সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শিলিগুড়ি : টানা বৃষ্টির জেরে উত্তরবঙ্গ (North Bengal)-এর বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত বিপর্যস্ত। আলিপুরদুয়ার (Alipurduar), জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) এবং কোচবিহার (Cooch Behar)-এর একাধিক ব্লকে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভুটান (Bhutan) সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে নদীর জল বিপদসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় ধস নেমে শিলিগুড়ি (Siliguri) থেকে মিরিক (Mirik) যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া প্রবল বর্ষণে তিস্তা (Teesta), তোর্সা (Torsa), মহানন্দা (Mahananda), রায়ডাক (Raidak), সঙ্কোশ (Sankosh), জলঢাকা (Jaldhaka) এবং অন্যান্য নদীগুলির জলস্তর দ্রুত বেড়েছে। ভুটানের পাহাড়ি এলাকায় লাগাতার বৃষ্টির ফলে সেখান থেকে নামা জল সরাসরি উত্তরবঙ্গের নদীগুলিতে চাপ বাড়িয়েছে। এর জেরে আলিপুরদুয়ার জেলার জয়গাঁ (Jaigaon), হাসিমারা (Hasimara), কালচিনি (Kalchini), হ্যামিল্টনগঞ্জ (Hamiltonganj) এবং বানারহাট (Banarhat) এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, ‘রাতারাতি পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়, ঘরে জল ঢুকে পড়ে।’ বহু এলাকায় বাড়িঘর ডুবে গেছে, মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ভুটানের ফুন্টশিলিং (Phuentsholing) সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলও জলমগ্ন হয়ে পড়েছে, যা এই দুর্যোগের বিস্তৃতি বুঝিয়ে দিচ্ছে। প্রশাসনের তরফে ইতিমধ্যেই মাইকিং করে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে বহু বাসিন্দাকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা, তোর্সা, রায়ডাক এবং সঙ্কোশ নদীর ধার ঘেঁষা গ্রামগুলিতে তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। উদ্ধারকারী দল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফালাকাটা (Falakata) থেকে আলিপুরদুয়ারগামী সড়কের একাংশ ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াত ব্যাহত হয়েছে। চরতোর্ষা নদীর (Char Torsa) জলস্তর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ওই রাস্তার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে বহু জায়গায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অন্যদিকে, পাহাড়ি এলাকায় প্রবল বৃষ্টির কারণে নতুন বিপত্তি দেখা দিয়েছে। দার্জিলিং (Darjeeling) থেকে মিরিক যাওয়ার পথে বড়সড় ধস নেমেছে। পাহাড় থেকে বিশাল পাথর নেমে এসে রাস্তা ভেঙে দিয়েছে। রবিবার সকাল থেকে এই রুটে যান চলাচল বন্ধ। প্রশাসনের তরফে পাথর সরানোর কাজ শুরু হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।উল্লেখ, উত্তর সিকিম (North Sikkim)-এর ডুংজু (Dzongu) এলাকায় তিস্তার জল বেড়ে একটি বেলি ব্রীজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিখোলা (Pikholaa) এবং ফিদাং (Phidang)-এর মাঝের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই ঘটনাগুলি উত্তরবঙ্গ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কোচবিহারের হরিপুর (Haripur) এলাকায় তোর্সা নদীর জল ঢুকে পড়েছে একাধিক বাড়িতে। অন্তত ৫০টি বাড়ি জলের নিচে চলে গিয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বাসিন্দা মজিরুল মিয়া (Mojirul Mia) বলেন, ‘নদীর ধারে থাকা বাড়িগুলো সব ডুবে গেছে, কী করব বুঝতে পারছি না।’ একই এলাকার জগাই দার (Jagai Dar) জানান, ‘আর বৃষ্টি হলে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হবে।’
রবিবার সকালে জলমগ্ন এলাকা পরিদর্শনে যান কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক সুকুমার রায় (Sukumar Roy)। তিনি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর কথায়, ‘তোর্সার জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন, প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’ উল্লেখ্য, আলিপুর আবহাওয়া দফতর (Alipore Meteorological Department) জানিয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। সোমবার পর্যন্ত দার্জিলিং, কালিম্পং (Kalimpong), জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে অতি প্রবল বর্ষণের লাল সতর্কতা জারি রয়েছে। এই সময় ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার বা তারও বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও আগামী শনিবার পর্যন্ত ভারী বর্ষণ চলবে। উত্তর দিনাজপুর (Uttar Dinajpur), দক্ষিণ দিনাজপুর (Dakshin Dinajpur) এবং মালদহ (Malda)-তেও বিক্ষিপ্ত ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে নদীগুলির জলস্তর আরও বাড়তে পারে। এতে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া। তবে টানা বৃষ্টির কারণে উদ্ধার ও পুনর্বাসনের কাজও বাধার মুখে পড়ছে। স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ পরিস্থিতি দ্রুত বদলানোর কোনও ইঙ্গিত এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। উত্তরবঙ্গের এই দুর্যোগ রাজ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর জলস্তর, পাহাড়ি ধস এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। আগামী কয়েক দিন আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি কী দাঁড়ায়, তার উপরই নির্ভর করছে এই সংকট কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Taratala warehouse collapse Kolkata, Suvendu Adhikari compensation news | তারাতলায় ভয়াবহ গুদামধস ৯ মৃত, ২০ আহত, নির্মাণ দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার ৫, ক্ষতিপূরণ ঘোষণা




