সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর মাত্র এক মাসের মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসকে (TMC) ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। একসময় যে দলকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে দেখা হতো, সেই সংগঠন এখন অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং নতুন গোষ্ঠীর উত্থান নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে। আর এই পরিস্থিতিতেই সামনে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, দলের বিপুল তহবিল বা ফান্ডের নিয়ন্ত্রণ এখন কার হাতে?
রাজনৈতিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, তৃণমূলের আর্থিক কাঠামো নিয়েও নীরব অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বহু বছরের রাজনৈতিক কার্যকলাপ, নির্বাচনী প্রস্তুতি ও সংগঠন চালানোর জন্য যে বিপুল অর্থ সঞ্চিত হয়েছে, তা নিয়েই এখন দলের ভেতরে নানা জল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে। একটি সূত্রের দাবি, ‘দলের ফান্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভেতরে ভেতরে চাপা টানাপোড়েন চলছে।’ এই পরিস্থিতির কেন্দ্রে উঠে আসছে নেতৃত্বের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) -এর নেতৃত্বেই দল পরিচালিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) -ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে। যদিও এই দাবি নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) -এর তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবুও অন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা সামনে আসছে।
দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও বিভ্রান্তির কথা শোনা যাচ্ছে। একাধিক সূত্রের দাবি, ‘কে কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত, তা নিয়েই এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’ এই পরিস্থিতিতে দলীয় কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কতটা সুসংহত রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে দলের প্রতীক ‘জোড়াফুল’ (Jora Phool)। রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষো শুরু হয়েছে, ভবিষ্যতে যদি গোষ্ঠীগত বিভাজন তীব্র হয়, তবে প্রতীকের উপরেও প্রভাব পড়তে পারে কি না। যদিও দলের একাংশ এই ধরনের আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত বলেই মনে করছে, তবুও প্রতীক নিয়ে এই আলোচনা যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না। এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই পরিস্থিতি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে যেন দুই ধরনের পরিচয়ের কথা শোনা যাচ্ছে ‘তৃণমূল (ম)’ এবং ‘তৃণমূল (ঋ)’। যদিও এই বিভাজন আনুষ্ঠানিক নয়, তবুও আলোচনার স্তরে এটি জায়গা করে নিচ্ছে। এর ফলে সংগঠনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
দলের আর্থিক বিষয়টি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালাতে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। সেই অর্থের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তবে সংগঠনের কাজকর্মে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। একটি সূত্রের কথায়, ‘ফান্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালে সংগঠন চালানো কঠিন হয়ে উঠবে।’ কালীঘাট ঘনিষ্ঠ এক নেতার মন্তব্যও এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি বলেন, ‘দল এখন অনেক বিষয় পুনর্বিবেচনা করছে।’ তাঁর কথায়, ‘দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে অনেকেই আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়েছেন, কিন্তু সংকটের সময়ে সেই শক্তি কতটা কাজে লাগবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুদিনে অনেকেই পাশে থাকেন, কিন্তু কঠিন সময়ে সবাই সমানভাবে এগিয়ে আসেন না।’ এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) -এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল সংগঠনের ভিত মজবুত রাখা এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বজায় রাখা। রাজনৈতিক মহলের মতে, দলের ভেতরের এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা আগামী নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে নজর রয়েছে, দলীয় নেতৃত্ব এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে কী পদক্ষেপ নেয়। ফান্ডের নিয়ন্ত্রণ, নেতৃত্বের ভারসাম্য এবং সাংগঠনিক ঐক্য, এই তিনটি বিষয়ই এখন তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে এই বিতর্ক শুধুমাত্র দলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং রাজ্য রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরেও প্রভাব ফেলছে। আগামী দিনে এই টানাপোড়েন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Adhir Chowdhury on TMC crisis | মমতাকে তীব্র কটাক্ষ করে তৃণমূল কর্মীদের কংগ্রেসে ডাক অধীর চৌধুরীর, বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ




