সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : আঙ্কারা থেকে লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump)। সেই মতো তুরস্কের বিমানবন্দরে পুরনো এয়ারফোর্স ওয়ানে তিনি প্রকাশ্যেই উঠেছিলেন। ক্যামেরার সামনে হাত নেড়ে বিদায়ও জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিমানটি যখন তুরস্কের আকাশ ছাড়ল, তখন তাতে প্রেসিডেন্ট ছিলেন না! অত্যন্ত গোপনীয় এক নিরাপত্তা অভিযানে বিমানবন্দরের কেটারিং ট্রাকের সাহায্যে অন্য একটি সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল ট্রাম্পকে। কারণ, মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে এসেছিল ইরান বা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হামলার বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কা। মঙ্গলবার প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনাটি ঘটেছিল গত জুলাইয়ে ন্যাটোর (NATO) শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের সময়। আঙ্কারায় সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তিনি কাতারের দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন। ওই বিমানটিকেই ভবিষ্যতের নতুন প্রেসিডেন্টের বিমান হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু তুরস্ক ছাড়ার সময় আচমকাই বদলে যায় পুরো পরিকল্পনা।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এমন গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল, যাতে ট্রাম্পকে বহনকারী বিমানকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়। হুমকিটি ইরানের সঙ্গে যুক্ত প্রক্সি গোষ্ঠীর কাছ থেকে আসতে পারে বলে মার্কিন কর্তারা মনে করেছিলেন। ফলে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখা ও সম্ভাব্য হামলাকারীদের বিভ্রান্ত করাই হয়ে ওঠে নিরাপত্তা পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ট্রাম্পকে প্রথমে প্রকাশ্যে পুরনো এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে সাংবাদিক এবং হোয়াইট হাউসের কয়েক জন কর্মীও ওই বিমানে ছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট ওই বিমানেই ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। কিন্তু বিমানের ভিতরের ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে বিমানের পিছনের দিকের দরজা দিয়ে গোপনে বের করে আনা হয়। তার পর একটি বিমানবন্দর কেটারিং ট্রাকে করে তাঁকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ট্রাকের সাহায্যেই ট্রাম্পকে ছোট আকারের মার্কিন সামরিক বিমান সি-৩২এ (C-32A)-তে তুলে দেওয়া হয়। ফলে পুরনো এয়ারফোর্স ওয়ানটি প্রায় একটি বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে আকাশে ওঠে। এই অপারেশনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল গোপনীয়তার মাত্রা। হোয়াইট হাউসের সব আধিকারিকও নাকি জানতেন না যে ট্রাম্প ওই বিমানে নেই। যে সাংবাদিকেরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন, তাঁরাও ধারণা করেছিলেন ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন। বিমান ছাড়ার সময় তাঁদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাইরে থেকে বিমানের ভিতরে প্রেসিডেন্ট রয়েছেন কি না, তা বোঝার উপায়ও কমে যায়।
এখানেই শেষ নয়। পুরনো এয়ারফোর্স ওয়ানটি ট্রাম্পকে নিয়ে যাচ্ছে, এমন ধারণা তৈরি করাই ছিল পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্য দিকে সি-৩২এ বিমানে করে প্রেসিডেন্টকে গোপনে ব্রিটেনের দিকে পাঠানো হয়। দুই বিমান প্রায় কাছাকাছি সময়ে ব্রিটেনে পৌঁছয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পকে আবার নতুন কাতারি বিমানটিতে উঠতে দেখা যায় ও সেখান থেকেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে তিনি রওনা হন। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, কাতারের দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে করে ট্রাম্প তুরস্কে গেলেন কেন, অথচ ফেরার সময় সেটি ব্যবহার করলেন না? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গত মাস থেকেই জল্পনা চলছিল। তখন ট্রাম্প নিজে জানিয়েছিলেন, পুরনো এয়ারফোর্স ওয়ান ব্যবহার করার সিদ্ধান্তের পিছনে বিশেষ কারণ নেই। তিনি পুরনো বিমানটিতে ফেরার বিষয়টিকে অনেকটা পুরনো দিনের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। একই সময়ে নতুন বিমানটি ব্রিটেনের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে পাঠিয়ে সেখানে কর্মীদের সেটি দেখার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে অন্য তথ্য। গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ইরান ও তার সঙ্গে যুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা নেয় বলে মার্কিন কর্তাদের উদ্ধৃত করে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
নতুন কাতারি বিমান নিয়েও এই ঘটনার পরে ফের প্রশ্ন উঠেছে। বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানটি অত্যাধুনিক হলেও সেটি এখনও পুরনো প্রেসিডেন্টের বিমানের মতো সমস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেয়েছে কি না, তা নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, নতুন বিমানটি দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী করার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু পুরনো এয়ারফোর্স ওয়ানের তুলনায় তার প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু, হোয়াইট হাউসের তরফে নতুন বিমানটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করা হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক স্টিভ চেয়ং (Steven Cheung) জানিয়েছেন, ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে নিয়মিত নানা ধরনের হুমকি বিবেচনায় রাখা হয় এবং সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এই ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, প্রেসিডেন্টের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য গোপন রাখার কৌশল। সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিদেশ সফরে গেলে তাঁর বিমানযাত্রা ঘিরে কড়া নিরাপত্তা থাকে। একই সঙ্গে সাংবাদিক এবং প্রশাসনিক কর্মীদের একটি নির্দিষ্ট অংশ সফরের গতিপথ সম্পর্কে জানেন। কিন্তু তুরস্কের ঘটনায় সেই পরিচিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে এমন একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, যাতে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে তাঁর সফরসঙ্গীদেরও সীমিত তথ্য দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা অবশ্য নতুন নয়। ট্রাম্পের আগের মেয়াদ থেকেই ইরানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি (Qasem Soleimani) মার্কিন হামলায় নিহত হওয়ার পর তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। পরবর্তী বছরগুলিতে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা নিয়ে মার্কিন প্রশাসন একাধিক বার সতর্ক হয়েছে। তুরস্কের আকাশপথে ওই গোপন বিমানবদলের ঘটনা তাই শুধু একজন প্রেসিডেন্টের সফরসূচি পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান আড়াল করার মতো একাধিক স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা। একটি বড় বিমানকে সামনে রেখে ছোট সামরিক বিমানে প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়, নিরাপত্তা সংস্থাগুলি পরিস্থিতিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিল।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, পুরো পরিকল্পনাটি এতটাই গোপনে করা হয়েছিল যে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। তুরস্ক থেকে ব্রিটেন পর্যন্ত ট্রাম্পের যাত্রা সম্পর্কে তখন যে ছবি তৈরি হয়েছিল, তার আড়ালে চলছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অভিযান। সামনে পুরনো এয়ারফোর্স ওয়ান, আর আড়ালে কেটারিং ট্রাক ও সি-৩২এ, এই দুই স্তরের পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের প্রকৃত যাত্রাপথ গোপন রেখেছিল। তবে নতুন তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা, কাতারের দেওয়া নতুন বিমানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং বিদেশ সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের গতিবিধি কতটা গোপন রাখা যায়, এই তিনটি প্রশ্নই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আর তুরস্কের সেই রাতের ঘটনা দেখিয়ে দিল, প্রয়োজন পড়লে মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা অপ্রত্যাশিত পথেও যেতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi US visit 2026, Trump India visit timing | ডিসেম্বরে আমেরিকায় মোদী, ট্রাম্পের ভারত সফর কবে? ইঙ্গিত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের




