সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মস্কো: রাশিয়া-ইউক্রেন (Russia-Ukraine) সংঘাতের ভয়াবহতার মাঝেই উঠে আসছে এক নতুন প্রবণতা, যা একই সঙ্গে আবেগঘন এবং বিতর্কিত। যুদ্ধে নিহত বা নিখোঁজ রুশ সেনাদের (Russian Soldiers) স্মৃতিকে ‘জীবন্ত’ করে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর ব্যবহার দ্রুত বেড়ে চলেছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হচ্ছে এমন সব ছবি ও ভিডিও, যেখানে মনে হচ্ছে মৃত সৈন্যরা যেন আবার ফিরে এসেছেন তাঁদের পরিবারের কাছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাস থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের ভিডিওর সংখ্যা হঠাৎ করেই বাড়তে শুরু করে। ভিডিওগুলিতে দেখা যায়, একজন সৈনিক বাড়ির দরজা খুলে ঢুকছেন, স্ত্রী বা সন্তানের সঙ্গে আলিঙ্গনে মগ্ন, কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের স্বর্গ থেকে ফিরে এসে প্রিয়জনদের উদ্দেশ্যে কথা বলতেও দেখা যায়। এই দৃশ্যগুলি এতটাই বাস্তবসম্মত যে প্রথম দেখায় তা সত্যি বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
এই ভিডিওগুলির একটি বড় অংশে রুশ সেনাদের দেশের রক্ষক ও সাহসী যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে সমালোচকদের মতে, এই উপস্থাপনায় সংঘাতের ভয়াবহতা বা ইউক্রেনের (Ukraine) সাধারণ মানুষের ক্ষতির দিকটি প্রায় অনুপস্থিত। ফলে একপাক্ষিক আবেগের ছবি তুলে ধরা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই প্রবণতার পিছনে রয়েছেন একাধিক এআই নির্মাতা এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তাঁদের মধ্যে অন্যতম কাতিয়া জিন (Katya Zhin), যিনি প্রথমে নিজের নিখোঁজ স্বামীকে কেন্দ্র করে এই ধরনের ভিডিও তৈরি করেছিলেন। পরে তিনি এটিকে একটি পরিষেবা হিসেবে চালু করেন। এখন বহু মানুষ তাঁদের প্রয়াত বা নিখোঁজ আত্মীয়দের ছবি জমা দিয়ে এই ধরনের ভিডিও তৈরি করাচ্ছেন। কাতিয়া বলেন, ‘মানুষ তাঁদের প্রিয়জনকে আবার একবার দেখতে চান। এই ভিডিওগুলি সেই অনুভূতিটুকু ফিরিয়ে দিতে পারে।’ তাঁর তৈরি ভিডিওগুলিতে শুধু দৃশ্য নয়, আবেগঘন বার্তাও যুক্ত করা হয়। ফলে তা আরও বেশি হৃদয়স্পর্শী হয়ে ওঠে।
রাশিয়ার আর এক নাগরিক আনা কোরাবলেভাও (Anna Korableva) একই ধরনের কাজ করছেন। তিনি জানান, ‘অনেক পরিবার তাঁদের প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখতে চান। এই ভিডিও তাদের সেই সুযোগ করে দেয়।’ তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি অনুরোধ আসে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের পরিবারের কাছ থেকেই। তবে এই প্রবণতা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। প্রযুক্তির ব্যবহার যেখানে মানুষের আবেগকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, সেখানে তার প্রভাব কতটা ইতিবাচক, তা নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Cambridge) গবেষক কাতারজিনা নোভাচিক-বাসিন্সকা (Katarzyna Nowaczyk-Basińska) এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই ধরনের এআই ভিডিও মানুষের শোক কমায়, নাকি তা আরও বাড়িয়ে দেয়, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।’ তাঁর মতে, এটি এক ধরনের বৃহৎ সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত পরীক্ষা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অর্থনৈতিক বিষয়। এই ধরনের ভিডিও তৈরি করতে রাশিয়ায় খরচ পড়ছে প্রায় ২০০ থেকে ১০,০০০ রুবেল পর্যন্ত। ফলে অনেকেই এটিকে একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখছেন। এর জেরে অভিযোগ উঠছে, অন্যের দুঃখ-যন্ত্রণাকে পুঁজি করে আয় করা হচ্ছে। সংঘাতের প্রকৃত চিত্রও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ লাখ ২৫ হাজার রুশ সেনার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে এই ধরনের এআই ভিডিওর প্রসার আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিওগুলি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। কেউ এটিকে শোক সামলানোর একটি উপায় হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অনেক ইউক্রেনীয় নাগরিক এই ভিডিওগুলির সমালোচনা করেছেন, কারণ এতে যুদ্ধের অন্য দিকটি সামনে আসে না। এআই প্রযুক্তির এই ব্যবহার ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে এটা পরিষ্কার, প্রযুক্তি এবং আবেগের এই মেলবন্ধন নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মানুষের স্মৃতি, শোক এবং প্রযুক্তির সীমারেখা কোথায়, এই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Anvay Dravid: ‘দ্য ওয়াল’-এর উত্তরসূরি! ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দলে সুযোগ পেলেন অনভয় দ্রাবিড়




