সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: দীর্ঘ উত্তেজনার পর অবশেষে ইরান ও আমেরিকা -এর সংঘাতের ইতি ঘটেছে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে হরমুজ প্রণালী যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ। এই পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে। প্রশ্ন উঠছে, এর ফলে কি ভারতে পেট্রোলের (Petrol) দাম ১০০ টাকার নিচে নামতে পারে? বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তেল ও গ্যাস সরবরাহের মূল পথ এই প্রণালী। যুদ্ধের কারণে যখন এই পথ কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তখন তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। ভারত, যে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানির উপর নির্ভরশীল, সেই চাপ সরাসরি অনুভব করেছিল।
এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। শান্তি চুক্তির পর আবার খুলে দেওয়া হয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে একাধিক তেলবাহী জাহাজ। সূত্রের খবর অনুযায়ী, প্রায় ১০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে ট্যাঙ্কারগুলি ভারতীয় উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে যে জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে। শুধু তেলই নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহেও গতি ফিরছে। কাতার (Qatar) থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) বহনকারী একটি জাহাজ নির্বিঘ্নে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। পাশাপাশি সৌদি আরব (Saudi Arabia) থেকেও চারটি ট্যাঙ্কার ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। ইরানের বিভিন্ন বন্দর থেকেও একাধিক জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে পতনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, খুব শীঘ্রই প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৭৭ ডলারের আশপাশে নেমে আসতে পারে। যদি এই প্রবণতা বজায় থাকে, তাহলে ভারতের খুচরো বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরিশোধিত তেলের দাম কমলে সাধারণত খুচরো জ্বালানির দামও কিছুটা হ্রাস পায়। তবে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে কর কাঠামো, পরিবহন খরচ এবং মুদ্রার বিনিময় হার। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের উপর। এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক আরও মজবুত করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক স্তরে উদ্যোগ শুরু হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই ভারতে আসছেন ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী মহোসেন পাকনিজাদ (Mohsen Paknejad)। তিনি ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী (Hardeep Singh Puri) -এর সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গিয়েছে।
এই বৈঠকে জ্বালানি সরবরাহ, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং মূল্য স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় আমেরিকা থেকে তেল আমদানি করতে গিয়ে যে অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল, তা কমানোর পথ খুঁজতেই এই আলোচনার গুরুত্ব বাড়ছে। এর পাশাপাশি ব্রিকস (BRICS) দেশগুলির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ভারতে। এই বৈঠকের পার্শ্ব আলোচনায় ভারত, ইরান, রাশিয়া (Russia) এবং চিন (China) -এর মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলাদা করে কথা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সেই লক্ষ্যে এগোনোর পথ কিছুটা সহজ হয়েছে।
কিন্তু, পেট্রোল ১০০ টাকার নিচে নামবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা, কর কাঠামো এবং সরকারের নীতি, সব কিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত দাম। তবুও বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যেমন জ্বালানির সরবরাহ বাড়ছে, অন্যদিকে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এই দুইয়ের সমন্বয় দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবহন খরচ কমলে পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়বে, যা সামগ্রিকভাবে বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে। তেলের দাম কমার এই ধারা কতটা স্থায়ী হয়, সেটাই নির্ধারণ করবে সাধারণ মানুষের পকেটে কতটা স্বস্তি আসবে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Ethanol blending India | পেট্রোলে বড় বদল! ২৫% ইথানল মিশে চলবে গাড়ি, তেলের দামের চাপ সামলাতে কেন্দ্রের নতুন রণকৌশল



