সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: লোকসভা ভোটের আগে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) -এর অন্দরে অস্বস্তি আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দলের ভেতরের মতপার্থক্য এবার প্রকাশ্যে এনে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিলেন কোচবিহারের সাংসদ জগদীশ বর্মা বাসুনিয়া (Jagadish Barma Basunia)। তাঁর একাধিক মন্তব্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, সংগঠন পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই সঙ্গে আরেক তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে (Mahua Moitra) ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা, তিনি কী দল ছাড়তে পারেন? একটি সাক্ষাৎকারে বাসুনিয়া সরাসরি অভিযোগ করেন, দলের মধ্যে মতপ্রকাশের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এসেছে। তাঁর কথায়, ‘দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই নেওয়া হচ্ছে, বাকিদের মতামতের তেমন মূল্য নেই।’ এই মন্তব্যে তিনি কার্যত শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর নিশানায় ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Abhishek Banerjee)। বাসুনিয়ার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দলের ভেতরে অসন্তোষ জমছিল, যা এখন প্রকাশ্যে আসছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই মহুয়া মৈত্রকে নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই বাসুনিয়া সরাসরি কিছু না বললেও জল্পনা উসকে দেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে কিছুই অসম্ভব নয়।’ এই একটি মন্তব্যই রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। অতীতে মহুয়া মৈত্রর দলীয় নেতৃত্বের সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে বাসুনিয়া ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে বড় কোনও সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্থানীয় নেতৃত্ব বা প্রবীণ নেতাদের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে। বাসুনিয়া বলেন, ‘আমি নিজে সাংসদ হয়েও অনেক ক্ষেত্রে জানতাম না আমার এলাকায় কারা প্রার্থী হচ্ছেন।’ এই অভিযোগ দলীয় গণতন্ত্রের প্রশ্ন তুলেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বিদ্রোহী সাংসদদের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে। বাসুনিয়া জানান, তাঁরা লোকসভার স্পিকারের (Lok Sabha Speaker) কাছে গিয়ে সংসদে আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে বসার অনুমতি চাইতে পারেন। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই একাধিক সাংসদ এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘সাম্প্রতিক এক বৈঠকে ১৪ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন, যেখানে ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’ এই বক্তব্যে পরিষ্কার, বিষয়টি শুধু মতপার্থক্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সাংগঠনিক স্তরে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। এই সম্ভাব্য গোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনাও তৈরি হয়েছে। বাসুনিয়া জানান, কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar) অথবা শতাব্দী রায় (Satabdi Roy) -এর মতো প্রবীণ নেতারা সামনে আসতে পারেন। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এর মধ্যেই আরেক তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ (Kirti Azad) -এর মন্তব্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, অর্থের বিনিময়ে কিছু সাংসদ অবস্থান বদলাচ্ছেন। এই অভিযোগের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বাসুনিয়া বলেন, ‘বাংলার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ওঁর ধারণা নেই।’ তাঁর মতে, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, যা দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার অন্যতম কারণ। অপরদিকে, নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন বাসুনিয়া। তিনি জানান, ২০১৯ সালে রাজনৈতিক হিংসার কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছিল। সেই সময় দলীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনও সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমি কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি, কিন্তু কেউ খোঁজ নেয়নি।’ এই মন্তব্যে তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রতিফলনও দেখা যায়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এত বিতর্কের পরেও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন বাসুনিয়া। তিনি বলেন, ‘এত কিছু ঘটার পরেও কেউ ফোন করেনি।’ এই মন্তব্য দলীয় সম্পর্কের দূরত্বকে সামনে এনে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে লোকসভা নির্বাচনের আগে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বিরোধীদের জন্য বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
মহুয়া মৈত্রকে ঘিরে জল্পনা, বিদ্রোহী সাংসদদের সম্ভাব্য আলাদা গোষ্ঠী গঠন এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন, তৃণমূলের ভিতরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকাশ্যে। আগামী দিনে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন রাজনৈতিক মহলের নজরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BGBS controversy West Bengal, Suvendu Adhikari BGBS investigation | ‘বিজিবিএস’-এ ৬৩৫ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন! তদন্ত ও মামলার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর, চাপে মমতা জমানার আয়োজন



