সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ক্রিকেটে বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘ক্যাচেস উইন ম্যাচেস’। কিন্তু সেই জায়গাতেই এখন ধাক্কা খাচ্ছে ভারতীয় দল। ব্যাটিং বা বোলিং নয়, বরং ফিল্ডিং বিশেষ করে ক্যাচ মিস এখন দলের বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, শেষ দু’মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সব ফরম্যাট মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটাররা ২৮টি ক্যাচ ফস্কেছেন। এই ধারাবাহিক ভুলই ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে ভারতীয় দলের নেতৃত্বে থাকা শুভমন গিল (Shubman Gill) ও টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে এই বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সিরিজগুলিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ক্যাচ হাতছাড়া হওয়ায় প্রতিপক্ষ দল সুবিধা পেয়েছে। ম্যাচের মোড় ঘোরানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে ভারত।
পরিসংখ্যান বলছে, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্টে ৪টি ক্যাচ পড়েছে। এক দিনের সিরিজ়ে আরও ১টি সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৬টি ক্যাচ মিস হয়েছে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজ়ে ৫টি ও এক দিনের সিরিজ়ে ২টি ক্যাচ পড়েছে। সব থেকে বেশি নজর কেড়েছে জিম্বাবোয়ে সিরিজ়, যেখানে ভারত ১০টি ক্যাচ ফেলেছে। সব মিলিয়ে গত দুই মাসে মোট ২৮টি ক্যাচ মিসের ঘটনা সামনে এসেছে। ক্যাচিংয়ের শতাংশও উদ্বেগজনক। এই সময়কালে ভারতের ক্যাচিং সাফল্যের হার দাঁড়িয়েছে ৭৬.৮ শতাংশে। বিশেষ করে জিম্বাবোয়ে (Zimbabwe) সিরিজ়ে তা আরও নেমে গিয়ে ৬৪.২ শতাংশে পৌঁছয়। সেখানে ভারত ১৮টি ক্যাচ নিলেও ১০টি সুযোগ হাতছাড়া করেছে। তুলনায় জ়িম্বাবোয়ে ১২টি ক্যাচ নিয়েছে এবং ফেলেছে মাত্র ১টি, তাদের সাফল্যের হার ৯২.৩ শতাংশ। শুধু ক্যাচিং নয়, সামগ্রিক ফিল্ডিংয়েও সমস্যা দেখা যাচ্ছে। সহজ বল বাউন্ডারি হয়ে যাচ্ছে, এক রানের জায়গায় দু’ রান দিচ্ছে ভারতীয় দল। ফলে প্রতিপক্ষ দল অতিরিক্ত রান পাচ্ছে, যা ম্যাচের ফলাফলে বড় ভূমিকা নিচ্ছে।
ভারতের প্রাক্তন ফিল্ডিং কোচ আর শ্রীধর (R Sridhar) এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘ফিল্ডিং কোনও একদিনে তৈরি হয় না। এটা দলের সংস্কৃতির অংশ।’ তাঁর মতে, ক্রিকেটারদের মানসিকতা এবং নিয়মিত অনুশীলনের উপরই নির্ভর করে ভালো ফিল্ডিং। তিনি আরও বলেন, ‘কোচ পরিকল্পনা করতে পারেন, কিন্তু মাঠে তা কার্যকর করার দায়িত্ব ক্রিকেটারদেরই।’ সম্প্রতি জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমির বেঙ্গালুরু কেন্দ্রেও একটি ফিল্ডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ৬৪ জন ক্রিকেটার। সেখানে দেখা যায়, অনেকেই ফিল্ডিংয়ের সময় সক্রিয় থাকার বদলে বাইরে বসার সুযোগ খুঁজছিলেন। এই প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফিল্ডিং সমস্যার আর একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দলে ঘনঘন পরিবর্তন। চলতি বছর আইপিএল (IPL) -এর পর থেকে ভারত তিন ফরম্যাটে মোট ১৭টি ম্যাচ খেলেছে এবং সেখানে ৩৫ জন ক্রিকেটারকে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জনের অভিষেক হয়েছে। ফলে একটি স্থায়ী ফিল্ডিং ইউনিট তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। শ্রীধরের মতে, ‘দলে বারবার পরিবর্তন হলে ফিল্ডিং সেটআপ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, নির্দিষ্ট পজিশনে দক্ষ ফিল্ডার তৈরি করতে সময় লাগে ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। কিন্তু ঘনঘন বদলের ফলে সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সামনে রয়েছে শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka) সিরিজ়। স্পিন সহায়ক উইকেটে স্লিপ বা শর্ট লেগের মতো পজিশনে ফিল্ডারদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। সেখানে ক্যাচ মিস হলে তার প্রভাব সরাসরি ম্যাচের ফলাফলে পড়তে পারে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (World Test Championship) -এর দৌড়ে টিকে থাকতে ভারতকে এই সিরিজ়ে ভালো ফল করতে হবে। ফলে ফিল্ডিংয়ের এই দুর্বলতা কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন ফিল্ডিং কোচ শুভদীপ ঘোষ (Shubadeep Ghosh) দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় পাননি। এই অল্প সময়ে তিনি কতটা পরিবর্তন আনতে পারেন, সেটাই এখন দেখার।
ভারতীয় ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে ফিল্ডিংকে শক্তিশালী দিক হিসেবে দেখা হত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক ভুল সেই ভাবমূর্তিতে ধাক্কা দিয়েছে। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ক্যাচ মিসের পুনরাবৃত্তি দলের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। ক্রিকেট মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, এই সমস্যা কাটাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অনুশীলন বাড়ানো, মানসিক প্রস্তুতি উন্নত করা এবং নির্দিষ্ট ফিল্ডিং পজিশনে স্থায়ী খেলোয়াড় তৈরি, এই সব দিকেই নজর দিতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India 402 runs Gill Kishan : ৪০২ রানের পাহাড় গড়ল ভারত, শুভমন-ঈশানের জোড়া সেঞ্চুরিতে বিধ্বস্ত আফগানিস্তান, তবু শেষের ধস নিয়ে প্রশ্ন




