথে এগোয়, সেদিকেও নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রাজ্য সরকার আপাতত পুরস্কার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তেই নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। সরকারি নথিতে অনন্ত মহারাজের নাম বঙ্গবিভূষণ প্রাপকদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে ২১ ফেব্রুয়ারি পাওয়া সেই সরকারি সম্মান এখন আর তাঁর পরিচয়ের অংশ নয়। আর নেতাজিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নতুন করে রাজ্য রাজনীতিতে যে উত্তাপ যোগ করেছে, তা-ও বৃহস্পতিবারের এই সিদ্ধান্তের পর আরও বেড়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari, Mamata Banerjee | শুভেন্দুর তোপে মমতা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধ্বংসের অভিযোগে তোলপাড় বাংলা




