সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কটক: সাধারণত আম মানেই গ্রীষ্মের মিষ্টি স্বাদ, কিন্তু সেই পরিচিতির বাইরেও এমন এক আম রয়েছে যার দাম শুনলে চমকে উঠতেই হয়। জাপানের বিখ্যাত ‘মিয়াজাকি’ (Miyazaki Mango) আম, যার আন্তর্জাতিক বাজারদর প্রতি কেজিতে প্রায় তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। আর সেই বিরল ফল এবার ফলিয়েছেন ওড়িশার (Odisha) মালকানগিরি জেলার এক কৃষক দেবা পাধিয়ামি (Deba Padhiyami)। ঘটনাটি সামনে আসতেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি। তবে এই সাফল্যের সঙ্গেই জুড়েছে নতুন উদ্বেগ, চুরির আতঙ্ক এবং বিক্রির অনিশ্চয়তা। মালকানগিরির তামাসা গ্রামের প্রত্যন্ত পরিবেশে কৃষিকাজ করেন দেবা। সাধারণ চাষের মধ্যেই হঠাৎ এক অন্য অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে তাঁর জীবনে। কয়েক বছর আগে তিনি একটি মিয়াজাকি আমের চারা পান। সেই চারাকে ঘিরেই শুরু হয় এক নতুন যাত্রা। দীর্ঘদিন যত্ন, পরিচর্যা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে সেই গাছে ফল ধরেছে। আর সেই ফলই এখন কোটি টাকার সম্ভাবনা তৈরি করেছে তাঁর সামনে।
পিটিআই (Press Trust of India) -কে দেওয়া কথায় দেবা বলেন, ‘চার বছর আগে এক সমাজকর্মীর কাছ থেকে চারা পেয়েছিলাম। তখন ভাবিনি এমন কিছু হবে। এখন গাছে ফল এসেছে, কিন্তু কীভাবে বিক্রি করব সেটাই বুঝতে পারছি না।’ তাঁর এই মন্তব্যেই উঠে এসেছে এক বাস্তব চিত্র—দামি ফসল ফলালেও বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বাজারের চিন্তার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে, নিরাপত্তা। মিয়াজাকি আমের উচ্চমূল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই চুরির আশঙ্কা বেড়েছে। দেবা জানিয়েছেন, ‘এখন প্রায় প্রতিদিনই গাছের পাশেই ঘুমোতে হচ্ছে। এত দামী ফল, কখন কে নিয়ে যাবে সেই ভয় কাজ করছে।’ ফলে দিনের পর দিন নির্ঘুম রাত কাটছে তাঁর।
এই আমের বিশেষত্বই তাকে এত মূল্যবান করে তুলেছে। সাধারণ ভারতীয় আম যেখানে হলুদ বা সবুজ রঙের হয়, সেখানে মিয়াজাকি আম পেকে গেলে গাঢ় লাল হয়ে ওঠে। উজ্জ্বল রঙ এবং নিখুঁত আকৃতির কারণে অনেকেই একে ‘ডাইনোসরের ডিম’ বলেও উল্লেখ করেন। জাপানে এই আমকে অত্যন্ত অভিজাত ফল হিসেবে দেখা হয় এবং প্রায়ই নিলামে উচ্চ দামে বিক্রি হতে দেখা যায়। গুণগত দিক থেকেও এই আম অনন্য। প্রতিটি আমের ওজন সাধারণত ৩৫০ গ্রামের বেশি হয় এবং এতে চিনির পরিমাণ অন্তত ১৫ শতাংশ থাকে। ফলে স্বাদে এটি অত্যন্ত মিষ্টি ও সুস্বাদু। জাপানে এই আম বাজারে তোলার আগে কঠোর মান যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। শুধুমাত্র রঙ, স্বাদ এবং আকৃতিতে নিখুঁত আমগুলিকেই ‘এগস অফ দ্য সান’ (Eggs of the Sun) নামে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
দেবার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ফলের বিপণন। তিনি জানেন না কোথায় এই আম বিক্রি করবেন বা কত দাম দাবি করা উচিত। কারণ, এই ধরনের ফল সাধারণ বাজারে বিক্রি হয় না। বিলাসবহুল ফলের দোকান, রপ্তানিকারক সংস্থা, সংগ্রাহক কিংবা উচ্চমানের হোটেল-রেস্তোরাঁতেই সাধারণত এই আমের চাহিদা থাকে। ফলে সঠিক যোগাযোগ ও পরিকাঠামোর অভাবে সম্ভাব্য বড় আয়ের পথ এখন অনিশ্চিত। স্থানীয় প্রশাসন বা কৃষি দপ্তরের সহায়তা পেলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ, এই ধরনের বিরল চাষ শুধু একজন কৃষকের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। যদি সঠিকভাবে বাজার তৈরি করা যায়, তবে ভবিষ্যতে আরও কৃষক এই ধরনের উচ্চমূল্যের ফল চাষে আগ্রহী হতে পারেন।
ওড়িশার মতো রাজ্যে যেখানে এখনও অনেক কৃষক প্রথাগত চাষের উপর নির্ভরশীল, সেখানে দেবা পাধিয়ামির এই উদ্যোগ এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। সীমিত সম্পদের মধ্যেও নতুন ফসলের চাষ যে সম্ভব, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। তবে সেই সাফল্যকে অর্থনৈতিক লাভে পরিণত করতে গেলে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং বাজার সংযোগ। বর্তমানে তাঁর বাগানের দিকে কৌতূহলী মানুষের নজর বাড়ছে। আশপাশের এলাকাতেও এই খবর ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। ফলে যেমন প্রশংসা মিলছে, তেমনই বাড়ছে উদ্বেগও। এই পরিস্থিতিতে দেবা শুধু একটি বিষয়ই চাইছেন, তাঁর পরিশ্রমের সঠিক মূল্য এবং ফসলের নিরাপত্তা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Manipur Cobra Deployment | মণিপুরে প্রথমবার কোবরা কমান্ডো মোতায়েন! সহিংসতার মাঝে বড় সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের



