Sasraya News Sunday’s Literature Special | 28th June 2026, Issue 116 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ২৮ জুন ২০২৬, রবিবার, সংখ্যা ১১৬

SHARE:

ম্পাদকীয়
এই অবক্ষয়ের জন্য কেবল প্রযুক্তি বা রাজনীতিকে দায়ী করলে চলবে না। নাগরিক সমাজের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য যাচাইয়ের অভাব, আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া এবং সমালোচনামূলক চিন্তার অভ্যাসহীনতা এই সবই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

ভাববার সময় এসেছে! সমাজ, সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনীতির জটিল সঙ্ঘাতে বর্তমান সময়ের নির্মম অবস্থান 

মকালকে বুঝতে হলে শুধু ঘটনাপঞ্জি না তার অন্তর্গত স্রোতগুলিকেও বিশ্লেষণ করতে হয়। বর্তমান সমাজ সেই দিক থেকে গভীর রূপান্তরের পর্যায়ে অবস্থান করছে। বর্তমানে উন্নয়ন ও অবক্ষয় পাশাপাশি চলেছে। কিন্তু দ্বিতীয়টির অভিঘাত ক্রমশ অধিকতর প্রকট হয়ে উঠছে। এই অবক্ষয়ের বহুমাত্রিক রূপকে অনুধাবন করতে গেলে তিনটি দিক লক্ষ্য করতে হবে। সেই প্রধান তিনটি দিক সমাজজীবন, সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তার ও রাজনীতির পরিবর্তিত চরিত্র! এই তিনটি স্তম্ভকে একত্রে বিবেচনা করা প্রয়োজন। লক্ষ্য করা উচিৎ, সমাজ একদা শুধু অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বিন্যাসের ফল ছিল না; মূল্যবোধ, সংযম এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতার সমষ্টি লক্ষ্যণীয় ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিসরে দেখা যাচ্ছে, এই ঐতিহ্যবাহী নৈতিক ভিত্তি ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ব্যক্তি এখন আর বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবে নিজেকে ভাবতে আগ্রহী নন, আত্মকেন্দ্রিকতা ও তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষাই হয়ে উঠছে আচরণের প্রধান নির্ধারক। এই প্রবণতা সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং পোক্ত চিন্তাভাবনাকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছে।

 

এই সময় এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি সোশ্যাল মিডিয়া। প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতি নিঃসন্দেহে যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে তৈরি করেছে একটি বিপজ্জনক মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ। তথ্যের দ্রুত প্রবাহ এখানে প্রায়শই যাচাইয়ের সীমা অতিক্রম করে, ফলে সত্য ও অসত্যের বিভাজনরেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া, অর্ধসত্যের প্রচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি এই তিনের সম্মিলিত অভিঘাতে জনমানসে এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল যে এই প্ল্যাটফর্মগুলি এখন রাজনৈতিক কৌশলের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। রাজনীতি, যা একসময় নীতি ও আদর্শের আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত ছিল, তা ক্রমশ কৌশলগত প্রচার, ভাবমূর্তি নির্মাণ ও প্রতিপক্ষের অবমাননার প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত হচ্ছে। মতাদর্শের গভীরতা কমে গিয়ে সেখানে স্থান নিচ্ছে স্লোগাননির্ভরতা ও আবেগের উত্তেজনা। ফলে রাজনৈতিক আলোচনার মান নিম্নমুখী হচ্ছে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়া সমস্ত বিশ্বে দ্বিমুখী অস্ত্রের মতো কাজ করছে। একদিকে এটি জনমতের প্রতিফলন ঘটায়, অন্যদিকে তা জনমতকে প্রভাবিত করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। অ্যালগরিদম-নির্ভর এই পরিসরে মানুষ ক্রমশ ‘ইকো চেম্বার’-এর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। যেখানে নিজের মতের প্রতিধ্বনি ছাড়া অন্য কোনও মত পৌঁছায় না। এর ফলে সহনশীলতা ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কের পরিসর সঙ্কুচিত হচ্ছে, আর তার জায়গা নিচ্ছে বিভাজন ও বিদ্বেষ।

উদ্বেগের যে, সমাজজীবনের উপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাবও অনস্বীকার্য। পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে মতাদর্শগত সঙ্ঘত প্রবেশ করছে, যা আগে এতটা প্রকট ছিল না। ভিন্নমতকে গ্রহণ করার সংস্কৃতি ক্ষীণ হয়ে আসছে ও তার পরিবর্তে দেখা দিচ্ছে একরৈখিক চিন্তার আধিপত্য। এই প্রবণতা সামাজিক স্থিতিশীলতার পক্ষে ক্ষতিকর।

কিন্তু এটিও সত্যি, এই অবক্ষয়ের জন্য কেবল প্রযুক্তি বা রাজনীতিকে দায়ী করলে চলবে না। নাগরিক সমাজের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য যাচাইয়ের অভাব, আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া এবং সমালোচনামূলক চিন্তার অভ্যাসহীনতা এই সবই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। গণতান্ত্রিক কাঠামো তখনই শক্তিশালী হয়, যখন নাগরিকরা সচেতন, সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান সময় তাই গভীর আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। সমাজকে পুনর্গঠিত করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুধু না, প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ, সামাজিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এই তিনের সমন্বয়েই একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ কল্পনা করা সম্ভব। নচেৎ, অবক্ষয়ের এই স্রোত আমাদের আরও অস্থির ও বিভক্ত বাস্তবতার দিকে ঠেলে দেবে, সেখানে হয়ত উন্নয়ন থাকবে, কিন্তু মানবিকতার ভিত ক্রমেই শূন্য হয়ে পড়বে।🍁

 

 

🍂মহামিলনের কথা
কি মন! দাঁড়াচ্ছ কেন? তোমার কি নাম করতে ইচ্ছা
করছে? সত্যই তো এমন পাষাণ কে আছে যার নামে লোভ হয় না।
আচ্ছা মন, তুই দুটা দল ছেড়ে ভ্রুমধ্যে বীজকোষের উপর বোস্ — আমি নাম করি কেমন?

শ্রীশ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী

(বিবিধ প্ৰবন্ধ)
শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব। ছবি ; সংগৃহীত

কলির পথ—-
শোন্, শোন্ ও মন! সঙ্কল্প বিকল্প দুটা দলে লাফালাফি করিস না, একটা কথা বলি শোন্।
দেখ মন! একদিন এই নীলাম্বরের অর্থাৎ নীল আকাশের মত তুইও ছিলি। তখন স্হূল, সূক্ষ্ম, কারণ-দেহরূপ এ তিনটা উপাধি ছিল না, তারপর আকাশের গায়ে মেঘের মত যেমন উপাধি আসিল, অমনি সে অখণ্ডভাব কোথায় চলিয়া গেল, তখন তুই দেহ অভিমানে দেহ হইয়া গেলি।
আবার লাফালাফি করছিস? যাক্, শোন্ অন্য কথা বলি, এই আকাশ যেমন সৰ্ব্বত্র ব্যাপিয়া আছে তেমনি সেই সচ্চিদানন্দময় ব্রহ্ম সর্ব্বত্র বিরাজমান। পুষ্পে গন্ধের ন্যায়, বস্ত্রে সূতার ন্যায় তিনিই এ বিশ্বের অন্তরে বাহিরে খেলা করছেন।

আঃ পালাসনে শোন্। যখন এ অখন্ডভাব ধারণা করিতে পারিস না তখন তিনিই পীতাম্বর, ব্যাঘ্রাম্বর, দিগম্বরী, নীলাম্বরী আদি মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করেন। তাহাতে উপাসকের ধ্যানের সুবিধা হয়।
আবার পালাচ্ছিস্, তোর কি একটু স্থির হইতে নাই? কি দুষ্ট তুই! অথবা তোরই বা দোষ কি, যেমন আহার, যেমন বিহার, যেমন সঙ্গ, তুই ত সেইরূপ গঠিত হইবি।
যাক্, যখন ধ্যান করিবার শক্তি তোর থাকে না, তখন গুরুরূপে তিনি আসেন, শাস্ত্রপাঠ করিতে বলেন। শাস্ত্র-পাঠে ও গুরুসেবায় ধ্যান করিবার শক্তি জন্মায়।
আঃ যাস্ নে মন! যখন গুরুসেবার শক্তিও থাকে না, সেই সময় তিনি নামরূপে আসেন।
তোর কেবল যাই যাই, দাঁড়া না। যখন নাম করিবার ইচ্ছা থাকে না তখন সৎসঙ্গরূপে তিনি আসিয়া নামেতে অনুরাগ আনিয়া দেন।

দূর হ, কেবল সঙ্কল্প বিকল্প দুটা দলে লাফালাফি করবি? একটু স্থির হইতে নাই? তাই কর্, তোকে আমার আর দরকার নাই। আমি কলির জীব, আমার জন্য শাস্ত্র বলেছেন —

জিহ্বাগ্রে বর্ত্ততে যস্য হরিরিত্যক্ষরদ্বয়ম্।
বিষ্ণোর্লোকমবাপ্নোতি পুনরাবৃত্তিদুর্লভঃ।।
——– বৃহন্নারদীয়পুরাণ।

জিহ্বাগ্রে ‘হরি’ এই অক্ষর দুইটী থাকিলে পুনরাবৃত্তিহীন বিষ্ণুলোক লাভ হয়।
ওরে মন! তোকে আমি চাহি না, আমি জিহ্বায় কেবল হরি হরি করিব। যা তুই চলে যা, দেখি তুই কতদিন লাফালাফি করিতে পারিস্!

ওই শ্রীগুরুদেব বলছেন, ওই শ্রুতি, ওই স্মৃতি, ওই পুরাণ, ওই দয়াল— সকলে এক বাক্যে বলছেন—“নাম কর্” কেবল “নাম কর্”, ইহাতেই শান্তি পাবি। তাই করব, মন তোকে জব্দ করব। জিহ্বায় নাম আর হাতে করতাল নিলুম, তোর একদিন কি আমার একদিন আজ দেখবো।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।

কি মন! দাঁড়াচ্ছ কেন? তোমার কি নাম করতে ইচ্ছা
করছে? সত্যই তো এমন পাষাণ কে আছে যার নামে লোভ হয় না।
আচ্ছা মন, তুই দুটা দল ছেড়ে ভ্রুমধ্যে বীজকোষের উপর বোস্ — আমি নাম করি কেমন?

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে৷
হরে রাম হরে রাম রাম রাম রাম হরে হরে।।
—এই ত কলিপীড়িত জীবের শ্রুতি-কথিত সনাতন পথ৷ যথাকালে সন্ধ্যা করা আর অবিরাম নামযজ্ঞ করা। জীবিত অবস্থায় বৈকুণ্ঠে বাস, কারণ নামের সঙ্গে নামী আছেন। আর প্রারদ্ধক্ষয়ে ভূতের বোঝা দেহ তিনটাকে ত্যাগ করে স্বরূপ লাভ। —- হরি বোল হরি বোল হরি বোল।

**শ্রীপ্রবোধচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পুরানতীর্থ-রত্ন
(শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেবের গার্হস্থ্য আশ্রমের নাম শ্রীপ্রবোধচন্দ্র।)
‘সনাতন’ পত্রিকা হতে গৃহীত
পুনর্মুদ্রণ ‘পথের আলো’

 

🍂ফিরেপড়া | কবিতা 

 

পূর্ণেন্দু পত্রী -এর একটি কবিতা

বিষন্ন জাহাজ

আমরা যেখানে বসেছিলাম
তার পায়ের তলায় ছিল নদী
নদীতে ছিল নৌকা
আর দূরে একটা বিষন্ন জাহাজ।

আমি যখন তোমার
তুমি যখন আমার ঠোঁটে বুনে দিচ্ছিলে
যাবজ্জীবনের সুখ
ঠিক সেই সময়ে ডুকরে কেঁদে উঠল জাহাজটা
ভোঁ বাজিয়ে।

তারপর থেকে রোজ
আমাদের যাবজ্জীবন সুখের ভিতরে
একটু একটু করে ঢুকে পড়ছে সেই বিষন্ন জাহাজ
তার সেই ভয়ঙ্কর আর্তনাদ বাজিয়ে।

 

 

🍂গদ্য
সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই আমাদের পিতৃবিয়োগ ঘটে। গানবাজনা শোনার অভ্যেস, সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় সাময়িক ছেদ পড়লেও কলেজে ওঠার পর আমার নজর পড়ল মামাবাড়িতে প্রায় অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকা ওই ফিয়েস্টা সেটটির ওপর। বন্ধুবান্ধবদের উৎসাহে আবার গান ও সাহিত্যের সংস্পর্শে ফিরে এসেছি ততদিনে। এর পর একদিন সেই ফিয়েস্টাটি গোয়াবাগানের পুরনো পাততাড়ি গুটিয়ে বারাসাতে আমাদের পৈতৃক বাড়িতে এসে উঠল, আর আমিও লেগে পড়লাম সামান্য টিউশনের টাকায় বাছাই করা রেকর্ড জোগাড়ের লক্ষ্যে।

 

নিভৃত প্রাণের দেবতা যেখানে আছে একা!‌‌

কিংবদন্তী দেবব্রত বিশ্বাস। ছবি: সংগৃহীত

অনীশ ঘো ষ

ছর দশেক আগে, ১৯১১–‌তে প্রায় অনাড়ম্বরভাবেই কেটে গেছে প্রিয় মানুষটির জন্মশতবর্ষ। তারপর একে একে চলে গেছে আরও দশটি ২২ আগস্ট। এ বছরও রবীন্দ্রগানের কিংবদন্তী শিল্পীর বর্ষাঘন জন্মদিন পার করে এলাম আমরা। একইরকম অনাদরে। হয়তো ভক্তকুল তাঁদের প্রাণের এই দেবতার জন্মদিনে ভালোবাসা, প্রণামে যতটা সম্ভব হৃদয়–‌উৎসারিত বিনম্র ‌শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন নিজেদের মতো করে, হয়তো খুব সাদামাঠাভাবেই, কিন্তু শুধু কি এইটুকুই তাঁর প্রাপ্য ছিল, আর কোনও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কি তিনি দাবি করেন না?‌ রবীন্দ্রগানের প্রতি যিনি সাধারণ বাঙালির টান হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর ব্যারিটোন জাদুকণ্ঠটির মধ্য দিয়ে, সেই ‘‌ব্রাত্যজন’‌ দেবব্রত বিশ্বাস, ছোট–‌বড় সকলের কাছেই যিনি পরিচিত ছিলেন ‘‌জর্জদা’‌ নামে, মাত্র মাস দুয়েক আগে তাঁকে আবারও উপেক্ষায় দূরে সরিয়ে দিতে কারও মধ্যে কোনও হেলদোল দেখা গেল না!‌ এই প্রসঙ্গে এ কথা উল্লেখ করা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, আরেক বরেণ্য শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও তাঁর আধুনিক গান, ফিল্মের গান, সর্বোপরি রবীন্দ্রগান শুনিয়ে আমাদের হৃদয়হরণ করে ফেলেন সহজে, আজও। তাঁর কণ্ঠটিও ভরাট ও এবং সুরেলা অবশ্যই।

সম্ভবত ৭৭ সালের কথা। স্মৃতিভ্রমের বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় আজ আর ঠিকঠাক বছরটা মনে করতে পারছি না। আমি তখন ‘‌সেঁজুতি’‌ নামে একটি সাহিত্যপত্রের প্রকাশ শুরু করেছি বন্ধুবান্ধবদের ভালোবাসা, সহযোগিতায়। পাশাপাশি প্রতি বছর একটি করে ভালো অনুষ্ঠান আয়োজন করছি রবীন্দ্র–‌নজরুলগীতির জনপ্রিয় শিল্পীদের নিয়ে। বারাসাতের স্থানীয় প্রেক্ষাগৃহ থেকে কলকাতার বনেদি রবীন্দ্রসদনেও।

কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, রবীন্দ্রগানের প্রতিটি শব্দে তাঁর গায়কিতে জর্জ বিশ্বাস যেন এক আলাদা জাদুর ছোঁয়া লাগিয়ে দিতেন। সে গানের প্রতিটি শব্দ যেন হয়ে উঠত তাঁর অবাক কণ্ঠের রোমাঞ্চে ভরপুর, মাধুর্য মিশে থাকা মনোময় ছবি!‌ তিনি যখন গাইতেন, ‘‌তখন পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু ঝরে জল, শ্যামল বনান্তভূমি করে ছলোছল’‌, মনে হত যেন গান বেয়ে কান বেয়ে সেই জলের ফোঁটার পতন আমরা কত অনায়াসে অনুভব করতে পারছি, যেন অদূরে কোথাও গাছের পাতা থেকে সত্যিই ঝরে চলেছে বিন্দু বিন্দু অশ্রু!‌ সেই কারণেই হয়ত, অনবদ্য কণ্ঠলাবণ্য নিয়েও রবীন্দ্রগানের ক্ষেত্রে জর্জ বিশ্বাসের সঙ্গে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার নিরিখে একটা বড়সড় দূরত্ব ছিল। দুজনের রেকর্ড বা অ্যালবাম বিক্রির সংখ্যাটির দিকে নজর রাখলে সহজেই বোঝা যায় এই দূরত্বটা। মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রগানের রেকর্ডের ক্ষেত্রে সর্বাধিক বিক্রীত দেবব্রত বিশ্বাসের পরেই দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ই। কিন্তু এক আর দুইয়ের মধ্যে ফারাকটা এ ক্ষেত্রে ছিল বিস্তর— ১০০: ১০। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের প্রতি যথেষ্ট দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও এ কথা বলতে হচ্ছে পরিসংখ্যানই হিসাবটা তুলে ধরছে বলে। রবীন্দ্রগানে আপামর শ্রোতাকে এমনটাই ‌মাতিয়ে রাখার ম্যাজিক ছিল জর্জ বিশ্বাসের আয়ত্তাধীন!‌
২০২১–‌এর ২২ আগস্ট তাঁর ১১০তম জন্মদিনটি সামান্য কিছু চর্চা আর উদ্যোগ ও আবেগ ছাড়া যখন আর কোনও আন্তরিকতার পরিচয় বা প্রয়াস দেখাতে পারে না, তখন তো বাঙালির সুরে ও ছন্দে জেগে থাকা প্রাণের এই মানুষটির প্রতি অবহেলায় আমাদের মনে আক্ষেপ হবেই!‌ ২০২০–‌তে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়েরও জন্মশতবর্ষ ছিল। এ কারণে কিছু কিছু কাজ হয়েছে, কিছু সঙ্কলনও তৈরি হয়েছে তাঁকে নিয়ে, ফেসবুকের দৌলতে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় হেমন্ত–‌স্মরণও লক্ষ্য করা গেছে বেশ কিছু ‘‌লাইভ’‌ আসরে, এই ভাইরাসকালের হাতে বাধ্যত আটকে থাকা যাপনবেলায় হয়ত এর বেশি সুযোগও ছিল না, কিন্তু থাকলেও ঝাঁপিয়ে পড়ে কিছু হত কি স্মরণের উদ্যোগ?‌ হয়ত হত কিছু মঞ্চানুষ্ঠান, গান হত, কথা হত, স্মৃতিচারণও হত ঘনিষ্ঠজন ও অনুরাগীদের, কিন্তু আমার মনে হয় তাতে প্রাণের সাড়া তেমন থাকত না!‌ বাঙালি কি ইদানিং তার যাবতীয় ঐতিহ্যকে ভুলতে বা এড়িয়ে যেতে শিখেছে?‌ কী জানি!‌ তবে বিষাদ আরও দীর্ঘ হয়, যখন মনে করি, দেবব্রত বিশ্বাসের মতো একজন লড়াকু এবং প্রবল জনপ্রিয় শিল্পীও এ ক্ষেত্রে থেকে গেছেন উপেক্ষিত, বিস্মৃত এবং ‘‌ব্রাত্য’!‌
সম্ভবত ৭৭ সালের কথা। স্মৃতিভ্রমের বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় আজ আর ঠিকঠাক বছরটা মনে করতে পারছি না। আমি তখন ‘‌সেঁজুতি’‌ নামে একটি সাহিত্যপত্রের প্রকাশ শুরু করেছি বন্ধুবান্ধবদের ভালোবাসা, সহযোগিতায়। পাশাপাশি প্রতি বছর একটি করে ভালো অনুষ্ঠান আয়োজন করছি রবীন্দ্র–‌নজরুলগীতির জনপ্রিয় শিল্পীদের নিয়ে। বারাসাতের স্থানীয় প্রেক্ষাগৃহ থেকে কলকাতার বনেদি রবীন্দ্রসদনেও। অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্ঘ্য সেন, স্বপন গুপ্ত, সুমিত্রা সেন, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, বাণী ঠাকুর, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সুকুমার মিত্র, সুবিনয় রায়, ঋতু গুহ, শাঁওলি মিত্র, এমনকি কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত গেয়ে গেছেন বা যাবেন সেই অনুষ্ঠানে। এর মধ্যেই এক বছর মনে হল, এবার জর্জ বিশ্বাসকে দরকার। ঠিকানা জোগাড় করে এক সকালে হাজির হয়ে গেলাম ট্র‌্যাঙ্গুলার পার্কের কাছে তাঁর বাড়িতে, আমি আর প্রিয় গানবন্ধু সুব্রত পাল। রবীন্দ্রগানের শিল্পী সুব্রত তখন সুবিনয় রায়ের কাছে নিয়মিত তালিম নিচ্ছে। সে ছিল আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু। পারানির কড়ি!‌ দুজনের হৃদয়েই রবীন্দ্রনাথ, মগজে জর্জ বিশ্বাস!‌ সেই তীর্থস্থানে পৌঁছে দেখলাম একতলার ঘরে প্রিয় মানুষটি বিভা সেনগুপ্ত নামে এক ছাত্রীকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শেখাচ্ছেন। আমাদের যাওয়ার কারণ বেশ সঙ্কোচেই নিবেদন করলাম তাঁকে। কিন্তু জর্জদা তখন অনুষ্ঠান করা ছেড়ে দিয়েছেন প্রায়। আমাদের থেকেও যেন বেশি সঙ্কোচ তাঁর গলায়, সে কথা জানাতে। সদ্য গোঁফ গজানো আমাদের দুজনকে সম্বোধন করছেন আপনি, আপনারা বলে!‌ অনেকক্ষণ বোঝানোর চেষ্টা হল, বেশ কিছু কথা হল, কিন্তু অনুষ্ঠান করতে রাজি হলেন না কিছুতেই!‌ অভিমানী শিল্পীকে বুঝতে পারলেও মন তো মেনে নিতে চায় না!‌ শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকে আনানো চা খেয়ে, এমনকি ছাত্রীকে শেখানো তাঁর অনেকগুলো গানও সামনে বসে অনেকক্ষণ ধরে শুনে শেষমেশ ব্যর্থ হয়েই ফিরে আসতে হল। শত চেষ্টা, আবেদন–‌নিবেদন বিফল হওয়ায় বেশ মনমরা তখন আমরা দুজনেই। বেরিয়ে আসার সময় হঠাৎই জর্জদা আমাদের ডেকে বললেন, আপনাদের কারও ফোন নাম্বার আছে?‌ সুব্রতদের পরিবার ছিল যথেষ্ট অবস্থাপন্ন, ওদের বাড়িতে একটা ল্যান্ড ফোনও ছিল। সে ‘‌হ্যাঁ’‌ বলাতে জর্জদা সেই নাম্বারটা জেনে নিয়ে একটা পেনসিল দিয়ে ঘরের দেওয়ালে লিখে রাখলেন!‌ জর্জদার চেহারাটা কিন্তু ছিল নেহাতই আন–‌ইমপ্রেসিভ, ছোটখাটো, কালো, বৈশিষ্ট্যহীন— স্থানীয় বা পরিচিতজনেরা ছাড়া পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেও বুঝবেই না, ইনি হলেন গানদুনিয়ার একজন বেতাজ বাদশা! প্রায় সেরকমটাই ছিল চেহারা তাঁর ওই বসার ঘর বা গানঘরটিরও!‌ রঙচটা জানালা–‌দরোজা, সাদামাঠা একখানা তক্তাপোশ, দুটো চেয়ার, আর দুদিকের দেওয়াল জুড়ে প্রচুর পেনসিলের আঁকিবুকি!‌ ততক্ষণে অবশ্য বুঝে গেছি, ওগুলো নেহাত আঁকিবুকি নয়, সবই দরকারি তথ্য। সেই কারণেই লিখে রাখা। ডায়েরি বা নোটবই তিনি ব্যবহার করতেন না সম্ভবত। কিছুদিন পরে কিন্তু অশোকনগরে একটি সংবর্ধনাসভায় যাওয়ার আগে ওই নাম্বারে ফোন করে জর্জদা সুব্রতকে আমন্ত্রণ করেছিলেন, ইচ্ছে হলে সে তাঁর সঙ্গে ওই অনুষ্ঠানে যেতে পারে জানিয়ে। সুব্রত এর পরেও বার কয়েক জর্জদার ওই বাড়িতে গেছে, আমার অবশ্য আর যাওয়া হয়নি!‌
পরে শুনেছি, প্রায় একাই থাকতেন জর্জদা, গানের জগতের মাতব্বররা তাঁকে প্রায় ত্যাগ করেছিলেন, কিছুটা ওঁর অত্যধিক জনপ্রিয়তার কারণে একটা ঈর্ষা এবং বাকিটা তাঁর মুখের ওপর মনের কথা খোলসা করে বলে দেওয়া বা রবীন্দ্রগানের ব্যবহারিক প্রয়োগ, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে বলিষ্ঠ ও বিরুদ্ধ মত থাকার কারণে। আত্মীয়জন, বন্ধুবান্ধবরাও যে নিয়মিত সঙ্গ বা নির্ভরতা দিতেন, তাও নয়। সাউন্ড উইং রেকর্ডিং স্টুডিওর কর্ণধার আলো কুণ্ডু, যিনি জর্জদার পরের দিকের প্রায় সব কটি অনুষ্ঠান বা বাড়ি বসে গাওয়া গানের অডিও রেকর্ডিং করে রাখেন, তাঁর একটা রেস্তোরাঁ ছিল ভবানীপুরের দিকে, সেখান থেকে জর্জদার খাবার আসত, বি কে চ্যাটার্জি নামে এক ভদ্রলোকের প্রাইভেট গাড়িটি জর্জদা কোথাও যেতে–‌আসতে ব্যবহার করতেন। তবে তাঁর নিজের একটা বুলেট মোটরবাইক ছিল, সেটা নিজেই চালাতেন প্রয়োজনমতো!
‌জীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রিয়জন, বন্ধুজনদের থেকে অনেক যন্ত্রণা পেয়েই মনের দিক থেকে দৃঢ়চেতা, আজীবন বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী মানুষটা বাধ্যত এক সময় অভিমানী হয়ে ওঠেন। একটা সময় অনুষ্ঠান করাও বন্ধ করে দেন একেবারে। ’‌৭১ সালের পরে প্রবল জনপ্রিয়তাকে উপেক্ষা করেই আর কখনও কোনও রবীন্দ্রগান রেকর্ডও করেননি তিনি। বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের পক্ষে নানাবিধ শর্তাবলি চাপিয়ে তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গীত ঘরানাটিকে আহত করার চেষ্টা একদমই পছন্দ হয়নি তাঁর। তাই এই স্বেচ্ছা নির্বাসন!‌ কিন্তু বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে তো এর পরেও বুকে আগলেই রেখেছিলেন!‌
আমার পিতা চাকরি করতেন গানের জগতের অদ্বিতীয় হিজ মাস্টার্স ভয়েজ রেকর্ড কোম্পানিতে। আকাশবাণী ও পেশাদারি থিয়েটারে, চিৎপুরের যাত্রাপালার গান ও স্ক্রিপ্ট লিখতেন তিনি, বাণিজ্যিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, অফিসপাড়ার সখের নাটকের নির্দেশনা দিতেন। অভিনয় ও গানের জগতের অনেক নামীদামি মানুষ সেই সূত্রেই ছিলেন তাঁর বন্ধু ও বিশেষ পরিচিত। আমাদের উত্তর কলকাতার দর্জিপাড়ার বাড়িতে তাঁদের অনেকেরই নিয়মিত আনাগোনা ছিল। তো আমার সেজমামা তাঁর এহেন ভগ্নীপতির কাছে বিশেষ আবদার করায় আমার পিতা তাঁদের কোম্পানি, অর্থাৎ এইচ এম ভি–‌র কাঠের ক্যাবিনেটওলা বেশ বড়সড়, সেই সময়কার বিচারে বেশ উচ্চমানের একটি রেডিও সেট আর একটি ফিয়েস্টা রেকর্ড প্লেয়ার মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন শ্যালকের জন্য উপহার হিসাবে। আমাদের বাসাবাড়িতেও এইচ এম ভি–‌রই একটা বড় রেডিও সেট ছিল। ছোটবেলা থেকে গান শোনার পাঠ পেয়েছি তাঁর থেকেই। রেডিওর অনুরোধের আসরের জন্য থাকত হাপিত্যেশ অপেক্ষা। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই আমাদের পিতৃবিয়োগ ঘটে। গানবাজনা শোনার অভ্যেস, সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় সাময়িক ছেদ পড়লেও কলেজে ওঠার পর আমার নজর পড়ল মামাবাড়িতে প্রায় অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকা ওই ফিয়েস্টা সেটটির ওপর। বন্ধুবান্ধবদের উৎসাহে আবার গান ও সাহিত্যের সংস্পর্শে ফিরে এসেছি ততদিনে। এর পর একদিন সেই ফিয়েস্টাটি গোয়াবাগানের পুরনো পাততাড়ি গুটিয়ে বারাসাতে আমাদের পৈতৃক বাড়িতে এসে উঠল, আর আমিও লেগে পড়লাম সামান্য টিউশনের টাকায় বাছাই করা রেকর্ড জোগাড়ের লক্ষ্যে। শ্যামবাজার, শিয়ালদা থেকে ধর্মতলা, রাসবিহারীর সিম্ফনি, মেলোডি হয়ে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পুরনো রেকর্ডের ঠেকে মাঝেসাঝেই চলতে থাকল পছন্দের রেকর্ডের সন্ধানে হানাদারি। সেই থেকে জর্জ বিশ্বাস ও মোহরদির (‌কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ রবীন্দ্রগান, হেমন্ত–‌মান্না–‌শ্যামল–‌সন্ধ্যার আধুনিক, মানবেন্দ্রর নজরুলগীতি, গুলাম আলি আর জগজিৎ–‌চিত্রা সিংয়ের গজল, রবিশঙ্কর–‌আলি আকবর–‌বিসমিল্লার যন্ত্রসঙ্গীত ইত্যাদি একটু একটু করে রক্তে মিশতে শুরু করে দিল নেশার মতো!‌ পকেট ও পরিবারের অবস্থা ছিল সঙ্গিন, ফলে এ নিয়ে বিস্তর বিড়ম্বনায় পড়তে হত প্রায়শই, কিন্তু আমার ভিতর কে যেন ওই অবস্থায় গেয়ে উঠত, ‘‌হাঙ্গামা হ্যায় কিঁউ বড়পা, থোড়ি সি তো পি লি!’‌‌ সুরাপান নয়, সুরপান করে করে আমার তখন পাগলের দশা!‌ ৭৮/‌৪৫ আর পি এম, লংপ্লেয়িং রেকর্ড কিনছি ধার করে হলেও, দু–‌তিনজন বন্ধুর বাড়ি থেকে পছন্দের রেকর্ড চেয়ে এনে রাতদিন ফিয়েস্টায় দম দিয়ে চাপিয়ে দিচ্ছি, শুনছি, পত্রিকা বের করছি আর হাত পাকাচ্ছি লেখালিখিতে!‌
এর পর রেকর্ডের দিন অস্তমিত হয়ে ক্রমে ক্যাসেট, সিডি হয়ে এম পি থ্রি, পেনড্রাইভের দিন এসে পড়ল সময়ের হাত ধরে। সেই ফিয়েস্টাটি খুব স্বাভাবিক কারণেই খাটের তলায় মুখ লুকিয়ে শোকেসের ওপরের জায়গাটা ছেড়ে দিল প্রথমে সন্তোষের টেপরেকর্ডারকে, পরে সেটিকেও বিদায় জানায় ফিলিপসের ৪০০ ওয়াটস পাওয়ার হাউস!‌ আর এখন সেই গানবাক্সটির গায়েও পুরু ধুলো, স্মার্ট ফোন থেকে স্মার্ট টিভিতে গান শোনানোর পাকা বন্দোবস্ত যখন দিব্য বিদ্যমান ইউ টিউব এবং অন্যান্য ডিজিটাল অ্যাপসে!‌
কিন্তু জর্জদা সেই সদ্য যুবকবেলা থেকে আজ এই প্রৌঢ়বেলাতেও, এই ১০০ শতাংশ ডিজিটাল যুগেও প্রায় নিত্য সঙ্গে আছেন আমার!‌ রেকর্ড আর অনুষ্ঠানে যার শুরু, পরে ক্যাসেট, সিডি হয়ে আজ হ্যান্ডসেট বা টিভি সেটে এসেও বারে বারে শুনতেই হয় তাঁকে। শুনি ‘‌আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই তখন যাহা পাই সে যে আমি হারাই বারে বারে.‌.‌.‌’‌ আশ্চর্য কণ্ঠের মলমপ্রলেপ ছড়িয়ে যায় শিরায়, রক্তে, হৃদয়ে। অমোঘ টানটি তাঁর, চারপাশের এত কিছু অদলবদলের মধ্যেও দিব্য জেগে থাকে!‌
শুনেছি তাঁর সেই ট্র‌্যাঙ্গুলার পার্কের ঠিকানাটিরও বাহ্যিক কিছু বদল ঘটেছে। সেটি এখন একটি রেস্তোরাঁর রূপ পেয়েছে। কাল আর পাত্র তো নিয়মের নিগড়ে বাঁধা পড়ে একই জায়গায় অনড় থেকে যেতে পারে না!‌ বদল অনিবার্য। তবু শান্তি, কোনও বহুতলের রূপ নিয়ে নয়, একান্ত দর্শনের আমার সেই তীর্থস্থানটি বেঁচে আছে খাবারদাবারের একটি ঠিকানা রূপে। এক সময় এই রেস্তোরাঁর খাবারই তো বরাদ্দ ছিল প্রায় নিয়মিত জর্জ বিশ্বাসের জন্য। বর্তমান মালিকের বদান্যতায় ওই রেস্তোরাঁয় ধোঁয়া ওঠা খাবারের পাশ কাটিয়েই নিত্য বেজে ওঠেন জর্জদা, তাঁর ঐশ্বরিক ভরাট কণ্ঠের মায়া–‌বাস্তবতায়!‌ আমি দূর থেকেই তাঁকে প্রণাম জানাই।
আমার সেই গানের দেবতার সঙ্গে একান্ত দর্শন ও আলাপচারিতার কয়েকটা বছর পরেই প্রয়াত হন তিনি, ১৯৮০ সালে। বড় দুঃখ, বিষাদের সেই বিদায়। কিন্তু আমরা কি সবাই সেদিনই চিরবিদায় জানিয়ে এলাম প্রাণের দেবতাকে!‌ তার পর তো একে একে ৩১টা বছর পেরিয়ে শতবর্ষ এসেও চলে গেল, ১০টা বছর গড়িয়ে গেল আরও। আমাদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য, ভালোবাসাকে ভুলতে ভুলতে কীভাবেই বা এর পরেও ভালো থাকব আমরা! ওই তো শুনতে পাচ্ছি মন্ত্রের মতো চরাচরে ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর জাদুগান—
‘‌‘‌নিশীথে কী কয়ে গেল মনে কী জানি, কী জানি.‌.‌.‌
সে কথা কি অকারণে ব্যথিছে হৃদয়, একি ভয়, একি জয়।‌
সে কথা কি কানে কানে বারে বারে কয় ‘‌আর নয়’‌ ‘‌আর নয়’‌।
সে কথা কি নানা সুরে বলে মোরে ‘‌চলো দূরে’‌—
সে কি বাজে বুকে মম, বাজে কি গগনে। কী জানি, কী জানি।।’‌’‌
না, সত্যিই জানি না। শুধু এটা জানি, বাঙালি ক্রমে জর্জ বিশ্বাসকে ভুলতে বসেছে। এবারের ২২ আগস্টের বর্ষাঘন জন্মদিনটি রাতের গভীরে পৌঁছে সেই ভুলকে কান্নার মতো ঝরিয়ে দিয়ে বলতে চেয়েছিল, বোধ হল— ‘‌মেঘ বলেছে ‘‌যাব যাব’‌, রাত বলেছে ‘‌যাই’‌, সাগর বলে ‘‌কূল মিলেছে— আমি তো আর নাই’‌!‌ সত্যিই কি তাই? সত্যিই কি আমরা ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীতকে পিছনে ফেলে আরও একটি বেসুরো শতকের পথে এগিয়ে চললাম?‌ যেখানে শুধু একাই বিরাজ করেন আমার নিভৃত প্রাণের দেবতা?‌‌🍁 ‌‌‌

