সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : আসন্ন রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে রাজ্যে উৎসবের আবহ তুঙ্গে। তার মধ্যেই বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। নবান্নে প্রশাসনিক বৈঠক থেকে তিনি জানিয়ে দিলেন, রাজ্যের ৬০টি রথযাত্রা কমিটিকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শ্রাবণ মাস জুড়ে জলযাত্রীদের জন্য একাধিক পরিষেবার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি। সরকারের এই পদক্ষেপকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সোমবার নবান্নে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জেলার প্রশাসনিক কর্তা ও বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকদের পাশাপাশি ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন রথযাত্রা কমিটির প্রতিনিধিরা। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ‘দশকের পর দশক ধরে যে সব রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, এমন ৬০টি কমিটিকে আমরা পাঁচ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেব। এটি সরকারের তরফে সরাসরি অংশগ্রহণ।’ তিনি আরও জানান, প্রথম বছরে তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলে তা সহনীয় দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করা হচ্ছে। তিনি ভবিষ্যতে আরও সুসংহত তালিকা তৈরি করা হবে বলেও আশ্বাস দেন।
রথযাত্রার ঐতিহ্য রক্ষা ও সংরক্ষণের উপর জোর দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কমিটিগুলিকে পুরনো রথ সংস্কারের আহ্বান জানান। বিশেষ করে কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী রথগুলিকে পুনর্গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি অনুদান ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘আজ যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা আগামী দিনে বৃহত্তর আকার নেবে এবং স্থায়ী রূপ পাবে।’ এই প্রসঙ্গে পূর্বতন তৃণমূল সরকারকেও কটাক্ষ করেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি বলেন, ‘এত দিন রথযাত্রার মতো বড় উৎসবে সরকারের ভূমিকা সীমিত ছিল। কয়েক জন ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যেত। বর্তমান সরকার উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য, এই দুইকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)-র নীতি অনুসরণ করে রাজ্য সরকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাজ্যের ৭৫টি ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা মেলায় সেবাকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের তত্ত্বাবধানে এই কেন্দ্রগুলিতে পুণ্যার্থীদের জন্য ন্যূনতম পরিষেবা নিশ্চিত করা হবে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পুরসভা এবং সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলিকে এই কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুধু রথযাত্রা নয়, শ্রাবণ মাসে জলযাত্রীদের জন্যও একাধিক নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শেওরাফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত পথজুড়ে প্রতি পাঁচ কিলোমিটার অন্তর সেবাকেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে পানীয় জল, ওআরএস, বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা পরিষেবা থাকবে। পুলিশ সহায়তা কেন্দ্রও রাখা হবে, যাতে যাত্রাপথে কোনও অসুবিধা হলে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যায়। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র, জলপাইগুড়ির জল্পেশ মন্দির (Jalpesh Temple), ভুটান সীমান্তবর্তী জয়ন্তী এলাকার একটি মন্দির এবং তারকেশ্বর ধামকে (Tarakeswar Dham) কেন্দ্র করে এই পরিষেবাগুলি গড়ে তোলা হচ্ছে। এই তিনটি জায়গায় জলযাত্রীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনা থাকবে, যাতে তাদের যাত্রা আরও সুরক্ষিত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়।
সবচেয়ে নজরকাড়া ঘোষণা হল, শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার জলযাত্রীদের উপর হেলিকপ্টার থেকে গোলাপের পাপড়ি বর্ষণ করা হবে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ইতিমধ্যেই এই ঘোষণাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তিনি নিজেও ১৪ জুলাই তারকেশ্বরে উপস্থিত থেকে শ্রাবণী মেলার সূচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। রাজ্যের ধর্মীয় পর্যটন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘তীর্থক্ষেত্র সার্কিট’ গঠনের কথাও মনে করিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন প্রাচীন মঠ, মন্দির এবং ঐতিহাসিক স্থানের সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে রাজ্যের পর্যটন শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এছাড়াও সামাজিক পরিষেবার ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। ভারত সেবাশ্রম সংঘ (Bharat Sevashram Sangha)-এর হাসপাতালগুলিকে আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat)-এর আওতায় আনা হয়েছে বলে তিনি জানান। স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)-এর জন্মস্থান সিমলা স্ট্রিটের উন্নয়নের জন্য কর্পাস ফান্ড গঠনের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
উল্লেখ্য, রথযাত্রা ও শ্রাবণ মাসকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের এই বহুমুখী উদ্যোগ ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রশাসনিক অংশগ্রহণের এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের সুবিধা বৃদ্ধি এবং পর্যটনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা কতটা সফল হয়, এখন সেদিকেই নজর সকলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal syllabus change, Syama Prasad Mookerjee history | পাঠ্যবইয়ে শ্যামাপ্রসাদ, বাদ সিঙ্গুর আন্দোলন! শুভেন্দুর ঘোষণায় বাংলার শিক্ষানীতিতে বড় বদলের ইঙ্গিত




