সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ঘাটাল, পশ্চিম মেদিনীপুর: এইচআইভি (HIV) আক্রান্ত হওয়ার কারণে এক অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি হাসপাতালে কাজ করা ওই কর্মীর দাবি, তাঁর শারীরিক অবস্থাকে কারণ দেখিয়েই তাঁকে দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নবান্ন ও স্বাস্থ্য ভবন পর্যন্ত পৌঁছতেই কড়া অবস্থান নিয়েছেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadwat Mukhopadhyay)। তিনি জানিয়েছেন, ‘অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে কোনওভাবেই এমন আচরণ মেনে নেওয়া হবে না।’
অভিযোগকারী স্বাস্থ্যকর্মীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে ঘাটালের একটি সরকারি হাসপাতালে সাফাইকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে দায়িত্বে পরিবর্তন আসে, পরে তাঁকে ওয়ার্ডে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার কাজ দেওয়া হয়। প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করার পর ২০২৪ সালে রাজ্য সরকারের জারি করা অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত নির্দেশিকার ভিত্তিতে তিনি আবেদন জানান। তাঁর দাবি, সেই আবেদন জানানোর পর থেকেই কর্তৃপক্ষের আচরণ বদলে যেতে শুরু করে। বর্তমানে তাঁর বয়স প্রায় ৫০-এর কাছাকাছি। সংসারে রয়েছেন স্ত্রী ও দুই মেয়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি নিজেই। কাজ হারানোর ফলে পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অভিযোগকারী জানান, ‘এই বয়সে এসে কাজ হারালে কোথায় যাব? এত বছর কাজ করার পর আজ আমাকে অযোগ্য বলা হচ্ছে।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, ২০০৭ সালে তাঁর শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়ে। সেই সময় থেকে নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যেই রয়েছেন তিনি। ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালের এক মেডিক্যাল অফিসার তাঁকে কাজের জন্য উপযুক্ত বলে ‘ফিট সার্টিফিকেট’ দিয়েছিলেন। তাঁর প্রশ্ন, ‘যে রোগ নিয়ে আমি এত বছর কাজ করেছি, সেটাই হঠাৎ করে কাজের অযোগ্যতার কারণ হয়ে গেল কীভাবে?’
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তাঁকে কাজে আসতে নিষেধ করা হয়। এর পাশাপাশি মজুরি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পূর্ণ সময় কাজ করেও মাসে মাত্র ৬০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। শ্রম দফতরের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির সঙ্গে এই পরিমাণের কোনও মিল নেই বলেই অভিযোগ। অন্য দিকে, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন ওই কর্মী। তাঁর স্ত্রী আগে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে টাকা পেলেও বর্তমানে ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’-এর সুবিধা পাচ্ছেন না। এলাকায় ১২৫ দিনের কাজ প্রকল্পেরও কার্যকারিতা নেই বলেই অভিযোগ করেছেন তিনি। ফলে আর্থিক সঙ্কট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালের সুপার মহেশ্বর মান্ডি (Maheswar Mandi) বলেন, ‘অভিযোগকারীর বক্তব্য পুরোপুরি ঠিক নয়। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে কাজ করছেন, এই তথ্য সঠিক নয়। ২০১৬-১৭ সাল থেকে তিনি মজুরিভিত্তিক কাজ করতেন। আমাদের এখানে এইচআইভি আক্রান্ত আরও অনেকেই কাজ করেন। কাউকে আমরা কাজ থেকে সরাইনি। উনি নিজে থেকেই কাজে আসছেন না।’ তবে তিনি সরাসরি জানাননি, ওই কর্মী কাজে ফিরতে চাইলে তাঁকে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না। উল্লেখ্য, সুপারের বক্তব্যের পাল্টা অভিযোগ করে স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, ‘আমাকে সবার সামনে এইচআইভি আক্রান্ত বলে কাজ করতে দেওয়া যাবে না, এমন কথা বলা হয়েছে। আমার কাজের সমস্ত নথি, রস্টার, সবই জমা দিয়েছি। তদন্ত হলে সত্যিটা সামনে আসবে।’
ঘটনাটি সামনে আসতেই বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadwat Mukhopadhyay)। তিনি বলেন, ‘এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি এমন আচরণ সমাজে ভুল ধারণা তৈরি করে। কাউকে ছুঁলেই সংক্রমণ ছড়ায়, এমন ধারণা ঠিক নয়। যদি অভিযোগের ভিত্তি থাকে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের আচরণ বরদাস্ত করা হবে না।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও একটি পুরনো ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, এক চিকিৎসক-পড়ুয়াকেও একই কারণে একঘরে করার চেষ্টা হয়েছিল, যার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ঘাটালের ঘটনাতেও একইভাবে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মনোভাব, সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। দীর্ঘদিন কাজ করার পর এক কর্মীর হঠাৎ কাজ হারানো, তাও শারীরিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এখন তদন্তের ফলাফলই ঠিক করবে, অভিযোগ কতটা সত্য এবং দায় কার উপর বর্তাবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : doctor duty hours West Bengal, Sharadvat Mukhopadhyay clarification | ‘সপ্তাহে ৯৬ ঘণ্টা কাজ নয়, ডিউটি স্টেশনে থাকার অনুরোধ’ : বিতর্কের মাঝে অবস্থান পরিষ্কার করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়