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১ 
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

৩৪. 

প্রত্যাবর্তনের অস্বস্তি

ন্ধ্যার পরে শহরটা শীতকালে খুব দ্রুত বদলে যায়। দিনের ভিড়, হর্ণ, মানুষের ব্যস্ততা যেন হঠাৎ করেই স্তিমিত হয়ে আসে। বাতাসে একটা শুকনো ঠাণ্ডা জমতে থাকে, আর সেই ঠাণ্ডা শুধু শরীরেই নয়, মানুষের চিন্তার মধ্যেও ঢুকে পড়ে। দিশা মিত্র বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাস্তার আলো জ্বলেছে কিছুক্ষণ আগে। নিচে দু-একজন পথচারী দ্রুত পা চালিয়ে চলে যাচ্ছে। তিনি অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছেন, অথচ কিছু দেখছেন না। তার দৃষ্টি বাইরের দিকে, কিন্তু মন সম্পূর্ণ অন্য কোথাও। ফোনটা কেটে যাওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে। তবু কণ্ঠস্বরটা এখনও কানের ভেতরে রয়ে গিয়েছে।
রণজয়!
এত বছর পরেও নামটা তার মধ্যে কোনো আবেগের বিস্ফোরণ ঘটায়নি। বরং যা হয়েছে, তা আরও জটিল। যেন বহু বছর আগে চাপা পড়ে থাকা কোনো স্তর হঠাৎ নড়ে উঠেছে। যে ক্ষতকে তিনি সারিয়ে তুলেছেন বলে ভেবেছিলেন, সেটি আবার ব্যথা করছে না, কিন্তু তার অস্তিত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন, এই ফোনকল কী সত্যিই প্রয়োজন ছিল? মানুষ কী সবসময় ফিরে আসে? নাকি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অসমাপ্ত কাজগুলোর সামনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়?
পাশের ঘরে তিতাস পড়ছিল। মাঝে মাঝে পাতার শব্দ শোনা যাচ্ছে। এই শব্দটা দিশার কাছে অদ্ভুতভাবে আশ্বাসের। কারণ এই শব্দ তাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা তিনি ভুল করেননি। অনেক কিছু ভুল হতে পারে। সম্পর্ক ভুল হতে পারে। বিশ্বাস ভুল হতে পারে।মানুষ ভুল হতে পারে। কিন্তু তিতাস ভুল নয়। কখনও ছিল না। তিনি ধীরে ঘরে ফিরে এলেন। টেবিলের উপর ডায়েরিটা এখনও খোলা। অনেকদিন পরে তিনি আবার সেই পুরনো পৃষ্ঠাগুলো পড়ছেন।

—তাহলে সেটাই লিখবে। আজ কিছু মনে আসেনি।
বেল্লা অদ্ভুতভাবে হেসে ফেলল। অনেকদিন পরে এমন হাসি। অকারণ। স্বতঃস্ফূর্ত। ঋত্বিক লক্ষ্য করছিল। বলল না কিছু। কিছু অনুভূতি উচ্চারণ করলে ছোট হয়ে যায়। স্কুল ছুটির পরে বাড়ি ফেরার সময় বেল্লা খাতাটা ব্যাগ থেকে বের করল। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে প্রথম পাতায় লিখল,
—আজ আমি হাসতে পেরেছি।

এমন নয় যে লেখা তার মুখস্থ নেই। বরং এত বছর পরে প্রতিটি বাক্য তার মনে গেঁথে গিয়েছে। তবুও মানুষ নিজের অতীতকে বারবার পড়ে। কারণ অতীতের ঘটনা বদলায় না, কিন্তু তাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। সেই সময় তিনি ছিলেন একা। আজও অনেকটা একা। কিন্তু এই দুই একাকীত্ব এক নয়।তখন একাকীত্ব ছিল অনিশ্চয়তার। এখন একাকীত্ব দায়িত্বের। ঠিক সেই সময় তিতাস ঘরে ঢুকল,
—-মা, চা খাবে?
দিশা মাথা তুলে তাকালেন।মেয়েটাকে দেখে তার বুকের মধ্যে হঠাৎ একটা টান অনুভব হল। এই মেয়েটার কাছে তিনি কত কিছু লুকিয়ে রেখেছেন।
তিতাস হাসল,
—কী হয়েছে? এমন করে তাকিয়ে আছ কেন?
—কিছু না।
—কিছু একটা হয়েছে।
—কেন বলছ?
—তোমাকে আমি চিনি।
দিশা খুব আস্তে হেসে ফেললেন।
অদ্ভুত ব্যাপার, মানুষ যত বড় হয়, ততই বুঝতে পারে তাকে আসলে কতটা পড়তে পারে তার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলো! তিতাস চেয়ার টেনে বসল,
—স্কুলে কিছু হয়েছে?
—না।
—অনীকের সঙ্গে ঝগড়া?
—না।
—তাহলে?
দিশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।তারপর বললেন,
—তোর কি কখনও মনে হয়, মানুষের সব সত্যি জানা উচিৎ?
তিতাস অবাক হয়ে তাকাল!
—হঠাৎ এই প্রশ্ন?
—এমনি।
—জানি না।
—যদি কোনও সত্যি জানলে কষ্ট হয়?
তিতাস একটু ভেবে বলল,
—কষ্ট হলেও জানাটা ভাল।
—সবসময়?
—বেশিরভাগ সময়।
তারপর একটু থেমে যোগ করল,—অন্তত আমি তাই মনে করি।
দিশা আর কিছু বললেন না। কিন্তু এই উত্তর তার ভেতরে থেকে গেল।

অন্যদিকে সেই সময় সোমদত্তা নিজের ঘরে বসে ছিলেন। ডায়েরিটা আবার পড়েছেন। কিছু অংশ দ্বিতীয়বার, কিছু অংশ তৃতীয়বার। বয়স বাড়ার একটা সুবিধা আছে, মানুষ ঘটনাকে নয়, তার পরিণতিকেও দেখতে শেখে। দিশার জীবনের গল্প তাকে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু আরও বেশি নাড়া দিয়েছে তিতাসকে নিয়ে ভাবনা। একটা মানুষ নিজের জীবন সম্পর্কে কতটা জানে? আর কতটা জানে না? তিনি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। হঠাৎ মনে হল, এতদিন ধরে তিনি একজন শিক্ষিকা হিসেবে বহু ছাত্র-ছাত্রীকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। অথচ এখন যখন সত্যটা একজন নির্দিষ্ট মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তখন তিনি নিজেই দ্বিধাগ্রস্ত। ঠিক তখনই অনীক ঘরে ঢুকল,
—মা, ঘুমাওনি?
—না।
—আমিও।
অনীক মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।তারপর অনীক বলল,
—তুমি কি ভাবছ তিতাসকে বলা উচিৎ?
সোমদত্তা অবাক হলেন না। তিনি জানতেন, ছেলে একই প্রশ্নের মধ্যে ঘুরছে।
—জানি না।
—আমি যদি ওর জায়গায় হতাম, জানতে চাইতাম।
—আর যদি জানার পর ভেঙে পড়তে?
অনীক কিছুক্ষণ চুপ রইল, মানুষ না জেনেও ভাঙে। কথাটা শুনে সোমদত্তা ছেলের দিকে তাকালেন। কখন যে অনীক বড় হয়ে গিয়েছে, তিনি অনেক সময় বুঝতেই পারেন না।
এদিকে বেল্লার জীবনও অদৃশ্যভাবে বদলাচ্ছে। পরের দিন স্কুলে গিয়ে সে অনুভব করল, তার ভেতরের ভয়টা পুরো চলে যায়নি, কিন্তু তার ওপর ভয়টার কর্তৃত্ব কমেছে। আগে করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় মনে হতো সবাই তাকে দেখছে। এখন মনে হয়, সবাই নিজের জীবন নিয়েই ব্যস্ত। এই উপলব্ধিটা ছোট নয়। অনেক মানুষের জীবনের বড় অংশ নষ্ট হয় এই ভেবে যে অন্যরা তাকে নিয়ে ভাবছে। আসলে বেশিরভাগ মানুষ নিজের নিয়েই ভাবে।

লাইব্রেরিতে ঢুকে সে ঋত্বিককে দেখতে পেল। ছেলেটা একটা বই নিয়ে বসেছিল। বেল্লাকে দেখে বলল,
—তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।
সে ব্যাগ থেকে একটা ছোট নোটবুক বের করল।সাদামাটা। নীল মলাট।
—এটা কী?
—খাতা।
—সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।
ঋত্বিক হেসে বলল,
—এই খাতায় একটা কাজ করবে।
—কী কাজ?
—প্রতিদিন নিজের সম্পর্কে একটা ভাল কথা লিখবে।
বেল্লা ভ্রু কুঁচকাল!
—ভাল কথা?
—হ্যাঁ।
—আমি পারব না।
—কেন?
—মাথায় আসবে না।
—তাহলে সেটাই লিখবে। আজ কিছু মনে আসেনি।
বেল্লা অদ্ভুতভাবে হেসে ফেলল। অনেকদিন পরে এমন হাসি। অকারণ। স্বতঃস্ফূর্ত। ঋত্বিক লক্ষ্য করছিল। বলল না কিছু। কিছু অনুভূতি উচ্চারণ করলে ছোট হয়ে যায়। স্কুল ছুটির পরে বাড়ি ফেরার সময় বেল্লা খাতাটা ব্যাগ থেকে বের করল। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে প্রথম পাতায় লিখল,
—আজ আমি হাসতে পেরেছি।
এইটুকুই। কিন্তু লিখে তার মনে হল, যেন একটা দরজা সামান্য খুলেছে। রাতে অরিন্দম মেয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দরজা পুরো বন্ধ নয়, আধখোলা। ভেতরে বেল্লা লিখছে। তিনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। ভেতরে ঢোকেননি। শুধু দেখলেন। তার নিজের মেয়েকে তিনি কত কম চিনেছেন, এই উপলব্ধিটা আজকাল তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। বেল্লা ছোটবেলায় খুব কথা বলত। তারপর ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল। কিন্তু কখন? কেন? খেয়াল করেননি। মানুষ অনেক সময় জীবিকার জন্য এত ব্যস্ত থাকে যে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটার ভেতরের পরিবর্তন দেখতে পায় না। সেদিন রাতে শিউলি বললেন,
—মেয়েটা আজকাল আবার কী লিখছে এত?
অরিন্দম ধীরে উত্তর দিলেন,
—কিছু হয়ত…!
শিউলি অবাক হয়ে তাকালেন।
—খাতায়?
—মানুষ অনেক সময় খাতার সঙ্গে বেশি সৎ হতে পারে।
শিউলি কিছু বললেন না। তবে তার মুখে এমন একটা ভাব এল, যেন তিনি প্রথমবার বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন। এদিকে গভীর রাতে দিশার ফোন আবার বেজে উঠল। একই নম্বর। তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। ধরবেন কি ধরবেন না ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত ধরলেন। ওপাশে রণজয়। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সে বলল,
—আমি শহরে এসেছি।
দিশার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শীতলতা ছড়িয়ে গেল।
—কেন?
—তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
—এত বছর পরে?
—হ্যাঁ।
—কেন?
রণজয় উত্তর দিতে সময় নিল। তারপর বলল,
—কারণ আমি জানি, কিছু ঋণ না শোধ করে মানুষ বাঁচতে পারে না।
দিশা জানালার বাইরে তাকালেন। রাত গভীর। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কিন্তু তার মনে হল, বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা পথ আবার খুলতে শুরু করেছে। সে পথ কোথায় নিয়ে যাবে, তিনি জানেন না। শুধু জানেন, অতীত কখনও পুরোপুরি মরে না। সুযোগ পেলেই সে ফিরে আসে। আর যখন ফিরে আসে, তখন শুধু স্মৃতি নিয়ে আসে না, নিয়ে আসে হিসাবও। 🍁 (ক্রমশঃ)

 

 

🍂কবিতা

 

সুদীপা বসু -এর দু’টি কবিতা

পাশেই তুমি

আমার পাশেই তুমি
অথচ চারিদিক জল থৈ থৈ
বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস নেই
শুধু প্লাবনের স্রোত!

আমার পাশেই আছো
অঘ্রাণের রোদ্দুরের মতো
তবু বিষন্ন আকাশে দেখি
মেঘের তোলপাড়!

ঘরময় তোমার সংসার
অগোছালো আগের মতোই
হাওয়ায় হাওয়ায় চিৎকার
শুধু ধূসরিত গোধূলির রঙ!

 

চেনা-অচেনা

কয়েক দিন ধরেই বোতলদের বলছিলাম
ঐ রকম ভরা পেটে থাকিস্ না
বদ হজম হবেই হবে।

অনেক দিন পর
স্বপ্নকেও বললাম-
এই অসময়ে আর
আমার ঘুম ভাঙ্গাস না,
এমনিতেই ঘুম আসে না।
এখন আর আগের মতো
ঘুমও কাছে আসতে ভয় পায়।
কি জানি–
কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা।

রাস্তায় বের হলে–
রাস্তাটাও মশকরা করে।
অথচ রাস্তা আমার অনেক দিনের চেনা,
কেমন যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেছে।

চেনা মুখ গুলোও–
এখন মুখোশে ঢাকা,
পাশাপাশি হাঁটছি অথচ দূরত্ব বাড়িয়ে!

ইদানীং ব্যবধান প্রাচীর তুলেছে।

 

 

বৃন্দাবন দাস -এর একটি কবিতা

আমার লেখালেখি

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যা লিখেছি ভালই লিখেছি।

ভাল’র তো আর শেষ নেই! কত কত তার পথ!
পথের কথা বললে, চারধারের কথা আসে,
গাছপালার কথা আসে, খানাখন্দের কথা আসে,
আগাছা আর ঝোপঝাড়ের কথা এসে যায়।

এত যাওয়াযায়ির ভেতর ঢুকে পথ না হারানোই ভাল।

তোমার পথ তুমিই চলো।
এত ডাকাডাকির কী আছে?
ডাকলেই তো আর সবাই সাড়া দেবে না!
যার যার আলাদা বিছানা বালিশ …
কারো কারো উইয়ের ঢিবি হয়ে উল্টো মুখো জীবন।

আমাদের ‘পৃথিবী জয়ের ঘোড়া’ যতই দৌড়ুক
রোজি ঢুকে যাচ্ছি ‘ নির্জনতার গভীর কন্দরে’
গাঢ় অন্ধকার ঠেলে যতদূর যাওয়া যায় –
এই আর কী…

 

শর্বাণীরঞ্জন কুন্ডু -এর একটি কবিতা 

দোদুল্যমান সমাজ 

এখন সমাজ মাধ্যম হয়েছে।
মানুষ সত্য মিথ্যা অনেক কিছু বলছে।
কিন্তু কে সত্য বলছে, কে মিথ্যা,
তা কি বোঝা যায় না?
নিশ্চই যায়।
কিন্তু কাজের চাপে পদক্ষেপ নিতে অনেক সময় হয়ত সরকারের দেরী হয়ে যায়।
নানা বিধি, বাধা-নিষেধ থাকে।

পাপের ঘড়া একটু একটু করে ভরে।
আর এই যে পাপগুলো সংঘটিত হয়,
তাতে মানুষের প্রাণ যায়,
আরো অনেক ক্ষতি হয়।
এগুলোকে আক্ষেপের সাথে স্বীকার করতে হয়।
যার যায়, তার যায়।
ঠিক হরিণের পালে বাঘ পরলে যেমন হয়,
মানুষের অবস্থাও তদনুরূপ।
কাউকে কাউকে বধ্য হতে হয়।
দু ফোঁটা চোখের জল পরে,
বলতে হয় ভবিতব্য!
মানুষ ক্রমে সেসব ভুলেই যায়।
যার যায়, তার যায়।
সভ্যতা এগোয়,
কখনো পিছোয়।
কবে পরিবর্তন আসে,
চাকা আবার ঠিক দিকে ঘোরে,
কেউ আগাম বলতে পারে না।
কাল চক্র ঘোরে।
এভাবেই দোদুল্যমান সমাজে সব কিছু চলে।
মানুষের তৈরী সমাজ ব্যবস্থা যে বড়ই অসুষ্ঠ!

 

 

মাহফুজা অনন্যা -এর দু’টি কবিতা

রোরুদ্যমান চুম্বন

খুব বাড়াবাড়ি করে চলেছ একরোখা শীত ঋতুর মতো, হাড় কাঁপিয়ে দুঃখে শীতল করে দিয়ে যাচ্ছো, অবুঝ প্রেমিক আমার

কষ্টের বারুদ জ্বেলে দূর থেকে সহাস্যে দেখছো, আগুন কী করে আমাকে ঝলসে দেয় পুড়িয়ে মারে!

হৃদয়ের আলমিরায় পিয়ানোটা বেজে চলেছে নির্বিঘ্নে, কোনো থামাথামি নেই, করুণ সুর একসময় তোমাকে বধির সাব্যস্ত করে…

একদিন এই বিপুল প্রান্তরে আর কোনো হৃদয় জাগবে না
এলোচুলে মধ্যবয়সী কোনো সুদর্শনা নারী অপেক্ষা করতে ভুলে যাবে

একদিন, একদিন আত্মার সন্ধানে কেউ তোমার স্মৃতিকে করবে না রোরুদ্যমান চুম্বন…

 

 

দ্বিপদী অনন্যতা

চোখ থেকে ঘুম বের হয়ে ঘরময় উপচে পড়ে
জীবনের স্মৃতি থেকে আমিও বেরিয়ে পড়ি তোমার সাথে হিজরতে

নির্বাসিত যারা তারা কারাগার সেলাই করতে করতে ছোট হতে থাকে আদিম জরায়ুর ভিতর
দেহের সমুদ্রে ভাসে অশ্রুর হ্রদ!

জীবন সমুদ্রে আমাকে আমার চেয়ে বেশি চেনে যে, সে তুমি
তোমাকে নিয়েই আমার দেহ একক, অখণ্ড…

তুমিই একমাত্র জানো, তোমার জন্যই অতলান্ত জাহান্নামে নির্মাণ করি আমাদের প্রেম।

 

 

 

🍂গল্প
বোকারাম আকাশ থেকে পড়ে। এই লোকটার সাথে দেখাই হয়নি। তবে কি সেই নেকড়ে আর ভেড়ার গল্পের মতো! নেকড়ে ঝর্ণার উপরের দিকে দাঁড়িয়ে নিচের পাহাড়ের খাঁজে জল পান উদ্যত ভেড়াকে বলেছিল, তুই আমার জল নোংরা করেছি্স, তোকে আমি ছাড়ব না। ভেড়া হাতজোর করে বলেছে, প্রভু জল তো আপনার কাছ থেকে আমার কাছে আসছে, আমি কীভাবে নোংরা করব!

বোকা বানানোর গল্প

তাপস রায়

বোকারাম মাহাত পিতৃদত্ত নাম। পাল্টানোর উপায় নেই। বাবা ছেলেকে বোকা বানিয়ে দিয়ে স্বর্গে কেটে পড়েছে । বাবাকে নিচে নামিয়ে তো আর পার্মিশন নেবার উপায় নেই। আর বাবার অসম্মান হতে দেবেন না মা-ও। মা বাবার গুলি খাওয়া চাকরি নিয়ে এখন পুলিশ কনস্টেবল। লোকে বলে মাওবাদীরা একদিন ঝেড়ে দিয়েছিল। তখন ওরা বাঁকুড়ায় থাকত । এখন এখানে এই উত্তর-২৪ পরগণায়। কাজের গুঁতোয় হোক বা স্বভাবই হোক মা বেজায় রাগি । তাকে এড়িয়ে পাতাটি কুড়োনোও চলে না। ফলে নাম পাল্টানোর জায়গায় বোকারামের কপালে আরো একটা দাগ জমে। কাটা দাগ। স্কুলের ছুটিতে মারামারি করে কপাল কাটে। ওটা ক্লাস ফাইভের দাগ। এখন বড় ক্লাসে উঠে, মানে ক্লাস নাইন-এ আরো খানিক বড় দেখায় সেটি। আয়নায় চোখ পড়লেই বোকারাম বলে খ্যাপানোর জন্য বন্ধুদের সাথে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা রোজ রোজ তাজা হয়ে ওঠে।
বোকারাম মাহাত-র কাছে স্কুলের গরমের ছুটি এবছর একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। ভোটের মরসুম। টিভি দেখতে দেখতে একটা মতলব মাথায় এসেছে তার। সে দেখেছে সবাই রামকে ব্যবহার করে শুধু বড় লোক নয়, মানী মানুষ হয়েও যাচ্ছে। যেমন হনুমানের জ্বালায় মানুষ অতিষ্ঠ হলেও যেই রামভক্ত হনুমান হয়ে মেটে সিঁদুরে শরীর লিপ্ত করে কোনো হনুমানমূর্তি অশ্বত্থ তলায় বসছে, মাসাধিক কাল যেতে না যেতেই সেখা্নকার টিকিধারী পুজারীর সে কী কদর! ঢলোঢলো বৌ-মানুষরা এসে মাথা পেতে আশীর্বাদ নিচ্ছে ওই পুরোহিতের। মন্দিরের কাঁসার রেকাবিতে পাঁচ টাকা দশ টাকার ঠন্‌ ঠন্‌ শব্দে আমোদিত হয়ে উঠছে স্থানীয় বাতাস।
আজ বোকারামের মনে হলো বাইরে থেকে এসে লোকজন করে খাচ্ছে এখানে, অথচ তার নিজেরই কিছু হল না। কিন্তু হওয়ার হলে তারই তো হওয়ার কথা। আজ নিজেকেই দুষছে। এতদিন মাথায় আসেনি কেন! গনগনে্, সূর্যের দিকে চেয়ে সে মরা বাবাকে একটা পেন্নাম ঠুকে দিল। বোকারাম নামটা তো তারই দেয়া।
দেশের সব মহান লোকের মতো তারও নামের সাথে রাম জড়িয়ে আছে। শ্রীরাম থেকে শুরু করে কাঁশিরাম। ওষুধের কারবারী রামদেব থেকে সিনেমা ব্যাবসার রামোজী সিটি। লোকে প্রতিদিন রাম উচ্চারণ না করে কথাই বলতে পারে না। কোনো কথা ভুল বললে জিভ কেটে বলে, আরে রাম রাম। শ্মশান যাত্রার সময় সমবত ধ্বনি বের হয়, রাম নাম সাচ হ্যায়। এখন বোকারাম নিজের মনে চ্যুইংগাম চিবতে চিবতে পায়ের দোল বাড়িয়ে দিয়েছে বারান্দায় কাঠের টুলে বসে। বেলা নটা। মা বেরিয়ে গেছে ভোটের ডিউটিতে, সে বায়োলজি বইয়ের পাতায় চোখ রেখে মন রেখেছে এই নতুন নাম-কীর্তনে।
বই পাশে রেখে সে রামের সাথে যুক্ত শব্দ জোড় খাতায় টুকে ফেলতে চাইল। প্রথমেই লিখে ফেলল রামছাগল শব্দটি। এবং বিচার করে দেখল রাম যুক্ত হওয়ায় ছাগল সমাজে তার প্রতিপত্তি যথেষ্ট হয়েছে। তাহলে বোকাদের সমাজেও সে গুরু হয়ে উঠতে পারে আর রামভক্ত, রামদা শব্দগুলিও সে পাশে লিখে গোলাকার বন্ধনীর ভেতর রাখল।
স্কুল বন্ধ না হলে ঠিক ছিল। কিন্তু স্কুল খোলার জন্যও তো আর অপেক্ষা করে থাকতে পারবে না! খুব প্রাণের বন্ধু স্নেহাংশু এ তল্লাটেই থাকে। গ্যাসে ভাত হয়ে এসেছে। নামিয়ে রেখে, গ্যাসের নব ঘুরিয়ে বোকারাম সাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে দিল। উসুমপুরের বটতলা পেরিয়ে আগরপাড়া স্টেশনমোড় মাত্র এক কিলোমিটার। রোদ্দুর তেমন তাতেনি। ভোট গরমও আজকে কম। পাঁচ দফা ভোট গোটা দেশে হয়ে গেছে, আর দু দফা বাকি।
স্নেহাংশু বলল, “ জানিস তো যখন কান মলা দিতে ইচ্ছে করছে, অথছ পারছে না, বাবা মা দু’জনেই তখন আমাকে বোকা বলে গালি দেয়। মা আবার এককাঠি সরেস, বাজারে যেতে হলে বলে, কাউকে একটা সঙ্গে নিয়ে যা, তুই যা বোকা, সবাই ঠকিয়ে দেবে। ”
“ বোকা বললে তোর রাগ-দুঃখ হয় না?” এটা স্নেহাংশুকে উদ্দেশ্য করে বলা বোকারামের।
“ হবে না কেন! ক্লাসে বন্ধুদের মিচকি হাসি দেখলে গা চিড়বিড় করে। বিশেষ করে অঙ্ক ক্লাসে। আমি অঙ্কে খারাপ, তাতে তোদের কি! অঙ্কে চল্লিশ পাওয়া মানে কি বোকা! কেমিস্ট্রিতে আশি, বায়োলজিতে চুরাশি পেলাম যে, তার বেলা! বোকা বললে রাগ হবে না!”
“তাহলেই বোঝ স্নেহাংশু, আমাকে তো সব সময় ওই বোকার বোঝা বইতে হয়। আর ঠিক তোর যেমন কপাল, আমারও। আমার নামের সাথে যে রাম শব্দটা আছে, তা কারো চোখেই পড়ে না।! ”
স্নেহাংশু বিষয়টা তেমন বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু এটা বোঝে বোকারামের গলার স্বর কেমন পালটে গেছে। একটা কিছু সে বলতে চায়, যা নতুন। সে বোকারামের মুখের উপর কৌতূহলী চোখ ফেলে।
“ শোন, আমি মায়ের কাছে মুখে মুখে রাময়ণ মহাভারত শিখেছি। সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ‘যুদ্ধের ডামাডোলের ভেতর গলার শিরা ফুলিয়ে বলেছিল অশ্বথামা হত। তারপর গলা নামিয়ে বলেছিল ইতি গজ। এই চাপাস্বরের গুরুত্ব আছে। যুদ্ধ পর্যন্ত হাত ছাড়া হয়ে গেল ওই চাপা স্বরের কেরামতিতে!”
স্নেহাংশু দেখল না কোনো বোকামো কথা বলছে না তার বন্ধুটি। সে উদ্গ্রীব হল।
“ দেখ বস, আমি সারাদিন কাল টিভিতে দেখেছি বিদ্যাসাগর বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে চলে ফিরে বেড়াচ্ছেন। আরে সোদপুর স্টেশন বাজারেও দেখলাম খোলা ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ছেন তিনি। তাঁর হাতে ক্ষয়ে আসা লাল রঙের মলাটে ঢাকা বর্ণ পরিচয়। তার দিকে লোকে ফুল ছুঁড়ছে। জয় বিদ্যাসাগরের জয়, ধ্বনির সাথে সাথেই উঠছে জয় কে এস সি-র জয়। লোকে তার দিকে শুধু ফুল ছুঁড়ছে না, টাকাও ছুঁড়ছে। কত টাকা যে জমে গেল!
“ তাতে কী হল? আমিও তো টিভিতে দেখেছি। লোকটা খুব স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন বিদ্যাসাগরের চরিত্রে। আর মেকআপও নিখুঁত হয়েছে। ”
“ দেখ স্নেহাংশু, আমি খানিকটা খানিকটা অভিনয় জানি , আমিও ওরকম সেজে গুঁজে দাঁড়িয়ে পড়তে পারি, হ্যাঁ। ”
স্নেহাংশু বিস্ময় প্রকাশ ঠিক নয়, খানিকটা বিরক্ত স্বরে বলে, “ ভোটের বাজারে বিদ্যাসাগর, রামমোহন এর দর উঠেছিল। উঠবেই। ওঁরা তো মহাপুরুষ। কিন্তু তাই বলে তুই! ”
বোকারামের আর্ত চোখের দিকে সুধাংশুর চোখ পড়ে যেতেই তো তো করে সে, “ না,আমি মানে বলতে চাইছি যে প্রাতঃস্মরণীয় বলে ভোটের বাজারে ওদের প্রচারে লাগান গেছে। এর মানে এই নয় যে কেউ ভোটের প্রচারে সাজ গোজ করে দাঁড়ালে গুরুত্ব পাবে।”
“আমি তো তাই বলছি, রাস্তা ফাঁকা, চল পানসি বেলঘড়িয়া।”
স্নেহাংশু মাথা চুলকোয়।
চায়ের কাপে জম্পেশ শেষ চুমু্কটি দিয়ে বোকারাম বলল, “শুধু আমাদের জনা চারেক ছেলে জোগাড় করতে হবে রে। বাদ বাকি পাবলিক দিয়ে ম্যানেজ”।
বোকারাম কথা থামায় না। সে আজ বেশ খানিক উত্তেজিত। “ বলছি কি একটা রিক্সাকে ম্যানেজ করতে পারবি ? আর একটা চোঙাও দরকার। রিক্সার পেছনে বেঁধে নিতে হবে। ”
“ হ্যাঁ সে তো করা যাবে, কিন্তু তা দিয়ে হবেটা কী !” স্নেহাংশু-র গলায় বেশ উষ্ণতা।
বোকারাম স্নেহাংশুর কথাকে তেমন পাত্তা না দিয়ে বলে যেতে থাকে, “ দু’টি ছেলেকে লাগবে, মানে মেয়ে হলে ভালো হয়। তা তুই আবার মেয়েমানুষ কীভাবে ম্যানেজ করবি, তা ছেলে দিয়েই হবে। ওরা দুজন, মিছিলের সামনে সাদা কাপড় বা গেরুয়া কাপড় যাই হোক মেলে পথ পরিক্রমা করবে। টাকা-পয়সা ওই কাপড়ের ভেতরেই পড়বে।”

বোকারাম টিভিতে দেখেছে বিদ্যাসাগর বেশধারী এক ভদ্রলোক সকালে রুলিং পার্টির প্রচারে অংশ নিয়ে রোড শো করেছেন। আবার দুপুরের খাবার খেয়েই বিকেল চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বিরোধীদের সমাবেশে মঞ্চ জুড়ে হাঁটা-চলা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই বিদ্যাসাগর দেখার জন্য ভিড় করছে। বক্তারাও জ্যান্ত বিদ্যাসাগরকে দেখিয়ে গলায় তার সপ্তক লাগিয়ে হাততালি আদায় করছেন।
বোকারাম এখানেই নিজেকে প্লেস করে ভাবল, হ্যাঁ হবে। রেললাইনের অন্যপাড়ে যেখানে স্নেহাংশু থাকে, সেখানে অ্যান্টি রামের লোকজনে ভর্তি। ওই পাড়ার ক্লাবের ছেলেরাও তাই। আজ সে যদি বিদ্যাসাগরের মতো ওই দিকটাতে একটু অন্য অভিনয় করে আসতে পারে তো কি এমন দোষের! আর ওই দিকটায় কিছু করলে চম্পাও জানবে না। মাকেও সে নালিশ করতে পারবে না।

“ আরে সেই থেকে ভুল-ভাল বকে যাচ্ছিস যে বড়, পেট গরম হয়েছে নাকি!” এইসব এতরবেতর কথায় মেজাজ খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। স্নেহাংশুর-ও হলো।
স্নেহাংশুকে অস্বস্তির ভেতর আর রাখবে না ভাবল বোকারাম। চা খাওয়াও হয়ে গেছে। বোকারাম বলল,
“ দেখ, আমার একটা ভাবনা এসেছে। তা হল, রাম নিয়ে সবাই যা খুশি করছে, আমরা একটু করতে পারব না কেন! রামবাবু নিজে তো আর লোকজনকে বলে দিচ্ছেন না, তুমি আমাকে নিয়ে করো। মানে তাঁর পারমিশনের যখন প্রয়োজন নেই, তখন আমিও রামকে ব্যাবহার করতে পারি। আর এখানে আমার হক সব থেকে বেশি। ”
স্নেহাংশু বোকারামকে বলতে দেয়। সে বোকারামের মুখের উপর চোখ ফেলে বসে থাকে। মানে ওই ফাত্‌নার দিকে তাকিয়ে মাছ ধরতে বসার মতো।
বোকারাম বললও। “ আমাদের পাড়ায় ঘরে ঘরে হনুমান চালিশা পড়া হয়। মঙ্গলবার নিরামিশ। মানে অধিকাংশই রামের ভক্ত। এখানে আমরা একটা রোড শো করব । সবাই করছে। আর রাম অনুরাগী দল এটা পছন্দ করবে। তারা আমাদের সাথে থাকবে। আর খানিকটা জয়ধ্বনি দেবে। বিরোধী দলকে মুর্দাবাদ বলবে। ”
স্নেহাংশু বলল,“ হ্যাঁ , সে ব্যাবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু জয়ধ্বনিটা কার নামে দেবে?”
“ আমার নামে দেবে।” বেশ দৃপ্ত উচ্চারণ বোকারামের।
স্নেহাংশু দেখল বোকারাম ভাট বকছে। সে গাত্রোত্থানের আয়োজন করে। মানে বোকারামকেও বাড়ি যাবার ইঙ্গিত দেয়।
“ আরে সবটা শুনবি তো! না শুনেই উঠে পড়ছিস যে! দেখ , আমরা এখানে যুধিষ্ঠিরের ফর্মুলাটা ফেলব। মানে আলগা উচ্চারণের কেরামতি আর কি! অশ্বত্থামা হত কথাটা লোকে শুনবে। বাকিটা শুনবে না। রিক্সার উপরে দাঁড়ানো আমার হাতে একটা পুরনো বড় খেলনা ধনুক থাকলেও থাকতে পারে। আর তুই রিক্সার পেছনে মাইক্রোফোনে চেঁচাবি, ‘ জয় শ্রী বোকারাম’। কিন্তু বোকা শব্দটা এমন আস্তে হবে বা জড়িয়ে বলবি লোকে শুনতে পাবে না। ”
“ হ্যাঁ, তা তোর নামে জয়ধ্বনি লোকে শুনবে কেন?”
“ লোকে আমার নামে জয়ধ্বনি শুনবে না। তাদের কান অভ্যস্থ হয়ে আছে জয় শ্রী রাম-এ। তারা বোকারাম না শুনে শুনবে জয় শ্রীরাম । তারা দলে দলে রিক্সার পেছনে মজা দেখতে ভিড় করবে। সামনে আমাদের ভোট, আমরা একটা বিশেষ দলের প্রচার করছি ভাববে। এটা তাদের সমর্থকদের ভালো লাগবেই। আমার ধারণা সামনে কাপড় পাতা থাকলে টাকা পয়সা ফেলতে ভক্তরা কার্পণ্য করবে না। আর পুলিশও বকবে না। বোকারাম ধ্বনিতে তাদের কোনো অ্যালার্জি নেই। ”
“ বেড়ে ভেবেছিস ! কিন্তু এটাতে তো তোর নাম ফাটবে, আমার কী হবে!”
“ আরে বোকারাম, আমাদেরই তো সব হবে। এ পাড়া ও পাড়ায় ডাকবে লোকজনেরা। কত কত টাকা হবে বল তো ! সব আমাদের। মানে আমাদের দু’জনের। ”
“ ইস তুই আমাকে বোকারাম বললি! অথচ তোর বাপ-মার দেয়া নাম বোকারাম। আর তুই আমাকে বললি! ”
“ ওই রে, জিভ ফসকে বেরিয়ে গেছে রে! এটা হল গে স্লীপ অব টাং। তুই রাগ করিস না। ”

দুই.
কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামাল একজন মহিলা। বেজায় রেগেছেন তিনি। আর রাগ হওয়াই তো স্বাভাবিক। সারাদিনের পর বাড়িতে এসে ধড়াচূড়ো ছেড়ে চান-টান করে ফ্রেস হতে হবে। কিন্তু কোথায় কী! ঘর বন্ধ।

রোয়াকে বসে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ফোন করতে যাবেন, তখনই এই অদ্ভূত খবরটা দিল পাশের বাড়ির মেয়ে চম্পা।
“ সে তুমি যারে খোঁজ করতিছ, দেখোগে যাও, তিনি রিক্সার উপরে দাঁড়ায়ে তিরধনু ছোঁড়া প্রাকটিস করছেন। আর মাইকে তার নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে লোকজন চলেছে। হেই ঢ্যাঙা মানুষটা ঝুঁকে পড়ে একটা হলুদ গাঁদা ফুলের মালাও গলায় পড়ে নিয়েছে গো মাসি।”
ভয় পেলেন ঝুমরা দেবী। তিনি পুলিশে কাজ করলেও, এত ছোটোখাট তার পরিচয়, যে অন্যরকম কিছু হলে পুলিশের হেপাজত থেকে ছাড়িয়ে আনতে কালঘাম ছুটে যাবে। ভোটের বাজার, পুলিশ হন্যে হয়ে লোক খুঁজছে ফাটকে পুরবে বলে। ইলেকশন কমিশনের নির্দেশ আছে। আর আজকাল যা হয়েছে, কথায় কথায় উঁচু মাথাদের মাথা বিগড়ে যাচ্ছে। বসে থাকাটা নিরাপদ বোধ করলেন না তি্নি। চম্পার কাছ থেকে জেনে নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে এই রেলবাজারের কাছে ধরা গেল। কোনো কথাবার্তা নয়। কান ধরে নামিয়ে নিলেন প্লেন ড্রেসের রামকে। তখনও তার হাতে খেলনা ধনুর্বাণ।
স্নেহাংশু পরদিন গুটিগুটি পায়ে দুপুরে এসেছে। বেশ খানিকটা টাকা হয়েছে। রিক্সাওয়ালা, কাপড় ধরা ছেলেদুটো আর মাইক ইত্যাদির খরচ দিয়েও সাতশ টাকা বেঁচে আছে। বোকারামের ভাগের সাড়ে তিনশ টাকা দিতে এসেছে। কাল তো বোকারামকে রিক্সা থেকে নামিয়ে নিয়ে চলে গেলেন ওর মা।
জীবনের প্রথম উপার্জন। বোকারাম হাতে নিয়ে উদাস হয়ে গেল। আকাশে রোদ ঠেলে বাবাকে খুঁজে দেখে একবার বিড়বিড় করে নিল। আর এটা করল একেবারে লর্ডসের মাঠে শচিন যেমন করে করেছিল শত রান করার পর। মনে আছে। ঠিক সেরকম করল সে। বাবাকে কৃতজ্ঞতা জানাল। বাবা যদি নামটা না দিত, তবে কি পারত আজ!
স্নেহাংশু চলে যাবার পর সর্ষে তেল গায়ে মাথায় মেখে রাস্তার উল্টো দিকের ক্ষয়ে যাওয়া তাল গাছের গুঁড়ির ঘাটে বসে জলের ভেতর পা নাচিয়ে শব্দ তুলতে তুলতে বোকারাম মাহাত নতুন একটা প্লান ভাজতে চেষ্টা করল। উপার্জনের প্লান। নাম ভাঙানোর প্লান।
“ কি বোকা দা, চান না করে ঘাটে বসে আছ? স্কুল খুলবে কবে?”
ইউরেকা! পেয়ে গেছি। প্রথম ঝটকায় খারাপ লেগেছিল কথা। শেষ পর্যন্ত চম্পাও ওকে ‘বোকা’-দা বলছে! এই মেয়েটার প্রতি বোকারামের যে দুর্বলতা আছে, তা দু’বাড়ির সবাই জানে। বোকারামের মা-ও ঠিক করে রেখেছে এই পুতুল পুতুল মেয়েটিকে সময় হলে নিজের ঘরের লক্ষ্মী করে নেবেন।
পেছন ফিরে চম্পার মুখের দিকে তাকিয়ে টের পেল, না এই কথার ভেতর শ্লেষ নেই। খুব সরলতায় মোড়া মুখ থেকে তার নামটি ছোটো করে, আন্তরিক করে ডাক পাঠিয়েছে অষ্টম শ্রেণীর সুন্দরী। যেমন মামা বাড়িতে প্যাংলা সরলা মাসিকে গুরুজনেরা আদর করে সরু বলে ডাকে। যেমন স্কুলে ঘন্টা পেটানো পিয়ন, কুচকুচে কালো ঘনশ্যাম রায়কে ছাত্র শিক্ষক সকলেই ঘনা-দা বলে ডাকে। আর সে তো পড়েইছে গল্পের হবুচন্দ্র রাজা আর তার গবুচন্দ্র মন্ত্রীকে সবাই আদর করে হবু, গবু বলে । এই ডাকটা অনেকটা সেরকম। বোকারাম নিজের খারাপ লাগাকে বাড়তে না দিয়ে ভাবনার আবিষ্কারটুকু নিয়ে বেশ পুলকিত হল। চম্পার কথায় কোনো বাক্যব্যায় নয়। সে ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ল জলে। তারপর তিন ডুব দিয়েই উঠে এল। চম্পা দেখল, অন্য দিনের মতো পুকুরের শান্ত জলতল কাঁপিয়ে বোকা-দার উচ্ছ্বাস সাঁতার আজ কোনো অজ্ঞাত কারণে ডুব মেরেছে। বোকা-দার ভেজা শরীরের চলে যাবার দিকে চোখ ফেলা ছাড়া ফলে তার অন্য কিছুই কিছুই করার ছিল না।
বোকারামের মাথার ভেতর তখন আইডিয়া কিলবিল করছে। সাঁতার কাটতে গিয়ে তা যদি পালিয়ে যায়! হ্যাঁ সত্যি তো বোকারামের বোকা কথাটির সম্যক ব্যবহার করা যেতে পারে। বোকারাম দু’দিন আগেই টিভিতে দেখেছে এক বিদ্যাসাগরকে নিয়ে সব দলের টানাটানি। কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি নাকি ভেঙে গেছে। আর তাতে বাঙালিকে বর্ণ পরিচয় করানো বিদ্যাসাগরমশাই নাকি খুব চটেছেন। বোকারাম সারাদিন ধরে সব চ্যানেলে সেই খবরই দেখেছে।

বোকারাম টিভিতে দেখেছে বিদ্যাসাগর বেশধারী এক ভদ্রলোক সকালে রুলিং পার্টির প্রচারে অংশ নিয়ে রোড শো করেছেন। আবার দুপুরের খাবার খেয়েই বিকেল চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বিরোধীদের সমাবেশে মঞ্চ জুড়ে হাঁটা-চলা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই বিদ্যাসাগর দেখার জন্য ভিড় করছে। বক্তারাও জ্যান্ত বিদ্যাসাগরকে দেখিয়ে গলায় তার সপ্তক লাগিয়ে হাততালি আদায় করছেন।
বোকারাম এখানেই নিজেকে প্লেস করে ভাবল, হ্যাঁ হবে। রেললাইনের অন্যপাড়ে যেখানে স্নেহাংশু থাকে, সেখানে অ্যান্টি রামের লোকজনে ভর্তি। ওই পাড়ার ক্লাবের ছেলেরাও তাই। আজ সে যদি বিদ্যাসাগরের মতো ওই দিকটাতে একটু অন্য অভিনয় করে আসতে পারে তো কি এমন দোষের! আর ওই দিকটায় কিছু করলে চম্পাও জানবে না। মাকেও সে নালিশ করতে পারবে না।
বোকারাম খুব তাড়াতাড়ি বিউলির ডাল, ঢেরস ভাজা আর গন্ধরাজ লেবু দিয়ে এক থালা ভাত পেটে চালান করে দিয়ে থালা-বাসন মেজে ধুয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সবে সকাল সাড়ে এগারো। আজ বিকেলে রামের বিরোধীদের দলের হয়ে যদি রোড শো করা যায় তবে তার নাম আবার ফাটবে। বোকারাম নামটি খানিক জনপ্রিয় হবে।
স্নেহাংশু গত কালের পাওয়া সাড়ে তিনশ টাকা লুকিয়ে রেখেছে আগরওয়ালের অঙ্ক বই-এর ভেতরে। বোকারামকে আসতে দেখে পাতা উলটে একবার দেখে নিয়ে বই বন্ধ করে দিল। হ্যাঁ, তার পছন্দ হয়েছে
বোকারামের প্ল্যান। খারাপ কিছু না। ধুতি পরে তার বন্ধু খোলা ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে। শুধু তার বুকের উপরে রঙিন অক্ষরে নাম লেখা হবে। প্রথম বোকা শব্দটা বেশ বড় আর রঙিন হবে।
বন্ধুকে বোকারাম আরো বলল, “ তুই আমাদের কাউন্সিলর হেবোদাকে বলিস আমি রাম নাম জব্দ করার জন্য নিজের নাম ব্যবহার করে এই মিছিলে যাব, যেন কিছু মালকড়ি ছাড়ে। আমরা দু’জন তা ভাগ করে নেব। আর যেন একটা বড় ফেস্টুন, মানে আজকাল তো খুব তাড়াতাড়ি কম্প্যুটার ড্রইং দিয়ে ফ্লেক্স বের করে দেয়া যায়, মানে বলছিলাম কি , ‘বোকারামের পদযাত্রা’ বলে একটা ফেস্টুন করলে আরো বেশি কাজে আসবে। আর আমার নামেরও প্রচার হবে। হেবোদার দলও ভোটের আগে চাঙ্গা হয়ে উঠবে। ”
কত কত লোক আর পতাকা। সরকারি দলের অনেক সুবিধা। লোক আজকাল ফোনে ফোনে জোগাড় হয়ে যায়। মুরগি কাটা তপু রোডশোর শেষে কাছে এসে একটু হাত মেলাতে চেয়ে এগিয়ে এসেছে যেমন, তেমনই অটো ইউনিয়নের নেতা কটা-জাহাঙ্গির আর তার দলবলের বুকেও ‘ বোকা রাম’ লেখা বড় বড় ব্যাচ ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছে বোকারাম। তার নিজের নাম কত কত জায়গায় ছড়িয়ে গেল, এই আত্মপ্রসাদ নিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে তার মনে ভয় হয় চম্পা আবার আজ দেখে ফেলেনি তো! রেললাইন টপকে তাদের পাড়ার দিকেও যে একবার ঢুকেছিল মিছিল! ওর মুখ বন্ধ রাখার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে মা জানতে পারলে ধোলাই বাঁধা আছে।
দু’হাজার টাকা হাতের ময়লা ওদের। তাতেই রফা হয়েছিল। হেবো দা স্নেহাংশুকে বলেছে, আরও একদিন বিধায়কের উপস্থিতিতে এই রেটেই কাজটা করে দিতে হবে। তা ভোটের প্রচার শেষ হবার ঠিক আগের দিন হবে। তাতে মানুষের স্মৃতিতে টাটকা থাকবে অ্যান্টি রাম ফিলিং। ভোট দেবার সময় যেন রামের দিকে সমর্থন না যায়। যেন রামকে বোকা হিসেবে ভাবে তারা। মানুষ সবাই জানে রাম অযথা লোকের কথায় নিজের স্ত্রীকে সুইসাইড করতে
পাঠিয়েছিল। তা সে বোকা না তো কী! রামের দলের খাপ একেবারে শেষবেলায় এসে খুলে নিতে হবে, যাতে বিরোধীরা বোকারামকে নিয়ে কাউন্টার এটাক করার সময় না পায়।

তিন.

বেলঘরিয়া থেকে যে রাস্তাটা তিন-চারটে বড় ঝিলকে সাথে নিয়ে উসুমপুরের দিকে এসেছে, সেইখানে দারোগাবাড়ির মোড়ে এসে বিকেলের মিঠে হাওয়ায় দু’ই বন্ধু ফুচকা খাচ্ছিল। দু’দিনে তাদের নিজেদের ট্যাঁকের অবস্থা টাঁকশালের মতো। জীবনে এত টাকার মালিক তারা আগে কখনও হতে পারেনি। দুজনের কাছেই ১৩৫০ টাকা করে আছে। দু’জনেই আজ খুচরোটা, মানে ৩৫০ টাকা করে নিয়ে বেরিয়েছে। কুড়ি টাকা করে ফুচকা খেল দুজনে। কিন্তু টাকা দিতে গেলে বিহারী ফুচকাওলা একগাল হেসে বলে ওঠে “ মাফ কিজিয়ে, ইয়ে প্যায়সা নেহি লুঙ্গা।”
বোকারামের পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির শরীর ঝুঁকে আসে পাঁচ ফুটের ফুচকাওলার মুখের কাছে। আবার সে শুনতে চায়। কোনো ভুল হয়নি তো ! দশ টাকায় পাঁচটা করে, দশটা ফুচকা তো কুড়ি টাকাই। কম দিচ্ছে না তো ! সে বলে বসে, “ আমরা তো দশটা করে খেয়েছি, কুড়ি টাকাই তো হবে!”
“ আরে রাম রাম ! তা বলেছি নাকি! হিসেব ঠিক আছে , কিন্তু আপনাদের থেকে আমি পয়সা নিতে পারব না। হেবো বাবু জানলে আমাকে খুব ডেঁটে দেবে!”
বোকারামের মুখ হাঁ হয়ে আছে। তার মুখে কথা সরছে না দেখে স্নেহাংশু বলল, “ আমাদের ফুচকা খাওয়ার সাথে হেবো-দার সম্পর্ক কী?”
মুখে খইনি ছিল। একটু দূরে নালার ভেতর তা সশব্দে সমর্পণ করে এসে বোকারামের দিকে ঘাড় উঁচু করে ফুচকাওয়ালা বলল, “ আপনি এত্ত বড় নেতা, কাল আপনাকে নিয়ে মিছিল হল, আর আজকে আপনাকে আমি দু’টো ফুচকা খাওয়াতে পারব না! আরে রাম রাম! গুনাহ হয়ে যাবে আমার। আমিও তো ছিলাম কাল মিছিলে। আমিও শ্লোগান
দিয়েছি — বোকা রাম জিন্দাবাদ , বোকা রাম জিন্দাবাদ ! অনেকেই দেখেছে আমাকে। কাটারুটের আটোওলা সামা আর আমি একসাথে হেঁটেছি। ” ফুচকাওয়ালা নিজেকে পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী বলে পরিচয় দিতে চায়।
বোকারামের মাথায় বুদ্ধি খলবল করছে ততক্ষণে। বুঝে গেছে। ফুচকাওয়ালার মনের ভাষা বুঝে ফেলেছে। মা ঘরে ফিরতে সেই রাত সাত- সাড়ে সাত। এখন তো সবে সাড়ে পাঁচটা। আর একটু ঘোরাঘুরি করে ফ্রেস এয়ার মাথায় নিয়ে তবে পড়তে বসবে। বলল, “চল তো গুরু, তপুর মুরগির দোকানে। দেখি তো ! কাল তো হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে গিয়েছিল। আমি হাত ধরতে দিইনি। হাতে কত রক্তের দাগ। খুনীর হাত তো! মানুষ খুন করলে খুন, আর মুরগী খুন করলে খুন নয়! খুন খুনই! চল তো বস, সেখানে যাই।”
আগরপাড়া স্টেশনের আগে রেল-লাইনের ধারে ‘দিল হুম হুম চিকেন শপ’। ওটাই তপুর মুরগির দোকান। বেশ ভিড় থাকে। অফিস ফেরত যাত্রীরা ফেরার পথে পাঁচশ, আড়াইশ তুলে নিয়ে যায়। সকালে অফিস যাবার আগে বাজার করার সময় থাকে না। ট্রেনের শব্দে মুরগির আর্ত চীৎকার চাপা পড়ে যায়। দুশ কুড়ি টাকা করে কিলো।
“ কি হল তপু দা, কত করে কিলো যাচ্ছে? ”
ব্যাস্ত মানুষ। ওয়ান ম্যান আর্মি। একটা মুরগির গলা কেটে পায়ের বুড়ো আঙুলের তলায় কণ্ঠনালী চেপে রেখে তাকে ঝটপটাতে দিয়ে অন্য আরেকটির ছাল ছাড়াচ্ছিল। পালক ফেলে ফেলে পাশের লাল হয়ে যাওয়া জলের বালতিতে হাত ডুবিয়ে হাত সাফা রাখছিল। তারপর মুরগির দু’ই হাত ও পায়ের মাঝামাঝি সে তীব্র তীক্ষ্ণ বটিতে চিরে পেটের নাড়িভুঁড়ি আবার রিসাইকেলে মাছের খাবারের জন্য সরিয়ে রেখে একবার মুখ তুলতে পেরেই চমকিত হয়ে গেল বোকারামকে দেখে।
“ আরে হ্যাঁ হ্যাঁ এসো … মানে আসুন। কত লাগবে? একটুকু দাঁড়ান। মানে এই দু’জনকে দিয়েই আপনাকে দিচ্ছি। ”
এমনিতে তপুর বয়স বোকারামের থেকে ঢের বেশি। কিন্তু রাজনীতিতে উঁচু জায়গায় বসলে কেউ ভাই হয় না, সব দাদা। কাল ম্যাটাডোরের উপরে ছিল বোকারাম। আর তপুরা নিচে, পিছে পিছে। তাই সে দ্রুত তুমি সম্বোধন- কে আপনিতে পালটে নেয়। তাছাড়া কাল তো বোকারামের নামেই জয়ধ্বনি দিয়েছে। হেবো-দার নির্দেশে বিকেলের
কারবার কাল লাটে উঠেছিল। কিন্তু কিছু করার নেই। রেল লাইনের ধারে কেন, এখানে যেকোনো জায়গায় ব্যবসা করতে হলে হেবো-দাকে অসন্তুষ্ট করা চলবে না, তা সে জানে।
খদ্দের দু’জন চলে গেলে এক মুখ হেসে তপু বলল, “ ছোটো কাটব না বড়? ছোটো খেলে ভালো । মানে ছিবড়ে হয়ে যাবে না মাংস। ”
বোকারাম মুখে একটা অপার্থিব হাসি ধরে রাখে। মানে কাল যে হাসিটা তাকে ধরতে হয়েছিল, সেটা। মানে খানিকটা ক্যালেন্ডারের রামের মতো চাপা হাসি। অবশ্য কালকের মতো আজ আর সারা গায়ে নীল রং নেই। ওরা বলেছিল তো দামি রং। সোদপুরের গাড়িসাড়াইওয়ালা স্প্রে করছিল। সেই বলছিল বার্জার পেইন্টিং এর দোকান থেকে দিয়েছে। চামড়ার অসুবিধে হবে না। হ্যাঁ তা খুব একটা হয়নি। রাতে তেল মেখে পুরনো কাপড় দিয়ে ডলে নিতেই উঠে গেছে। তারপর লাইফবয় সাবানে স্নান করে নিয়েছে।
মুখের সেই হাসিটি নিয়ে সে শুধলো তপুকে, “ কত করে চলছে এখন?”
কঁক কঁক করে দু’টো ডাক দিতে না দিতেই ধড়ফড় শব্দ। আর পায়ের নিচে তেমন করে চেপে রেখে আর একটার গলায় কোপ সেরে সে বলল, “ দাম দিয়ে কী হবে গো! আমি কি তোমার কাছ থেকে, মানে আপনার কাছে থেকে দাম নেব ভেবেছেন! কাল কি আমি দেখিনি, কত জনপ্রিয় নেতা আপনি ! আপনি আমাদের অঞ্চলে থাকেন, এটাই তো আমাদের গর্বের বিষয়। টিভির লোকেরাও আপনার ফোটো তুলে নিয়ে গেছে। আর আপনাকে একটু মাংস খাওয়াতে পারব না!”
বোকারাম তোতলাতে তোতলাতে স্নেহাংশুর দিকে দেখিয়ে বলল, “না মানে , ওর দরকার শ’ পাঁচেক, তাই-ই।”
“ আপনার বলার আগেই আমি দু’টো কেটেছি দু’জনের জন্য। আপনার ওই দীর্ঘ শরীরে নীল রং খুব মানিয়ে ছিল জানেন। একদম ক্যালেন্ডারের রামের মতো। আপনার পাশেই আপনার বন্ধুকে কাল দেখেছি। ”
আবার তোতলায় বোকারাম। কিন্ন্ তু টাকা না দিয়ে কী করে নেব! বাড়িতে নিয়ে গেলে মা রাগ করবে। ”
বয়সে অনেক বড় হলেও এখন মুরগি মাংসের ব্যাপারী ছোটো হয়ে যায়। সে জানে রাজনীতির লোকেরা সব দাদা হয়। সেখানে ভাই বন্ধু তেমন চলে না। সে গলায় অনুনয় ফুটিয়ে নেয়, “ আপনার নিজের ভাইকে কি এরকম বলতে পারতেন! একটুকু মাংস কি আমি দাদাকে ফ্রিতে খাওয়াতে পারি না!”
আর কথা চলে না। কিন্তু মা-র কাছে কী কথা বলবে বোকারাম! ভাবতে ভাবতে বটতলার দিকে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে। সবে ছটা। মা আসতে আসতে এখনও একঘন্টা। মাংসটা রান্না করতে হলে তো একটু পেঁয়াজ আর আদার দরকার। আর গরম মশলা। বাড়ির কাছাকাছি মুদির দোকানে গিয়ে পাঁচশ পেঁয়াজ ,একশ আদা আর দুটো গরম মশলার পাউচ নিল। মনে পড়ল শুকনো লংকাও নিতে হবে। তারপর পকেট থেকে একশ টাকার নোট বের করে দিতেই বয়স্ক দোকানদার হাত জড়ো করে বলল, “ না না এটা আমি নিতে পারব না। আপনি হলেন গে ভগমান । আপনারা দেন বলে বলে আমরা খেয়ে পরে বাঁচি। আপনার কাছ থেকে দাম নিতে পারব না।”
জব্বর করে ঝাল-টাল দিয়ে মাংসটা রেঁধে মাকে গরম ভাত বেড়ে রাতে খাওয়ালে যে কোনো একটা ভুজুং-ভাজুং দিয়ে চালিয়ে দেয়া যাবে। অনেকটা মাংস দিয়েছে তপু। কিছুটা পাশের বাড়ির চম্পাকেও দিয়ে আসবে। আর একবার মনে করিয়ে দেবে যেন গতকালের রাম সাজার ঘটনা না বলে মাকে। মেয়েটা বড্ড কুচুটে। সুযোগ পেলেই মাকে দিয়ে মার খাওয়ায়। বোকারাম অনেকদিন থেকে রান্না-বান্নার কাজটায় হাত পাকিয়েছে। আজ অনেকদিন বাদে বাড়িতে মাংস হচ্ছে। হাঁড়িতে চাট্টি চাল বেশি নেয়। সে নিজেও তো আজ একটু বেশি খাবে।

চার.

“ ম্যায়নে তেরা কেয়া বিগাড়া হ্যায়! তু মেরা পিছে কিঁউ পড় গিয়া রে? ” লোকটার কাঁদো কাঁদো গলা।
বোকারামের চেনা চেনা লাগছে লোকটাকে। কিন্তু চিনতে পারছে না। কেমন ধোঁয়া উঠছে চারদিকে, তার ভেতর দাঁড়িয়ে। লোকজন চেনার উপায় হিসেবে জায়গার ভূমিকা থাকে। জোগ্রাফিতে পড়েছে। সে খুব চোখ ব ড় করে তাকিয়ে জায়গাটা চেনার চেষ্টা করল। কিন্তু চোখ কি বড় হচ্ছে! বুঝতে পারছে না। এত ধোঁয়া কেন! সে ছোটবেলায় দেখেছে মা কয়লার উনুন ধরাতে যখন ঘুঁটে আর কাঠ সাজিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে তার উপর কয়লা চাপাত, এরকম ধোঁয়া হত। এখন তো অনেকদিন হল এই তল্লাটে সেসব আর নেই। তার চোখে পড়ছে, গাছ-পালা, ঘর-বাড়ির অংশ। রাস্তার উপরেও নদীর মতো ধোঁয়ার স্রোত। গাড়ি-ঘোড়া, বিশেষ করে অটো চলতে দেখছে, তার কর্কশ হর্ণও কানে আসছে, কিন্তু চিনতে পারছে না কোন রাস্তা।
ভারি বিড়ম্বনায় পড়ল বোকারাম। লোকটা তুই তোকারি করছে মানে কাছের লোক। এখন যদি নাম জানতে চাওয়া হয় তো কেলেঙ্কারির একশেষ। মানে লোকটার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়া। বোকারাম জানে এই কাজটা খুবই খারাপ। সাধারণত দুষ্কৃতিদের কাছ থেকে ঘুষ খাওয়ার পর কিছুদিন বাদে পুলিশ এরকম চোখ উলটে দেয়। বারবার এরকম করায় তার বাপটাকে এক ছাটলোহার কারবারী রেগে গিয়ে দানা ঠুসে দিয়েছিল। পুলিশ নিজেদের নাম খারাপ করবে না বলে মাওবাদীদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছিল। আর মাকে একটা কনস্টেবলের চাকরি দিয়েছে।
বোকারামের কাঁচুমাচু মুখটা দেখে হয়ত লোকটার মায়া হয়েছে। বোকারামের কাছে এই একটা তুরুপের তাস আছে। যখন কিছুতেই পরিস্থিতি নিজের দিকে আসছে না টের পায়, তখন এই অস্ত্রটি ছাড়ে। সে বোকা পাঁঠা হয়ে যায়। লোকজনের মায়া হয়। বোকারাম নিজের মুখের উপর আষাড়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে তোলে।
ধুর! একটা ধনুক হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেন লোকটা! শহরে কোথায় খরগোস, শুয়োর পাবে! যা না, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার জঙ্গলে যা না। সেখানে অনেক শিকার। হরিণও পেতে পারে। হ্যাঁ, শিকারীদের মতো অবশ্য চোখটা জ্বলজ্বল করছে। একটু কি ভয় পাবে বোকারাম! যদি তির ছোঁড়ে! নিজের বুকের দিকে তাকায়। হার্ট যেখানে থাকে সেখানে হাত চাপা দিয়ে দেয়। ভাবখানা এই হার্ট ফুটো হওয়া থেকে তো রক্ষা পাবে। ওর বাবাকেও তো বুকে গুলি করেছিল। ছ্যাঁদা হার্টে কতক্ষণ বাঁচবে! বাঁচেনি। মনে আছে অপরাধী উপরতলায় টাকা খাইয়ে বেমালুম ছাড় পেয়েছে।
“ আরে ডরো মৎ! কব বোলা ম্যাঁয় তুমকো মার ডালে গা?” এই রে লোকটা কী করে মনের কথা টের পেল! বোকারাম স্বাভাবিক হতে চেয়ে হাত ফাত নাড়াতে চায়। কিন্তু তা কি সহজ কর্ম! হাত যেন বোকারামের কথা শুনছে না।
“ না না , আপনার ধনুকটা তো বেশ লম্বা দেখাচ্ছে। কাঠের না স্টিলের! বেশ ভারিই হবে, না!।আমি কি তুলতে পারব! না পারব না। লম্বায় আপনার মতো হলেও, আপনার শরীর স্বাস্থ্য খুব ভালো। দেখলেই লোকে সমীহ করবে। আর আমাকে দেখুন, আমার এই প্যাংলা শরীর দেখলে লোকে খ্যাপায়। ঢ্যাঙা ভূত বলে অনেকে।” কথা ঘোরাতে চায়। লোকটা বেশ জাঁদরেল তবে। ধরে ফেলেছে বোকারামকে।
“ শুন, মেরে কো বহৎ চোট দিয়া তুমহে। মেরা দিল টুটনেঅলা হ্যায়। ওহ বিদ্যাসাগর বাবু সে জাদা হ্যায় ইয়ে চোট। ক্যায়া বঁলু, আভি খান-পিনা কুছ কা মন নেহি লাগতা, কেবল ইয়ে দিল রোনা মাঙতা। ”
লোকটাও যখন কান্নার কথা বলছে, বোকারামের সাহস হয়। সে শুধোয়, “ আহা, কাঁদবেন কেন! আর আপনাকে জানি না শুনি না, আমি কী করে চোট পৌঁছাব!”
“ বেটা ঝুট বোলনা ঠিক নেহি। হওয়াই কিলে বনানে সে কোই লাভ নহীঁ। আভি তু-তু ম্যাঁয় ম্যাঁয় সে কোই ফয়দা নহীঁ। তুমহে মুঝে গালিয়াঁ দিয়া হ্যায়। ”
এবার মেজাজ হারায় বোকারাম। একেবারে মায়ের মতো লোকটা চাপ দিয়েই যাচ্ছে। মা চেপে চেপে কথা বের করে,টুথপেস্ট বের করার মতো। সারা দিন বোকারাম বাড়িতে বসে কী করেছে জানতে চায়। একই কথা বলে রাগিয়ে দিয়ে মা সত্যি কথা বের করে ফেলে।
তা মা তো পুলিশে কাজ করে, এটা ওদের কথা বের করার একটা পদ্ধতি। কিন্তু এই লোকটা কে! এতো আর মা নয়, যে খামোকা গায়ে পড়ে কথা বলতে পারবে! আর লোকটার কথার উত্তর দেবেই বা কেন! বোকারাম বলে ফেলে, “ আচ্ছা, সেই তখন থেকে আপনি ঘ্যান ঘ্যান করছেন, কিন্তু বলছেন না, আমি আপনার কী করেছি! কোথায় আপনার সাথে দেখা হল! আপনার নাম কী? বেশ মজার মানুষ তো আপনি!”
এটুকু বলতে পেরে স্বস্তি পায় বোকারাম । বেশ নিজের পিঠ চাপড়াবার আয়োজন করতে যাবে , লোকটা হিসহিসিয়ে ওঠে, “ তুম মেরেকো গালি নেহি দিয়া? তুম মেরা নাম পর চুনা নেহি লাগায়া? বেতমিজ ঝুটা কাঁহিকা!”
এই রাগ দেখে বোকারাম এর হাত-পা আবার ঠান্ডা। লোকটার হাতে যে ধনুক আছে। তা ছাড়া গায়ে-গতরে বেশ তাগড়াই।
লোকটা থেমেছে বটে , কিন্তু তার থামার ভেতর থেকেও ফোঁসফোঁস শব্দ শোনা যাচ্ছে। স্কুলের মারামারির ঘটনা মনে পড়ে বোকারামের। সেদিন মৃন্ময়ও এরকম দম মেরে ছিল খানিক। তারপর টেবলের উপর থেকে ডাস্টার তুলে নিয়ে এসে তার কপালে সজোরে মেরেছিল। রক্তে স্কুল ইউনিফর্ম থই থই।
সে তো তো করে অবস্থা সামলানোর চেষ্টা করে, “না আমি তো আপনাকে চিনি না, আমি কীভাবে আপনাকে গালি-গালাজ করব!”
“বকোয়াস বন্দ্ করো। ওহি তো বলনা চাহতা হুঁ। কোই জানপহচান নেহি, ফিরভি ইতনা বদনাম কাঁহে মেরা মুহ মে ফেকা ? মুঝে সচ্ সচ্ বতায়ো। ” কথায় একটু গর্জন ছিল। বোকারাম ভয় পায়।
“ না, দেখুন, আমরা স্কুলে বন্ধু-টন্ধুদের পেছনে লাগি বটে, কিন্তু তা তো আমি তাদের চিনি বলে। কিন্তু সত্যি বলছি,আপনার সাথে কোনোদিন কথা বলিনি, কোনোদিন দেখিনিও এর আগে।”
“ তব কাঁহে তুম কল মেরে কো বোকা বনায়া! বেতমিজ!”
বোকারাম আকাশ থেকে পড়ে। এই লোকটার সাথে দেখাই হয়নি। তবে কি সেই নেকড়ে আর ভেড়ার গল্পের মতো! নেকড়ে ঝর্ণার উপরের দিকে দাঁড়িয়ে নিচের পাহাড়ের খাঁজে জল পান উদ্যত ভেড়াকে বলেছিল, তুই আমার জল নোংরা করেছি্স, তোকে আমি ছাড়ব না। ভেড়া হাতজোর করে বলেছে, প্রভু জল তো আপনার কাছ থেকে আমার কাছে আসছে, আমি কীভাবে নোংরা করবো! নেকড়ে বলেছে আজ না কাল করেছিলি। প্রভু আমি তো কাল আসিনি। নেকড়ে ভেড়ার উপর ঝাঁপ দিতে দিতে বলে তুই করিসনি তোর পূর্বপুরুষের কেউ করেছিল। সেরকম আজ এই লোকটা তাকে তিরবিদ্ধ করে ছাড়বে মনে হচ্ছে বোকারামের। সে বোঝানোর চেষ্টা করে। গলার স্বরে জোর কমে এসেছে। বলে, “ দেখুন হয়ত কোথাও ভুল হচ্ছে, আমার সাথে এর আগে আপনার দেখাই হয়নি।”
“ হম ভি ওহি বাত বোল রহা হুঁ। এতনা বড়া ইনজাম তু কিঁউ লাগায়া! জানতা নেহি, একবার ইনজাম লাগনে সে সিবিআই ছোড়তা নেহি !”
লোকটা ধনুক-এ হাত দিচ্ছে দেখে একবার শেষ চেষ্টা করে বোকারাম। বলে, “ কিন্তু আমি কী বলেছি বলুন তো! আর আপনি প্রমাণ দিতে পারবেন আমি বলেছি কিছু আপনাকে? ”
“ পুরা মহল্লা জানতা। সব আদমি লোগোকে সামনে তু মেরেকো বোকা বনায়া। মেরে কো বোলা বোকা
রাম !”🍁

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী

২১.

—এখন তাহলে আসি বৌদি।
—কোথায় যাবে?
–দেখি।
—সুনয়নার কথার ভেতরে একরাশ হতাশা আর যন্ত্রণার ছবি ফুটে উঠল।
—কোথায় আর যাব! ফিরতে তো হবে অন্যের ঘরে। তিথি ভাবে যে ঘরটাকে ভালবেসে স্বপ্নের নীড় বানাবে ভালবাসার প্রদীপ জ্বালিয়ে সুখে সংসার করবে, সেই ঘর আজ তার নয়। সে ঘরে ঢুকতে ও তার গা ছমছম করে। এ কেমন ঘর চেয়েছে সে এসব ভাবতে ভাবতে সুনয়না তার ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরটাকে যেন গেট দিয়ে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে যেন টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তিথি সেটা দূর থেকে দেখতে লাগল কি বা করার আছে তিথির।
অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে সুনয়নার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। আস্তে আস্তে সুনয়নার শেষ কালো মাথার চুলটুকু যেন অন্ধকারে হারিয়ে গেল। ঘরে ফিরে সুনায়না দেখে চারিদিকে সব ছড়ানো ছিটানো ঘরটা কেমন অগোছালো হয়ে পড়ে আছে
সিগারেটের অ্যাস্ট্রেতে তখনও পোড়া সিগারেটের একটা অংশ পড়ে রয়েছে। বাড়িতে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না এই সময় শাশুড়ি মা কোথায় গেল মনে মনে ভাবছে সুনয়না। কে এসেছিলেন?
ও-জানে আজকে ওর কপালে দুঃখ আছে। এদিকে তিথি ভাবতে লাগল কতটা অসহায় নীড় হারা ঝোড়ো পাখির মত মনে হচ্ছিল সুনয়নাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের অস্ত যাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখল পশ্চিম আকাশে কী অপরূপ শান্ত স্নিগ্ধ আলোয় ভরে গিয়েছে। গেট লাগিয়ে তিথি এসব ভাবতে ভাবতে এসে বসে ব্যালকনিতে, অমনি সঙ্গে সঙ্গে পুচু এসে
লেজ নাড়তে নাড়তে তিথিকে আদর করতে লাগল।
—কী হল মা? হঠাৎ এত আদর কিসের?
তিথি ওকে দু’হাতে জড়িয়ে আদর করতে লাগল।
—বুঝেছি বুঝেছি বিকু খাবে তুমি? চল তোমাকে বিস্কিট দিই।
লেজ নাড়তে নাড়তে ঠিক টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল।
তিথি হাত বাড়িয়ে বিস্কিটের কৌটোটা নিয়ে দাঁড়াল।
তিথি কতগুলো বিস্কিট বের করে দিল। তারপর রান্নাঘরে চায়ের জল বসিয়ে ভাবতে লাগলো।
খুব বিচিত্র এই পৃথিবী আর বিচিত্র সব মানুষের সৃষ্টি। ছাঁকনি দিয়ে চা ঢালতে ঢালতে ভাবলো
বুবুনটা আজকে উঠল না কেন!

…আর একবার বলছি সোমাদি, একজনার নামে ব্লেন্ড দেবার আগে অনেকবার ভেবে কথা বলবে। আর তাছাড়া তোমার ওর নাম শুনলে এরকম জ্বলে ওঠে কেন? যদি আমি ইচ্ছে করতাম তো কাজের জন্য এসেছিল… কিন্তু দেখো সোমাদি আমরা কাউকে না কাজ থেকে নিজে নিজে তাড়িয়ে দিই না বা ছাড়িয়ে দিই না। কেউ যদি বলে আমি আর করতে পারব না তখনই আমরা কাজের লোক দেখি। আর তুমি যদি এখন বলে দাও করবে না তখনই আমাকে কাজের লোক খুঁজতে হবে, সেই সুনয়না হোক বা অন্য কেউ।

শ্বাশুড়ি মাকে এক কাপ চা দিয়ে এসে নিজে চা খেতে খেতে কাপটা নিয়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কী করছে সুনয়না কে জানে! হয়ত আজকে ওর কপালে অনেক দুঃখ আছে সারাটা দিন আজ বাড়ি ছিল না।
ও-কি করবে! সত্যিই কি যদি মানুষ ভাল হতে চায় তাহলে কী সমাজ তাকে ভাল হতে দেবে না? তার পূর্বের স্মৃতি আর তার নতুন জীবনের গতিপথ নতুন কর্মের দ্বারা কি নির্ধারিত হবে না? কেন? কিসের জন্য? দিকহারা নাবিক মাঝ সমুদ্রে অসহায় ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না, সুনয়নাও যেন আজ দিক হারা মাঝি। সঠিক রাস্তা নিশ্চয়ই দেখাবে এই আশা বুকে নিয়েই বেঁচে ওঠা।
এভাবেই চলে যায় দিন, চলে যায় সপ্তাহ, চলে যায় মাস। বেশ কয়েক মাস পর তিথি সুনয়নার কথা জিজ্ঞেস করে সোমাদিকে।
সোমাদি এমন চোখ মুখ বাঁকিয়ে উত্তরটা দিল যেন কিছুতেই ওর সন্তুষ্টি নেই।
—আচ্ছা সোমাদি সুনয়নার খবর কি গো?
ঘর মোছার নেতাটা নিংড়াতে নিংড়াতে বলল,
—কার কথা বলছ?
—কেন তুমি চিনতে পারছ না?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, পেরেছি একটা চোর। —এ আবার কি ধরনের কথাবার্তা
তোমরা পাশাপাশি থাকো
তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম।
—আমিও তো উত্তর দিলাম বৌদি।
—এ কেমন উত্তর দিলে। চোর শব্দটাই বা প্রয়োগ করলে কেন?
ঘর মোছার বালতির জল ফেলতে ফেলতে জোরে টাইম কল ছেড়ে দিল।
—কি বলব! এই তো দাসেদের বাড়িতে চুরি করে ধরা পড়েছে।
—চুরি করে ধরা পড়েছে!
—কি চুরি করেছে?
—টাকা…টাকা… টাকা।
—এসব কি বলছ?
—ঠিকই বলছি বৌদি।
—ও বৌদি কালকে কাজে আসব না।
—কী বলছ?
তিথি সুনয়নার কথাটা ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল। সোমাদি চোখ মুখ বাঁকিয়ে বলল শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে,
—কাল কাজে আসব না।
—আচ্ছা সোমাদি তোমার একটু কামাই করার প্রবণতা বেড়েছে না।
—কোথায় কামাই করলাম বৌদি?
তিথি অবাক হয়ে বলল,
—ভুলে গেলে? গত সপ্তাহতেই তো ৩-৪ দিন কামাই করলে।
—তা আমার যদি দরকার থাকে আমি ছুটি নেব না?
—নিশ্চয়ই নেবে কিন্তু আমার দিকটাও তো তোমাকে ভাবতে হবে বলো।
—আমার এখন মর্নিং স্কুল ছুটি নিলে চলবে না বুঝতেই পারছ, আমার স্কুল ছুটি হলে বাড়ি আসতে আসতে কত সময় লাগে। এসে আমি কখন কোন কাজটা করব?
সোমাদি নিচের দিকে তাকিয়ে পা টা ঘষতে থাকে মুখে কিছু বলে না।
—-তুমি কালকে আসবে না কেন?
—কালকে দশহরা গঙ্গা পুজো আছে না।
—গঙ্গা পুজো আছে ঠিক আছে তুমি সকালে কাজে আসবে গঙ্গা পুজোর সাথে ছুটির কী সম্পর্ক আছে?
—পুজো দেব না!
—ভাগ্যিস মনে করালে তা দশহরা দিন কাজে না আসলে হবে!
—আমাকেও তো পুজো পাঠাতে হবে। বাড়ি ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার আছে। তা আমি এসে কখন কোন কাজটা করব বল দিকিনি।
—তাহলে তুমি সুনয়নাকে কাজে নিয়ে নাও…
তিথি লক্ষ্য করছে, যবে থেকে শুনেছে সুনয়না এসেছিল, থেকে খেয়েছে, দুপুরে ঘুমিয়েছে ওর যেন সারা অঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে।
তাই ওর হাব-ভাব সবকিছুই যেন চেঞ্জ হয়েছে।
—কেন তুমি কাজ করবে না?
সোমা দি চুপ করে থাকে।
—না, না চুপ থাকলে হবে না।উত্তরটা দাও।
—দেখো বৌদি বিকেল হয়ে গেছে। আমারও তো বাড়িতে কাজ থাকে বলো। এখন তোমার এত কথার উত্তর আমি দিতে পারব?
—বেশ পারবে। পারবে না কেন এতগুলো কথা বলতে পারছ আর এ কথার জবাব দিতে পারবে না। আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করতে চাই না। তুমি কাজ যদি না করতে চাও তুমি বলো কবে থেকে কাজে আসবে না তাহলে আমাকে তো লোক দেখতেই হবে।
—তোমাকে আর লোক দেখতে হবে কেন তোমার তো লোক ঠিক করাই আছে।
এবার তিথির গাটা যেন রাগে পুড়ে যেতে লাগল, পারদ অনেক চড়তে লাগল।
—ঠিক করা আছে?
—তা কে ঠিক করা আছে?
—কেন সুনয়না একটা চোর।
—দেখো, আর একবার বলছি সোমাদি, একজনার নামে ব্লেন্ড দেবার আগে অনেকবার ভেবে কথা বলবে। আর তাছাড়া তোমার ওর নাম শুনলে এরকম জ্বলে ওঠে কেন? যদি আমি ইচ্ছে করতাম তো কাজের জন্য এসেছিল… কিন্তু দেখো সোমাদি আমরা কাউকে না কাজ থেকে নিজে নিজে তাড়িয়ে দিই না বা ছাড়িয়ে দিই না। কেউ যদি বলে আমি আর করতে পারব না তখনই আমরা কাজের লোক দেখি। আর তুমি যদি এখন বলে দাও করবে না তখনই আমাকে কাজের লোক খুঁজতে হবে, সেই সুনয়না হোক বা অন্য কেউ।আমার শাশুড়ি মা নিজেই একজন অসুস্থ মানুষ। উনাকে দেখাশোনার জন্য একজন লোক আমার সব সময় লাগে। সুইটি বলেছে কাজ করবে না। লোক দেখতে বলেছে। আর তুমি হঠাৎ করে এভাবে বললে।
—তা বেশ তোমার যেটা ভাল মনে হয় তাই করো এই মাসটা করো তারপরে তুমি ছেড়ে দিও, এই মাসের আর বেশি বাকি নেই।
সোমা দি কোন কথা না বলে বেরিয়ে গেল! তিথি ওর বেরিয়ে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকল, কিন্তু কোনও একটা বিশেষ অনুভূতি ওর জন্য যেন কাজ করল না। 🍁(ক্রমশঃ)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com 

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা  আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন