সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যে নতুন করে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে বড় পদক্ষেপ নিল সরকার। সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ় অ্যাক্ট, ২০২৬’। এই আইন চালু হতেই তার প্রয়োজনীয়তা এবং লক্ষ্য নিয়ে সরাসরি অবস্থান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি জানিয়েছেন, ‘রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় কিছু গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই আইনের প্রয়োজন ছিল।’ বারুইপুরে (Baruipur) পূর্ববর্তী ঘোষণার পর সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কার্যকর হয়েছে এই আইন। প্রশাসনিক মহলে মনে করা হচ্ছে, এর ফলে পুলিশ এবং প্রশাসনের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাবে। মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যে এমন পরিস্থিতি ছিল, যেখানে আইন প্রয়োগে কঠোরতার প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই এই আইন।’ তিনি আরও বলেন, ‘কমিউনিস্ট আমলের হার্মাদ এবং পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের গুন্ডাদের জব্দ করার জন্য এই আইনের দরকার ছিল।’
এই আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রতিরোধমূলক আটক ব্যবস্থা। নতুন বিধান অনুযায়ী, প্রশাসন যদি মনে করে কোনও ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন বা বড় ধরনের অপরাধের পরিকল্পনায় যুক্ত, তবে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তাঁকে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখা যাবে। এই ধারাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই একে কেন্দ্রীয় ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’ (National Security Act) -এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
এই আইনে ‘এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার’ বা এলাকা থেকে বহিষ্কারের বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি পর্যায়ের আধিকারিকরা যদি মনে করেন কোনও অপরাধী নির্দিষ্ট এলাকায় থাকলে অশান্তি বাড়তে পারে, তবে তাঁকে সেই এলাকা বা জেলা থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরিয়ে দেওয়া যাবে। এই সময়সীমা সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে। প্রশাসনের মতে, এই ব্যবস্থা প্রয়োগ করা গেলে অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ আনা সহজ হবে। নতুন আইনে জামিন-সংক্রান্ত বিধান আরও কঠোর করা হয়েছে। অধিকাংশ ধারাকেই জামিন-অযোগ্য করা হয়েছে, যার ফলে অভিযুক্তদের দ্রুত মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে। পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন। পাশাপাশি, সমাজবিরোধী কার্যকলাপের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সংগঠিত অপরাধ বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ ও সম্পদ সরাসরি সরকারের অধীনে নেওয়া যেতে পারে।
আইনে ‘সমাজবিরোধী’ শব্দটির পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। তোলাবাজি, সিন্ডিকেট কার্যকলাপ, জোর করে জমি বা বাড়ি দখল, অবৈধ বালি তোলা, বেআইনি খনি ব্যবসা, এই সবকেই এর আওতায় আনা হয়েছে। এমনকি আন্দোলনের নামে সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার ঘটনাকেও কঠোর ভাবে দেখার কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড রুখতে আইনটি কার্যকর ভূমিকা নেবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘ভারতের অন্যান্য রাজ্যে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেই মানদণ্ডে পৌঁছতেই এই উদ্যোগ।’ তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে কঠোর আইন প্রণয়ন প্রয়োজন ছিল এবং সেই লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ।
রাজনৈতিক মহলেও এই আইন নিয়ে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। একাংশ মনে করছে, এটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর হতে পারে, আবার অন্য অংশের মতে, এর প্রয়োগ কী ভাবে হবে, তা দেখার বিষয়। তবে সরকার ইতিমধ্যেই পরিষ্কার করেছে যে, জননিরাপত্তা রক্ষা করাই এই আইনের প্রধান লক্ষ্য। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ সূত্রে জানা যাচ্ছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন জেলায় পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে। কোথায় কী ভাবে এই আইন প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে জেলা স্তরে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের মধ্যে সমন্বয় রেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই নতুন আইন কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলবে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে পরিষ্কার, তিনি এই আইনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সমস্যা মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান নিতে চাইছেন। নতুন আইনের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কতটা পরিবর্তন আসে, এখন সেদিকেই নজর রাজ্যবাসীর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Prosenjit Chatterjee Nabanna meeting, Suvendu Adhikari meeting news | নবান্নে দু’ঘণ্টার বৈঠক! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে প্রসেনজিতের সাক্ষাৎ ঘিরে জল্পনা, মুখ খুলে সব পরিষ্কার করলেন অভিনেতা




