সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে স্তব্ধ ভেনেজ়ুয়েলা (Venezuela)। প্রবল ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে একাধিক এলাকা, প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯২০ জন। সেই তালিকায় রয়েছেন ফুটবল জগতের একাধিক পরিচিত মুখের পরিবারের সদস্যরা। একদিকে ভেনেজ়ুয়েলার ফুটবলার হেক্টর বেল্লো (Hector Bello) হারালেন তাঁর স্ত্রীকে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার (Argentina) ডিফেন্ডার লুকাস ত্রেজো (Lucas Trejo) হারালেন স্ত্রী ও দুই সন্তানকে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনাগুলি বিশ্বকাপের উত্তেজনার মাঝেই ফুটবল মহলে গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছে। গত বুধবারের ভূমিকম্প ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। বহু ঘরবাড়ি মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ঘটেছে এক অসাধারণ আত্মত্যাগের ঘটনা। বেল্লোর স্ত্রী আন্দ্রেয়া (Andrea) নিজের প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করেছেন তাঁদের এক বছরের কন্যা আলানাকে (Alana)। বাড়ি ভেঙে পড়ার সময় শিশুকন্যাকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন তিনি। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আলানাকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। কিন্তু তাঁকে আঁকড়ে থাকা আন্দ্রেয়ার শরীরে আর প্রাণ ছিল না।
এই মর্মান্তিক ঘটনার কথা সামাজিক মাধ্যমে জানান হেক্টর বেল্লো। স্ত্রী ও সন্তানের একসঙ্গে তোলা ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘মা, তুমি চিরকাল আমাদের পরিবারের নায়িকা হয়ে থাকবে। তোমার ভালবাসা যাতে আমাদের মেয়ে মনে রাখে, সেটা আমি নিশ্চিত করব। ওকে বোঝাবো তুমি কতটা গভীর ভাবে তাকে আগলে রেখেছিলে।’ তাঁর এই কথায় উঠে এসেছে একদিকে শোক, অন্যদিকে কৃতজ্ঞতার আবেগ। ২৮ বছরের এই ডিফেন্ডার আরও লিখেছেন, ‘আমার মেয়ে শক্ত মন নিয়ে বড় হয়ে উঠুক, সেটাই চাই। ওর সামনে এখন কঠিন পথ। আমার ভেঙে যাওয়া মনকে ঠিক করতে হবে ওকেই। হয়ত আগের মতো হাসতে পারব না, তবু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, ওকে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ করে তুলব। এখন শুধু আমরা দু’জন। ওর মা আকাশ থেকে আমাদের দেখছে।’ বেল্লোর এই বার্তায় ফুটবল দুনিয়া জুড়ে সমবেদনার ঢেউ নেমেছে। অন্যদিকে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লুকাস ত্রেজো। তিনি একসঙ্গে হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী ইয়ানিনা মারানেলা (Yanina Maranella) এবং দুই সন্তান অ্যারন (Aaron) ও আইনহোয়াকে (Ainhoa)। ভেনেজ়ুয়েলার ক্লাব ডেপোর্টিভো লা গুয়াইরার (Deportivo La Guaira) হয়ে খেলেন ৩৮ বছরের এই ফুটবলার। ক্লাব কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে ত্রেজোর পরিবারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
সূত্রের খবর, যে বাড়িতে তাঁরা থাকতেন, ভূমিকম্পের অভিঘাতে সেটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ঘটনার সময় ত্রেজো দলের সঙ্গে কারাকাস (Caracas)-এ প্রশিক্ষণ শিবিরে ছিলেন। সেই কারণে প্রাণে বেঁচে গেলেও পরিবারের সদস্যদের আর ফিরে পাননি। শুরুতে নিখোঁজ ছিলেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা। সেই সময় সামাজিক মাধ্যমে আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন ত্রেজো। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্লায়া গ্রান্ডে (Playa Grande)-তে আমাদের বাড়ি ধসে পড়েছে। আমি বিশ্বাস করতে চাই, আমার পরিবার তখন সেখানে ছিল না। দয়া করে ওদের খুঁজে পেতে আমাকে সাহায্য করুন।’ সেই পোস্ট ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উদ্ধারকারী দল তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধার করে। সেই খবর সামনে আসতেই শোকের ছায়া নেমে আসে। এই দুই ঘটনার পর ফুটবল জগত জুড়ে নেমে এসেছে স্তব্ধতা। বিশ্বকাপের উত্তেজনার মাঝে এমন ট্র্যাজেডি অনেককেই নাড়া দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ফুটবলাররা বেল্লো ও ত্রেজোর পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানানো হয়েছে।
ভেনেজ়ুয়েলায় উদ্ধারকাজ এখনও চলছে। বহু মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলি দিনরাত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের ক্রীড়া জগতও একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে। হেক্টর বেল্লোর স্ত্রীর আত্মত্যাগের ঘটনা যেমন মানবিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে, তেমনই লুকাস ত্রেজোর পরিবার হারানোর যন্ত্রণা ফুটবলপ্রেমীদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। মাঠের বাইরে জীবনের এই কঠিন বাস্তবতা আবারও সামনে নিয়ে এল প্রকৃতির নির্মম রূপ। ফুটবল, যা সাধারণত আনন্দ ও আবেগের প্রতীক, সেই জগতেই এখন শোকের ছায়া। বিশ্বকাপের আলোয় ঢাকা পড়ে থাকা এই মানবিক গল্পগুলি মনে করিয়ে দিচ্ছে, খেলার বাইরেও জীবন অনেক বড়। বেল্লো ও ত্রেজোর মতো ফুটবলারদের ব্যক্তিগত লড়াই এখন বিশ্ববাসীর কাছে এক গভীর অনুভূতির বিষয় হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : FIFA water break controversy, World Cup 2026 rules | ‘জলপানের বিরতি নাকি বিজ্ঞাপনের ফাঁদ?’ বিশ্বকাপে ফিফার সিদ্ধান্তে তুমুল বিতর্ক, ক্ষুব্ধ ফুটবল দুনিয়া



