Nirmal Ghosh arrested, RG Kar case Nirmal Ghosh | আরজি কর মামলায় বড় পদক্ষেপ, ওড়িশার হোটেল থেকে গ্রেফতার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসক-ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তাঁর দেহ দ্রুত সৎকার করার অভিযোগে এ বার গ্রেফতার হলেন পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ (Nirmal Ghosh)। উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহ থানায় নিহত চিকিৎসকের বাবা নতুন করে অভিযোগ দায়ের করার পরই তদন্তে গতি আসে। পুলিশ সূত্রে খবর, এফআইআর দায়ের হওয়ার পর নির্মল ওড়িশায় চলে যান। সেখানেই পুরীর কাছে একটি হোটেল থেকে বৃহস্পতিবার সকালে তাঁকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁকে স্থানীয় আদালতে হাজির করিয়ে ট্রানজ়িট রিমান্ডে কলকাতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নির্মলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট আরজি করের নিহত চিকিৎসক-ছাত্রীর দেহ ময়নাতদন্তের পরে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার পর শেষকৃত্যের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল। পরিবারের অভিযোগ, স্বাভাবিক নিয়ম না মেনে দ্রুত দেহ সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। এই ঘটনায় নির্মল ঘোষের পাশাপাশি পানিহাটির পুরপ্রতিনিধি সোমনাথ দে (Somnath Dey) ও মৃতার এলাকার বাসিন্দা সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের (Sanjib Mukhopadhyay) নামও এফআইআরে রয়েছে। ঘটনার নতুন তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই নির্মলের গতিবিধির দিকে নজর রাখছিল পুলিশ।

আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Auckland speech, India New Zealand ties | ‘২৫ বছর আগে বন্ধুর দেওয়া মাফলার এখনও আছে’ : অকল্যান্ডে আবেগঘন মোদী, প্রবাসী ভারতীয়দের সামনে পুরনো স্মৃতি ও নতুন সম্পর্কের বার্তা

তদন্তকারীদের দাবি, এফআইআর দায়ের হওয়ার পর তিনি ওড়িশায় চলে যান। নিজের পুরনো মোবাইল ফোন ব্যবহার না করে নতুন ফোন এবং নতুন সিমকার্ড নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। সেই নতুন নম্বর থেকেই কয়েক জন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখছিলেন। পুরনো ফোনটি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

তদন্তকারীরা মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন অনুসরণ করে নির্মলের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পান। মঙ্গলবার থেকেই তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে পুলিশের কাছে তথ্য আসতে শুরু করে। সেই সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার সকালে পুরীর কাছাকাছি একটি হোটেলে পৌঁছন তদন্তকারীরা। সকাল প্রায় ৯টা নাগাদ সেখানে অভিযান চালিয়ে নির্মলকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাঁকে ওড়িশার স্থানীয় আদালতে হাজির করানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সেখান থেকে ট্রানজিট রিমান্ডে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসার কথা। কলকাতায় আনার পর শুক্রবার ব্যারাকপুর আদালতে তাঁকে হাজির করানো হতে পারে। পুলিশ তাঁর কাছ থেকে দেহ সৎকারের ঘটনার বিষয়ে আরও তথ্য জানতে চাইবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্মলের গ্রেফতারির খবর সামনে আসতেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও আলোড়ন তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Shardwat Mukhopadhyay) পুলিশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ এবং প্রশাসনকে সাধুবাদ জানাই। তবে আমার প্রশ্ন, নির্মল ঘোষ এত দিন কী ভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন?’ তাঁর বক্তব্যে এই মামলায় দীর্ঘ সময় পরে গ্রেফতারির বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠে এসেছে। নির্মলকে গ্রেফতারের সূত্রপাত হয় নতুন এফআইআর থেকে। আরজি করের নিহত চিকিৎসকের বাবা সোমবার খড়দহ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে ২০২৪ সালের ৯ অগস্টের ঘটনাগুলির কথা উল্লেখ করা হয়। পরিবারের দাবি, তাঁদের মেয়ের দেহ ময়নাতদন্তের পর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দ্রুত শেষকৃত্য করার জন্য চাপ তৈরি হয়েছিল।

পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক জন রাজনৈতিক কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে অভিযুক্তেরা তাঁদের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন। দ্রুত দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। পরিবারের কয়েক জন সদস্য শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগও যথাযথভাবে পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এই অভিযোগ নতুন করে সামনে আসে আরজি করের ঘটনার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত স্মরণসভাকে কেন্দ্র করে। রবিবার উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে ওই স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। সেখান থেকেই তিনি ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট পানিহাটির শ্মশানঘাটে কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটকে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। পুলিশের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার এফআইআর দায়ের করা হয়। অভিযোগে নির্মল, সোমনাথ এবং সঞ্জীবের নাম উঠে আসে। এর পরেই তদন্তকারীরা নির্মলের খোঁজ শুরু করেন।

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঘোলা থানার নাটাগড় কদমতলা শ্মশানঘাট। পরিবারের দাবি, সেখানে সেদিন একাধিক মৃতদেহ শেষকৃত্যের অপেক্ষায় ছিল। অভিযোগ, আরজি করের নিহত চিকিৎসকের দেহ তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও অন্যদের আগে তাঁর দেহ সৎকার করা হয়। শ্মশানের নির্ধারিত খরচও পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। পরিবারের প্রশ্ন, প্রশাসনিক নিয়মের বাইরে গিয়ে কেন এত তাড়াহুড়ো করে শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়েছিল? কার নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত হয়েছিল? কেন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সেখানে সক্রিয় হয়েছিলেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য।

নির্মলের বিরুদ্ধে অবশ্য এই প্রথম কোনও অভিযোগ উঠল না। তোলাবাজি, বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও লটারির টিকিট সংক্রান্ত অভিযোগ-সহ একাধিক মামলায় তাঁর নাম জড়িয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষের (Tirthankar Ghosh) বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। গত ১৩ জুলাই নির্মল-পুত্রকে দক্ষিণেশ্বর (Dakshineswar) এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ছেলের গ্রেফতারের পর নির্মল প্রকাশ্যে খুব বেশি দেখা দেননি। কিন্তু জুলাই মাসে তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) শিবিরের একটি বৈঠকের কাছে তাঁকে দেখা গিয়েছিল। সেই বৈঠকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে পরে দলের তরফে জানানো হয়। শিবিরের বিধায়ক সন্দীপন সাহা (Sandipan Saha) সে সময় বলেছিলেন, ‘আমরা বেনোজল আটকাতে বদ্ধপরিকর। বেনোজল আটকাতে ছাঁকনি রাখা হচ্ছে।’ নির্মল অবশ্য সেই বৈঠকে থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, তিনি সেখানে বৈঠকে যোগ দিতে যাননি। কসবার বিধায়ক জাভেদ খানের (Javed Khan) সঙ্গে দেখা করতেই ওই এলাকায় গিয়েছিলেন।

পানিহাটির রাজনীতিতে নির্মল ঘোষ দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। স্থানীয় ভাবে ‘নান্টু’ নামে পরিচিত নির্মল ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পর পর তিন বার তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) প্রার্থী হিসেবে পানিহাটি কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অবশ্য তাঁকে আর প্রার্থী করা হয়নি। তাঁর পরিবর্তে তৃণমূল তাঁর ছেলে তীর্থঙ্করকে প্রার্থী করেছিল। সেই নির্বাচনে তীর্থঙ্করকে হারিয়ে দেন বিজেপির প্রার্থী তথা আরজি করের নিহত চিকিৎসকের মা। ফলে পানিহাটির নির্বাচনী ফলাফলও আরজি করের ঘটনার আবেগ ও রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় আসে।

এখন নির্মলের গ্রেফতারির পরে তদন্ত কোন দিকে এগোয়, সেটিই নজরে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২০২৪ সালের ৯ অগস্টের শেষকৃত্যের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে কী তথ্য পাওয়া যায়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এফআইআরে নাম থাকা অন্য দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধেও পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, তা নিয়েও নজর রয়েছে। আরজি কর মামলার মূল ধর্ষণ ও খুনের তদন্তের পাশাপাশি নিহত চিকিৎসকের দেহ সৎকারের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ায় মামলাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, শেষকৃত্যের ক্ষেত্রে নিয়ম ভাঙা হয়েছিল কি না, কারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, কে কী নির্দেশ দিয়েছিলেন ও পরিবারের উপর কোনও ধরনের চাপ তৈরি করা হয়েছিল কি না। কিন্তু, পুরীর হোটেল থেকে নির্মল ঘোষের গ্রেফতারির পর এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার পথ আরও এগোল। আদালতে তাঁকে হাজির করার পরে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পায় কি না, তার উপরও পরবর্তী তদন্তের গতি অনেকটাই নির্ভর করবে। ২০২৪ সালের সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহের বহু অজানা দিক এবার তদন্তে উঠে আসে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে নিহত চিকিৎসকের পরিবার থেকে শুরু করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : NRS nurse Rupali Barman death, Rupali Barman husband Rahul Das : নার্সের রহস্য মৃত্যু! এনআরএসের নার্স রুপালির মৃত্যুতে মুখ খুললেন স্বামী

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন